শেষ ৫০ পয়সা
উজ্জ্বল দাস,
কলকাতা
কলকাতার বিকেলটা তখন ধীরে ধীরে সন্ধের দিকে ঝুঁকছে। অফিস ছুটির ভিড়ে
ঠাসা বাসে কোনোমতে দাঁড়িয়ে ছিলো অরিন্দম। সারাদিনের ক্লান্তি, মাথায়
হাজার চিন্তা। তার উপর আবার পকেটে খুচরো নেই।
বাস থেকে নামার সময় কন্ডাক্টর বললো,
- “দাদা ভাড়াটা !”
অরিন্দম মানিব্যাগ খুলে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলো,
- “একটা ৫০ পয়সা আছে… নেবেন?”
কন্ডাক্টর হেসে উঠলো,
- “ওসব এখন আর চলে না দাদা! রেখে দিন।”
আর কিছু ছিলো না। অগত্যা নেমে পড়লো অরিন্দম। বাকিটা পথ হাঁটতেই হবে।
রাস্তার ধারে আলো জ্বলছে, দোকানগুলো একে একে খুলে বসেছে। হালকা বাতাসে
পুরনো কলকাতার গন্ধ। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই একটা কণ্ঠস্বর,
- “বাবা… কিছু দাও না… সারাদিন কিছু খাইনি…”
একজন বৃদ্ধ ভিখারি। চোখে অদ্ভুত এক শান্তি, কিন্তু মুখে অভাবের স্পষ্ট
ছাপ।
অরিন্দম একটু থমকে দাঁড়ালো। পকেটে হাত দিলো। সেই একটাই ৫০ পয়সা।
মনে মনে ভাবলো -
এটা দিয়েই বা কী হবে? এটাওতো কেউ নেবে না…
তবু যেন এক অদ্ভুত টান। কয়েনটা বাড়িয়ে দিলো বৃদ্ধের দিকে।
বৃদ্ধ কয়েনটা হাতে নিয়ে মুচকি হেসে বললো-
- “তুমি জানো না বাবা… ৫০ পয়সা এখনও চলে… শুধু মানুষ ভুলে গেছে তার
দাম।”
কথাটা শুনে অরিন্দম একটু অবাক হলো। কিন্তু আর কিছু না বলে হাঁটা দিলো।
বাড়ি ফিরে জামা বদলাতে গিয়ে মানিব্যাগটা খুলতেই চমকে উঠলো।
ভিতরে কয়েকটা নতুন নোট। পাঁচশো, দু’শ… যেগুলো সে রাখেইনি!
হৃদস্পন্দন একটু বেড়ে গেলো।
এগুলো এলো কোথা থেকে?
পরদিন অফিস যাওয়ার আগে সে আবার সেই জায়গায় গেলো। বৃদ্ধকে খুঁজবে
বলে।
কিন্তু সেখানে কেউ নেই।
একটা চায়ের দোকানে জিজ্ঞেস করতেই দোকানদার বললো –
- “কাউকে খুঁজছেন?”
- “একজন বৃদ্ধ ভিখারি… এখানে বসে…”
দোকানদার একটু চুপ করে থেকে বললো -
- “আপনি নতুন বুঝি? এখানে তো বহু বছর আগে একজন ভিখারি ছিলো… মারা গেছে।
শেষদিকে নাকি সবার কাছে ৫০ পয়সা চাইতো…”
অরিন্দমের গা শিউরে উঠলো। নার্ভগুলো যেন সচেতন হয়ে উঠলো।
ধীরে ধীরে পকেটে হাত দিলো সে।
ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা ৫০ পয়সা।
কিন্তু এটা তো সেই পুরনো, মলিন কয়েন নয়।
এটা ঝকঝকে… একেবারে নতুন।
অরিন্দম চুপ করে তাকিয়ে রইল কয়েনটার দিকে।
মনে মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরতে লাগলো -
সত্যিই কি ৫০ পয়সা অচল …
নাকি অচল হয়ে গেছে আমাদের দেওয়ার ইচ্ছে।