তীরে ফেরা ঢেউ (পর্ব- ৯)
অনিন্দিতা গুড়িয়া,
নিউ-দিল্লি
পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য
লাইব্রেরি
বিভাগে দেখুন...
- সৈকত তোমার পাশে থাকলে বিশ্বজয় করতে পারবে তুমি, সে আমি তোমার আর
সৈকতের কথাবার্তা আর তোমার প্রাণ খোলা হাসি শুনেই বুঝে ছিলাম। কিন্তু
স্বপ্না মাসির কথা কি একেবারেই উড়িয়ে দেব মা! তোমার আর সৈকতের মধ্যে কি
কেবলমাত্র খালপাড়ের বস্তির বাচ্চাদের পড়ানোর সম্পর্ক? না কি তার বাইরেও
আরো কিছু আছে, তা আমার জানতে ইচ্ছে করছে।
- ওরে আমার পাগল মেয়ে, স্বপ্না কি বলল; কি বলল না, সেই শুনেই তুই মাথা
ঘামাচ্ছিস! আমার বয়সের কথাটা একবার খেয়াল রাখিস।
মা আমার কাছে বয়স মানে কেবলমাত্র একটা সংখ্যা, মনটাই আসল। সত্যিই যদি
তোমার মনে সৈকতের জন্য কোন জায়গা থাকে আমাকে তুমি খোলাখুলি বলতেই পারো।
আর জানো তো বাচ্চারা বড় হয়ে যাওয়া মানে তারা বন্ধুর মতো হয়ে যায়,
এখন তুমি আমাকে বন্ধু ভাবতেই পারো।
বুকে একরাশ অভিমান নিয়ে উর্মিলা তাকালো উর্মীর দিকে, তারপর খুব
শান্তভাবে বলল
- শুধু বাচ্চারা বড় হয়ে গেলে মায়ের বন্ধু হতে পারে, কখনো কি মায়েরা
বাচ্চাদের বন্ধু হয়ে উঠতে পারে না?
- কি বলতে চাইছো তুমি মা?
- কি বলতে চাইছি সেটা তোর থেকে ভালো কেউ জানে না উর্মি, কখনো তুই তোর
মনের কথা আমার সাথে শেয়ার করেছিস আমাকে বন্ধু ভেবে! না কখনোই তা করিস
নি, বরাবরই আমাকে দূরে সরিয়ে রেখে দিয়েছিস।
বিস্ময়ে উর্মি তাকিয়ে থাকে উর্মিলার দিকে, কি বলতে চাইছে মা! তবে কি
উর্মির বুকের ভেতরটা আজকে দেখতে পাচ্ছে উর্মিলা! না না তা কেমন করে হবে,
আজ এতগুলো বছরের কোন কথা যখন সে কাউকেই জানতে দেয়নি আজকেও সবার থেকে
গোপন করেই রাখতে হবে তাকে। এ যদি তার সুখ হয় তো শুধুই তার। এ যদি তার
দুঃখ হয় সেটুকুও শুধুই তার। অন্য কারোর এতে কোন অধিকার নেই। আর এই সুখ
বা দুঃখ সবটাই তার নিজের চাওয়া। প্রসঙ্গ ঘোরাতে উর্মি হালকা ভাবে বলে
ওঠে
- আজকে রাতে কি খাওয়াচ্ছ বললে না তো? রাত তো অনেক হল, আজকে কি আর
রান্নাবান্না করবে না? নাকি দিনের বেলার মতো আবারও স্বপ্না মাসির হাতের
ট্যালট্যালে ঝোল ভাত খেতে হবে। আর তা না হলে তোমাদের হোমের ক্যান্টিনের
রুটি তরকারি। কোনটা পাচ্ছি আজকের ডিনারে?
- না সপ্নার হাতের ঝোলভাত তোকে খেতে হবে আর না তো আমি হোমের ক্যান্টিন
থেকে রুটি তরকারি আনতে যাচ্ছি। আমি সপ্না আর সিধু কেও ফোন করে আসতে বলে
দিয়েছি, কিছুক্ষণের মধ্যে ওরা ও এসে যাবে। আমরা চারজনে আজ একসাথে খাবার
খাব।
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় উর্মি,
- চারজনে একসাথে খাবার খাব! তাও কিছুক্ষণের মধ্যেই! কিন্তু রান্নাবান্না
কোথায়! তুমি কি আজকাল জাদুর লাঠি হাতে পেয়েছ নাকি মা? ছড়ি ঘোরাবে আর
খাবার মুখের সামনে হাজির হয়ে যাবে!
- জাদুর লাঠি পাবো কেন? সবটাই আমার হাতের করা রান্না। ওবেলা সৈকতের
বাড়িতে যা যা রান্না করেছিলাম সবকিছুই সৈকত নিজের হাতে টিফিন
ক্যারিয়ারে ভরে তুলে দিয়েছে আমাদেরকে খাওয়ার জন্য।
- ওহো আমি তো ভুলেই মেরে দিয়েছিলাম, আজকে তো আবার তোমার সৈকতের জন্মদিন।
স্পেশাল খাওয়া-দাওয়া তো হবেই।
হই হই করতে করতে উর্মির স্বপ্না মাসী আর সিধু মামাও এসে গেল।
- কই রে তোরা মা মেয়েতে কোথায় আছিস, আমার আবার ওষুধ খাওয়ার সময় হয়ে
গেল। খাবার কথা বলে ডেকে বাইরের ঘর অন্ধকার করে রেখেছিস কেন?
সিধু মামার গলা শোনা গেল।
দেশে ফেরা থেকে আজ অবধি সিধু মামার সাথে দেখা হয়নি উর্মীর। গত এক সপ্তাহ
ধরে সিধু হোমেরই কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে পুরি বেড়াতে গিয়েছিল।
আজই তার ফেরার কথা। সিধু মামার গলা শুনে উর্মি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল
না, আনন্দে আত্মহারা হয়ে সেই ছোট্ট বেলার ছোট্ট উর্মি হয়ে গেল।
- ও সিধু মামা, স্বপ্ন মাসি, তোমরা এসে গেছ, একটু দাঁড়াও আমি
আসছি........
বলেই উর্মি তাড়াতাড়ি করে বিছানা থেকে নেমে বাইরের ঘরের লাইট না
জ্বালিয়ে দরজা খুলতে গিয়ে এক বিপত্তি বাঁধিয়ে ফেলল। অন্ধকারে দেখতে না
পেয়ে পড়ে থাকা একটা ব্যাগের হাতলে উর্মির পা জড়িয়ে গেলে সে "উফ বাবা
গো"- বলে আছাড় খেয়ে পড়ে যায়। আর উর্মি এতে করে বেশ ভালই ব্যথা
পেয়েছে তার পায়ে।
ভিতরের ঘর থেকে উর্মিলা ও তটস্থ হয়ে দৌড়ে বেরিয়ে আসে,
- দেখি দেখি কোথায় লাগালি আবার, আমার হয়েছে যত জ্বালা! উফ এই বুড়ো
মেয়ের কান্ড দেখে আমি আর পারিনা। সব তাতেই তোর তাড়াহুড়ো না করলে চলে
না; তাই না রে?
মৃদু ধমক দেয় উর্মিলা। তারপর নিজেই লাইটের সুইচ অন করে দরজা খুলে ভেতরে
ঢুকতে দেয় সিধু আর স্বপ্নাকে।
একেতো উর্মি পায়ে চোট পেয়েছে। তার উপরে মায়ের বকুনি খেয়ে উর্মির মনেও
খুব ব্যথা লেগেছে। কিন্তু তবুও উর্মি কারোর সামনে ওর এই ব্যথা প্রকাশ
করবে না। তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়াতে যায়, আবারো উফ মাগো বলে পড়ে যেতে
গেলে সিধু স্বপ্না আর উর্মিলা তিনজন মিলেই প্রায় একসাথে উর্মিকে ধরে
ফেলে। তারপরে দেখে সত্যিই বেশ ভালই চোট লেগেছে তার পায়। সিধু বলে
- তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কি কান্ডটাই না করলি বলতো উর্মি, এই এত
রাত্রিবেলা এখন আবার কোন ডাক্তার ডাকতে যাব বলতো, এতো বেশ ভালই চোট
পেয়েছিস দেখছি।
সপ্না চোখ টিপে সিধুকে ইশারা করে তারপর সিধু উর্মিলার দিকে তাকিয়ে বলে
- উর্মিলা তোর ডাক্তারবাবুকে একবার খবর দে না রে, মনে হয় তোর ডাক্তারেরই
দরকার এখন।
উর্মিলা সৈকত কে ফোন করতে যাচ্ছিল কিন্তু উর্মি বলল
- দরকার নেই, সকালবেলা আমি ডাক্তার দেখিয়ে নেব। আমার এখন খুব খিদে
পেয়েছে খেতে দাও তো।
সিধু উর্মিকে ধরে ধরে খাবার টেবিলের চেয়ারে বসিয়ে দেয়। তারপর উর্মিলা
একে একে সবার খাবার সার্ভ করে। খাবার দেখে উর্মি তো খুশিতে ডগ-মগ হয়ে
যায়। সবই তার পছন্দের খাবার। উর্মি খাবার কি খাবে অভিমানে কান্নায় তার
গলা প্রায় বুজে আসতে থাকে।
- আমি আজ কদিন হলো দেশে ফিরেছি, এবারে তো একদিনও তুমি আমার জন্য এমন করে
রাঁধোনি। আমার সমস্ত পছন্দের খাবার তুমি আজকে তার জন্য রান্না করলে! আমার
থেকেও সে এখন তোমার কাছে বেশি প্রিয় মা।
উর্মিলা কিছু বলে না শুধু আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে খেয়ে নে,
খেয়ে দেখ কেমন হয়েছে খাবারগুলো। শুধু তার জন্য কেন করব, দেখছিস না
সমস্ত কিছুই তোরই পছন্দ করা খাবার। আর মনে মনে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে - কি
করি বল, ছেলেটা যে বড্ড একা! সব থেকেও আজ ওর কিছুই নেই।
উর্মী আর কথা বাড়ায় না আস্তে আস্তে খাবার খেতে থাকে। চারজনে ওরা বেশ
মজা করে খোশ গল্প করতে করতে খাবার খায়। সকলের খাবার খাওয়া প্রায় শেষের
পথে, এমন সময় উর্মি বলে
- কি গো মা, আজকে জন্মদিনের খাবার খাচ্ছি, কই জন্মদিনের স্পেশাল বস্তুটা
তো এখনো পাতে পেলাম না। পায়েস কোথায়?
- উর্মিলা বলল তুই উঠে যা হাতমুখ ধুয়ে আয় পায়েস টায়েস নেই।
অবাক হয়ে যায় উর্মি, জন্মদিনের খাবারে পায়েস নেই! তাও আবার হয় নাকি!
যাইহোক উর্মি আর বাক-বিতন্ডাতে জড়াতে চায় না। সারাদিনের পর মন ভরে পেট
ভরে খাবার খেয়েছে এই তার জন্য যথেষ্ট। ধীরে ধীরে উর্মি ওয়াস বেসিনে উঠে
গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নেয়। তারপর একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ধীরে ধীরে
নিজের বেডরুমে ঢুকে টেবিল থেকে একটা জার্নাল উঠিয়ে পড়া শুরু করে। মিনিট
পাঁচেকের মধ্যে সে বুঝতে পারে পায়ে তার বেশ ভালই লেগেছে। বেশ যন্ত্রণাও
হচ্ছে এবার। এই মুহূর্তে উর্মির মনে হচ্ছে একজন ডাক্তারকে দেখিয়ে নিতে
পারলে ভালই হতো। যদি হাড়ে খুব বেশি চোট পপায়! এই বয়সে এসে চোট ফেলে
রাখা কোন বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে খুব বেশি রাত
হয়নি তখনও। সবেই এগারোটা বাজে, একটা ক্যাব বুক করে সিধু মামাকে সঙ্গে
করে কাছে পিঠে কোন ডাক্তার-খানাতে যাওয়াই যায়। সেই কথা ভেবেই উর্মি
আবারো একবার ডাইনিং স্পেস এর খাবার টেবিলে উপস্থিত হয়। তখনো তিন বন্ধুতে
মিলে খাবার খাচ্ছে আর গল্প করে যাচ্ছে। কোথায় কোথায় সিধু বেড়িয়েছে,
কি কি দেখেছে, সবকিছুই গল্প করছে। আর বাঁ হাতে ফোনে স্ক্রিন ঠেলে ঠেলে
ছবিও দেখাচ্ছে সিধু মামা। খাবার টেবিলে পৌঁছে উর্মি বলতে যায়
- তোমরা এখনো খাবার খাচ্ছো?
কিন্তু তার কথা শেষ হয় না তার আগেই সে অবাক হয়ে দেখে তার মা আর সিধু
মামা যে পায়েস খেয়েছে তা তাদের প্লেট দেখে বোঝা যাচ্ছে আর তখনও স্বপ্না
মাসি তার প্লেটের অবশিষ্ট পায়েস আয়েস করে চেটে চেটে খাচ্ছে। তবে যে মা
তাকে পায়েস না দিয়ে উঠিয়ে দিল এ কেমন ব্যাপার! পায়েস খেতে তো উর্মি
সেই ছোট্টবেলা থেকে ভীষণ ভালোবাসে। উর্মিকে দেখে ভূত দেখার মত যেন চমকে
ওঠে উর্মিলা। একটু তুতলিয়ে তাড়াতাড়ি করে বলে উঠল
- তু....তুই এখানে? কি....কি ব্যাপার? এখনো ঘুমোস নি কেন ?
- তেমন কিছু নয়, আমার পায়ে বেশ ব্যথা করছে তাই সিধু মামাকে সঙ্গে করে
ডাক্তারখানায় যাওয়ার কথা চিন্তা করছিলাম।
- সেটা তো আমাকে তোর রুম থেকে চেঁচিয়ে বললেই পারতিস, পায়ের ব্যথা নিয়ে
উঠে আসার দরকারই ছিল না ।ঠিক আছে তুই রুমে যা আমি ব্যবস্থা করছি।
- না কষ্ট করে তোমাকে আর ব্যবস্থা করার দরকার নেই।
- এ তো তোর রাগের কথা বললি। তোর ব্যথা লাগছে তা তোর মুখ দেখি আমি খুব
বুঝতে পারছি। তোর ব্যথা যাতে লাঘভ হয় সেই চেষ্টাই করছি আমি। একটু
অপেক্ষা কর মা।
- আমার রাগ দেখাতে ভারি বয়েই গেছে। আর রাগ দেখাবো কাকে? যে আমার রাগের
তোয়াক্কা করে তাকেই তো রাগ দেখানো যায়, কি বলো মা? তুমি কি আমার রাগের
তোয়াক্কা করো মা? আমি পায়েস চাইলাম তুমি আমাকে পায়েস দিলে না আর এখন
তিনজন মিলে তোমরা আনন্দ করে পায়েস খাচ্ছ, এটা তোমার কি রকম বিচার বল
দেখি মা!
উর্মিলার মুখ থেকে ফস করে বেরিয়ে যায়
- এই পায়েস তোর খেতে নেই।
- মানে ?
কথা ঘোরাতে তাড়াতাড়ি করে উর্মিলা বলে
- আসলে পায়েস খুব অল্প ছিল তো তাই আমরা তিনজনে খেয়ে নিয়েছি। আর আমি তো
তোকে মজা করেই বলেছিলাম পায়েস নেই। তুই ও তো আর কিছু বললি না, উঠে চলে
গেলি।
উর্মি কথা বাড়ায় না, তার পায়ে এখন ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে। যন্ত্রণার
চোটে উর্মির চোখ থেকে প্রায় জল বেরিয়ে আসার যোগাড়। কোন রকমের দাঁতে
দাঁত চেপে বলল
- যা করার করো, আমার ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে।
সিধু আর স্বপ্না হাতমুখ ধুয়ে নিয়ে উর্মিকে ধরে ধরে উর্মির বেডরুমে
নিয়ে যায় আর উর্মিলা ততক্ষণে সৈকত কে কল করে দিয়েছে। মিনিট ১৫-২০র
মধ্যেই বাড়ির সামনে একটা বুলেট থামার শব্দ কানে আসে উর্মীর। উর্মি বুঝতে
পারে সৈকত এসেছে। দরজায় বেল বাজিয়ে সৈকত মৃদু অথচ দরাজ কণ্ঠে ডাকা ডাকি
শুরু করে
- ডার্লিং কোথায় গেলে গো, দরজাটা খোলো।
উর্মিলাও ব্যস্ত কন্ঠে বলে ওঠে
- এই যে ডিয়ার আসছি........
বলেই দরজা খোলার জন্য প্রায় দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। এইসব দেখে শুনে
মুখ বেঁকিয়ে স্বপ্না মাসি বলে উঠলো
- ওই শুরু হলো আদিখ্যেতা। বলি হারি যাইহোক উর্মিলারও, এই বয়সে একটা
হাঁটুর বয়সী কচি নাগোর ধরে নেকামো যেন উথলে উঠেছে একেবারে।
বাইরে থেকে সৈকতের গলার শব্দ শোনা যাচ্ছে
- সন্ধ্যেবেলা যখনই এলাম তখনই আমি তোমার মেয়ের সাথে আলাপটা সেরে ফেলতে
চেয়েছিলাম ডার্লিং, কিন্তু তুমি মানা করলে। দেখলে তো ঈশ্বর সেই জন, তিনি
চাইছিলেন আজই তোমার মেয়ের সাথে আমার আলাপটা হয়ে যাক।
বলেই হো হো করে একটু হেসে উঠলো। সৈকতের আওয়াজটা উর্মির কানে যেন খুব
মিষ্টি শোনাচ্ছে। যন্ত্রণার মাঝেও উর্মির কান যেন উৎকীর্ণ হয়ে উঠলো ওই
ছেলেটির শব্দ শোনার জন্য। পরক্ষণে উর্মি নিজেকে বোঝালো, আরে আমি ওই
ছেলেটির ডাক শোনার জন্য উন্মুখ কেন হয়ে আছি কেন? ও আমার কে হয়? ও আমার
প্রতিপক্ষ। আজকে ওর জন্য আমি আমার মায়ের ভালোবাসা প্রায় হারাতে বসেছি।
উর্মির মনে আবার অভিমান জড়ো হয়। তবে স্বপ্নার কথাবার্তা শুনে সিধু বেশ
ঝাঁঝের সঙ্গে বলে ওঠে
- স্বপ্না তোর মুখটা একটু বন্ধ করবি? সব সময় যত রাজ্যের আজেবাজে কথা তোর
মুখে।
- হ্যাঁ হ্যাঁ তুই তো এই কথাই বলবি, কথায় বলে না 'যার জন্য করি চুরি সেই
বলে চোর' আমারও হয়েছে সেই দশা। বলি তোর মন্ডা যে অন্য কাকের মুখে, সেটা
কি দেখেও তুই দেখতে পাচ্ছিস না!
সিধু হেসে জবাব দেয়
- এতগুলো বছরে আমি যখন উর্মিলার মনে আমার জায়গা করতে পারিনি তখন এই
ডাক্তার ছোঁড়া না হয় ওর মনে জায়গা করে নিলেই বা, তাতে অসুবিধার কি আছে
তা তো আমি বুঝতে পারছি না।
সিধু স্বপ্নার কথাবার্তা শেষ হওয়ার আগেই ঘরে ঢুকে এলো সৈকত। সৈকত কে
দেখে এক মুখ হাসি নিয়ে সিধু এগিয়ে যায়
- এসো এসো ইয়াং ম্যান, দেখো দেখি এই রাতের বেলায় তোমাকে কেমন কষ্ট
দিলাম।
- না না দাদান, এতে আবার কষ্টের কি আছে? আমি একজন ডাক্তার, সেই হিসেবে
এটা তো আমার কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে।
এই কথোপকথন শুনে উর্মি বেশ বুঝতে পারে যে সৈকতের সাথে সিধু মামার ও ভালই
পরিচয় আছে। কিন্তু কই সিধু মামা তাকে আগে তো কখনো এসব কথা জানায়নি।
যাইহোক উর্মি মুখ উঠিয়ে সৈকত কে একবার দেখার চেষ্টাও করে না। অভিমানে
মুখটা ঘুরিয়ে রেখে দেয়। সৈকত এসেই বুড়ো ডাক্তারদের মতো গম্ভীর স্বরে
উর্মিলা কে বলে
- কই গো ডার্লিং, আমার পেশেন্ট কোথায়?
কেন জানিনা এই ডার্লিং শব্দটা শুনলেই স্বপ্না মাসি তেলে বেগুনে জ্বলে
ওঠে। দাঁতের দাঁত চেপে স্বপ্না মাসি বলে ওঠেন
- ওই এলেন আমার 'নাগর ঠাকুর', মুখে খালি চ্যাটাং চ্যাটাং বুলি।
সৈকত ঘরে ঢোকা মাত্রই কি সুন্দর একটা গন্ধে ঘরটা ভরে গেল। এই গন্ধটা
উর্মীর খুব চেনা, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারে না কোথায় এমন গন্ধ ও
পেয়েছে। উর্মির মনটাকে যেন এক লহমায় কেমন ভালো লাগা ঘিরে ধরল।
সৈকত বলল
- ডার্লিং তোমার মেয়ে তো মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে আছে, ডাক্তারের সামনে যদি
রোগী এমন ভাবে থাকে তাহলে ডাক্তার চিকিৎসা করে কিভাবে?
- কইরে উর্মি পা টা দেখা ওকে।
উর্মি মুখে কিছু বলে না, শুধু পা টা এগিয়ে দেয় ।
আবার সৈকত বলে
- ওকে বলো লোয়ার টা একটু উঠাতে, তবেই তো আমি পা টা চেক করব।
উর্মি কথা না বাড়িয়ে প্লাজোটাকে হাঁটু পর্যন্ত উঠিয়ে দেয় কিন্তু
একবারও ঘুরে তাকায় না সৈকতের দিকে। সৈকত উর্মির পা টা চেক করার জন্য
যেমনই উর্মীর পায়ে হাত দিয়েছে কেন জানেনা উর্মির সারা শরীরে যেন
বিদ্যুতের শিহরণ খেলে গেল। যেন সৈকত খুব মায়া ভরে আদর করে উর্মীর পায়ে
হাত বুলাচ্ছিল। একসময় উর্মীর মনে হল সৈকত তার দুটো হাত দিয়ে উর্মীর
দুটো পায়েই হাত দিয়েছে কিন্তু উর্মির অন্য পায়ে তো কিছুই হয়নি! উর্মি
বলে উঠলো
- এ কি হচ্ছে, আমার অন্য পায়ে তো কিছু হয়নি অন্য পায়ে হাত দেওয়া কেন?
উর্মিলা বলে
- আহ উর্মি, তুই বড় বেশি বকবক করিস, চুপ করে শুয়ে থাকতো, দেখতে দে
সৈকতকে।
এরপর উর্মি আর কোন কথা বলে না, বাধ্য মেয়ের মত চুপ করে শুয়ে থাকে। সৈকত
ভালো করে চেক করে বলে ওঠে, "আরে ডার্লিং, মনে হচ্ছে তোমার মেয়ের পা টা
ভেঙেছে গো। মাস তিনেক প্লাস্টার চড়িয়ে রাখতে হবে। এই বয়সে পা ভেঙেছে
কি যে হবে! আর নিজে পায়ে চলতে পারলে হয়।"
মনে মনে খুব রাগ হয় উর্মির। সে বলে ওঠে - "মোটেও আমার পা ভাঙেনি, যতসব
আজেবাজে কথা। এইরকম ঝোলা ছাপ ডাক্তারের আমার কোন দরকার নেই। এক্ষুনি
তোমার ডাক্তার কে চলে যেতে বল মা, আমি হসপিটালে যাব আমার চিকিৎসা
করাতে।"
এইবার হো হো করে হেসে ওঠে সৈকত। তারপর বলে
- ডার্লিং তোমার মেয়ে তো ভয়ংকর খেপেছে গো, মনে হচ্ছে ডাক্তার কে তার
মনে ধরে নি।
সপ্না বলে ওঠে
- ডাক্তার ডাক্তারের জায়গায় থাকো, উর্মির মনে ধরাধরি নিয়ে তোমার অতো
কিসের মাথা ব্যথা? যে তোমায় ধরে রেখেছে তুমি তার মনটাই ধরো ভালো করে।
বেশতো বুড়ো মাথাটাকে চিবিয়ে খেয়েছো, এখন আবার কচি মাথাটাও চিবিয়ে
খাওয়ার ধান্দা করছো?
সৈকত কোন কথা কানে নেয় না। সে আস্তে আস্তে উর্মীর পায়ে স্প্রে করে, জেল
লাগিয়ে একটা ক্রেপ ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দেয়। উর্মিলার দিকে তাকিয়ে সৈকত
বলে
- ডার্লিং মেয়েকে বলো চোট খুব বেশি নয়। দুদিন পা টাকে একটু রেস্ট দিতে,
তারপর দেখবে ঠিক হয়ে যাবে। আর এই দুটো ট্যাবলেট দিলাম, যদি বেশি ব্যথা
করে তাহলে খেয়ে নিতে ব'লো।
উর্মিলা হেসে বলে
- পেশেন্ট তো তোমার সামনেই, তুমি সরাসরি পেশেন্টের সাথেই কথা বলো না
ডিয়ার।
সৈকত বলে ওঠে
- পেশেন্ট তো আমার মুখটাও দেখছে না গো ডার্লিং। কথা বলি কেমন করে?
সৈকতের স্পর্শে যে কি যাদু ছিল তা উর্মীর জানা ছিল না, কিন্তু উর্মীর
ব্যাথা তো কমে গেলই তার সাথে সাথে উর্মীর মন চলে গেল পঁচিশ বছর আগের সেই
ঘটনায়। আজ ও যেন আবার নতুন করে সেই একই রকম আনন্তরিকতার ছোঁয়া পেল। যার
অনুভূতি আর পাঁচটা সাধারণ স্পর্শের মত নয়। এ যেন একেবারে অন্য কোন কিছু!
উর্মি বেশ বুঝতে পারে এতক্ষণ সে যে যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছিল সেই যন্ত্রণা
শুধু তার পায়ের যন্ত্রণা নয়, তার সাথে সাথে এ ছিল তার মনেরও যন্ত্রণা।
তাইতো এমন আরামবোধ করছে সে। এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে তার জীবনে মমতা
ভরা আন্তরিক এই স্পর্শটার বড়োই অভাব।
ক্রমশ..............