তীরে ফেরা ঢেউ (পর্ব- ৫)

অনিন্দিতা গুড়িয়া,

নিউ-দিল্লি


পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য লাইব্রেরি বিভাগে দেখুন...

বিরক্তিকর ট্রেন জার্নির পর অবশেষে উর্মি কলকাতায় মায়ের কাছে ফিরেছে। ওকে পেয়ে মা উর্মিলা খুব খুশি সেটুকু বুঝতে পারছে কিন্তু কোথাও যেন তাল কেটে যাচ্ছে। অন্যান্য বার উর্মি যখনই দেশে ফিরেছে উর্মিলা এয়ারপোর্টে গিয়ে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করেছে। যদিও উর্মি এবারে দিল্লি থেকে ট্রেনে ফিরেছে। তবুও উর্মিলা কিন্তু স্টেশনে ওর জন্য অপেক্ষা করেনি। অন্যান্য বারে বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে উর্মিকে পরীক্ষা করে দেখে নেয়, ও রোগা হয়ে গেছে কি মোটা হয়েছে, কালো হয়েছে কি ফর্সা হয়েছে, মাথার কটা চুল কালো আছে আর কটা চুলে রুপোলি রং চড়েছে, এবারে সে সব ব্যাপারে কোনো উচ্চবাচ্চ্যই নেই।

তবে সত্তরোর্ধ্ব উর্মিলার গ্ল্যামার দেখে উর্মী যার পরনায় হতবাক! এখন উর্মিলার পাশে ঊর্মিকে দেখলে কেউ আর মা মেয়ে বলবে না যেন বলবে দুই বোন। উল্টে ঊর্মিকে বড় বোন বললেও বেশি কিছু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে না। উর্মি মাকে জড়িয়ে ধরে বলল-
" কি ব্যাপার বলো তো মা, এই গ্ল্যামার পাও কোথা থেকে? তোমার বয়সে সিধু মামা স্বপ্না মাসি কেমন বুড়িয়ে গেছে, আর তুমি দেখো আমাকেও ফেল করে যাচ্ছ।"

উর্মিলা মুখে কিছু বলে না শুধু স্মাইল পাস করে।
-" না না মা শুধু হাসি দিয়ে এড়িয়ে গেলে চলবে না, আমাকে বলতেই হবে তোমাকে। "

-"ধুর পাগল মেয়ে কি যে বলিস তুই ....."

-"আমি জানি মানুষ যখন অন্তর থেকে খুশি থাকে তখন ভেতরের খুশিটা বাইরে প্রকাশ পায়, আমি আসাতে তুমি খুব খুশি হয়েছে তাইনা মা!'

এবারেও উর্মিলা কোন উত্তর দেয় না শুধু হাসে।

-"খুব খিদে পেয়েছে মা, কি রান্না করেছো বলো? আচ্ছা আচ্ছা থামো, তোমায় বলতে হবে না, আমি বলছি তুমি কি কি রান্না করেছো। মাছের মাথা দিয়ে কচু শাক, চিংড়ি মাছ দিয়ে এঁচোড়, ভেজানো ছোলা আর ঘি গরম মসলা দিয়ে মোচার ঘন্ট, আর সরষে টেংরা। সব আমার পছন্দের খাবার রান্না করেছো তাই না মা? "

-"বাথরুমে যা, আগে ফ্রেশ হয়ে আয়। তারপর দেখতে পাবি আমি কি রান্না করেছি"।

উর্মির পেটের ভেতর যেন ইঁদুর লাফাচ্ছিল, তাড়াতাড়ি বাথরুমে গিয়ে স্নান করে ফ্রেশ হয়ে এসে একেবারে বসে গেল খাবার টেবিলে। উর্মিলা যত্ন করে বেড়ে দিল ভাত ডাল ডিম ভাজা আর ফুলকপি আলুর তরকারি।

-"ও মা এসব কি ছাই পাঁশ রান্না করেছো! আমি কত আশা করে আছি, তুমি আমার পছন্দের খাবার গুলো বানাও নি!

-" আজ সময় বড্ড কম ছিল রে বাবু, তুই তো এখন থেকে এখানেই থাকবি, পরে পরে সব রান্না করে খাওয়াবো তোকে"।

-" এখন তুমি অফিস যাও না, চাকরি থেকে অবসর নিয়েছো, এখন তো তোমার হাতে সময়ই সময়। তবে তুমি কেন বলছো তোমার হাতে সময় কম ছিল রান্না করার জন্য? তোমার শরীর ঠিক আছে তো মা!

-" আমায় নিয়ে বেশি চিন্তা করিস না উর্মি, আমার শরীর একেবারে ঠিক আছে। আসলে এখন একটু করে বাইরে যাই তো তাই হাতে বেশি সময় পাই না"।

ঠোঁট ফুলিয়ে উর্মি বলে-"তোমার জন্য আমি চিন্তা করব না তো আর কে করবে? আরো কেউ আছে নাকি তোমার জন্য চিন্তা করার!"

এরপর আর কথা বাড়ায় না উর্মি। ভীষণ টায়ার্ড লাগছিল তার। তাই কোন মতে দুটো মুখে দিয়ে শরীরটাকে এলিয়ে দেয় সোফার উপরে। কখন যে দুচোখে ঘুম নেমে এসেছে বুঝতেই পারে না, সে সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়ে।

বাড়ি ফিরে থেকেই উর্মি দেখছে মা যেন বড্ড ব্যস্ত, কি আর করা যাবে, উর্মির সময় কাটছে বই পড়ে আর অফিসের টুকটাক কাজ করে। আজ সকালের চা খেয়ে সেই যে মা বেরিয়েছে এখনো বাড়ি ফেরার নাম নেই। বেলা গড়িয়ে প্রায় দুপুর হতে চলল। উর্মীর এবার বেশ একটু খিদে খিদে পাচ্ছে। না একটু উঠেই দেখি কি খাবার ব্যবস্থা করা যায়, ভেবেই উর্মি উঠে গেল রান্না ঘরের দিকে। তারপর সেখানে গিয়ে কৌটো বাটি কড়াই হাঁড়ি নাড়াচাড়া করে দেখলো মুড়ি চানাচুর ছাড়া আর অন্য কোন খাবার নেই। তবে কি ওকে নিজে রান্না করে খেতে হবে আজকে ? কই, মা তো কিছু বলে গেল না ওকে।

মা যেন আর সেই আগের মত নেই, কেমন যেন খাপছাড়া উড়ু উড়ু ভাব। এই আছে আবার দেখো এই নেই। না বলে কয়ে কোথায় যে হঠাৎ হঠাৎ উধাও হয়ে যায় কিছুই বোঝা যায় না। এবার সত্যিই ভীষণ বিরক্ত লাগছে উর্মির।

কোথায় এতদিন পর উর্মী বিদেশ থেকে ফিরল, মা এটা ওটা রান্না করে খাওয়াবে, জমিয়ে রাখা কত গল্প করবে তা নয়, মায়ের মধ্যে সেই উচ্ছাসটাই যেন নেই। উর্মিকে কাছে পেয়ে মা অন্যান্য বার যেমন আদর করেন, ভালবাসেন, এটা ওটা বানিয়ে খাওয়ান, এবার যেন মায়ের মধ্যে সেসবের কোন আগ্রহই নেই। উর্মি ভাবছে মায়ের সাথে কথা বলবে। কিন্তু এতটা লম্বা জার্নি করে তারপর এত বছর বাদে কলকাতায় পা রেখেই মায়ের সাথে এই সামান্য বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি করতে ওর একটুও ভালো লাগছেনা। তাই উর্মি ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করছে, কত দিনে মা থিতু হয়ে ওকে সময় দেয়।

কিন্তু প্রত্যেকটা ধৈর্যের ও একটা সীমা থাকে, দুদিন হয়ে গেল মায়ের যেন ওর সাথে কথা বলার সময়টুকুও নেই। এই জন্যই কি ও এত বিলাস- বৈভব প্রাচুর্য সবকিছুকে ছেড়ে দিয়ে মায়ের কাছে ফিরে এলো!

উর্মির ভাবনাগুলোকে এক নিমিষে উড়িয়ে দিয়ে এক মুখ হাসি নিয়ে হাতে টিফিন কৌটো নিয়ে ঘরে ঢুকলো স্বপ্না মাসি। এসেই বলল-
- "কিরে খাওয়া হয়নি এখনো? "

-"কি করে হবে মাসি, মা তো বাড়িতেই নেই। আর আমাকেও কিছু বলে যায়নি রান্নাবান্না করার কথা"।

-"আমি জানি, একটু আগেই আমার কাছে ফোন এসেছিল। তাইতো হন্তদন্ত হয়ে ঘরে যা রান্না করেছিলাম সেইটুকুই নিয়ে তোর কাছে চলে এলাম"।

-" কি ব্যাপার বলো তো মাসি। মা আজকাল যায় কোথায়"?

-"নতুন নাগর জুটিয়েছে একটা, তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে, এই বয়সে কোথায় পূজো আচ্ছা নিয়ে থাকবে তা নয়, এতদিন বাদে ওনার হঠাৎ নতুন নাগরের শখ হয়েছে"।

-" হি হি হি হি হি তবে তো বেশ ভালই হবে। বয়স কত? খুব বেশি বুড়ো হাবড়া হলে আমার আবার বাবা বলতে ভালো লাগবে না, হি হি হি! কি করেন, নাম কি তাঁর? সম্বন্ধটা যেই দেখে থাকুক আমি একটা নতুন বাবা পাব"।

- "আ মলো, থাম ছুঁড়ি, তোর সবটাতেই হি হি , একে তো ডাক্তার তাও আবার নিজের হাঁটুর বয়সী"।

-"যাহ্ মাসি.......তুমিও না কি সব আজেবাজে কথা বলো"।

-"না রে আজেবাজে নয়, কেন তুই তো তোর মাকে সবসময় বলিস স্মার্ট সুন্দরী, এই বয়সেও যে কারুর মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট"!

- "হ্যাঁ তা তো 100% সত্যি, সেটা আমার থেকে তোমরা আরো ভালোই জানো, কিন্তু মাকে তো আমি চিনি। আমি ছোট থাকাতে কতবার বাবার কথা বলেছি, সবার বাবা আছে আমার বাবা নেই! আভাসে ইঙ্গিতে মাকে বিয়ে করার জন্য বলেছি, এমনকি সিধু মামা যখন মাকে পছন্দ করত আমাকে দিয়ে জোর করে বাবা ডাকাতো তখন আমি মনে মনে চাইতাম এবং মাকে বলেছি, বুঝিয়েছি সিধু মামাকে বিয়ে করার জন্য। মা কিন্তু একবারও আমার কথায় শায় দেয়নি, উল্টে বুঝিয়েছে আমার বাবার জায়গা সুহাস হেমব্রম ছাড়া অন্য কাউকেই দিতে চায় না, সেই মায়ের ব্যাপারে.........নাহ্ তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে মাসি, আর তাছাড়া আমি যতদূর মায়ের থেকে শুনেছি, মা কোন বস্তিতে দুস্থ বাচ্চাদের পড়াতে যায়"!

-"না রে ভুল নয়, পড়ানো টড়ানো তো একটা বাহানা মাত্র, আসল গল্প অন্য কিছু। গত এক বছর ধরে আমি আর সীধু এই রঙ্গই দেখে চলেছি, কালে কালে তুইও দেখতে পাবি"।

-"সে কি এক বছর! কই আমাকে তো তোমরা কেউ কিছু জানাওনি, যদিও মায়ের এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে আমার অবাক লাগছে এই ভেবে যে, এই বয়সে কলকাতায় বসে এসব কি সম্ভব নাকি, এ কি আমেরিকা! ব্যাপারটা আমাকে একটু খুলে বলো তো মাসি।"

-" সব বলব, আগে তুই খেয়ে নে। আমি একটু যাই কিছু বড়ি রোদে দিয়ে এসেছি। তোকে সব কথা বলতে বলতে বেলা গড়িয়ে যাবে, এখানে আবার বড্ড কাঠবিড়ালির জ্বালা, সন্ধ্যার দিকে আসবো, তখন শুনে নিস সব।"

মনের ভিতর এককাঁড়ি জিজ্ঞাসা ঢুকিয়ে দিয়ে স্বপ্নমাসী তো চলে গেল। মনের ভিতর ওর যে কি হচ্ছে সে কাউকে বোঝাতে পারবে না। নানা জিজ্ঞাসা টানা পড়েন এর মধ্যেই কোনরকমে পেটের তাগিদে খাবারটা খেয়ে নিল। এরপর এঁটো বাসন গুলো রান্নাঘরের সিঙ্কের মধ্যে রাখতে গিয়ে উর্মি শুনতে পেল কোন একটা নাম না জানা পাখির খুব সুন্দর মিষ্টি ডাক। সেই ডাক লক্ষ্য করে ও জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখল কিন্তু পাখিটা কে খুঁজে পেল না। নাম না জানা একটা ঝাঁকড়া পাতা বাহার গাছের ভেতরে কোথায় যে লুকিয়ে পাখিটা ডাকছে তার অন্বেষণ কিছুতেই করতে পারল না উর্মি। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে পেছনের বড় পুকুরটায় বাতাসের ঝাপটা লেগে ছোট ছোট ঢেউয়ের ওঠা পড়া গুলো খুব দৃষ্টি আকর্ষণ করল উর্মীর। পুকুর পাড়ে বড় জাম গাছটার তলায় দুটো কাঠবিড়ালি হুটোপুটি করে গাছটাকে ঘুরে ঘুরে খেলে চলেছে, মন্ত্রমুগ্ধের মতো উর্মি এসব দেখে চলেছে। তার মনের প্রশ্ন, টানা পড়েন, কোথায় যেন এক নিমেষে ফুৎকারে সব মিলিয়ে গেছে।

কানে এলো একটা মোটরসাইকেলের শব্দ। কান সজাগ থাকলেও উর্মীর চোখ দৃষ্টি সবই রান্নাঘরের জানলা দিয়ে বাইরে নিবদ্ধ। কতদিন পর ও এই সব কিছু দেখছে। যেন সময় থমকে ছিল ওর কর্ম জগতে। আজকে যেন সেখান থেকে একটু মুক্তির শ্বাস নিচ্ছে উর্মি। এতগুলো বছর কেবল কেরিয়ার - ক্যারিয়ার - কেরিয়ার করেই দৌড়ে বেড়িয়েছে, না তো নিজের জন্য সময় ছিল, আর না মায়ের জন্য। মনে পড়ছে খুব ছোট্টবেলায় যখন ও হোস্টেল থেকে বাড়িতে আসতো আর মা উর্মিলা অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ওকে নিয়ে কোন পার্কে পিকনিক করতে যেত, ঠিক তখন এইভাবে কোন একটা গাছকে কেন্দ্র করে ঘুরে ঘুরে ওরা মা-মেয়েতে হুটোপুটি করে খেলত। সেই সব দিনের মধুর স্মৃতি ওর মনের জগতকে একটা অন্য মাত্রা দেয়। হঠাৎ করেই মনে হলো- ও কি মায়ের উপরে খুব অবিচার করে ফেলেছে!

না না শুধু মায়ের উপর কেন, অবিচার করেছে নিজের উপর। অবিচার করেছে অর্ণবের সাথে, অবিচার করেছে ওদের সদ্যোজাত সন্তানের সাথে।

কি জানি আজ অর্ণব আর ওর সেই সদ্যোজাত সন্তান কোথায় আছে! আজকে যেন কোথাও গিয়ে বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠছে, কোথাও একটা নিঃসঙ্গতা ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

মানুষের মন কত বিচিত্র! একটু আগেই যে মনে আনন্দের লহর উঠছিল, সেই মনেই এখন বিষাদের কালো কালি ঘুলে যাচ্ছে। যেন কোন কিছুই ভালো লাগছে না উর্মির। সবকিছু থেকে অনেক অনেক দূরে পালাতে ইচ্ছে করছে, ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে কিন্তু সে কান্না কাউকে দেখাতে চায় না উর্মি। মনের অজান্তে কখন যে দুটো চোখ ভরে এসেছিল জলে তা উর্মি বুঝতেও পারেনি।

সম্বিত ফিরল হাসির শব্দে। কান পেতে শুনে বুঝলো এ ওর মায়ের হাসি, মাকে কতদিন ওইভাবে প্রাণ খোলা হাসি হাসতে শোনে নি উর্মি। কার সাথে কথা বলে মা এমন হাসছে!

হাতের উল্টো পিঠে চোখের জল মুছে নিয়ে চোখে মুখে ভালো করে জলের ঝাপটা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ও রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো, এসে দেখলে যে ওর মা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাউকে হাত নেড়ে বায় বলছে। আর সেই ব্যক্তি মোটর বাইক ঘুরিয়ে এগিয়ে চলেছে গেটের দিকে। এক ঝলকের জন্য পেছন থেকে দেখতে পেল উর্মি, জিন্স টি-শার্ট পরা একজন লম্বা চওড়া সুঠাম ব্যক্তি, মনে মনে ভাবল এই কি তবে সেই জন! কি জানি, মাকে জিজ্ঞেস করবো আজ সব কিছু।


ক্রমশ..............