প্রতীক্ষার অবসান(পর্ব-এক)

অর্ঘ্যদীপ গুড়িয়া,

নতুন দিল্লি

রবিবারের দিন, অন্যান্য দিনের চাইতে শহরের ব্যস্ততা আজ যেন একটু কম। অফিস ছুটির দিন বলে রাস্তাঘাটেও সেই চিরচেনা কোলাহল নেই। আকাশে হালকা মেঘের ভেলা ভাসছে, মাঝেমধ্যে মৃদু বাতাস এসে গরমটাকে কিছুটা হলেও সহনীয় করে তুলছে। এমনই এক অলস রবিবারে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বেরিয়েছে পার্থ।
সাতাশ-আঠাশ বছরের যুবক পার্থ স্বভাবে ভীষণ লাজুক। ছোটবেলা থেকেই মনের কথা সহজে মুখে আনতে পারে না। বন্ধুদের সঙ্গে একবার মিশে গেলে অবশ্য তার হাসি-ঠাট্টার শেষ থাকে না, কিন্তু হৃদয়ের গভীর অনুভূতির কথা বলতে গেলেই যেন জিভ আটকে যায়। আর দীপার সামনে দাঁড়ালে তো তার অবস্থা আরও করুণ হয়। বুকের ভেতর অকারণ ধুকপুকানি শুরু হয়, গলা শুকিয়ে আসে, সব সাজিয়ে রাখা কথাগুলো এলোমেলো হয়ে যায়।
তবু আজ সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। গত দু'বছর ধরে দীপাকে ভালোবাসে সে। একই অফিসে কাজ করতে করতে কখন যে বন্ধুত্ব প্রেমে পরিণত হয়েছে, কেউই টের পায়নি। বাড়ি থেকেও বিয়ের জন্য চাপ বাড়ছে। মা প্রায়ই বলেন, "আর কতদিন অপেক্ষা করবি? এবার সংসার শুরু কর।" পার্থ জানে, দীপাকে ছাড়া অন্য কাউকে সে স্ত্রী হিসেবে কল্পনাও করতে পারে না। তাই আজ সে ঠিক করেছে, যাই হোক না কেন, দীপাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েই ছাড়বে।
যে ক্যাফেতে তাদের দেখা করার কথা, তার কাছেই একটি বিশাল পুরোনো বটগাছ। সময়ের অনেক আগেই পৌঁছে গিয়েছিল পার্থ। সরাসরি ক্যাফেতে না গিয়ে সে গাছটির নিচে এসে দাঁড়াল। বটগাছটি যেন যুগ যুগ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব প্রহরী। অসংখ্য ঝুরি নেমে এসেছে মাটিতে, শেকড়ের জালে যেন লুকিয়ে আছে শত শত বছরের গল্প।
পার্থ একা দাঁড়িয়ে নিজের মনে কথাগুলো সাজাতে লাগল। কখনও হাত নাড়ছে, কখনও মাথা নিচু করে বিড়বিড় করছে। তারপর হঠাৎ গাছটার দিকে তাকিয়ে যেন দীপাকেই কল্পনা করে বলতে শুরু করল, "দীপা, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া আমার জীবনটা আমি ভাবতেই পারি না। আমি চাই তুমি আমার জীবনের সঙ্গী হও। আমি চাই তোমাকে নিজের ঘরে, নিজের হৃদয়ে, নিজের স্ত্রী হিসেবে নিয়ে যেতে। তুমি কি আমার সঙ্গে সারাজীবন থাকবে?"
কথাগুলো বলতে বলতে পার্থর চোখে-মুখে এমন এক আন্তরিকতা ফুটে উঠল, যা সে জীবনে খুব কমই প্রকাশ করেছে।
কিন্তু সে জানত না, তার এই ভালোবাসার নিবেদন আরেকজন গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছে।
এই বটগাছেই বাস করত মনিদীপা।
দেড়শো বছরের পুরোনো এক প্রেতাত্মা।

তবে সাধারণ পেত্নীদের মতো সে ছিল না। কোনোদিন কাউকে ভয় দেখায়নি, কারও ক্ষতি করেনি। বরং এই গাছের আশেপাশে কেউ বিপদে পড়লে অদৃশ্যভাবে সাহায্য করেছে সে। কারণ তার নিজের জীবনেই ছিল এক অসমাপ্ত বেদনার ইতিহাস।

দেড়শো বছর আগে সে ছিল রক্তমাংসের মানুষ। একটি গ্রামের অতি সাধারণ কিশোরী। ছোটবেলা থেকেই ভীষণ ভক্তিমতী ছিল। ভোরবেলা উঠে শিবঠাকুরের পূজা করত, মায়ের সাথে পূজা আচ্চায় ব্রত রাখত, উপোস করত। গ্রামের সবাই বলত, এমন শান্ত আর ধর্মপরায়ণ মেয়ে খুব কম দেখা যায়।

চৌদ্দ বছর বয়সে তার বিয়ে ঠিক হয়। বাড়িতে আনন্দের শেষ ছিল না। কিন্তু বিয়ের দিনই ঘটে যায় বিপর্যয়। সন্ধ্যেবেলা লাল বেনারসিতে সজ্জিত হয়ে বর আসার অপেক্ষায় প্রহর গুন ছিল সে। বরযাত্রীরা যখন আসছিল, তখন মাঝপথে ডাকাত পড়ে। সর্বস্ব লুট হয়ে যায়। সেই ক্ষতির জন্য বরের পরিবার মনিদীপাকেই অপয়া বলে দোষারোপ করে। তারা বর সমেত রাস্তা থেকেই ফিরে যায়।

এক মুহূর্তে ভেঙে যায় কিশোরী মেয়েটির সমস্ত স্বপ্ন।

সেই সময়ের সমাজ ছিল বড় নিষ্ঠুর। লগ্নভ্রষ্টা মেয়ের জীবনে অপমান আর অবহেলা ছাড়া কিছুই জুটত না।
সমাজের কটূক্তি আর বাবা-মায়ের একঘরে হওয়া আর অপমানের কথা ভেবে সেই রাতেই আত্মহত্যা করে মনিদীপা। কিন্তু তার মুক্তি হয় না, সে প্রেত যোনিতে অবস্থান করে। কিন্তু তখনো সে ঈশ্বরকে ছাড়ে না। কেঁদে কেঁদে নিজের অন্তরের করুণ আকুতি জানাতে থাকে মহাদেবের দরবারে। ভক্তের ভক্ত মহাদেব আর স্থির থাকতে পারেন না। অবশেষে মনিদীপার দেখা হয় মহাদেবের সঙ্গে। কাঁদতে কাঁদতে সে প্রশ্ন করেছিল, "ঠাকুর, আমি তো তোমার এত সেবা করেছি। তবে আমার ভাগ্যে এমন পরিণতি কেন?"
মহাদেব করুণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, "তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয় ভক্ত। কিন্তু আত্মহত্যা মহাপাপ। তার ফল তো তোমাকে ভোগ করতেই হবে।"
মনিদীপা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, "তাহলে কি আমার মুক্তি হবে না ভোলেনাথ?"
মহাদেব বলেছিলেন, "হবে। যেদিন কোনো মানুষ অন্তর থেকে তোমাকে ভালোবেসে তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে, সেদিন তোমার এই অভিশাপমুক্তি ঘটবে।"
সেই থেকে সে অপেক্ষা করে আছে। এক বছর, দশ বছর, পঞ্চাশ বছর, একশো বছর...

অবশেষে দেড়শো বছর পরে আজ সেই কথাগুলো সে শুনল।
"আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। আমি তোমাকে নিজের স্ত্রী করতে চাই।"
এই কথাগুলো যেন তার শতাব্দীপ্রাচীন নিঃসঙ্গ হৃদয়ে বজ্রপাতের মতো আঘাত করল। মুহূর্তের মধ্যে সে নিজের রূপ ধারণ করল।
নিমিষেই চওড়া লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরা এক অপূর্ব সুন্দরী কিশোরী এসে দাঁড়াল পার্থর সামনে। ডাগর কালো হাস্যজ্জল দুটি আঁখি, মাথায় এক ঢাল কোমর ছাপানো চুলের রাশি। যেন কোন ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট সিনেমার চঞ্চল নায়িকা।
পার্থ চমকে উঠল।
মেয়েটি মিষ্টি হেসে বলল, "চলো।"
পার্থ হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কোথায়?"
মেয়েটি মাথা নিচু করে লজ্জিত কণ্ঠে বলল, "তোমার বাড়ি।
"আমার বাড়ি! কিন্তু কেন"?
বা রে! এই মাত্রই তো তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাইলে।"
"এই পুচকে মেয়ে আজেবাজে কথা না বলে এখান থেকে কেটে পড়ো তো"।
"আমি মোটেও আজেবাজে কথা বলছি না, আর পুচকে বলছো কাকে"?
"পুঁচকে কে পুচকে বললে আবার রাগ হয়, নাক টিপলে দুধ বেরোবে। আবার পাকামো করে শাড়ি পড়া হয়েছে। যাও যাও এখন তোমার পড়াশুনার বয়স পড়াশোনা করো গে যাও। এমনিতেই আমার মাথা খারাপ হয়ে আছে। আরও ঝামেলা করে মাথা খারাপ করো না প্লিজ"।
এবার মনিদিপা খিল খিল করে হেসে উঠলো, আর জানালো সে কোন মানবী নয়, এই গাছে থাকা শতাব্দী প্রাচীন এক প্রেতাত্মা। পার্থর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে তো দীপাকে মনে করে কথাগুলো বলছিল! কিন্তু নিজের স্বভাবসিদ্ধ জড়তার জন্য ঠিকমতো কিছুই বোঝাতে পারল না মনিদীপাকে। যতই বোঝানোর চেষ্টা করল, ততই কথাগুলো জড়িয়ে যেতে লাগল।
আর মনিদীপা? সে বিশ্বাস করে বসে রইল যে, অবশেষে তার মুক্তির দিন এসে গেছে, আর পার্থই সেই মুক্তিদাতা।

সেদিন আর দীপার সঙ্গে দেখা হলো না পার্থর। একপ্রকার ভয়ে আর বিষ্ময়ের অদ্ভুত এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে মনিদীপাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হলো সে। মনে মনে ভাবল আপাতত সাথে নিয়ে না গেলেই নয়, দেখা যাক কি হয়। তবে পার্থর সাথে ফেরার পথে মনিদীপা নিজের সমস্ত কাহিনি খুলে বলল, তখন পার্থর বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। এত অল্প বয়সে এমন নির্মম পরিণতি! মেয়েটার জন্য তার সত্যিকারের ভীষণ মায়া হলো। পার্থ মনিদিপা কে দীপার কথা জানালো। আরো জানালো যে আজকের সমাজে এই বয়সী কোন মেয়ের বিয়ে হয় না, আর যদি পার্থ তাকে বিয়েও করে তাহলে পার্থকে হাজত বাস করতে হবে। কিন্তু মনিদিপা তো ছাড়ার পাত্রী নয়, সে তার মায়াবী শক্তি প্রয়োগ করে নিজেকে পঁচিশ বছরের একটি সুন্দরী যুবতী কন্যায় পরিণত করল। এসব দেখেশুনে পার্থ তো রীতিমতো হাঁ হয়ে গেছে, সে কোন ভাবেই মনিদিপার পিছু ছাড়াতে পারল না।
কিন্তু দীপা, যাকে সে সত্যিই ভালোবাসে, আজ ক্যাফেতে পার্থকে না পেয়ে না জানি কতক্ষণ অপেক্ষা করবে। কিন্তু এই মুহূর্তে দীপার সাথে দেখা করারও কোন মানে হয় না, এই মেয়েকে সাথে দেখলে দিপা তাকে নিশ্চিত ভুল বুঝবে। আজ দীপার সাথে দেখা করাও হলো না আর মনের কথা ও তাকে বলা হলো না। কি জানি পার্থর এই অনুপস্থিতিকে দীপা কি ভেবে বসবে। এইসব নানা চিন্তা করতে করতে মনিদিপাকে সাথে নিয়ে সে বাড়ির পথে হাঁটা লাগালো।

ক্রমশঃ..............

(দেবীপক্ষ সংখ্যা থেকে শুরু হলো এক নতুন ধারাবাহিক। প্রেম, ত্যাগ, অলৌকিক রহস্য এবং সর্বোপরি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক অনন্য কাহিনি। যার প্রতিটি পর্ব পাঠককে নিয়ে যাবে এক নতুন অনুভূতির জগতে। আগামী দশটি সংখ্যাজুড়ে প্রকাশিত হবে এই ধারাবাহিক উপন্যাস।)