তীরে ফেরা ঢেউ (পর্ব- ১১)
অনিন্দিতা গুড়িয়া,
নিউ-দিল্লি
পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য
লাইব্রেরি
বিভাগে দেখুন...
সিটি হাসপাতালের মেন গেটের সামনে অটো থেকে নেমেই কোনোরকমে ভাড়াটা
মিটিয়ে উর্ধ্বশ্বাসে দৌড় দিল উর্মী। হাসপাতালের বিশাল লোহার গেট
পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই সে থমকে দাঁড়াল। টানা প্রায় পঁচিশ বছর আমেরিকার
অত্যাধুনিক, ঝাঁ চকচকে, কোনরকম বাড়তি শব্দ বর্জিত, নিয়ম নিষ্ঠার
পারাকাষ্ঠা হাসপাতালের করিডরে চলাফেরা করার পর কলকাতার সরকারি হাসপাতালের
এই দৃশ্য যেন একেবারেই অন্য এক পৃথিবী।
চারদিকে মানুষের ঢল। কোথাও স্ট্রেচারে মুমূর্ষু রোগী নিয়ে ছুটে চলেছে
কেউ, কোথাও উদ্বিগ্ন স্বজনের উৎকণ্ঠিত মুখ, কোথাও আবার লম্বা লাইনে
অপেক্ষমাণ অসংখ্য রোগী। বাচ্চার চ্যাঁ-ভ্যাঁ, রোগীর আর্তচিৎকার, বাতাসে
ওষুধ, ফিনাইল আর ঘামের উৎকট গন্ধ। তার সঙ্গে মিশে আছে উদ্বেগ, আতঙ্ক আর
অসহায়তার এক অদ্ভুত আবহ।
উর্মীর মনে হলো, এ যেন এক বিশৃঙ্খল যুদ্ধক্ষেত্র।
অজানা ভয় আর টেনশনে তার মাথা যেন কাজ করাই বন্ধ করে দিয়েছে। এত বড়
হাসপাতালে এত লোকের ভীড়ে সে কোথায় খুঁজবে তার মা কে? ঠিক সেই সময়
সৈকতের কথা মনে পড়তেই তাড়াতাড়ি মোবাইল বের করে সৈকতের নম্বরে ফোন করল।
একের পর এক রিং বেজে চলল, কিন্তু কেউ ফোন ধরল না।
উর্মীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। আশঙ্কা যেন মুহূর্তে কয়েকগুণ বেড়ে গেল।
সামনেই একজন সিকিউরিটি গার্ডকে দেখতে পেয়ে সে তার দিকে এগিয়ে গেল।
সৈকতের কথা জিজ্ঞেস করবে, এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল
- সৈকত কলিং।
এক মুহূর্তও দেরি না করে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপার থেকে এক তরুণীর কণ্ঠ
শোনা গেল-
- "ম্যাম, আপনি সোজা থার্ড ফ্লোরের আইসিইউ-র সামনে চলে আসুন।"
উর্মীর বুক ধক করে উঠল।
- "আইসিইউতে? কেন? মা কি..."
কথা শেষ করার আগেই লাইনটা কেটে গেল। আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে
সিকিউরিটি গার্ডের কাছ থেকে থার্ড ফ্লোরে যাওয়ার পথ জেনে লিফটে উঠে পড়ল
উর্মী।
লিফটের প্রতিটি সেকেন্ড যেন তার কাছে এক একটি যুগের সমান দীর্ঘ মনে
হচ্ছিল। থার্ড ফ্লোরে নেমেই তার সঙ্গে দেখা হলো ঋদ্ধির। সে লিফটের সামনেই
উর্মীর জন্য অপেক্ষা করছিল। উর্মী ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
- "সৈকত কোথায়?"
ঋদ্ধি শান্ত গলায় বলল,
- "সৈকত এখন ওটিতে আছে। তাই ওর ফোনটা আমার কাছেই ছিল। আপনি আমার সঙ্গে
আসুন।"
ঋদ্ধির সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে উর্মী পৌঁছল আইসিইউ-এর কেবিনের সামনে। দরজার
কাঁচের ওপার দিয়ে তাকাতেই তার বুকটা হুহু করে উঠল।
উর্মিলা নিস্তেজ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। নাক-মুখে অক্সিজেনের নল, হাতে
স্যালাইন, আর চারপাশে সারি সারি মনিটর। প্রতিটি যন্ত্র অনবরত 'বিপ...
বিপ...' শব্দ তুলে যেন জীবনের হিসেব কষে চলেছে।
মাকে এমন অবস্থায় দেখে উর্মীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। চোখ দুটো
মুহূর্তেই জলে ভরে গেল। উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে সে ঋদ্ধির দিকে ফিরে বলল,
- "আমার মায়ের কী হয়েছে? মাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে কেন?"
ঋদ্ধি শান্তভাবে উত্তর দিল,
- "আপনি দয়া করে ভয় পাবেন না। ওনার অবস্থা এখন অনেকটাই স্থিতিশীল। শুধু
একটু মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন।"
উর্মী বিস্মিত হয়ে বলল,
- "মাথা ঘুরে গিয়েছিল? কিন্তু কেন?"
ঋদ্ধি একটু ইতস্তত করে বলল,
- "আসলে ইমার্জেন্সিতে তিন্নির খুব তাড়াতাড়ি রক্তের দরকার ছিল। কিন্তু
ব্লাড ব্যাংকে সেই গ্রুপের রক্ত পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন... আপনার মা-ই
নিজের ইচ্ছায় রক্ত দিয়েছিলেন।"
কথাটা শেষ হতেই উর্মীর মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল।
- "এ কেমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ! এই বয়সে একজন মানুষকে রক্ত দিতে দিলেন?
আপনাদের কি একবারও মনে হলো না, এতে ওঁর শরীরের কী অবস্থা হতে পারে?"
ঠিক তখনই পিছন থেকে পরিচিত এক কণ্ঠ ভেসে এল।
- "কোনো মানুষ যদি শারীরিকভাবে সুস্থ থাকেন, তাহলে প্রয়োজন হলে যে কোনো
বয়সেই রক্তদান করতে পারেন।"
উর্মী ঘুরে দেখল- সৈকত। সদ্য ওটি থেকে বেরিয়েছে। অপারেশন থিয়েটারের
পোশাক এখনও গায়ে, মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
উর্মী আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সৈকতের উপর ঝাঁঝিয়ে উঠলো, - "আমার মা
যদি এতটাই সুস্থ, তাহলে তিনি এখন আইসিইউ এর বেডে কেন?"
সৈকত গভীর নিঃশ্বাস ফেলে ধীরস্বরে বলল,
- তিন্নির কথা জানিয়ে ফোন করার পর যতক্ষণে ডারলিং হাসপাতালে পৌঁছেছ,
ততক্ষণে আমার একটা ইমারজেন্সি কেস আসে আর খুব জরুরি অপারেশন শুরু হয়ে
গিয়েছিল। আমি ওটিতে ছিলাম, এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানতাম না।"
রিদ্ধি বললো
- তিন্নির অবস্থা খুব খারাপ হচ্ছিল। ওর বাবা-মা, দু'জনের কারও রক্তের
গ্রুপ মেলেনি। সময় হাতে ছিল না। সেই সংকটময় মুহূর্তে আপনার মা নিজেই
এগিয়ে এসে বলেছিলেন -'আমার রক্ত যদি মেয়েটার প্রাণ বাঁচাতে পারে, তাহলে
আর দেরি কেন?'... আমরা অনেকবার নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু উনি কারও কথা
শোনেননি।"
চোখভরা জল আর বুকভরা ক্ষোভে উর্মির সুন্দর মুখটা যেন মুহূর্তেই পাথরের
মতো শক্ত হয়ে উঠেছিল। তার চোখের দৃষ্টি এতটাই কঠিন হয়ে উঠেছিল যে, সৈকত
পর্যন্ত তার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে সাহস পাচ্ছিল না।
সে একটু ইতস্তত করে বলল,
- "আজকের ঘটনাটা কিন্তু একদিক থেকে ডার্লিং-এর জন্য শাপে বর
হয়েছে..."
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই উর্মি যেন ব্লাস্ট করলো।
- "স্টপ ইট, ননসেন্স! এই কথা বলতে তোমার একটুও লজ্জা করছে না? যাকে তুমি
এত ভালোবাসো, সেই মানুষটা আইসিইউতে শুয়ে আছে, আর তুমি বলছ -'শাপে বর
হয়েছে'? এটাই তোমার ভালোবাসা?"
সৈকত কিছু বলবে কিন্তু তার আগেই উর্মি যেন আবারো গর্জে উঠলো, এইবার
ঋদ্ধির দিকে তাকিয়ে বলল
- "ঠিক আছে, তুমি ওটিতে ব্যস্ত ছিলে। কিন্তু এই চব্বিশ-পঁচিশ বছরের
মেয়েটা? সে কি এক বোতল রক্তও দিতে পারল না? নাকি ইচ্ছে করেই আমার মাকে
বিপদের মুখে ঠেলে দিল?"
এবার সৈকতের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল।
সকাল থেকে একের পর এক জটিল অপারেশন। তার ওপর উর্মিলার হঠাৎ অসুস্থতা।
ভিতরে ভিতরে সেও প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন। তার ওপর উর্মির এই অকারণ অভিযোগ...
সে এগিয়ে এসে দু'হাতে উর্মির কাঁধ চেপে ধরে বলল,
"কাম ডাউন, ... প্লিজ! আগে আমার পুরো কথাটা শোনো। তারপর যা খুশি
ব'লো।"
ঠিক তখনই ঋদ্ধি ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়াল। তার মুখে মৃদু হাসি, অথচ
চোখ দুটোতে বিষাদের কালো ছায়া। খুব শান্ত গলায় সে বলল,
- "ম্যাম... আমি চাইলেও কাউকে রক্ত দিতে পারি না। আমি... একজন চিকিৎসাধীন
ব্লাড ক্যানসারের রোগী।"
কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল উর্মিকে। মুহূর্তের মধ্যে তার সমস্ত
রাগ, অভিযোগ, অভিমান যেন কোথায় মিলিয়ে গেল। নিজেকে ভীষণ ছোট মনে হলো।
সে মাথা নিচু করে কোনমতে শুধু বলতে পারল,
- "সরি..."
তারপর অসহায় চোখে তাকাল সৈকতের দিকে।
সৈকতের মুখেও তখন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা। সে ধীরে ধীরে বলল,
- "ডার্লিং নিজেও জানত না তার হার্টে একটা ছোট্ট ব্লক আছে। আজ মাথা ঘুরে
পড়ে যাওয়াটাই বরং আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াল। সব টেস্ট করার পরই বিষয়টা
ধরা পড়েছে।"
একটু থেমে আবার বলল,
- "আর একটা সুখবরও আছে। আগামীকাল ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ
কার্ডিয়োলজিস্ট, ডক্টর ভার্গব, দিল্লি থেকে কলকাতায় আসছেন একটা বিশেষ
সেমিনারে। আমি ওনার সঙ্গে কথা বলেছি। নিজের ব্যস্ত সময়ের মধ্যেও উনি
ডার্লিংকে দেখার জন্য রাজি হয়েছেন। তাই আজ ওনাকে হাসপাতালে রেখেছি। তুমি
একদম চিন্তা করো না। কাল উনি দেখে দিলে, আমি নিজেই ডার্লিং কে বাড়ি
পৌঁছে দিয়ে আসব।"
উর্মির মনে হলো, যেন পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে।
তার হাসিখুশি, কর্মঠ, সারাজীবন অন্যের জন্য ছুটে বেড়ানো মা...তার হার্টে
ব্লক! এ কথা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। সে ধপ করে পাশের চেয়ারে বসে
পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে তার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। পরের মুহূর্তেই সে সৈকতের
ডান হাত নিজের দু'হাতে শক্ত করে ধরে তার ওপর মাথা রেখে ছোট্ট শিশুর মতো
ডুকরে কেঁদে উঠল।
- "প্লিজ... আমার মাকে বাঁচাও। এই পৃথিবীতে মা ছাড়া আমার আর কেউ
নেই..."
উর্মির চোখের জলে ভিজে উঠছিল সৈকতের হাত। সেই উষ্ণ জল যেন সৈকতের বুকের
ভেতরেও কোথাও নীরবে ব্যথা হয়ে বিঁধছিল। তারও খুব ইচ্ছে করছিল উর্মির
মাথাটা নিজের বুকের সাথে শক্ত করে ধরে রেখে সস্নেহে বলতে- "আমি তো
আছি..."
কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। মুখে মৃদু হাসি এনে বলল,
- "এমন ভেঙে পড়ো না। প্রথম স্টেজেই ধরা পড়েছে। ঠিক সময়ে চিকিৎসা হলে
পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে।"
উর্মি ভেজা চোখ তুলে তাকাল।
- "সত্যি? মা পুরোপুরি ভালো হয়ে যাবে?"
- "অবশ্যই। কাল ডক্টর ভার্গব দেখে নিন। তারপর চিকিৎসা শুরু হবে। তুমি
শুধু একটু ভরসা রাখো।"
কথা শেষ করে সৈকত একবার ঋদ্ধির দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করল। তারপর
উর্মির পিঠে আলতো হাত রেখে বলল,
- "চলো... এবার একটু ক্যান্টিনে যাই। আমার তো সকাল থেকে কিছুই খাওয়া
হয়নি। তোমারও নিশ্চয়ই না। পেটের নাড়ি ভুঁড়ি নিয়ে ইঁদুরগুলো এখন
ফুটবল খেলছে।"
এই পরিস্থিতিতেও সৈকতের কথায় উর্মির ঠোঁটের কোণেও একফোঁটা হাসি ফুটে
উঠল। মন রাজি না থাকলেও সৈকতের কথায় আর ঋদ্ধির কোমল বাহুর ডোরে বাঁধা
পড়ে বাধ্য হয়ে সে ক্যান্টিনে গেল।
খাবারের গন্ধ নাকে আসতেই বুঝতে পারল, সত্যিই তারও ভীষণ খিদে পেয়েছে।
সৈকত তিন কাপ কফি আর ব্রেড টোস্ট অর্ডার করল। উর্মি অবাক হয়ে মনে মনে
বলল,
- "এই তোমার দুপুরের খাবার?"
সৈকত যেন মন পড়তে জানে, সে মৃদু হেসে বলে উঠল,
- " এটা শুধুই একটু ফ্রেশ হওয়ার জন্য। তারপর আমার কেবিনে গিয়ে আমরা
একসঙ্গে লাঞ্চ করব। আমার খাবার বাড়ি থেকেই আসে, হাসপাতালের খাবার আমি
খাই না।"
উর্মি তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল।
- "না না, সেটা কী করে হয়! তোমার বাড়ির খাবারে আমরা ভাগ বসাব কেন?
ক্যান্টিনে যা আছে, সেটাই খেয়ে নেব।"
সৈকত এবার নিজের স্বভাবসিদ্ধ প্রাণ খোলা হাসিটা হেসে উঠল। হাতঘড়ির দিকে
তাকিয়ে বলল,
- "ম্যাডাম, এখন বিকেল চারটে। এই সময় ক্যান্টিনে কফি-টোস্ট ছাড়া আর
কিছুই পাওয়া যায় না। তাই আপাতত এটা খাও।"
ঠিক তখনই ক্যান্টিনের ছেলে তিনজনের সামনে কফি আর টোস্ট রেখে গেল।
কফি শেষ করে ঋদ্ধি বলল,
- "সৈকত, আমি এবার উঠি। মা আমার জন্য না খেয়ে বসে আছে। বাবাকে মেসেজ করে
দিয়েছিলাম। ড্রাইভারও এসে গেছে।"
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল। ড্রাইভার নিচে অপেক্ষা করছে। ঋদ্ধি দু'জনের
কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল।
সৈকত আর উর্মি আবার আইসিইউ এর সামনে এল। উর্মিলা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
নার্স মৃদু হেসে বললেন,
- "আপনারা নিচে যাওয়ার পর উনি একটু জেগেছিলেন। ওয়াশরুমে গিয়েছিলেন।
তারপর আমি গরম স্যুপ আর দু'স্লাইস ব্রেড খাইয়ে ওষুধ দিয়েছি। এখন আরামে
ঘুমোচ্ছেন।"
উর্মির বুকটা একটু হালকা হলো। বাইরে বেরোতেই সে বলল,
- "কফি-টোস্ট খেয়েই আমার পেট ভরে গেছে। এই অবেলায় আর কিছু খেতে পারব
না। তুমি একাই খেয়ে নাও।"
কিন্তু সৈকত কিছুতেই শুনল না। প্রায় জোর করেই তাকে নিজের কেবিনে নিয়ে
এল। টিফিন ক্যারিয়ার খুলে যত্ন করে খাবার পরিবেশন করল। তারপর প্লেটটা
উর্মির হাতে দিয়ে বয়স্ক লোকেদের মত গম্ভীর গলায় বলল,
- " কোন কথা না বলে চুপচাপ খাও।"
পরক্ষণেই ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে যোগ করল,
- "অবাধ্য মেয়েকে শাসন করতে কিন্তু আমি খুব ভালোই পারি।"
এই সামান্য কথাটুকুতেই উর্মির চোখ আবার চিকচিক করে উঠল। কেন জানি না, মনে
হলো বহু বছরের পুরোনো কোনো ক্ষতে কেউ নিঃশব্দে মলম লাগিয়ে দিয়েছে। তার
চেয়ে প্রায় অর্ধেক বয়সের এই ছেলেটা তাকে এমনভাবে বকছে... যেন বহুদিনের
হারিয়ে যাওয়া বাবার স্নেহ ফিরে এসেছে।
এই শাসন...এই যত্ন...এই নিঃশর্ত ভালোবাসা...জীবনের কত বছর ধরে সে এমন
একটা আশ্রয়ের জন্য অপেক্ষা করেছে!
সত্যিই আর কোনো কথা না বলে সে ধীরে ধীরে খেতে শুরু করল।
প্রথম গ্রাসটা মুখে দিতেই সে থমকে গেল। এই স্বাদ...এই গন্ধ...এ যেন খুব
চেনা, কোথাও আগেও পেয়েছে সে।
হ্যাঁ...পেয়েছিলোই তো। প্রায় পঁচিশ বছর আগে। যখন সে প্রথম এবং শেষবার
মা হতে চলেছিল...
সেই সময় এই একই স্বাদের রান্না কতবার যে খেয়েছে, কিন্তু... এত বছর
পরে...সৈকতের টিফিনে সেই একই রকম স্বাদ এল কোথা থেকে? অজান্তেই উর্মীর
মুখ থেকে বেরিয়ে গেল
- "এই রান্না কে রেঁধেছে?"
- আমার বাবা...........
সৈকতের কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি উর্মি সবিস্ময়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো,
- মানে!
এবার সৈকত যেন নিজেকে একটু সামলে নিল, তারপর মুখে সেই চির পরিচিত হাসিটা
এনে বলল,
- "আরে আমার বাবার একজন খাস রান্নার লোক আছে, জ্ঞান হওয়া অবধি দেখছি তার
হাতে ছাড়া বাবা খেতেই চায় না।"
কথাগুলো উর্মীর কানে গেল কিনা কে জানে, তার হাতে ধরা চামচটা মাঝআকাশে যেন
থেমে রইল।
মুহূর্তের মধ্যে তার মনটা উড়ে গেল পঁচিশ বছর আগের সেই দিনগুলোয়। সে কোন
দিন কখন কি খেতে চায় সেসব জেনে নিয়ে অর্ণব নিজে হাতে খাবার বানিয়ে
তাকে খাওয়াতো। কি অসীম মমতা ছিল সেই স্পর্শে.......
একদিকে অদ্ভুত এক ভালো লাগায় বুক ভরে গেল। অন্যদিকে কোথা থেকে যেন জন্ম
নিল এক অসীম শূন্যতা। মনে হলো-
সময়ের চাকা পঁচিশ বছর ঘুরে আবার যেন ঠিক সেই জায়গাতেই এসে
দাঁড়িয়েছে...
জীবনের সব হিসেব-নিকেশের শেষে, সেই অমীমাংসিত শূন্যটাই আজও রয়ে গেছে।
ক্রমশ..............