পরিবারের সহমর্মিতাই থাইরয়েড রোগীর বড় শক্তি
মনিকা পুরকাইত,
ডায়মন্ড হারবার
থাইরয়েড নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথাঃ-
আমরা অনেক সময়ই লোকেদের মধ্যে কথোপকথের মাধ্যমে শুনতে পাই
"কিরে তুই এত শুকিয়ে যাচ্ছিস কেনো? " বা "তুই হঠাৎ করে এত মোটা হয়ে
যাচ্ছিস কেন? "
অপর দিক থেকে উত্তর আসে
"আমার থাইরয়েড হয়েছে"।
শুনতে হাস্যকর হলেও কথাটা খুব সত্যি যে থাইরয়েড হয়েছে মানে তার শরীরে
হঠাৎ করেই থাইরয়েড নামের কোন রোগ গজিয়ে উঠেছে এমনটা নয়। আসলে জন্ম
থেকেই থাইরয়েড আমাদের সবার মধ্যেই আছে। কোন কারণবশত থাইরয়েড রোগ হয়ে
যাওয়া সেই ব্যক্তির থাইরয়েড গ্রন্থি গ্রন্থি কম হরমোন নিঃসরণ করছে অথবা
বেশি হরমোনের নিঃসরণ করছে। তার ফলে তার শরীরে নানা ধরনের জটিলতা বা
সমস্যা দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে প্রথমেই জেনে নেওয়া দরকার থাইরয়েড কি?
থাইরয়েড একটি ছোট, প্রজাপতির আকারের গ্রন্থি, যা গলার মাঝখানে অর্থাৎ
ভয়েস বক্সের নিচে এবং শ্বাসনালীর(ট্রাকিয়া) চারপাশে আবৃত। এটি একটি
অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি। থাইরয়েড গ্রন্থি হরমোন তৈরির মাধ্যমে দেহের প্রায়
সকল বিপাকীয় প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।
তাহলে থাইরয়েড রোগটা কি ?
থাইরয়েড রোগ হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে থাইরয়েড গ্রন্থি প্রয়োজনের
চেয়ে কম (হাইপোথাইরয়েডিজম) বা বেশি (হাইপারথাইরয়েডিজম) হরমোন তৈরি
করে।
থাইরয়েড মূলত দুই প্রকারের হতে পারে— হাইপোথাইরয়েডিজম এবং
হাইপারথাইরয়েডিজম। এটি এমন এক সমস্যা, যা বাইরে থেকে সহজে বোঝা যায় না,
কিন্তু ভেতর থেকে মানুষের জীবনকে ভয়াবহভাবে নষ্ট করে দেয়।
থাইরয়েড সমস্যার সাধারণ উপসর্গসমূহঃ-
* ঘন ঘন মুড সুইং হওয়া, হঠাৎ রেগে যাওয়া।
* শরীরে সবসময় ক্লান্তি থাকা, অথচ ঠিকমতো ঘুম না হওয়া।
* মাথা ঘোরা, হাত-পা কাঁপা।
* চোখে ঝাপসা বা অন্ধকার দেখা।
* শরীরের বিভিন্ন স্থানে অকারণ ব্যথা।
* ভুলে যাওয়া, মনোযোগ কমে যাওয়া।
* কখনও ওজন বেড়ে যাওয়া, আবার কখনও কমে যাওয়া।
* খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন আসা।
* চুল পড়া, ত্বক শুষ্ক এবং খসখসে হয়ে যাওয়া।
* মন খারাপ থাকা, আনন্দ না পাওয়া।
বাইরে থেকে দেখলে এগুলোকে অনেকেই “অলসতা” মনে করে, কিন্তু আসলে এগুলো
হরমোনাল ইমব্যালেন্স এর প্রভাব।
সামাজিক ভুল ধারণাঃ-
অনেক সময় আশেপাশের মানুষ ভাবে—
“হাঁটাচলা তো ঠিকই করছো, কষ্ট কোথায়?”
“কম খাও, বেশি হাঁটো, সব ঠিক হয়ে যাবে!”
কিন্তু তারা বোঝে না যে, হাইপোথাইরয়েডিজমে মেটাবলিজম স্লো হয়ে যায়, ঘুমের
চক্র নষ্ট হয়, এমনকি মানসিক শক্তিও অনেক কমে যায়।
রিসার্চে জানা গেছে যে, মহিলারা পুরুষদের তুলনায় থাইরয়েড রোগে বেশি
আক্রান্ত হন। এবং তাদের আক্রান্ত হবার সসম্ভাবনা পুরুষদের চেয়ে প্রায়
পাঁচ থেকে আট গুণ বেশি।
বিদেশে বনাম আমাদের ভারতীয় সমাজঃ-
উন্নত দেশগুলোতে থাইরয়েড রোগী থাকলে পরিবারের সদস্যদেরও কাউন্সেলিং করানো
হয়—
রোগীর সাথে কেমন ব্যবহার করতে হবে, কী খাওয়া যাবে আর কী যাবে না,
মানসিকভাবে কিভাবে সাপোর্ট দিতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে বেশিরভাগ
পরিবারে মুডসুইং বা ডিপ্রেশনকে “ঢং” বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে রোগীরা
শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েন।
করণীয়ঃ-
থাইরয়েড একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হলেও সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসা নিলে
নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই পরিবারের সদস্য, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সমাজের সবার
উচিত—রোগীকে বোঝা, সহমর্মিতা দেখানো, সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত চেকআপে
উৎসাহিত করা। মনে রাখবেন, থাইরয়েড শুধু শরীর নয়, মানসিক স্বাস্থ্যকেও
গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই রোগীর পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় সহায়তা।