সংসার
সুমনা মজুমদার দাস,
কলকাতা
"আপনার নাম বুঝি দেবেন্দ্র প্রামাণিক, আজ্ঞে আমারও তাই, হে হে..... "
কথাগুলো হাসি হাসি মুখ করে পঁচাওর বছর বয়সের রোগা লোকটি সামনে বসা বেশ
লম্বা চওড়া চেহারার তার প্রায় সমবয়সী ভদ্রলোকটিকে উদ্দেশ্য করে
বলল।
এরপর রোগা লোকটি ভদ্রলোকটির পাশে বসাতে ভদ্রলোকটি একটু অস্বস্তি বোধ করতে
লাগলেন। কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারলেন না। তিনি তখন অন্যমনস্কতার ভান করে
অপরিচিত লোকটিকে বোঝাতে চাইলেন যে তিনি তার প্রতি আগ্রহী নন।
এদিকে রোগা লোকটি তাকে উদ্দেশ্য করে অনর্গল কথা বলেই চলেছেন।
"আসলে এর আগে একই নাম ও একই পদবীর কারোর সাথে কখনো আলাপ হয়নি। তাই একটু
অবাক লাগছে। তা এখানে এসে থেকে মনটা একটু খারাপই ছিল, আসলে সংসার ছেড়ে
কখনো এত দূরে আসিনিতো "
একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তারপর আবার বলতে শুরু করল, "সংসারের মায়া বড়ো মায়া, এ মায়ার বাঁধনে
যে একবার পরেছে সে সহজে বেরিয়ে আসতে পারে না। আপনি সংসারের জন্য যতই করুন
না কেন তবুও সবাই বলবে আপনি কিছুই করেননি। এই হলো সংসারের নিয়ম।
এই আমাকেই দেখুন না, সারাজীবন অল্পবিদ্যা পেটে নিয়েই কল-কারখানায় কাজ
করে সংসার চালিয়েছি। সেই সামান্য আয় দিয়েই বেড়ার বাড়ি থেকে পাকা
বাড়ি করেছি, জলের লাইন বসিয়েছি, বিদ্যুৎ এনেছি, বোনের বিয়ে
দিয়েছি,ছেলেকে ভালো স্কুলে পড়িয়েছি, ছেলে বড়ো হয়ে চাকরি করা শুরু
করলে তখন তারও বিয়ে দিয়েছি। তবু সকলে বলে আমি কিছুই করিনি।
হ্যাঁ, একটা কাজ আমি করিনি, তা হল সঞ্চয়। কোনোদিন ভবিষ্যৎ-এর কথা ভেবে
কোনো সঞ্চয় করিনি। আর সামান্য আয়ে থেকে কিইবা সঞ্চয় করতাম। সারাজীবন
বতর্মান নিয়েই ভেবেছি আর আনন্দ-ফূর্তি করেই কাটিয়েছি। আরে জীবন-যৌবন তো
একটাই, তাই না? তবে
জীবনের প্রথম দিকটা ভালো কাটলেও শেষটা কিন্তু ভালো কাটলোনা, হয়তো
সঞ্চয়ের অভাবে। যখন আমি চাকরি ছাড়ি তখন আমার হাত একদম খালি।"
স্বাস্থ্যবান ভদ্রলোকটি এতক্ষণ অপরিচিত লোকটির কথা এক রকম বাধ্য হয়েই
শুনে যাচ্ছিলেন। কিন্তু কখন যে তিনি লোকটির কথার গভীরতায় প্রবেশ করে
ফেলেছেন তা তিনি বুঝতেও পারেননি। নিজের অজান্তেই তিনি লোকটিকে জিজ্ঞেস
করলেন," আপনার পেনশন ছিল না? "
একথা শুনে লোকটি একটু উত্তেজিত হয়ে বললেন, "কল-কারখানার শ্রমিকদের আবার
পেনশন? বাড়িতে যখন 'বেকার','অকর্মা', 'ছেলের ঘাড়ে বসে খাও' এই ধরনের
কথা শুনি তখন মনে হয় বয়স্কদের জন্য পেনশনটা সত্যিই দরকার। বউ-ছেলেকে
যখন দীঘা, পুরী, দার্জিলিং ঘুরিয়েছি, ভালোমন্দ খাইয়েছি, যথা সম্ভব
চাহিদা মিটিয়েছি তখন তো কেউ বলেনি যে এভাবে ফালতু খরচ না করে ভবিষ্যতের
জন্য সঞ্চয় করো।"
একটু দুঃখিত স্বরে তিনি আবার বললেন,"তবে আমি মনে করি যে পরিবারের সাথে
ঘুরতে গেলে, তাদের সাথে সময় কাটালে একটা আলাদা ভালোবাসার বন্ধন তৈরি হয়
যেটা রোজকার জীবনে সম্ভব নয়। হয়তো এই বন্ধনটা তৈরি করতে পেরেছিলাম বলেই
আমার ছেলেটা এখনো আমায় খুব ভালোবাসে। কখনো বোঝা মনে করেনি।
নিজের খরচ চালাতে ট্রেনে হকারি করার চেষ্টাও করেছিলাম কিন্তু খোকার তাতে
খুব আপত্তি তাই আর কিছুই করা হয়ে ওঠেনি। এদিকে বউমা মনে করে আমরা
বয়ষ্করা তাদের স্বচ্ছন্দ জীবন যাপনের পথের বড়ো বাঁধা। ছেলের স্বল্প আয়
পাঁচজনের সংসারের জন্য যথেষ্ট নয়। তবুও খোকা সব সময়ই চেষ্টা করে সবাইকে
খুশি রাখতে।
একদিন বউমা খোকাকে নিয়ে আলাদা সংসার করার কথা বলাতে খোকার সাথে তার
তুমুল অশান্তি হলো। তারপর বউমা রাগ করে পাঁচ বছরের নাতনীটাকে নিয়ে বাপের
বাড়ি চলে গেল। আমরা অনেক চেষ্টা করেও তাকে আটকাতে পারিনি। আমার নাতনীটা
আমাকে খুব ভালোবাসে। সে তার মায়ের সাথে যেতে চাই ছিল না বলে বউমা তাকে
কি মারটাই না মারলো। তা দেখে আমার বুকটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছিল
। মনে হচ্ছিল আঘাতগুলো যেন আমার শরীরেই লাগচ্ছিল। কিন্তু তখন আমি এতটাই
অসহায় ছিলাম যে কিছুই করতে পারিনি।
এদিকে বাড়িতে বউ-মেয়ে না থাকায় খোকাও যেন কেমন হয়ে যাচ্ছিল। সময় মতো
কাজে যেত না, দেরী করে বাড়ি ফিরত, ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়া করত না, কিছু বদ
সঙ্গও জুটিয়ে ছিল। ওর জন্য ভারী কষ্ট হতো, যেন আমাদের জন্যই ওর সংসারটা
ভেঙে যেতে বসেছে। একদিন মনে হলো যদি আমরা সংসারে না থাকি তবে হয়তো ওর
সংসারটা বেঁচে যাবে। তাই আজ আমি এখানে। বউকেও বলেছিলাম আমার সাথে আসতে
কিন্তু সে রাজি হলো না। শুধু একটাই আপশোস যে শেষবারের মতো নাতনীটাকে
দেখতেও পেলাম না। "
কথা শেষ করে রোগা লোকটি এবার শিশুদের মতো ঢুকরে কেঁদে উঠলো। পাশের
ভদ্রলোকটি এতক্ষণ তার কথার মধ্যে তন্ময় হয়ে গিয়েছিলেন,হঠাৎ কান্নার
শব্দ শুনে তাকে সান্তনা দিয়ে বললেন, " আপনি কাঁদবেননা প্লিজ, আমি এতক্ষণ
আপনার সব কথাই শুনলাম। আপনি মনে করেন যে টাকা থাকলেই সুখী হওয়া যায়।
আপনার টাকা ছিলনা বলে আপনি সুখী হতে পারেননি কি তাই তো?"
চোখ মুছতে মুছতে রোগা লোকটি বললেন, "আপনাকে তো দেখে বেশ সম্ভ্রান্ত বলেই
মনে হয়। আপনি নিশ্চয়ই খুব সুখী ছিলেন তাহলে আপনি এখানে কেন? "
একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন," আমি কেমন সুখে সুখী তা আমার কথা
শুনলেই বুঝতে পারবেন।
আমি শিক্ষিত, ভদ্র বংশের ছেলে আমার বাবা উচ্চ শিক্ষিত হয়েও টাকা করতে
পারেননি। তাই ছোট থেকেই নিজের সব না পাওয়া গুলোকে পাবার জন্য টাকা
রোজগারেই বেশি মনোযোগ দিয়ে ছিলাম।
আমি উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মী ছিলাম। চাকরি সূত্রে বহু জায়গায়ে গিয়েছি।
কিন্তু আপনার মতো পরিবারের সাথে কোনোদিন কোথাও যাওয়া হয়নি। রোজগারের
নেশায় এতটাই মত্ত হয়ে ছিলাম যে ছেলের শৈশব দেখতে পাইনি,কোনোদিন
স্ত্রী-ছেলের বিশেষ দিনগুলোতে সময় দিতে পারিনি। শুধু ভেবেছি, এখনই তো
খাটার সময়, এখন খাটতে পারলে পায়ের উপর পা তুলে বাকি জীবনটা কাটাতে
পারবো।
কিন্তু হায়! টাকা দিয়ে আমি সুখ কিনতে পারলামনা।
যখন রিটায়ার্ করলাম তখন আমার ব্যাঙ্কে অনেক টাকা। প্রতি মাসে মোটা টাকার
পেনশন ঢুকছে অ্যাকাউন্টটে। কিন্তু ততদিনে আমার সংসারকে আমি হারিয়ে
ফেলেছি।
আমার স্ত্রী তখন প্যারালাইজ হয়ে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ছেলে বিদেশে
পড়তে গিয়ে সেখানেই এক বিদেশিনীকে বিয়ে করে সংসার করছে। প্রতি মাসে
শুধু টাকা পাঠিয়েই বাবা-মা এর প্রতি কর্তব্য সারে। দেশে সে আসতে চায়না।
শুধু একবার একা এসেছিল তার মায়ের স্টোকের সময়। তারপর আর আসেনি।"
এবার তিনি রোগা লোকটির কাঁধে হাত রেখে বললেন," আপনি তো খুব লাকি যে আপনার
সংসারে অভাব-অনটন আপনার সংসারটা তো ছিল। আমার তো থেকেও নেই। জানেন,
স্ত্রী সুস্থ থাকতে তার সাথে কোনোদিন ভালো করে কথা বলিনি। শুধু যে দামি
শাড়ি-গয়নাতেই স্ত্রী - এর সুখ থাকেনা তা অনেক পরে বুঝেছিলাম। তাই
অসুস্থ স্ত্রীর পাশে বসে বিভিন্ন কথা বলে তাকে সঙ্গ দিতে চেষ্টা করতাম।
কিন্তু তা আর বেশিদিন করতে পারলাম না। যেদিন সে আমাকে সম্পূর্ণ একা করে
দিয়ে চলে গেল সেদিন মনে হল সারা জীবন ধরে যে সুখের জন্য অনেক ত্যাগ
স্বীকার করে সঞ্চয় করলাম সেই সুখ চিরকাল অধরাই থেকে গেল।"
ভদ্রলোক এবার উত্তেজিত হয়ে বললেন," এই টাকার সমুদ্রে আমি যেন ডুবে
যাচ্ছিলাম, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল আমার। আর থাকতে পারলাম না। চলে এলাম
এখানে।"
এবার দুই প্রামাণিক পরস্পরের হাতে হাত রেখে নিজের হৃদয়ের ভার হালকা করার
আনন্দে আনন্দিত হলেন।
এ সময় দুজনের ডাক পরতেই দুজনেই উঠে দাঁড়ালেন। আর চলেন অকাল
মৃত্যুৎ-পরবর্তী এক নতুন সংসারের উদ্দেশ্যে।
সমাপ্ত