টুসু উৎসব বা মকর পরব
স্বাতী নাথ,
বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ
এটি একটি লোকউৎসব, যা বাংলা অগ্রহায়ণ মাসের শেষ দিনে শুরু হয় আর শেষ
হয় পৌষ সংক্রান্তি বা মকর-সংক্রান্তির পুণ্যলগ্নে। টুসু এক লৌকিক দেবী
যাকে কুমারী হিসেবে কল্পনা করা হয় বলে প্রধানত কুমারী মেয়েরা টুসুপূজার
প্রধান ব্রতী ও উদ্যোগী হয়ে থাকে।
এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পুরুলিয়া জেলা,ঝাড়গ্রাম জেলা,বাঁকুড়া
জেলা,পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা এবং ঝাড়খণ্ড রাজ্যের পূর্ব সিংভূম
জেলা,পশ্চিম সিংভূম জেলা, সাঁওতাল পরগনা, ধানবাদ জেলা,সরাইকেল্লা খরসোয়া
জেলা, রাঁচি ও হাজারিবাগ জেলার এবং ওড়িশা রাজ্যের ময়ূরভঞ্জ
জেলা,সুন্দরগড় জেলা,কেন্দুঝর জেলা এর কৃষিভিত্তিক উৎসব।
টুসু শব্দের উৎপত্তি নিয়ে অনেক মতভেদ আছে।অনেকেই বলেন টুসু শব্দটি এসেছে
ধানের তুষ থেকে। কিন্তু রাঢ়ভূমের বিখ্যাত লেখক বিপ্লব মাহাতো তাঁর এক
লেখায় বলেছেন টুসু শব্দটি তুষ থেকে আসেনি। কারণ তুষকে কুড়মালি ভাষায় বলা
হয় ভুসা। তিনি বলেছেন কুড়মালি ভাষায় 'টুসটুইসা' বা ঠুসল শব্দ থেকেই টুসুর
আগমন।কারণ টুসু শব্দের অর্থ পরিপূর্ণ ধান যা বংশবৃদ্ধি করতে সক্ষম। আবার
কেউ বলে
টুসু শব্দটি তুষ থেকে এসেছে। ধানের তুষ যাদুক্রিয়ার যেমন অঙ্গ তেমনি মৃত
ধানেরও প্রতীক। টুসুকে জলে বিসর্জন দেওয়ার অর্থ হল তাঁকে কবর দেওয়া।
আদিম মানুষ মৃত্যু ও পুনর্জন্মকে পরস্পরের সম্পর্কযুক্ত দুটি ঘটনার
অতিরিক্ত কিছু মনে করত না।
সাঁওতালরা টুসু পরব পালন করে, যা মূলত ফসল কাটার আনন্দ উদযাপনের একটি
লোকউৎসব। এই পরব অগ্রহায়ণ মাসের সংক্রান্তিতে শুরু হয়ে পৌষ সংক্রান্তির
দিনে শেষ হয়। মূলত কুমারী মেয়েরা এই পরবে প্রধান ভূমিকা পালন করে এবং
এর সাথে নানা গান, নাচ ও প্রতিমা বিসর্জনের মতো কার্যক্রম যুক্ত
থাকে।
টুসু উৎসব অগ্রহায়ণ সংক্রান্তি থেকে পৌষ সংক্রান্তি পর্যন্ত এক মাস ধরে
পালিত হয়। ধানের ক্ষেত থেকে এক গোছা নতুন আমন ধান মাথায় করে এনে খামারে
( যেখানে ধান কেটে এনে রাখা হয়, ঝাড়াই হয়) পিঁড়িতে রেখে দেওয়া হয়।
অগ্রহায়ণ মাসের সংক্রান্তির সন্ধ্যাবেলায় গ্রামের কুমারী মেয়েরা একটি
পাত্রে চালের গুঁড়ো লাগিয়ে তাতে তুষ রাখেন। তারপর তুষের ওপর ধান,
কাড়ুলি বাছুরের গোবরের মণ্ড, দূর্বা ঘাস, আল চাল, আকন্দ, বাসক ফুল, কাচ
ফুল, গাঁদা ফুলের মালা প্রভৃতি রেখে পাত্রটির গায়ে হলুদ রঙের টিপ
লাগিয়ে পাত্রটিকে পিড়ি বা কুলুঙ্গীর ওপর রেখে স্থাপন করা হয়। পাত্রের
এই পুরো ব্যবস্থা প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে টুসু দেবী হিসেবে পূজিতা হন।পৌষ
মাসের প্রতি সন্ধ্যাবেলায় কুমারী মেয়েরা দলবদ্ধ হয়ে টুসু দেবীর নিকট
তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অভিজ্ঞতা সুর করে নিবেদন করেন ও দেবীর
উদ্দেশ্যে চিঁড়ে, গুড়, বাতাসা, মুড়ি, ছোলা ইত্যাদি ভোগ নিবেদন
করেন।
টুসু উৎসব পালনের সময় পৌষ মাসের শেষ চারদিন চাঁউড়ি, বাঁউড়ি, মকর এবং
আখান নামে পরিচিত। চাঁউড়ির দিনে গৃহস্থ বাড়ির মেয়েরা উঠোন গোবরমাটি
দিয়ে নিকিয়ে পরিষ্কার করে চালের গুঁড়ো তৈরী করা হয়। বাঁউড়ির দিন
অর্ধচন্দ্রাকৃতি, ত্রিকোণাকৃতি ও চতুষ্কোণাকৃতির পিঠে তৈরী করে তাতে
চাঁছি, তিল, নারকেল বা মিষ্টি পুর দিয়ে ভর্তি করা হয়। স্থানীয় ভাবে এই
পিঠে গড়গড়্যা পিঠে বা গড়গড়ে পিঠে বা বাঁকা পিঠে বা উধি পিঠে ও পুর
পিঠা নামে পরিচিত। বাঁউড়ির রাত দশটা থেকে টুসুর জাগরণ অনুষ্ঠিত হয়ে
থাকে। মেয়েরা জাগরণের ঘর পরিষ্কার করে ফুল, মালা ও আলো দিয়ে সাজায়। এই
রাতে কিশোরী কুমারী মেয়েরা ছাড়াও গৃহবধূ ও বয়স্কা মহিলারাও টুসু গানে
অংশগ্রহণ করেন। এই রাতে টুসু দেবীর ভোগ হিসেবে নানারকম মিষ্টান্ন,
ছোলাভাজা, মটরভাজা, মুড়ি, জিলিপি ইত্যাদি নিবেদন করা হয়।
পৌষ সংক্রান্তি বা মকরের ভোরবেলায় মেয়েরা দলবদ্ধভাবে গান গাইতে গাইতে
টুসু দেবীকে বাঁশ বা কাঠের তৈরী রঙিন কাগজে সজ্জিত চৌডল বা চতুর্দোলায়
বসিয়ে নদী বা পুকুরে নিয়ে যান। সেখানে প্রত্যেক টুসু দল একে অপরের
টুসুর প্রতি বক্রোক্তি করে গান গাইতে দেবী বিসর্জন করে থাকেন। টুসু
বিসর্জনের পরে মেয়েরা নদী বা পুকুরে স্নান করে নতুন বস্ত্র পরেন। ছেলেরা
খড়, কাঠ, পাটকাঠি দিয়ে ম্যাড়াঘর বানিয়ে তাতে আগুন লাগান।
টুসু উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ টুসু সংগীত। এই সংগীতের মূল বিষয়বস্তু
লৌকিক ও দেহগত প্রেম। এই গান গায়িকার কল্পনা, দুঃখ, আনন্দ ও সামাজিক
অভিজ্ঞতাকে ব্যক্ত করে। কুমারী মেয়ে ও বিবাহিত নারীরা তাদের সাংসারিক
সুখ দুঃখকে এই সঙ্গীতের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন। গানের মাধ্যমে মেয়েলি
কলহ, ঈর্ষা, অভীপ্সা, দ্বেষ, ঘৃণা স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করা হয়। এছাড়া
সমকালীন রাজনীতির কথা ব্যাপক ভাবে এই গানে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এই
সমস্ত গানে পণপ্রথা, সাক্ষরতা সম্বন্ধে সচেতনতা, বধূ নির্যাতনের
বিরুদ্ধতা প্রভৃতি সামাজিক দায়িত্বের কথাও বলা হয়।।
টুসু গীতকে ভনিতাযুক্ত ও ভনিতাবিহীন এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।
ভণিতাবিহীন টুসু গীতকে মূল টুসু পদ এবং টুসু পদের রঙ এই দুইটি অংশে ভাগ
করা যায়। টুসু পদের রঙ অংশটি কখনো মূল পদের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে রচনা করা
হয়, কখনো বা স্বতন্ত্র ভাবে রচিত হয়। ভণিতাবিহীন টুসু পদ মূলতঃ চার
চরণে বাঁধা থাকে, যার মধ্যে রঙের জন্য মাত্র দুইটি চরণ নির্দিষ্ট থাকে
ঝাড়খণ্ড রাজ্য ও পুরুলিয়া জেলার অধিকাংশ স্থানে পুরাতন প্রথা অনুযায়ী
টুসু উৎসবে কোন মূর্তির প্রচলন নেই, কিন্তু পুরুলিয়া
জেলার বান্দোয়ান থানা এবং বাঁকুড়া জেলার খাতড়া থানার পোরকুলের টুসু
মেলায় টুসু মূর্তির প্রচলন রয়েছে। বিভিন্ন ভঙ্গীতে অশ্ব বাহিনী বা
ময়ূর বাহিনী মূর্তিগুলির গায়ের রঙ হলুদ বর্ণের ও শাড়ি নীল রঙের হয়ে
থাকে। মূর্তির হাতে কখনো শঙ্খ, কখনো পদ্ম, কখনো পাতা বা কখনো বরাভয়
মুদ্রা দেখা যায়।
আমি বাঁকুড়া জেলার সোনামুখী এবং বর্ধমান জেলার পানাগড়, রণডহা, দুর্গাপুরে
বড় হয়েছি বাবার চাকরি সূত্রে তাই এই উৎসব আমি দেখেছি এবং টুসু বিসর্জনে
অংশ ও নিয়েছি, খুব আনন্দ হয়, দামোদর, শিলাই, কংসাবতি নদীর তীরে এইদিন
মেলা হয় প্রচুর লোকের সমাগম হয়, সাঁওতাল ছাড়াও এখানকার গ্রামের মানুষ ও
একমাস ধরে টুসু পুজো করে মাটির পাত্র যার চার ধারে প্রদীপ ধাকে তাতে ফুল
ধানের বীজ ছড়িয়ে রাখে এবং এই একমাসে সেগুলো চারায় পরিণত হয় মকর পরব মানে
পৌষ সংক্রান্তি র দিনে প্রদীপ গুলো জ্বালিয়ে ওই টুসু পাত্র নিয়ে গান
গেয়ে দল বেঁধে নদী তে যায়, টুসু বিসর্জন করে স্নান করে এবং নদীর ধারে
মুড়ি তেলেভাজা, পাঁপড় , জিলাপি ইত্যাদি খায়, ঘরে ঘরে বিভিন্ন রকমের পিঠে
তৈরী হয়, টুসু গান এখন খুব প্রসিদ্ধ হয়েছে বিভিন্ন সংগীত কারে আর ইউ
টিউবের দৌলতে,
যেমন
"১
আমরা পোষ পরবে টুসু পাতিব
আমরা টুসুর পুজা করিব
চল সরদা চল বরদা কুলি তে মন মাতাবো
কুলির জলে সিনান কইর্যে বরদা চুল সুকাবো"
২.
উঠান ভরা আল্পনা গুলা ভরা ধান
গাও গো টুসুর গান দেখো পরব লেইঁগেছে
মকর পরবে মদনা ছোড়া ধামসা বাজাইছে
টুসু মণি ধামসার তালে কেমন দেখ কাচি
৩.
টুসু হামার খায় না কিছু
সুকাইঁ গেল চাঁদ বদন
রাত হইলে চাঁদ ধইর্যে দিব
কাঁইন্দ নাগো টুসু ধন
বেলা হইঁল ঝিকিমিকি
তুবু টুসু ওঠেনা, আইস টুসু
চেতন করো আমায় জালা দিও না
মোদের মনের এই বাসনা
টুসু ধনকে জলে দিব না
৪জল জল কর টুসু জলে
তোমার কি আছে মনে তে
ভাবিয়া দেখো জলে সসুর ঘর আছে।
৪.
চল টুসু খেলতে যাবো রানীগঞ্জের বটতলা
অমনি পথে দেখাই আইনব কয়লাখাদের জল তুলা
উলোট পালট ফুলুট বাঁশিতে
আমার মন মানে না ঘরেতে ...’
আবার এ গানেরই শেষের লাইনে সেই জীবিকার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে শহরে যাওয়ার
ব্যথা, টুসুর কাছে কিন্তু কোনো চাওয়া নেই , রূপণ দেহি , ধনং দেহি নেই ,
জমিতে ধান না হওয়ার জন্যে কোনো অভিযোগ নেই , বরং তাকে সঙ্গী করেই চলুক
জীবন সংগ্রাম –
‘ চল টুসু চল টাটা যাবো
ধান হইল না কি খাবো ’
।নতুন ফসল ঘরে আসার আনন্দ এবং কৃষিভিত্তিক সমাজের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির
একীভূত রূপ এটি।সাঁওতালদের পাশাপাশি কুর্মি, ভূমিজ, মুন্ডা সহ আরও অনেক
সম্প্রদায় এই পরব পালন করে।টুসু গান এই উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ,
যেখানে মেয়েদের জীবন ও অনুভূতি প্রকাশিত হয়।
টুসু এক কুমারী কন্যা। এর পূজাও করেন কুমারী কন্যারা। আমরা যাদের
নিম্নবর্গের মানুষ বলি সেই তাদের বাড়ির কুমারী কন্যারা। কিন্তু এ পূজার
কোনো মন্ত্র তন্ত্র , নেই নির্ধারিত ক্রিয়া-কর্ম , কোনো বিশেষ উপাচারও
নেই। অঘ্রান মাসের শেষ দিন থেকে পৌষ মাসের শেষ দিন অবধি রাঢ় বাংলার
প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে এই টুসু পূজিত হন ।যে হেতু মন্ত্র তন্ত্র নেই ,
তাই এ পূজায় কোনো ব্রাহ্মণের প্রয়োজন হয় না। সন্ধ্যাবেলায় গ্রামের
‘অশিক্ষিত’ মেয়েরা নিজেদের সাজানো রঙিন কাগজের চৌদলের উপর প্রতিষ্ঠিতা
পোড়ামাটির টুসুর মূর্তির সামনে বসে নানা রকমের গান বাঁধেন আর সেই গান
করেন কখনো সম্মিলিত কখনো একক কণ্ঠে। সে গানে টুসুর মহিমা কীর্তন শুধু নয়
, থাকে তাদের যাপিত জীবনের সাধ আহ্লাদ , আশা নিরাশা , ঠাট্টা তামাশার
কথা। এবং তাতে ছায়া ফেলে তাদের ঘিরে থাকা আধুনিক সময় , এবং তাদের
গাঁ-ঘরের পারিপার্শ্বিক। কখনো থাকে ক্ষোভ প্রতিবাদ , কখনো থাকে দুঃখ
বিষাদ।এক মাস ধরে এই মন্ত্রহীন পূজার শেষে মকর সংক্রান্তির দিন ব্যথিত
হৃদয়ে তাদের ঘরের মেয়ের প্রাণের প্রতিমা কে তারা বিসর্জন দিয়ে আসে
তাদের কাছের কোনো এক নদী অথবা পুকুরে। কোল, মুন্ডা, ওরাওঁ, সাঁওতাল,
মুন্ডা, ভূমিজ, ভুঁইয়া, কুর্মি, মাহাতো ,বাউরী বাগদী মহিলারা এই পুজো
করেন। কিন্তু আশ্চর্য লাগে এই ভেবে গোটা পূজার্চনার ব্যাপারটা পরিচালিত
হয় এই শ্রেণীর মহিলাদের দ্বারা আর এই উৎসবের প্রধান আকর্ষণ এই মেয়েদের
তাৎক্ষনিক ভাবে রচিত রচিত গান। নতুন ফসল ঘরে আসার খুশি উদযাপনের এর চেয়ে
সুন্দর রূপ আর কি বা হতে পারে।