শেষ ট্রেনের যাত্রী

উজ্জ্বল দাস,

কলকাতা

বছর তিরিশ আগের কথা।
তখন মোবাইল ফোন ছিল না, স্টেশন জুড়ে এল, ই, ডির ঝলমলে আলোও নয়। রাত যত গভীর হতো, ছোট ছোট গ্রামীণ স্টেশনগুলো ততই যেন পৃথিবীর মানচিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।
সিদাম সেদিন কাজে গিয়েছিল শিউলিডাঙ্গা হল্টে। ফেরার কথা ছিল সন্ধের ট্রেনে। কিন্তু কাজ শেষ হতে দেরি হয়ে যায়। যখন শিউলিডাঙা হল্টে পৌঁছল, স্টেশনের পুরোনো ঘড়িতে তখন রাত ন'টা চল্লিশ।

স্টেশনমাস্টার জানালেন, হাওড়াগামী লোকাল অন্তত দেড় - দু'ঘণ্টা দেরি করবে।
অগত্যা অপেক্ষা।
স্টেশনটা এমনিতেই নির্জন। নিচু প্ল্যাটফর্ম। দুটো লাইন ছাড়া চারদিকে কেবল ধানখেত। বাতাসে কাঁচা মাটি আর বুনো ফুলের গন্ধ। দূরে কোথাও শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে। স্টেশনমাস্টারের ঘরে টিমটিমে একটা বাতি জ্বলছে। বাকি স্টেশন অন্ধকারে ডুবে।রাত জাগা কিছু পাখি তখনো বাসায় ফেরার জন্য ব্যস্ত। তাদের ডাকে যেন গায়ে মাঝে মধ্যেই কাঁটা দিয়ে উঠছে সিদামের।

দুপুরের পর থেকে সিদামের পেটে একফোঁটা খাবার পড়েনি। যদি একটা চায়ের দোকানও অন্তত খোলা থাকত!
হঠাৎ...
“মহাশয়... একবার হাতটা ধরে টেনে দেবেন?”
শব্দটা এল উল্টোদিকের লাইন থেকে।
সিদাম চমকে তাকাল।
অন্ধকার ভেদ করে ধুতি, পাঞ্জাবি পরা এক বৃদ্ধ এগিয়ে আসছেন। । মাথায় পুরোনো লোহার ট্যাংকি। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে বুঝেই সিদাম প্ল্যাটফর্মের কিনারায় গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল।
বৃদ্ধও হাত বাড়ালেন।

মুহূর্তের জন্য সিদামের বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল। হাতে একটা কেমন যেন স্পর্শ। কিন্তু সে গুরুত্ব দিল না। জোরে টান দিতেই বৃদ্ধ প্ল্যাটফর্মে উঠে এলেন।
“বড় উপকার করলেন,” মৃদু হেসে বললেন তিনি।
তারপর মাথার ট্যাংকিটা সামলে ধীরে ধীরে স্টেশনমাস্টারের ঘরের দিকেই হাঁটতে লাগলেন।
সিদাম ভাবল, যাক, অন্তত একজন সঙ্গী পাওয়া গেল। কিন্তু কথা বলার আগেই বৃদ্ধ অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন।
কয়েক মিনিট অপেক্ষা করেও তিনি আর ফিরলেন না।
কৌতূহলবশত সিদাম উঠে দাঁড়াল।
স্টেশনমাস্টারের ঘরের দিকে তাকিয়ে রইল।
কেউ নেই।
চারদিকে শুধু বাতাসের শব্দ। টিমটিমে আলোয় ঘনঘন ঝিঁঝিঁর ডাক আর পাতা খসার শব্দ ব্যাস।
ঠিক তখনই চোখ পড়ল প্ল্যাটফর্মের কিনারায়।
সেখানে একটা লোহার ট্যাংকি পড়ে আছে।
সিদাম হতচকিত হয়ে অপলক তাকিয়ে থাকে।
বৃদ্ধ তো এটা মাথায় নিয়েই চলে গেছিলেন!
ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সে।
ট্যাংকির হাতল ধরতেই হাতটা কেমন আঠালো লাগল।
স্টেশনের মৃদু আলোয় নিজের আঙুলের দিকে তাকিয়ে সিদামের বুক হিম হয়ে গেল।
আঙুলে লেগে আছে শুকিয়ে যাওয়া কালচে রক্ত।
আর ঠিক ট্যাংকির পাশেই পড়ে আছে একটি সাদা পাঞ্জাবি জড়ানো মানুষের হাত।
কবজির খানিক ওপর থেকে কাটা।
ধুতি - পাঞ্জাবির সাদা হাতা এখনও কবজির সঙ্গে ঝুলছে।
সেই হাতটাই...
কয়েক মিনিট আগে সিদাম শক্ত করে ধরে টেনে তুলেছিল।
সিদামের গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না।
হঠাৎ পিছন থেকে স্টেশনমাস্টারের কণ্ঠস্বর ভেসে এল -
“কিছু হয়েছে?”
কাঁপা গলায় সবটা বলল সিদাম। গলা থেকে শব্দগুলো আতঙ্কের সঙ্গে বেরোচ্ছিল কোনোরকমে।
স্টেশনমাস্টার অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“আপনি আজ যাকে দেখেছেন, তাকে এই লাইনের পুরোনো লোকেরা চেনে।”
সিদাম স্তব্ধ।কোনো প্রশ্ন করতে পারে না সিদাম।
“প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে এক মিষ্টিওয়ালা এই স্টেশনেই শেষ ট্রেন ধরতে এসে লাইনে কাটা পড়েছিলেন। মাথায় ছিল ঠিক এমনই একটা লোহার ট্যাংকি। লোকজন যখন ছুটে আসে, তখন শরীর আর ডান হাত আলাদা হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে মাঝেমধ্যে শেষ ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা এক - আধজন যাত্রী বলেন কেউ একজন নাকি হাত বাড়িয়ে বলে, ‘একবার টেনে দেবেন?’”
স্টেশনমাস্টার থামলেন।
“কেউ বিশ্বাস করে, কেউ করে না।”
দূরে তখন ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছে।
সিদাম আর একবার নিচে তাকাল।
প্ল্যাটফর্মে আর কিছু নেই।
না ট্যাংকি।
না কাটা হাত।
শুধু নিজের ডান হাতের তালুতে পাঁচটি শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ স্পষ্ট হয়ে লেগে আছে। ট্রেনে উঠে বসার পরেই ট্রেনটা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল। পাশের প্লাটফর্মে হঠাৎ চোখ যায় সিদামের। খেয়াল করে দেখে সেই ধুতি-পাঞ্জাবি পড়া ভদ্রলোক যেন তার দিকেই তাকিয়ে আছে আর দূর থেকে হাত নেরে বিদায় সম্ভাষণ জানাচ্ছেন।
বাড়ি তো ফিরে এসেছিল সিদাম। অনেকবার হাত ধোবার পর রক্তও উঠে গিয়েছিল।

কিন্তু সেই অস্বাভাবিক স্পর্শ...