নারী জাগরণের অপর নাম দুর্গাপূজা
অরুন্ধতী রায়,
বেহালা, কলকাতা
দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি নারীশক্তির (Women
Empowerment) এক অনন্য প্রতীক ও সামাজিক অনুষ্ঠান উদযাপনের ক্ষেত্র।
ভারতীয় সংস্কৃতিতে দেবী দুর্গাকে বিবেচনা করা হয় পরম শক্তি, সাহস এবং
ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে, যা সরাসরি নারীক্ষমতায়নের মূল ভাবনার সাথে
সংযুক্ত।
নিচে দুর্গাপূজা কীভাবে নারীশক্তির প্রতীক, তা ব্যাখ্যা করা হলো:
১. অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে নারীশক্তির উত্থান:
পুরাণ মতে, মহিষাসুর নামক রাক্ষস যখন দেবালয় ও মর্ত্যে অন্যায় ও অত্যাচার
চালিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল, তখন কোনো পুরুষ দেবতা তাকে পরাজিত করতে
পারেননি। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের সম্মিলিত তেজ থেকে আবির্ভূত হন
দেবী দুর্গা। তিনি একাই সেই মহাক্রমশালী অত্যাচারী শক্তিকে বিনাশ করেন।
এই রূপকটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, প্রয়োজন ও সংকটের মুহূর্তে নারী দুর্বল
বা অবলা নয়; বরং সে-ই সমাজ থেকে অন্যায় ও নিপীড়ন দূর করার প্রধান শক্তি
হতে পারে।
২. বহুমাত্রিক ভূমিকার সমাহার (Multitasking):
দেবী দুর্গার দশ হাত এবং দশটি অস্ত্র তাঁর বহুমুখী ক্ষমতার প্রতীক।
আধুনিক যুগে নারীরা যেভাবে একই সাথে গৃহস্থালি, কর্মক্ষেত্র, মাতৃত্ব এবং
সামাজিক দায়িত্ব সমান দক্ষতায় সামলান, দেবী দুর্গার দশভুজা রূপটি সেই
বহুমাত্রিক ক্ষমতারই প্রাচীন প্রতীকী প্রতিচ্ছবি।
৩. শক্তি ও করুণার অপূর্ব মিশ্রণ:
দেবী দুর্গা একই সাথে 'মহিষাসুরমর্দিনী' (সংহারকারী রূপ) এবং
'জগদ্ধাত্রী' বা সন্তানবৎসলা মা। লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশকে
সাথে নিয়ে তিনি মর্ত্যে আসেন। এই চিত্রটি প্রমাণ করে যে একজন নারী যেমন
পরিবারের প্রধান কান্ডারী এবং মমতা ও স্নেহের উৎস, তেমনি প্রয়োজনবোধে
সমাজ ও সংসারের সুরক্ষায় তিনি হয়ে উঠতে পারেন কঠোর রণচণ্ডী।
৪. সমাজে নারীর নেতৃত্বের স্বীকৃতি:
দুর্গাপূজায় ঈশ্বরকে ‘পিতা’ হিসেবে নয়, ‘মাতা’ বা 'মেয়ে' রূপে আরাধনা করা
হয়। ঘরের মেয়ে উমা যেভাবে বাপের বাড়িতে ফিরে আসে, সেই ভাবাবেগই এই উৎসবের
প্রাণ। একটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পরম শক্তিকে নারী রূপে কল্পনা করা এবং
দেবীর সামনে ধ্যানস্থ হওয়া নারীদের সামাজিক মর্যাদা ও নেতৃত্বের এক বড়
স্বীকৃতি।
৫. আধুনিক উৎসবে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষমতায়ন:
বর্তমানে দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
পূজার মণ্ডপ তৈরি, থিম প্রতিমা তৈরি, ঢাক বাজানো থেকে শুরু করে পুরোহিত
হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। সিঁদুর খেলার মতো প্রথাগুলো এখন
সমস্ত নারী (একক, বিধবা, ট্রান্সজেন্ডার)—সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে
নারীসংহতির এক বড় মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, দেবী দুর্গা হচ্ছেন আত্মবিশ্বাস, স্বাবলম্বিতা,
প্রতিরোধ এবং মাতৃসত্তার প্রতীক। তাই দুর্গাপূজা নারীশক্তির অন্তর্নিহিত
ক্ষমতাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার এবং সমাজে নারীর অধিকার ও সমতার সামাজিক
বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতীক।