রোমাঞ্চের হাতছানি

অনিন্দিতা গুড়িয়া,

নিউ-দিল্লি

২০২৫ সাল। স্কুলে স্কুলে গরমের ছুটি চলছে। বাবা-মা গত প্রায় আড়াই বছর ধরে সেজো বোনের কাছে পোর্ট ব্লেয়ারে ছিলেন। সেই কারণে আমাদেরও প্রায় তিন বছর কলকাতায় যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এ বছর বাবা-মা ফিরে এসেছেন, তাই অনেকদিন পর সবাই মিলে কলকাতায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। বেশ আগে থেকেই ট্রেনের টিকিট কেটে রাখা হয়েছিল। মনে হয়েছিল, দীর্ঘদিন পর আবার একসঙ্গে হবে পারিবারিক মিলনমেলা।

কিন্তু মানুষের পরিকল্পনার ওপর তো ভাগ্যেরও একটা নিজস্ব পরিকল্পনা থাকে।

প্রথমে ওয়াকফ আইনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অশান্তির খবর কানে আসতে লাগল। তার কিছুদিন পরই ঘটল কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের সেই মর্মান্তিক ঘটনা। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠল। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতি, যুদ্ধের আশঙ্কা, চারদিকে উদ্বেগের আবহ- সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, বুঝি বড় ধরনের সংঘাতের মুখোমুখি হতে চলেছে দেশ। এরপর শুরু হল ‘অপারেশন সিন্দুর’। সংবাদমাধ্যমের টানা প্রচার ও নানা জল্পনায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ বলে মনে হচ্ছিল।

পরিবারের সকলেই পরামর্শ দিল, এমন অবস্থায় অযথা দীর্ঘ ভ্রমণে না যাওয়াই ভালো। যে যেখানে আছি, সেখানেই থাকি। তাই অনেকটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও সবার কলকাতার টিকিট বাতিল করে দেওয়া হল।

মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল।
তবে তখনও বুঝিনি, আরও বড় আক্ষেপ অপেক্ষা করে আছে সামনে। কারণ অল্পদিনের মধ্যেই যুদ্ধ পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেল। তখন শুরু হল আফসোস- “ইস্! এত তাড়াতাড়ি টিকিটগুলো বাতিল না করলেই হত!”

সবচেয়ে বেশি মন খারাপ হয়েছিল বাচ্চাদের। বছরের এই একটা সময়েই তো ওরা দাদু-দিদুর বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ পায়। দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ভাইবোন, মাসিমনিরা, সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়। সেই আনন্দ থেকে এ বছর ওরা বঞ্চিত হল।

আমার মেজ বোন থাকে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে। তারও কলকাতায় যাওয়ার কথা ছিল। ভেবেছিলাম, অনেকদিন পর ভাইবোনেরা সবাই একসঙ্গে হব। কিন্তু যখন সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেল, তখন আমি বোনকে বললাম-
“তুই বরং দিল্লিতে চলে আয়। তোর ছেলে আর আমার ছেলে-মেয়ে মিলে কটা দিন খুব আনন্দ করবে। তিন ভাইবোন একসঙ্গে থাকলে ওদেরও ভালো লাগবে।”

মে মাসের শেষের দিকে মেজ বোন তার ছেলেকে নিয়ে উজ্জয়িনী থেকে দিল্লি চলে এল। তারপর শুরু হল বাচ্চাদের আনন্দযজ্ঞ। দিল্লির অসহনীয় গরমকেও উপেক্ষা করে ওরা তিন ভাইবোন মিলে শহরের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে লাগল। আর আমরা দুই বোন? আমরা কিন্তু ঘরের মধ্যেই রইলাম। সত্যি বলতে কী, সেই দহনজ্বালা গরমে বাইরে বেরোনোর কথা ভাবলেই ক্লান্তি এসে যেত।

কিন্তু ছুটি কি আর শুধু ঘরে বসে কাটানো যায়?

একসময় মনে হল, না, কোথাও না কোথাও বেরোতেই হবে। দিল্লির এই দাবদাহ থেকে কয়েক দিনের জন্য হলেও মুক্তি চাই। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হল নতুন পরিকল্পনা। অনেক চিন্তাভাবনার পর টিকিট কেটে ফেললাম।

অবশেষে ২৯ মে, ভোরের আলো ফোটার আগেই তল্পিতল্পা গুছিয়ে দুর্গা দুর্গা বলে আমরা পাঁচজন বেরিয়ে পড়লাম। সামনে কয়েক দিনের মুক্তির স্বাদ, কিছুটা প্রকৃতির সান্নিধ্য, কিছুটা একসঙ্গে কাটানোর আনন্দ।

দিল্লির ব্যস্ত, যান্ত্রিক জীবনকে কয়েক দিনের জন্য পিছনে ফেলে আমরা উঠে বসলাম জন শতাব্দী এক্সপ্রেসে। গন্তব্য- উত্তরাখণ্ডের শান্ত, সবুজে ঘেরা পাহাড়ি শহর কোটদ্বার।

নতুন এক ভ্রমণকাহিনির সূচনা হল সেদিন ভোরে।

সমতলের গরম আর কোলাহল পেছনে ফেলে ট্রেন ছুটে চলল পাহাড়ের কোলে। আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল বিখ্যাত সিদ্ধবলী মন্দিরের গেস্ট হাউসে। গেস্ট হাউসের ঠিক পাশ দিয়েই ঝিরঝির শব্দ তুলে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী কোহ। নদীর কলকল ধ্বনি আর পাহাড়ি হাওয়ার মৃদু স্পর্শ যেন ক্লান্ত মনকে মুহূর্তেই সতেজ করে দিল।

সন্ধ্যাবেলায় আমরা মন্দিরে আরতি দেখতে গেলাম। ধূপ, প্রদীপ আর ঘণ্টাধ্বনির মায়াময় পরিবেশ মনকে এক অনাবিল শান্তিতে ভরিয়ে দিল, ভক্তিগানের সুরে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠেছিল। তারপর মন্দিরের সর্বোচ্চ স্থানে উঠে দাঁড়িয়ে দেখলাম এক অপার্থিব দৃশ্য। পশ্চিম আকাশে সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে নিচের শহরের ঘরবাড়িগুলিতে একে একে জ্বলে উঠছে আলো। মনে হচ্ছিল যেন অন্ধকারের ক্যানভাসে অসংখ্য জোনাকি ছড়িয়ে পড়েছে।

গেস্ট হাউসের এক পাশে বয়ে চলেছে কোহ নদী, আর অপর পাশে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে সবুজে মোড়া পাহাড়। প্রকৃতি যেন দু'হাত ভরে আশীর্বাদ বিলিয়ে দিয়েছে এই স্থানকে। নদীর ধারে ধারে আঁকাবাঁকা সর্পিল রাস্তা চলে গেছে দূর অজানায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেই পথে অবিরাম ছুটে চলেছে গাড়ি, অথচ প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্য কোথাও যেন বিন্দুমাত্র ব্যাহত হয় না।

পরদিন ভোরে কোটদ্বারের মেন বাজার থেকে পথে খাবার জন্য লিচু আর আম কিনে একটি গাড়ি ভাড়া করে আমরা রওনা দিলাম ল্যান্সডাউনের পথে। সমতলের বাসিন্দা হিসেবে পাহাড়ি পথে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমাদের খুব বেশি ছিল না। তাই যাত্রার শুরু থেকেই উত্তেজনার সঙ্গে মিশে ছিল খানিকটা ভয়।

পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল। রাস্তার একপাশে সুউচ্চ পাহাড় আর অপর পাশে অতল খাদ। এক একটি ব্লাইন্ড টার্নের মুখে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি গাড়ি খাদে গড়িয়ে পড়বে! কোথাও রাস্তার একাংশে ধস নেমে ভয়ঙ্কর অবস্থা, কোথাও আবার এত সরু পথ যে দুটো গাড়ির ক্রসিংয়ের সময় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। কিন্তু অভিজ্ঞ চালকের দক্ষ হাতে আমরা নিরাপদেই এগিয়ে চললাম।

পথের ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছিল প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য। পাহাড়ের চূড়াগুলো মেঘে ঢাকা পড়ে যেন ধোঁয়াটে স্বপ্নরাজ্য তৈরি করেছে। দূরে দূরে পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে থাকা বাড়িগুলোকে মনে হচ্ছিল খেলনা বাড়ি, যেন কেউ তার নিপুন হাতে সুন্দর সুন্দর রঙিন বাড়িগুলি হ্যাঙ্গারে করে ঝুলিয়ে রেখেছে পাহাড়ের গায়ে গায়ে। পথে কত রকম বন্যপ্রাণীও দেখতে পেলাম! কোথাও ঝরনার ধারে এক পাল হরিণ জল পান করছে, কোথাও কয়েকটি ভালুক নদী পার হচ্ছে, আবার কোথাও নীলগাইয়ের দল পাহাড়ের ঢালে চরে বেড়াচ্ছে।

ল্যান্সডাউনে পৌঁছেই আমরা পাহাড়ি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ, এরই মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বিশাল পাইন গাছের সারি। এত উঁচু গাছ আমি জীবনে আগে কখনও দেখিনি। ঘাড় পেছনের দিকে হেলিয়ে অনেক চেষ্টা করেও গাছগুলোর চূড়া চোখে পড়ছিল না। প্রকৃতির সেই অপরূপ মহিমা যেন আমাদের এক মুহূর্তেই অন্য এক জগতে নিয়ে গেল।

ল্যান্সডাউন বাজার থেকে আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল ভূল্লা তাল। গাড়ির চালক এবং কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার কাছ থেকে জানতে পারলাম, পাহাড়ি পথ ধরে মাত্র দশ-পনেরো মিনিট হাঁটলেই সেখানে পৌঁছে যাওয়া যাবে। অনেক পর্যটককে পায়ে হেঁটে যেতে দেখে আমরাও গাড়ি না নিয়ে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু পরে বুঝেছিলাম, সেটাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল!

আমাদের সবার পিঠেই এক একটা ছোট খাটো বোঝা। কোনটাতে জলের বোতল, কোনটাতে খাবার আবার কোনটাতে ছাতা ইত্যাদি ইত্যাদি। পাহাড়ের মানুষের কাছে দশ-পনেরো মিনিটের হাঁটা আর সমতলের মানুষের কাছে পাহাড়ি পথে দশ-পনেরো মিনিটের হাঁটা -দুটোর মধ্যে যে কতটা পার্থক্য, তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম। পাঁচ-সাত মিনিট এগোতে না এগোতেই হাঁপিয়ে উঠলাম। ক্লান্তিতে পথের ধারে যেখানে সুযোগ পাচ্ছিলাম, সেখানেই একটু বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। কোথাও রাস্তার পাশে বসার জন্য বেঞ্চ ছিল, কোথাও আবার পাথরের উপরেই বসে পড়ছিলাম।

তবে আমাদের ক্লান্তির মাঝেও বাচ্চাদের উৎসাহের কোনো কমতি ছিল না। তারা আনন্দে চারপাশের প্রকৃতি দেখতে দেখতে এগিয়ে যাচ্ছিল। পথের ধারে ফুটে থাকা রঙিন পাহাড়ি ফুল তুলে এনে কখনও আমাদের চুলে গুঁজে দিচ্ছিল, আবার কখনও চিড় বা পাইনের ফল কুড়িয়ে যত্ন করে জমা করছিল। এসবই ছিল তাদের কাছে একেবারে নতুন আর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

অবশেষে প্রায় চল্লিশ মিনিট আঁকাবাঁকা পাকদণ্ডী পথ পেরিয়ে আমরা পৌঁছালাম ভূল্লা তালে। সেখানে পৌঁছেই যেন পথশ্রমের সমস্ত ক্লান্তি মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। স্বচ্ছ জলের বুকে ভেসে বেড়াচ্ছিল অসংখ্য রঙিন নৌকা, আর জলের ওপর রাজকীয় ভঙ্গিতে বিচরণ করছিল বড় বড় রাজহাঁস। সেই মনোরম দৃশ্য দেখে বাচ্চারা আনন্দে হইহই করে উঠল।

টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করতেই শুরু হলো আনন্দের নতুন অধ্যায়। আমরা বোটিং করলাম, আর বাচ্চারা মেতে উঠল নানা রকম রোমাঞ্চকর খেলায়। বিশেষ করে তীর-ধনুক হাতে লক্ষ্যভেদ করার খেলাটি তাদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছিল। ট্রি-হাউসে ওঠা, এদিক-ওদিক দৌড়ঝাঁপ, হাসি-ঠাট্টা, আর অজস্র ছবি তোলা, সব মিলিয়ে ভূল্লা তালে কাটানো সময়টি হয়ে উঠেছিল আমাদের ভ্রমণের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। কখন যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গিয়েছিল, তা আমরা টেরই পাইনি। পাহাড়, হ্রদ আর শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে ভরা সেই দিনটির স্মৃতি আজও মনকে এক অপূর্ব আনন্দে ভরিয়ে দেয়।

চারদিকে ফুটে থাকা নাম না-জানা ফুল, পাহাড়ি হাওয়ার মাদকতা আর নির্মল পরিবেশ আমাদের মন ভরিয়ে দিল। রেস্টুরেন্টে সুস্বাদু খাবার খেয়ে আরও কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে সন্ধ্যার একটু আগে আমরা নামতে শুরু করলাম। ফিরতে হবে কোটদ্বারের গেস্ট হাউসে।

কিন্তু পাহাড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা আর পাহাড় থেকে নামার অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। ওঠার সময় যে রোমাঞ্চ অনুভব করেছিলাম, নামার সময় তার জায়গায় এল শারীরিক অস্বস্তি। উপর থেকে নিচের দিকে ঢালের কারণে আমাদের গাড়ি যেন হুড়মুড়িয়ে নেমে আসছিল। রাস্তার প্রতিটি বাঁকে মনে হচ্ছিল পেটের ভেতর সবকিছু ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। মাথা ঘুরছিল, চোখে অন্ধকার দেখছিলাম। পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো অবস্থাই আর ছিল না।

গেস্ট হাউসে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি থেকে নেমে হড়হড় করে বমি করে ফেললাম। সকালে সাজগোজ করে আনন্দে বেরিয়েছিলাম, আর ফিরে এসে নিজেদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল যেন সবাই ভুলভুলাইয়া সিনেমার মঞ্জুলিকা! কোনোরকমে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। পথ শ্রমে ক্লান্ত শরীরে ঘুম আসতে দেরি হলো না একটুও।

চোখ খুললো যখন তখন রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। চারিদিক নিস্তব্ধ নিঝুম, মন্দিরের ঘন্টার ধ্বনি অনেক আগেই থেমে গেছে। জানলার বাইরে দূর দূর পর্যন্ত গাঢ় অন্ধকারে ভরা। পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছিল গভীর রাত। ঘুম থেকে উঠে আমাদের সকলের শরীর খুব ফুরফুরে লাগছিল, কিন্তু পেট মানবে কেন! দুপুরের পর আর কিছুই খাওয়া হয়নি। সকলের পেটে খিদে চুঁই চুঁই করছে, যেন পেটের মধ্যে একশ ছুঁচোয় ডন মারছে। কিন্তু এত রাত্রে খাবার কোথায় পাবো! কি করি, কি করি, ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ল বাঙালির চিরন্তন ভ্রমণসঙ্গী মুড়ি আর চানাচুরের কথা। ব্যাস আর কি! ধীরে ধীরে ব্যাগ থেকে বেরোল মুড়ি, চানাচুর, শসা, পেঁয়াজ, টমেটো আর কাঁচা লঙ্কা। খবরের কাগজ বিছিয়ে তার উপরে মুহূর্তের মধ্যেই তৈরি হয়ে গেল জমজমাট মুড়ি-মাখা। সবাই মিলে হাসতে হাসতে রাতের খাবার সেরে ফেললাম। সেই সাধারণ খাবারের স্বাদ আজও ভোলা যায় না।

সন্ধ্যেবেলা একটু ঘুমিয়ে নেওয়ার পর আমাদের সবারই ক্লান্তি অনেকটাই কেটে গিয়েছিল। চোখে তখন আর ঘুমের লেশমাত্র নেই। তাই রাতের নির্জনতাকে সঙ্গী করে আমরা সবাই মিলে বসে পড়লাম গানের লড়াই খেলতে। চারদিক নিস্তব্ধ। দূরের পাহাড় থেকে ভেসে আসা শীতল বাতাসের শনশন শব্দ, পাশে বয়ে চলা কোহ নদীর অবিরাম কলকল ধ্বনি আর তার সঙ্গে মিশে আমাদের মৃদু কণ্ঠে গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত- সব মিলিয়ে যেন এক অপার্থিব আবহ তৈরি হয়েছিল। মনে হচ্ছিল প্রকৃতি নিজেই আমাদের গানের আসরের নীরব শ্রোতা হয়ে বসে আছে।

তবে সেই জমাটি আসর বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। কিছুক্ষণ পর আমার বোন, তার ছেলে আর আমার মেয়ে নিজেদের রুমে চলে গেল বিঙ্গো খেলতে। আমাদের ঘরে তখন রইলাম শুধু আমরা দুজন। কিন্তু তাতেও যেন আনন্দের কোনো ঘাটতি ছিল না। একটার পর একটা গান গেয়ে চলেছি, কখনো রবীন্দ্রনাথ, কখনো নজরুল, কখনো বা পুরোনো দিনের প্রিয় সুর।

একসময় সে বলল,# - “চলো না, বাইরে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াই।” আমরা উঠে গেলাম ব্যালকনিতে। সামনে অন্ধকারে ঢেকে থাকা নদী। দু'জনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলাম সেই দিকে। নদীর বুকজুড়ে তখন ধোঁয়াটে কালো অন্ধকারের এমন এক ঘন চাদর নেমে এসেছে যে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। অবিরাম বয়ে চলা জলের শব্দে শুধু তার অস্তিত্ব অনুভব করা যাচ্ছিল। দূরের পাহাড়, রাতের আকাশ, নদীর কলতান সব মিলিয়ে এক রহস্যময় নৈঃশব্দ্য আমাদের ঘিরে ধরেছিল।

হঠাৎ সেই গভীর নীরবতাকে ভেঙে তার গুরুগম্ভীর কণ্ঠ ভেসে উঠল রাতের আকাশে-

"ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা,#
তাহার মাঝে আছে যে দেশ সকল দেশের সেরা।#
ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি, সে দেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা,#
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,#
সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি..."

গানটি যেন শুধু তার কণ্ঠেই ধ্বনিত হচ্ছিল না; প্রতিধ্বনি তুলে ছড়িয়ে পড়ছিল পাহাড়ের গায়ে, নদীর জলে, রাতের বাতাসে। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, প্রকৃতির বিশালতার মাঝে দাঁড়িয়ে আমরা যেন আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করছি নিজের দেশকে, নিজের শিকড়কে, নিজের অস্তিত্বকে। আজও সেই রাতের কথা মনে পড়লে নদীর কলকল ধ্বনি, পাহাড়ি বাতাসের শীতল স্পর্শ আর সেই দেশাত্মবোধক গানের আবেগ একসঙ্গে ফিরে আসে হৃদয়ের অন্তঃস্থলে। মনে হয়, জীবনের কিছু মুহূর্ত সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে চিরকাল স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে থেকে যায়।

ওহ্ আরেকটা কথা তো তোমাদের বলতে ভুলেই গিয়েছি, লেন্স ডাউন থেকে ফেরার পথে গাড়ি থেকে নামার কিছুক্ষণ আগেই আরেকটি অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। হঠাৎই চোখের সামনে দেখা দিল এক পাল হাতি। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে তারা দ্রুত নেমে এল, তারপর আমাদের গাড়ির সামনে দিয়েই রাস্তা পার হয়ে আবার নিচের জঙ্গলের দিকে চলে গেল। দলে ছিল সাত-আটটি হাতি। সামনে একটি বিশাল দাঁতাল হাতি, তার পেছনে আরও কয়েকটি পূর্ণবয়স্ক হাতি। মাঝখানে ছিল দুটি ছোট্ট হাতিশাবক। তারা কি সুন্দর করে মায়ের লেজ শুঁড় দিয়ে জড়িয়ে ধরে নিরাপদে এগিয়ে চলেছিল। বিন্দু মাত্র এদিক ওদিক না তাকিয়ে, কর্ণপাত না করে, সুশৃংখলভাবে তারা তাদের দলপতিকে অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছে। সেই দৃশ্য যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত ডকুমেন্টারি!

পরদিন সকালটা শুরু হল কোহ নদীর নির্মল জলে জলকেলির মধ্য দিয়ে। জুন মাস বলে নদীতে তখন জলের পরিমাণ খুব বেশি ছিল না- কোথাও শুধু পায়ের পাতা ভিজছে, কোথাও হাঁটু সমান জল, আবার কোথাও বুক পর্যন্ত গভীরতা। একটু ভালো করে স্নান করার আশায় আমরা গেস্ট হাউস থেকে বেশ খানিকটা দূর এগিয়ে গেলাম। অবশেষে নদীর এক প্রশস্ত অংশে পৌঁছে প্রায় চার ফুট গভীর স্বচ্ছ জল পেলাম। সেখানেই শুরু হল আমাদের আনন্দ উৎসব। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে স্নান, জলকেলি, খেলাধুলা আর আড্ডায় মেতে রইলাম আমরা। পাহাড়ি নদীর ঝিরঝিরে শীতল স্রোত যেন শরীরের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে নিয়ে মনকেও এক অপূর্ব সতেজতায় ভরে দিল।

ভিজে কাপড়েই গেস্ট হাউসে ফিরে এলাম। তারপর বাথরুমে ঢুকে আরও এক দফা স্নান সেরে নিলাম। শুকনো পোশাক পরে সবাই নিচে নেমে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার ঘরে ফিরে এলাম। খাওয়া-দাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই একটু বিশ্রামের মেজাজ। গেস্ট হাউসে আমাদের মুখোমুখি দুটো ঘর ছিল। একটি ঘরের দরজা বাইরে থেকে টেনে বন্ধ করে দিয়ে অন্য ঘরে আমরা সবাই একসঙ্গে জমিয়ে বসলাম গল্প-আড্ডার আসরে।

এমন সময় আমার বোন হঠাৎ বলে উঠল, “দেখ তো, এখানে আসার পর তিন দিন হয়ে গেল। আবহাওয়া এত সুন্দর যে একবারও এসি চালানোর প্রয়োজন পড়েনি। অথচ এসি রুমের জন্য অতগুলো টাকা দিলাম! এসি না চালিয়েই যদি ফিরে যাই, তাহলে তো বড় অন্যায় হবে!”

যেমন কথা, তেমন কাজ। মুহূর্তের মধ্যেই এসি চালু হয়ে গেল। বাইরে পাহাড়ি আবহাওয়া এমনিতেই শীতল, তার ওপর এসির ঠান্ডা হাওয়া। ফলে সবাই তাড়াতাড়ি মোটা মোটা কম্বল গায়ে জড়িয়ে নিলাম। তারপর শুরু হল আমাদের লুডো খেলা।

কিন্তু বেশিক্ষণ এসি চালিয়ে রাখা গেল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘর এতটাই ঠান্ডা হয়ে উঠল যে বাধ্য হয়ে সেটি বন্ধ করতে হল। তবে সেই স্বস্তিও বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। খেলা ততক্ষণে জমে উঠেছে, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঘরের উত্তাপও!

কীভাবে? সে গল্পও মজার। লুডো খেলায় যদি একটু খুনসুটি, একটু হুড়োহুড়ি, একটু তর্ক-বিতর্ক না থাকে, তবে কি আর খেলার আসল আনন্দ থাকে? কার গুটি কাটা হলো, কে ছক্কা পেল, কে সুযোগ পেয়েও ঘরে ঢুকতে পারল না- এসব নিয়েই শুরু হল হাসি-ঠাট্টা, অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের বন্যা। মুহূর্তে ঘর ভরে উঠল হৈচৈ, চিৎকার-চেঁচামেচি আর অট্টহাসির কলরবে। পাহাড়ি নির্জনতার মাঝেও আমাদের সেই প্রাণখোলা আনন্দ যেন গেস্ট হাউসের চার দেওয়াল পেরিয়ে চারপাশের প্রকৃতিকেও ছুঁয়ে যাচ্ছিল।

অবশেষে বিদায়ের সময় এল। সেই দিন রাতে কোটদ্বার থেকে আনন্দবিহার এক্সপ্রেসে চেপে আবার ফিরে এলাম দিল্লিতে। যাওয়ার সময় দিনের আলোয় চারিদিকের শোভা উপভোগ করার জন্য চেয়ার কার নিলেও ফেরার সময় আমরা বার্থ নিয়েছিলাম। খুব ভালোভাবেই জানা ছিল যে সারাদিন হইহুল্লোড় করার পর শরীর আর সাথ দেবে না, একটু ঘুমের প্রয়োজন হবে সবারই। পরদিন খুব ভোর ভোর আমরা পৌঁছে গেলাম দিল্লিতে। ট্রেন থেকে নেমেই সেই চির চেনা একই রকম পরিবেশ, প্রচন্ড গরম ধুলো ধোঁয়া আর অগণিত যানবাহনের দাদাগিরি।

মাত্র তিন দিনের এই সফর আমাদের উপহার দিয়েছিল অজস্র স্মৃতি। পাহাড়ের রোমাঞ্চ, নদীর প্রশান্তি, মন্দিরের আধ্যাত্মিক আবহ, বন্যপ্রাণীর বিস্ময়কর উপস্থিতি, মুড়ি-মাখার রাতের ভোজ আর পরিবারের সঙ্গে কাটানো অসংখ্য হাসি-আনন্দের মুহূর্ত। আজও চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই কোহ নদীর কলকল ধারা, পাহাড়ের গা বেয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা, সন্ধ্যার আলোয় ঝলমল কোটদ্বার আর মায়ের লেজ ধরে হেঁটে চলা সেই ছোট্ট হাতিশাবক দুটিকে। মনে হয়, ভ্রমণ শেষ হয়ে গেলেও সেই স্মৃতিগুলো এখনও পাহাড়ের মেঘের মতো মন জুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে।