তীরে ফেরা ঢেউ (পর্ব- ১০)
অনিন্দিতা গুড়িয়া,
নিউ-দিল্লি
পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য
লাইব্রেরি
বিভাগে দেখুন...
দিন তিনেকের মধ্যেই উর্মির পা একেবারেই সুস্থ হয়ে গেছে। এখন উর্মি বেশ
ভালোভাবেই চলাফেরা করতে পারছে। এই তিন দিনে উর্মি যেন তিন যুগ বেঁচে
নিয়েছে। সিধু মামা স্বপ্না মাসি বা তার মা তাকে প্রতি মুহুর্তে আগলে
রেখেছিল সেই ছোট্টবেলার মতো। আসলে উর্মি ছাড়া তো এদের জীবনে আর কেউ নেই,
তাই উর্মীর কিছু হলে এদের যেন প্রাণটা বেরিয়ে যায়। সারাদিন হাসি আড্ডা
গল্প আর মায়ের হাতের ভালো ভালো খাবার খেয়ে উর্মীর মন বেশ ফুরফুরে। তার
উপরে সৈকত দুটি বেলা নিয়ম করে এসে দেখে গেছে। এ যেন উর্মীর মনের এক
আরামের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে উর্মি খুব চাপা তো- তাই এসব কোন
কিছুই প্রকাশ করবে না কখনোই। কেন যে স্বপ্ন মাসি সৈকতকে দু চোখে দেখতে
পারেন না তা কিন্তু উর্মীর বোধগম্য হলো না। তবে উর্মীর সামনে সিধু মামা
আর উর্মিলা আজকাল যেন একটু বেশ খোলাখুলি সৈকতের ব্যাপারে আলোচনা করে।
উর্মি দেখায় সে যেন অন্য কোন কাজে ব্যস্ত বা অন্যমনস্ক হয়ে আছে, আসলে
কিন্তু উৎকীর্ণ হয়ে থাকে সৈকতের ব্যাপারে আরো অনেক কিছু জানার জন্য।
আজ সকাল বেলা সৈকত যখন উর্মিকে দেখতে এলো তখন উর্মি ওয়াশরুমে ছিল। ওয়াশ
রুমের ভিতর থেকেই উর্মি মায়ের আর সৈকতের হাসা হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছিল।
উর্মি যখন ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো, দেখল- সৈকত খুব যত্ন করে একটা লাল
গোলাপ উর্মিলার চুলে গুঁজে দিয়ে চিবুক তুলে চোখ ভরে দেখছে তার মায়ের
দিকে আর বলছে -
- "ডার্লিং তোমাকে আজকে ফাটাফাটি দেখতে লাগছে।" এমন দৃশ্য উর্মির চোখে
পড়েনি অনেক যুগ। এ দৃশ্য তাকে যেন সেই স্কুল পড়ুয়াদের প্রেমের কথা মনে
করিয়ে দিচ্ছিল। আর অজান্তেই উর্মি খুক খুক করে হেসে ফেলে। তার হাসির
শব্দে দুজনেই যেন একটু অপ্রস্তুুতে পড়ে যায়। তবে কথা ঘোরাতে সৈকত
একেবারে পাকাপোক্ত। বেশ করে একটু গলা খাকরে নিয়ে বুড়ো ডাক্তারদের মত
করে বলে -
- "ডার্লিং তোমার মেয়েকে বল পা দেখাতে। কেমন আছে সে আজ? "
বলাই বাহুল্য এই তিন দিনে উর্মি আর সৈকত অনেকটা সহজ হলেও সরাসরি একে
অপরের সাথে কথা বলছে না। যদিও সৈকত চায় সরাসরি কথা বলতে তবে উর্মি তো
বলছে না, তাই উর্মিলাকে মাধ্যম করেই দুজনের কথাবার্তা চলছে। উর্মী ও তেমন
বলে ওঠে -
- "মা তোমার ডাক্তার কে বল আমার পা আজকে একেবারেই ঠিক আছে, আমি খুব
ভালোভাবেই চলাফেরা করতে পারছি, আর ব্যথা একেবারেই নেই। তোমার ডাক্তার
ভালো ডাক্তার, ঝোলা ছাপ নয়। "
কথাটা শুনেই সৈকত হো হো করে হেসে ওঠে। সৈকতের এই প্রাণ খোলা হাসিটা
উর্মির বুকে যেন এক অন্যরকম হিল্লোল তোলে। বড় ভালো লাগে উর্মীর সৈকতের
এই প্রাণ খোলা হাসি। এইসব কথাবার্তার মাঝখানেই উর্মীর চোখ চলে যায় তার
টেবিলের উপর, দেখে একেবারে তাজা এক গোছা হলুদ গোলাপের তোড়া রাখা আছে
সেখানে। উর্মির দৃষ্টি অনুসরণ করে সৈকত বলে ওঠে-
- "ডার্লিং তোমার মেয়েকে জিজ্ঞেস করো, বন্ধু হবে আমার?"
মুখে কোন কথা না বলেই উর্মি আস্তে আস্তে গোলাপের তোড়াটা হাতে তুলে নেয়
আর তাতেই সৈকত আর উর্মিলা বুঝতে পারে উর্মীর মৌন সম্মতির কথা। এরপর আর
সৈকত অপেক্ষা করে না, তার হসপিটালের ডিউটির সময় হয়ে যাচ্ছিল তাই
তাড়াহুড়ো করে সৈকত "বাই"- বলেই বেরিয়ে যায় সেখান থেকে। উর্মিলা ও
নিজের কাজে চলে যায়। উর্মী যেন এই সুযোগটারই অপেক্ষা করছিল। সবাই ঘর
থেকে বেরিয়ে গেলে উর্মি আস্তে আস্তে নিজের ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দেয় আর
তারপর খুব আদরে অতি যত্নে হাতে তুলে নেয় সেই গোলাপের তোড়া আর পরম
মমতায় নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে। কি জানি কি আরাম বোধ করছে উর্মী তাতে।
তবে তার চোখে মুখে আজকে একেবারে অন্যরকম একটা ভালো লাগার অনুভূতি উপচে
পড়ছে। তবে যতই উর্মী ভাবুক সে সকলের চোখের আড়ালেই এই কাজটা করছিল
কিন্তু আসলে তা নয়। উর্মিলা উর্মির জন্য চা নিয়ে আসছিল আর বাতাসে উড়তে
থাকা জানলার পর্দার ফাঁক থেকে সবটাই দেখে ফেলে। আর তারপর উর্মিকে চা টা
না দিয়েই মুখ টিপে একটু হেসে সেখান থেকে সরে যায়। আসলে উর্মিলা ও মনে
মনে চাইছিল উর্মি আর সৈকতের মধ্যে একটু মিল মিশ হয়ে যাক।
আজ উর্মিলা একা একাই চা খেয়ে নেয় ডাইনি স্পেসে বসে। তারপর প্রায় মিনিট
১০-১৫ পরে আরো একবার চা বানিয়ে উর্মীর রুমে যায়। উর্মিলা দেখে তখনও
উর্মি গোলাপ তোড়াটা হাতে নিয়ে জানলার বাইরের দিকে এক নিমিষে তাকিয়ে কি
যেন ভাবছে। আস্তে করে ভেজানো দরজার পাল্লায় ঠেলা দেয় উর্মিলা। দরজা
খোলার শব্দে ঊর্মি সচকিত হয়ে যায়। তারপর তাড়াতাড়ি করে ফুলের তোড়াটা
যেমন টেবিলের উপর ছিল সেই ভাবে রেখে দিয়ে একটু সরে দাঁড়ায়। মুখ তুলে
বলে -
- "ও মা, তুমি চা নিয়ে এসেছ! খুব ভালো করেছো। এখন আমার এটারই খুব দরকার
ছিল। দাও দাও........"
বলেই উর্মি উর্মিলার হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে চায় চুমুক দিতে থাকে।
আসলে নিজের অনুভূতির বাহ্যিক প্রকাশ কোনমতেই চায় না সে, তাই সেটাকে
ঢাকার জন্য তাড়াহুড়ো করে ৪/৫ চুমুকেই এক কাপ গরম চা খেয়ে ফেলে।
উর্মীলা বলে -
- "আরে ধীরে ধীরে খা, এমন তাড়াহুড়ো করছিস কেনো!"
উর্মি বলে -
- "না না, ধিরে খাওয়ার কি আছে, চা টা তো প্রায় ঠান্ডা হয়ে এসেছে। "
কিন্তু উর্মিলা জানে চা টা কতটা গরম আছে। উর্মিলা বলে -
- "কই দেখি; এদিকে আয় তো, বোস আমার সামনে। কতদিন হয়ে গেছে তোর মাথায়
তেল লাগিয়ে দিইনি। আয় আজকে একটু ভালো করে তেল লাগিয়ে দিই তোর মাথায়।
- "বাবা আজ সূর্য কোন দিকে উঠেছে গো মা, আজকে তোমার সংসারের কাজের তাড়া
নেই! রান্নাবান্নার তাড়া নেই!
- "না আজকে রান্নার তাড়া নেই, কারণ গতকাল রাত্রেই একটু বেশি বেশি করে
রান্না করে রেখে দিয়েছি। আজ ফ্রিজ থেকে বের করে সেটা মাইক্রোওয়েভে
দিয়ে দিলেই হয়ে যাবে। "
- "তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু মনে আছে তিন দিন হয়ে গেছে। তুমি তোমার
খালপাড়ের বস্তিতে বাচ্চাদের পড়াতে যাওনি। তোমার প্রাণটা হাঁপিয়ে উঠছে
না মা?"
- "নারে এই ব্যাপারে সৈকতের সাথে আমার কথা হয়ে গেছে, ও আমাকে বলেছে-
যতদিন না তুই পুরোপুরি সুস্থ হচ্ছিস, আমাকে পড়াতে যাওয়ার দরকার নেই। ও
একলাই সামলে নেবে। "
- "তাও আবার হয় নাকি! ও ডাক্তার, ওর নিজের ডিউটি আছে। হসপিটাল আছে। একা
একা কি করে সবদিক সামলাবে?"
- "একা কোথায়, এখন তো আমাদের সাথে আরও একজন আছে।"
- "সে কে মা?"
- "সে হলো ঋদ্ধি, সৈকতের ক্লাসমেট। একসাথেই কূলে পড়াশুনা করেছে ওরা। আর
তাছাড়া তুই পড়াতে যাওয়ার কথা বলছিস আমাকে, কিন্তু আমার পড়াতে
যাওয়াটা তো তোর একেবারেই ভালো লাগেনা। আমি ওদিকে পড়াতে গেলে তোকে সময়
দিতে পারি না, তোর জন্য ভালো মন্দ রান্না করতে পারি না, তুই তো ভেবেই বসে
আছিস আমি তোকে আর আগের মতো ভালোবাসি না। তাই কি করি বল, সবকিছু
ছেড়েছুড়ে দিয়ে তোর জন্য শুধু বসে আছি।"
- "কি যে বলো না মা, এ তোমার অভিমানের কথা। তুমি খুব ভালোই জানো আমি নিজে
কাজ পাগল মানুষ আর আমিও চাই তুমিও কাজের মধ্যেই থাকো। ও তো তখন আমি তোমার
উপর একটু অভিমান করেছিলাম। আসলে জানোই তো, খিদে পেলে আমার আবার মাথার ঠিক
থাকে না। আর তার উপরে তোমার হাতের ভালো ভালো খাবার খেয়ে খেয়ে এমন
অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে যে দেশে থাকা মানেই শুধু ভালো-মন্দ খাওয়া। তুমি
আমার সোনা মা, তুমি আমার ভালো মা....."
বলেই উর্মি মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে মায়ের গালে একটা বড় করে হামি দেয়।
উর্মিলা বলে, -
- "যা যা হয়েছে আর অত বাটারিং করার দরকার নেই।"
ইতিমধ্যেই উর্মিলার মোবাইলে একটা কল আসে, দেখে সৈকত ফোন করেছে। উর্মিলা
ফোনটা তোলে। তারপর কি যে কথা হয় উর্মী বুঝতে পারে না কিন্তু উর্মিলার
মুখের ভাবটা যেন ধীরে ধীরে বদলে গেল। ফোনটা রাখার পরেই উর্মি জিজ্ঞেস করে
-
- "কিছু কি হয়েছে মা?"
উর্মিলা বলে -
- "হ্যাঁ রে, আমাকে এখনই একবার বেরোতে হবে।"
কেন মা কি হয়েছে?
"আমাদের কোচিংয়ে তিন্নি নামের বছর আষ্টেকের যে মেয়েটা পড়তে আসে তার
শরীরটা খুব খারাপ করেছে, সে হসপিটালে এডমিট আছে।"
- "কি হয়েছে মা?"
- আসলে বাচ্চাটা থ্যালাসেমিয়া পেশেন্ট তো, তাই মাঝে মধ্যেই ওর শরীরটা
খুব খারাপ হয়।
- "আমি কি তোমার সাথে আসবো মা?"
- "না রে তার দরকার হবে না, বরং তুই বাড়িতে থেকে রেস্ট কর। তেমন
প্রয়োজন হলে আমি তোকে কল করে ডেকে নেব"।
উর্মিলা তাড়াতাড়ি করে তৈরি হয়ে বেরিয়ে যায়।
সেই যে সকালবেলা উর্মিলা বেরিয়ে গেল তারপর থেকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে
চলল উর্মিলার কোন খবর নেই। উর্মির মনে নানা রকম আবোল তাবোল খেয়াল আসছে,
মনটা যেন কেমন কু ডাকছে। উর্মি বারবার তার মা কে ফোন করছে। কিন্তু ফোনটা
সুইচ অফ বলছে। উর্মির চিন্তার পারদ হু হু করে বাড়ছে, কি করবে বুঝতে
পারছিল না। সৈকত কে কি একবার ফোন করে জিজ্ঞেস করবে? কিন্তু সৈকতের নম্বর
তো তার জানা নেই! একবার ভাবল সিধু মামাকে ডেকে নেয়, পরক্ষণেই তার মনে
পড়ল সিধু মামা তো আজ ভোরবেলাতেই আবারো কোথাও ঘুরতে বেরিয়ে গেছে, দিন
সাতকের আগে ফিরবে বলে মনে হয় না।
তবে এখন উর্মীর কর্তব্য কি! কি করবে উর্মি এখন! উর্মি ভাবলো ঘরে বসে
চিন্তা করলে শুধু চিন্তাটাই বাড়বে। কাজের কাজ কিছু হবে না তার চেয়ে
গুটিগুটি পায়ে একটু এগিয়ে গিয়েই দেখি। যেমন ভাবা তেমন কাজ, লোয়ার টার
উপর একটা ধোয়া কুর্তি পরে মানি পার্সটা হাতে নিয়ে ঘরে চাবি লাগিয়ে
উর্মি গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে চলল হসপিটালে দিকে। এমন সময় উর্মীর ফোনে
একটা কল এলো, একটা আননোন নম্বর। ফোনটা তুলবে কি তুলবে না ভাবতে ভাবতেই
কয়েকটা রিং এর পর উর্মী ফোনটা তুললো-
- "হ্যালো....."
বলার সাথে সাথেই ওপার থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো-
- "উর্মি ম্যাম বলছেন? "
এ কন্ঠস্বর উর্মির খুব চেনা, সৈকতের আওয়াজ। উর্মী তখন মায়ের খবর জানার
জন্য মরিয়া। উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠলো-
- "সৈকত মায়ের কোন খবর জানো?" পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল-
- "ওহো তোমাকে 'তুমি' বলে ফেললাম, কিছু মনে করো না।
- "না না ম্যাম এখন মনে করা করির কিছু নেই, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনি
একবার হসপিটালে চলে আসুন।"
- "কেন সৈকত, কি হয়েছে?"
- " আপনি একবার হসপিটালে চলেই আসুন না, সব জানতে পারবেন।"
- " সব ঠিক আছে তো সৈকত? মা......."
কথাটা শেষ করার আগেই সৈকত বলে উঠলো-
- "সব ঠিক আছে, বেশি তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই, আপনি একটু সময় নিয়ে
ধীরে সুস্থেই আসুন।"
কথা বলতে বলতেই একটা অটো উর্মির পাশ থেকে এগিয়ে যাচ্ছিল উর্মি সেই অটোকে
হাত দেখিয়ে দাঁড় করিয়ে তাতেই চেপে বসে বলল-
- "সিটি হসপিটাল চলো"
ক্রমশ..............