তীরে ফেরা ঢেউ (পর্ব- ৮)
অনিন্দিতা গুড়িয়া,
নিউ-দিল্লি
পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য
লাইব্রেরি
বিভাগে দেখুন...
দুই এক দিন পরে উর্মিলা ছাতা ফেরত দিতে গিয়ে জানতে পারলেন ছেলেটির
নাম—সৈকত চৌধুরী। দোকানদার হাসতে হাসতে বলল, “ওই ছেলেটা প্রায়ই এমন করে।
ওটা একটা পাগল ছেলে। এই যে সামনে বড় মাল্টি স্পেশালিটি হসপিটাল, সৈকত
সেই হসপিটালের অর্থপেডিক সার্জেন। নিজের দুই বন্ধুকে সঙ্গে করে খালপাড়ে
একটা কোচিং সেন্টার খুলেছে।
"খাল পারে কোচিং সেন্টার! কারা পড়ে সেখানে!"- বিস্ময় ঝরে পড়ল উর্মিলার
গলা থেকে।
"খালপাড়ের বস্তির বাচ্চাদের পড়ায়। শুধু পড়ানোই নয়—নিয়মিত খাবার
দেয়, জন্মদিনও পালন করে।” কথাগুলো উর্মিলার বুকের ভেতর কোথাও গেঁথে গেল।
সেদিন বাড়ি ফিরে তিনি অনেকক্ষণ জানলার ধারে বসে ছিলেন। বৃষ্টির
ফোঁটাগুলো ছাদের কার্নিশ বেয়ে পড়ছিল, আর তাঁর মনে পড়ছিল সেই ছেলেটির
চোখ—কেমন যেন শান্ত, অথচ দৃঢ়, যেন এই চোখ উর্মিলার খুব চেনা।
এরপর দিন কেটে যায়, সপ্তাহ পেরোয়। উর্মিলা খোঁজখবর করতে থাকেন। কোথায়
খালপাড়, কোন বস্তি, কোন সময়ে টিউশন হয়—সব ধীরে ধীরে জেনে নেন। একদিন
বিকেলে বাচ্চাদের জন্য কিছু খাবার হাতে নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন।
খালপাড়ের বস্তির কাছে যেতেই শব্দের বদল টের পেলেন—হাসি, পড়ার আওয়াজ,
খাতার পাতা উল্টানোর খস খস শব্দ। ছোট্ট একটা ঘর, ভেতরে কয়েকটা বেঞ্চ,
দেয়ালে টাঙ্গানো সাদা বোর্ড টায় হাতে লেখা অক্ষর। দরজায় দাঁড়িয়েই
তিনি দেখলেন সৈকত—কালো বোর্ডে অঙ্ক বোঝাচ্ছে। উর্মিলাকে দেখে সে যেন থমকে
গেল; তারপর চোখে বিস্ময় আর আনন্দ একসাথে ঝিলমিল করে উঠল।
“ ডার্লিং তুমি!”—সৈকতের কণ্ঠে বিস্ময় আর আবেগের সুর।
উর্মিলা হাসলেন। বললেন, “ছাতাটা ফেরত দিতে গিয়ে তোমার কথা শুনেছিলাম।
ভাবলাম, নিজের চোখে দেখে আসি।” একটু থেমে যোগ করলেন, “ শুনলাম তোমার আরো
দুই বন্ধু তোমার এই কাজের সাথে যুক্ত, কই তাদেরকে তো দেখছি না! "
মৃদু হেসে সৈকত বলল হ্যাঁ ডার্লিং, ওরা আসতো। একজন সুমনা, বেশ কয়েক মাস
হল সে আর আসছে না। আর একজন ফিরোজ, ফিরোজ এখন দিল্লিতে, চাকরি পেয়ে চলে
গেছে। বর্তমানে আমি একাই এই সেন্টারটা চালাই। "
"ওমা সে কি কথা! এই যে শুনলাম তুমি ডাক্তার, তবে তুমি এত সময় পাও কোথা
থেকে?"
" সময় কি আর পাই ডার্লিং, সময় বের করে নিই। তাইতো সব দিন আসতে পারি না।
"
না না, মাস্টার মশাই যদি না আসে তবে বাচ্চাগুলোর পড়াতে তো ব্যাঘাত
ঘটবে।"
" সে তো আমি জানি ডার্লিং কিন্তু কিইবা করবো বলো, যখন ডে ডিউটি চলে আসতে
পারি না তবে নাইট থাকলে চলে আসি।"
"আমি কি কোন ভাবে তোমাকে সাহায্য করতে পারি না সৈকত?"
"তুমি কিভাবে আমাকে সাহায্য করতে চাও ডার্লিং?" "এই ধরো যদি আমি তোমার এই
মহৎ কাজের সঙ্গী হতে চাই, মানে যাতে বাচ্চারা নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারে
সেই ব্যবস্থা করি। আসলে আমি তো রিটায়ার্ড মানুষ বাড়িতেই বসে থাকি, সময়
কাটে না, এখানে এলে বাচ্চাদের মাঝে আমার সময়টা ভালই কাটবে।”
সৈকত যেন কথা হারিয়ে ফেলল। তারপর বলল, “ তুমি এলে আমরা তো হাতে চাঁদ পাই
ডার্লিং, আমাদের এই কোচিং সেন্টারের খুব উপকার হবে।” সেদিনই তারা ঠিক
করল—কাজটা একা নয়, একসাথে করবে। উর্মিলা নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে
এলেন—পড়ানোর ধৈর্য, গল্প বলার কৌশল, বাচ্চাদের মন বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা।
সৈকত আনল তরুণ উদ্যম—নতুন বই, রুটিন, খেলাধুলোর ভাবনা। দু’জনে কাঁধে কাঁধ
মিলিয়ে বস্তির বাচ্চাদের জন্য একটা নিয়মিত দিন বানিয়ে দিল।
দিন গড়াল, মাস পেরোল। উর্মিলা আর সৈকতের বন্ডিং যেন ধীরে ধীরে শক্ত থেকে
শক্ততর হচ্ছিল। উর্মিলা বাচ্চাদের হাতে খাতা ধরিয়ে দিতেন, কখনও গল্পে
গল্পে পড়াতেন। সৈকত পড়াশোনার ফাঁকে গান শেখাত, জন্মদিন এলে কেকের
ব্যবস্থা করত। উর্মিলা নিজের বাড়ির রান্নাঘর থেকে মাঝেমাঝেই কিছু না
কিছু খাবার বানিয়ে নিয়ে যেত। বাচ্চাদের চোখে তখন নতুন স্বপ্নের আলো,
পড়াশুনার পাশাপাশি তারা কখনো যেত চিড়িয়াখানায় কখনো আবার কোন ফাঁকা
ময়দানে পিকনিক করতে।
দু’বছর এভাবেই কেটে গেল। বর্ষার দিনে ছাতা যেমন আশ্রয় দেয়, আমাদের
দু’জনের কাজ তেমনই আশ্রয় হয়ে উঠল অনেক শিশুর জীবনে। জানিস উর্মি একটা
জিনিস বেশ বুঝলাম—বয়স কখনও দেওয়াল নয়; ইচ্ছে থাকলে আলো ছড়ানো যায়।
খালপাড়ের বস্তিতে এখন পড়াশোনার সঙ্গে মানবিকতার আলোও জ্বলছে—নীরবে,
অবিরাম। আর সৈকত পাশে থাকলে আমি তো বিশ্বজয় করতে পারি।
ক্রমশ..............