শ্রেয়ার স্বপ্ন
রাকা নাথ,
কলকাতা
শ্রেয়া দাস তার বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় সে
অত্যন্ত মেধাবী। একসময় তারা উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জে থাকত। স্টেশন
থেকে অটো করে কয়েক মিনিটের পথ পেরিয়ে বাড়ি ফিরতে হতো। পরে বাবার
চাকরির সুবাদে স্টেশনের কাছেই একটি নতুন ফ্ল্যাটে তাদের বসবাস শুরু
হয়।
এখন শ্রেয়ার বয়স চব্বিশ বছর। সামনে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
লক্ষ্য ডাক্তার হওয়া।
একদিন সকালে চা খেতে খেতে মা বললেন,
- "শোন তো শ্রেয়া, তুই কি আরও পড়াশোনা করবি, নাকি এবার বিয়ের কথা
ভাববি?"
শ্রেয়া অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
- "এ কী বলছ মা! এখনই বিয়ে কেন? আমি তো আরও পড়তে চাই।"
মা একটু চিন্তিত গলায় বললেন,
- "তাই তো জিজ্ঞেস করছি। যদি বিয়ে করতেই হয়, তবে এখন থেকেই পাত্র দেখা
শুরু করতে হবে। পরে যদি ভালো পাত্র না পাওয়া যায়?"
এবার শ্রেয়ার বাবা হেসে বললেন,
- "কোনো পাত্রের জন্য আমার মেয়ের স্বপ্ন থেমে থাকবে না। ও আগে পড়াশোনা
করবে।"
তিনি স্নেহভরে মেয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
- "বল তো মা, তোর স্বপ্ন কী?"
শ্রেয়ার চোখে তখন আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি।
- "আমি ডাক্তার হতে চাই, বাবা। মানুষের সেবা করব। দেশের মানুষের পাশে
দাঁড়াব। এটাই আমার স্বপ্ন।"
বাবার মুখ গর্বে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
- "বাহ! এর চেয়ে বড় স্বপ্ন আর কী হতে পারে!"
মা এখনও কিছুটা দ্বিধায়।
- "মেয়ে যা ভালো বোঝে তাই করুক। তবে পরে বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেলে
কিন্তু আফসোস করতে হবে।"
শ্রেয়া শান্ত গলায় বলল,
- "মা, আগে আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। বিয়ে পরে হলেও হবে। আর বিয়েই
জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। একজন মানুষ নিজের স্বপ্ন পূরণ করেও সুখে
থাকতে পারে।"
কথা শেষ করে সে নিজের ঘরে পড়তে চলে গেল। সামনে এম.বি.বি.এস.-এর চূড়ান্ত
পরীক্ষা।
সময়ের স্রোতে কেটে গেল কয়েকটি মাস।
আগস্ট মাসে প্রকাশিত হলো এম.বি.বি.এস. পরীক্ষার ফল। শ্রেয়া অসাধারণ
সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হলো। দীর্ঘ দিনের কঠোর পরিশ্রমের পর সে চিকিৎসক
হিসেবে স্বীকৃতি পেল। ডাক্তারির সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে সে বাবার সামনে
দাঁড়াল।
বাবা সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে আবেগে ভরে বললেন,
- "আজ আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। আমার মেয়ে শুধু আমাদের নয়,
দেশেরও গর্ব।"
তিনি আনন্দে স্ত্রীকে ডাকলেন,
- "ওগো, তাড়াতাড়ি এসো! দেখো, আমাদের মেয়ে ডাক্তার হয়েছে!"
মা সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে দেখলেন। চোখে আনন্দ থাকলেও মনে তখনও একটাই
চিন্তা।
- "সবই তো হলো, কিন্তু বিয়েটা কবে করবে?"
শ্রেয়া মৃদু হেসে মায়ের হাত ধরল।
- "মা, আমার জীবনটা আমি মানুষের সেবায় উৎসর্গ করতে চাই। যদি কোনো দিন
মনে হয় বিয়ে করব, তখন নিশ্চয়ই ভাবব। কিন্তু শুধু সমাজের ভয়ে আমি কোনো
সিদ্ধান্ত নেব না। প্রয়োজন হলে আমি একাই থাকব। আমার রোগীরাই হবে আমার
বড় পরিবার।"
মেয়ের চোখের দৃঢ়তা দেখে মা আর কিছু বললেন না। তিনি বুঝলেন, মেয়ের সুখ
তার নিজের স্বপ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
সেদিন থেকে তিনিও মেয়ের সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে শিখলেন। আর মনে মনে
বললেন স্বপ্ন যদি সত্যিই নিজের হয়, তবে তাকে পূরণ করার সাহসও নিজের
মধ্যেই জন্মায়। আর সেই সাহসই একজন মানুষকে সবার থেকে আলাদা করে তোলে,
তাইতো তুই সবার থেকে এত আলাদা। আশীর্বাদ করি অনেক অনেক বড় হ মা।