সম্পাদকের কলমে
শিউলি ঝরে ভোরের বুকে কাশের বনে হাওয়া,—
নীল আকাশে সাদা মেঘে মায়ের পথ চাওয়া।
ঢাকের তালে মন যে নাচে, বাজে আগমনী গান,
দেবীপক্ষের আলোয় ভরে বাঙালির মন-প্রাণ।
মা আসেন সিংহে চড়ে, আলো নিয়ে সাথে,
অশুভ যত দূরে সরুক শুভের নির্মল হাতে।
মায়ের দশটি হাতের মাঝে দেখি শক্তির কত রূপ,
ভয়কে জয়, - এগিয়ে চলা এই তো মায়ের স্বরূপ।
শুধু কি মা মণ্ডপে আসেন? আসেন মনের ঘরে,
ভাঙা মনে জুগিয়ে সাহস আশার সোপান গড়ে।
সব বাঙালির হৃদয়ে জুড়ে উৎসবেরই রং,
শরৎ দিনের শারদ হাওয়ায় খুশির অনুরণন।
ঠাকুমার সেই পুজোর গল্প, মায়ের হাতের ভোগ,
বিজয়ার দিনে আপন ক'রে জড়িয়ে ধরার যোগ।
প্রজন্ম পেরিয়ে সেই ঐতিহ্য থাকুক অমলিন,
বাংলা ভাষার মায়াবী সুর হোক চিরনবীন।
বর্ণে বর্ণে লিখি আজ তাই শিকড় ছোঁয়ার গান,
“দেবীপক্ষ” হোক সবার মনে আলোর আহ্বান।
অশুভ যত মুছে যাক আজ, দূর হোক সব ভয়,
মানুষ যেন মানুষের তরে ভালোবাসাময় হয়।
শরৎ আসুক বারেবারে, মা আসুন ঘরে,
বাংলা থাকুক বুকের মাঝে বর্ণে বর্ণে-র অক্ষরে।
শুভ হোক দেবীপক্ষ, শুভ হোক শারদীয়া
মায়ের আশিসে জ্বলে উঠুক প্রতিটি প্রাণের দিয়া।।"-
বর্ষার মেঘ, বৃষ্টির শব্দ আর সবুজের স্নিগ্ধতাকে সঙ্গে নিয়ে বর্ণে
বর্ণে-র আগের সংখ্যা “চিরসবুজ” আপনাদের কাছে পৌঁছেছিল। প্রকৃতির সেই সবুজ
আবেশ পেরিয়ে আজ আমরা এসে দাঁড়িয়েছি শরতের দোরগোড়ায়।
শিউলির গন্ধে ভোরের বাতাস যখন নরম হয়ে আসে, কাশফুলের দোলায় যখন শরতের
আকাশ তার শুভ্রতার বার্তা পাঠায়, তখনই মন বলে ওঠে - মা আসছেন। চারদিকে
যেন এক অদৃশ্য আনন্দের আবেশ। ঢাকের মৃদু আওয়াজ, ধূপের গন্ধ, উলুধ্বনি আর
মায়ের আগমনী সুরে বাঙালির হৃদয় জেগে ওঠে এক চিরপরিচিত আবেগে। এই
সময়টিই আমাদের দেবীপক্ষ। আলো, শক্তি, মঙ্গল ও নতুন আশার এক পবিত্র
অধ্যায়।
দেবীপক্ষ শুধু একটি ধর্মীয় সময় নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য,
স্মৃতি ও শিকড়ের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হওয়ার সময়। মা দুর্গার আগমন
আমাদের মনে করিয়ে দেয় অশুভের বিরুদ্ধে শুভের, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর
এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই চিরন্তন। তাই দেবীপক্ষের মাহাত্ম্য
আমাদের জীবনে কেবল পূজার আচারেই সীমাবদ্ধ নয়; তার গভীরে রয়েছে
মানবিকতা, সাহস, ঐক্য এবং ভালোবাসার শিক্ষা।
আমাদের পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যা আসলে বাঙালির জীবন ও অনুভূতির এক একটি
ঋতুচিত্র। “চিরসবুজ”-এ ছিল বর্ষার রং, প্রকৃতির নিবিড়তা এবং জীবনের নানা
গল্প। আর “দেবীপক্ষ”-এ আমরা তুলে ধরতে চেয়েছি শরতের সেই চিরন্তন
বাঙালিয়ানা, যেখানে উৎসব আছে, আবেগ আছে, সাহিত্য আছে, স্মৃতি আছে, আছে
আমাদের সংস্কৃতির গভীর শিকড়।
“বর্ণে বর্ণে”-র এই দেবীপক্ষ সংখ্যা সেই চিরচেনা বাঙালিয়ানার আবহকে আরও
একবার আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চায়। আমাদের ভাষা, সাহিত্য, কবিতা,
লোকসংস্কৃতি, রান্নাবান্না, উৎসব, স্মৃতি এবং বাঙালির জীবনযাপনের নানা
রঙ; সবকিছুকে এক সুতোয় গেঁথে এই পত্রিকার পথচলা।
আজ পৃথিবী অনেক ছোট হয়ে এসেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে দূরের মানুষও
মুহূর্তে কাছে চলে আসে। কিন্তু এই দ্রুত বদলে যাওয়া সময়ের মধ্যেই যেনো
কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অনেক
পরিচিত শব্দ। আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ে আমরা হয়তো অনেক দূরে চলে
যাচ্ছি আমাদের পরিচিত শিকড় থেকে। নতুন প্রজন্মের হাতে স্মার্টফোন আছে,
পৃথিবীটা তাদের কাছে হাতের মুঠোয়; কিন্তু সেই পৃথিবীর ভিড়ে যেন হারিয়ে
না যায় বাংলা ভাষার মাধুর্য, রবীন্দ্রনাথের গান, নজরুলের বিদ্রোহ, শরতের
কাশবন, ঠাকুরদালানের স্মৃতি কিংবা পুজোর দিনের সেই একান্ত বাঙালি
অনুভূতি।
আমাদের বিশ্বাস, সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হল তাকে
পরবর্তী প্রজন্মের হাতে ভালোবাসা দিয়ে তুলে দেওয়া। নতুন প্রজন্ম হয়তো
জানে পৃথিবীর নানা দেশের গল্প, কিন্তু তাদের নিজেদের শিকড়ের গল্পটুকুও
যেন তারা জানে, - এই ইচ্ছাটুকু আমাদের বর্ণে বর্ণে-র পথচলার অন্যতম
প্রেরণা।
এই কারণেই “বর্ণে বর্ণে” কেবল একটি পত্রিকা নয়; এটি আমাদের স্মৃতির
আয়না, আমাদের সংস্কৃতির ছোট্ট এক আশ্রয় এবং বাংলা ভাষার প্রতি
ভালোবাসার একটি আন্তরিক প্রয়াস। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন,
বাংলাকে হৃদয়ে ধারণ করার যে আনন্দ এই পত্রিকার প্রতিটি পাতায়, - আমরা
সেই আনন্দটুকুই ভাগ করে নিতে চাই।
দেবীপক্ষের এই শুভক্ষণে আমাদের একটাই প্রার্থনা - মায়ের আশীর্বাদে সকলের
জীবন ভরে উঠুক শান্তি, সুস্থতা, আনন্দ ও সম্প্রীতিতে। দূর হোক সমস্ত
অশুভ, সংকীর্ণতা ও বিভেদ। আমাদের সন্তানরা জানুক তাদের শিকড়ের কথা,
ভালোবাসুক বাংলা ভাষাকে, আর গর্বের সঙ্গে বলুক- আমি বাঙালি, বাংলা আমার
ভালোবাসা।
শরতের নীল আকাশের নিচে, কাশফুলের শুভ্রতায়, ঢাকের বাদ্যির তালে এবং
মায়ের আগমনী সুরে আপনাদের সকলকে জানাই দেবীপক্ষের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও
শারদীয় প্রীতি।
শুভ দেবীপক্ষ।
শুভ শারদীয়া।
বাংলা বেঁচে থাকুক আমাদের 'বর্ণে বর্ণে'-র প্রতিটি অক্ষরে, প্রতিটি
শব্দে, প্রতিটি বাক্যে এবং অবশ্যই প্রতিটি হৃদয়ে।
নমস্কারান্তে —
অনিন্দিতা গুড়িয়া,
সম্পাদক, নিউ-দিল্লি
প্রসেনজিৎ দাস,
যুগ্ম-সম্পাদক, পশ্চিম মেদিনীপুর
বর্ণে বর্ণে- বাংলা ই পত্রিকা ৩য় বৎসর, ৩য় সংখ্যা
দেবীপক্ষ ১৪৩৩,/ অক্টোবর ২০২৬