শেষটুকু এখনও বাকি(তৃতীয় পর্ব)

প্রসেনজিৎ দাস,

পশ্চিম মেদিনীপুর


পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য লাইব্রেরি বিভাগে দেখুন...

পরদিন সকালে রমেন বাবু নিজের কাজে বেরিয়ে পড়েছিলেন। ঘরের ভেতর তখন মালতী সংসারের নিত্যকার কাজে ব্যস্ত, আর প্রীতি ও প্রত্যুষ তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আজ টিউশন ছুটি - তাই সকালের তাড়া নেই, নিস্তব্ধতা যেন ঘর জুড়ে মৃদু ছায়ার মতো বিস্তৃত।

হঠাৎই দরজার বাইরে পায়ের শব্দ। কিছুক্ষণ পরেই রমেন বাবু ফিরে এলেন। টালির চাল দেওয়া মাটির দাওয়ায় ধপ করে বসে পড়ে ক্লান্ত গলায় বললেন,

“মালতী, একটু জল দাও তো…”

অবাক হয়ে মালতী ছুটে এলেন, হাতে একটি স্টিলের ঘটিতে জল। স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত স্বরে বললেন,

“কি গো, ফিরে এলে? কাজে গেলে না?”

রমেন বাবু ধকধক করে কিছুটা জল পান করে একটু ধাতস্থ হয়ে মৃদু স্বরে উত্তর দিলেন,

“না গো, আজ আর যাইনি… শরীরটা ভালো লাগছে না, তাই ফিরে এলাম।”

মালতী উদ্বিগ্ন হয়ে স্বামীর গায়ে হাত রাখতেই আঁতকে উঠলেন।

“এই তো জ্বর! গা একেবারে পুড়ে যাচ্ছে! হঠাৎ এমন হলো কী করে?”

রমেন বাবু ক্লান্ত কণ্ঠে বললেন,

“জানো তো, পায়ের তলায় একটা ফোস্কাও পড়েছে…”

“ফোস্কা! কীভাবে হলো?” চমকে উঠলেন মালতী।

রমেন ধীরে ধীরে বললেন,

“কাল যে সকালে উদয়ন বাবুকে দাহ করে এলাম… সেখানেই আগুনের কয়লার টুকরোয় পা পড়ে গিয়েছিল। তাই ফোস্কা হয়েছে। কিন্তু এই জ্বরটা… বুঝতে পারছি না। আর বসে থাকতে পারছি না গো… এই দাওয়াতেই একটা মাদুর পেতে দাও, একটু শুয়ে পড়ি।”

এই সময়ে প্রীতি ঘুম থেকে উঠে সব শুনে ছুটে এল। বাবার পেছন থেকে গলা জড়িয়ে ধরে সরল উচ্ছ্বাসে বলল,

“বাপি, তুমি কি কাল দাদাকে সব গল্প বলে দিয়েছ? আমি তো কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেই পারিনি…”

কথা শেষ হওয়ার আগেই মালতী ধমক দিয়ে উঠলেন,

“এই, তুই চুপ কর! মানুষটা জ্বরে কাঁপছে, আর তোর এত কথা! যা, মুখ-হাত ধুয়ে এসে কিছু খেয়ে পড়তে বস।”

রমেন বাবু-র মাথায় তখন তীব্র যন্ত্রণা অসহ্য, অবিরাম। যন্ত্রণার ঢেউ যেন শরীরের প্রতিটি শিরায় শিরায় আছড়ে পড়ছে। কাতরাতে কাতরাতে হঠাৎই তার মনে পড়ে গেল কয়েক মাস আগের এক সন্ধ্যার কথা। সেদিনও কাজের সূত্রে বাইরে ছিল সে , অঝোর বৃষ্টিতে ভিজে জ্বরে কাবু হয়ে পড়েছিল। সেই রাতেও এমনই একাকীত্ব, এমনই অসহায়তা তাকে গ্রাস করেছিল।

যন্ত্রণার মাঝেই মায়ের কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। বাড়িতে থাকলে মা কত যত্ন করত , কপালে জলপট্টি দিত, নিজের হাতে খাইয়ে দিত, ওষুধ দিত। সেই স্মৃতি যেন আরও ব্যথা বাড়িয়ে দিল। চোখের কোণ বেয়ে নেমে এল অশ্রুধারা। অস্ফুট স্বরে কয়েকবার ডেকে উঠল সে - “মা… মা…”

ঠিক সেই সময়, যেন হঠাৎ করেই চারপাশের আলো ম্লান হয়ে এল। ঘরের পরিবেশ ধীরে ধীরে ডুবে গেল এক অদ্ভুত অন্ধকারে আলো-আঁধারির এক রহস্যময় খেলায়। রমেন বাবু ঘোরের মধ্যে শুয়ে শূন্যের দিকে, কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তখনই, যেন সেই কড়ি কাঠের দিক থেকে ভেসে উঠল এক বিশাল মুখ কালচে নীলাভ আভা, আলুথালু চুল, অথচ দৃষ্টিতে অপার মায়া। সেই মুখ নিবিড় স্নেহে চেয়ে রইল তার দিকে। মনে হলো, অদৃশ্য কোনো হাত তার মুখে কিছু তুলে দিচ্ছে মমতার স্পর্শে, স্নেহের আদরে। তারপর কপালে জলপট্টি দিয়ে ধীরে ধীরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল সে সত্তা। সেই স্পর্শে যেন সমস্ত যন্ত্রণা গলে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই, ঠিক যেমন রহস্যময়ভাবে এসেছিল, তেমনই মিলিয়ে গেল সে।

তারপর আর কিছুই মনে নেই।

ভোরে ঘুম ভাঙতেই রমেন বাবু দেখলেন, তিনি একটি ঘরের মধ্যে শুয়ে আছেন। শরীরে জ্বরের কোনো চিহ্ন নেই , একেবারে সুস্থ। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলেন, তার সাইকেলটি পড়ে আছে - কাল রাতের ঝড়-বৃষ্টিতে কাদা মাখামাখি হয়ে গেছে।

অবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন - সে কখন ফিরল? কীভাবে এলো ঘরে? কাল তো তার প্রবল জ্বর ছিল! তবে আজ এই সুস্থতা কীভাবে?

গত রাতের স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে ফিরে আসতে লাগল। আর সেই স্মৃতির ভেতর থেকেই যেন এক অলৌকিক উপলব্ধি জেগে উঠল তার মনে -

“তাহলে কি… মা তারা এসেছিলেন?”

শ্রদ্ধা আর ভক্তিতে তার বুক ভেঙে এল। অঝোরে কেঁদে উঠল সে -

“তোর এত দয়া, মা… সন্তানের কষ্ট দেখে তুই নিজেই চলে এলি!”

এইসব ভাবনাই তখন ঘুরপাক খাচ্ছিল তার মনে, যখন সে মাটির দাওয়ায় মাদুর পেতে শুয়ে ছিল। মনে মনে এক অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠল -

যদি আবার দেখা পাওয়া যায়! যদি আবার সেই মায়াময় স্পর্শ অনুভব করা যায়! তবে তার আর কোনো কষ্টই থাকবে না।

এমনকি, সেই সান্নিধ্যের জন্য যদি আরও কঠিন শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়, তাতেও সে প্রস্তুত।

এই ভাবনার স্রোতে ভেসে যেতে যেতে, ধীরে ধীরে তার চোখে নেমে এলো তন্দ্রার আবরণ অচেতনতার এক কোমল আলিঙ্গনে সে ডুবে গেল নীরবে।

ক্রমশঃ..............