শরতের চিঠি

অনিন্দিতা গুড়িয়া,

নতুন দিল্লি

প্রিয় বাঙালি,
আজকের স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, আর হোয়াটসঅ্যাপের দিনে চিঠিপত্রের বালাই নেই বললেই চলে। তবু অনেকদিন পর আবার তোমাদের কাছে লিখতে বসলাম। জানি, আমার আসার খবর তোমরা আগেই পেয়ে যাও। ভোরের বাতাসে শিউলির গন্ধ, নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, দূরের মাঠে কাশফুলের দোলা - এসবই তো আমার আগমনী বার্তা। তবু তোমাদের চোখে-মুখে যখন হঠাৎ আনন্দের আলো দেখি, তখন মনে হয়, প্রতি বছর নতুন করে তোমাদের কাছে আসাটাই যেন আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।
আমি শরৎ।
আমার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তোমাদের কত পুরোনো স্মৃতি! ছোটবেলার নতুন জামা, পুজোর বাজার, পাড়ার মণ্ডপে ছুটে যাওয়া, ঢাকের আওয়াজে বুকের ভেতর কেমন একটা আনন্দের ঢেউ ওঠা, অষ্টমীর অঞ্জলি, নবমীর রাত আর দশমীর বিষণ্ণ বিদায় সবকিছুর সঙ্গেই তো আমি কোথাও না কোথাও মিশে আছি।
তোমরা যখন কাশবনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাও, আমি নিঃশব্দে তোমাদের সঙ্গে হাঁটি। ভোরে শিউলি কুড়োতে বেরোনো শিশুটির হাতে আমি তুলে দিই এক মুঠো সাদা-কমলা স্মৃতি। আর যখন ঢাকের প্রথম আওয়াজ বাতাসে ভেসে আসে, তখন তোমাদের মনের দরজায় আলতো করে কড়া নেড়ে বলি-“মা আসছেন।”
তবে জানো, আমি শুধু উৎসবের শরৎ নই।
আমি সেই বৃদ্ধার জানালার পাশে বসে থাকা নরম রোদ, যিনি বিদেশে থাকার ছেলের অপেক্ষায় দিন গোনেন, যিনি বহু বছর পরও পুজোর দিনগুলোর কথা মনে করেন।
আমি সেই প্রবাসী বাঙালির চোখের কোণে জমে থাকা জল, যে দূরদেশে থেকেও ঢাকের শব্দ শুনলে নিজের শহরের কথা ভাবে।
আমি সেই মায়ের ব্যস্ততা, যিনি সবার নতুন জামা গুছিয়ে রাখতে রাখতে নিজের কথা ভুলে যান।
আমি সেই শিশুটির বিস্ময়, যে প্রথমবার মণ্ডপে এসে দেবী প্রতিমার দিকে তাকিয়ে থাকে মুগ্ধ চোখে।
আর আমি সেই মানুষটিরও সঙ্গী, যার জীবনে হয়তো আনন্দের চেয়ে দুঃখই একটু বেশি। তাকে আমি মনে করিয়ে দিতে চাই - অন্ধকার যত দীর্ঘই হোক, আলো আসবেই।

দেবীপক্ষের এই সময়ে তাই তোমাদের কাছে আমার একটিই অনুরোধ - শুধু মায়ের মূর্তির সামনে নয়, মানুষের মধ্যেও শক্তিকে খুঁজে নিও। যে হাতটি বিপদে তোমাকে ধরে, তাকে সম্মান করো। যে মানুষটি একা, তার পাশে দাঁড়াও। যে শিশু নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তাকে বাংলার একটি গল্প শোনাও, একটি বাংলা গান শোনাও, একটি পুজোর স্মৃতি উপহার দাও।
কারণ উৎসব তখনই পূর্ণ হয়, যখন তার আনন্দ সবার মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।
আজ তোমাদের শহর বদলেছে, জীবন বদলেছে, পুজোর ধরন বদলেছে। কিন্তু তোমাদের হৃদয়ের সেই পুরোনো অপেক্ষাটা এখনও বদলায়নি। এখনও ষষ্ঠীর ভোরে মন বলে ওঠে-“এবার মা এলেন।”
এই অপেক্ষাটুকু বাঁচিয়ে রেখো। এই বাংলাটুকু বাঁচিয়ে রেখো। শিউলির গন্ধ, কাশফুলের দোলা, ঢাকের বাদ্যি আর বাংলায় বলা ভালোবাসার কথাগুলোকে বাঁচিয়ে রেখো।
আমি আবার আসব। হয়তো আগামী বছর, আবার কোনো নীল আকাশের সকালে। ততদিন তোমাদের হৃদয়ের কোণে আমার জন্য একটু জায়গা রেখো।
মায়ের আগমনী আলোর সঙ্গে তোমাদের সকলের জীবন ভরে উঠুক আনন্দে, শান্তিতে আর ভালোবাসায়।

ইতি, তোমাদেরই শরৎ
শুভ দেবীপক্ষ।
শুভ শারদীয়া।