প্রিয়জন(শেষ পর্ব)

সুলেখা ভান্ডারী,

কসবা, বালিগঞ্জ

পলি দ্বিতীয়বার মা হওয়ার সময় যখন ওর প্রসব বেদনা উঠেছিল তখন ওর আশেপাশে কেউ ছিল না, আর সেই মুহূর্তে কেমন করে না জানি ওর আমার কথা মনে হয়েছিল, আর ও আমাকে ফোন করেছিল। আমি তখন একটুও সময় নষ্ট না করে আমার স্বামীকে সাথে নিয়ে ওদের বাড়িতে গিয়ে ওকে সেখান থেকে উঠিয়ে হসপিটালে এডমিট করানো, তারপর ওর ছেলে হওয়ার পর যে কদিন ও হসপিটালে ছিল ওর কাছেই সব সময় থেকেছি। হসপিটাল থেকে ছুটি হয়ে যাওয়ার পরে ওর ছেলে সহ ওকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে তারপরে আমরা স্বামী-স্ত্রী ছুটি নিয়েছিলাম। ওর ছেলেটি খুব সুন্দর আর ফুটফুটে হয়েছিল। তারপর থেকেই ওর কাছে আমি বৌদি আর আমার বর ওর আপন দাদার মতো হয়ে গেছে। পলি একটি বাটিতে করে মুড়ি মেখে নিয়ে এসে আমার হাতে দিয়ে বলল "কিগো বৌদি একা বসে বসে কি চিন্তা করছো? "

"না না তেমন কিছু না, তোর যখন ছেলেটা হল সেই সব পুরনো কথাই ভভাবছিলাম।"
"সত্যি বৌদি, আমি কোনদিন তোমার আর দাদার কথা ভুলবো না, সেই সময় তুমি এত করেছিলে আমার আর আমার ছেলের জন্য।" বলতে বলতে ও ইমোশনাল হয়ে পড়ল।  আমি বললাম-
"থাক থাক আর কতবার এই কথা বলবি, আচ্ছা
তোর এত তাড়ার কি ছিল রে? এই তো কিছুক্ষণ আগেই চাওমিন খেলাম আবার এখনই মুড়ি মাখতে হলো?"
দুজন আমরা মুড়ি খাচ্ছি আর চাঁদের আলো গায়ে মেখে গল্প করছি। "বৌদি আজকে চাঁদের আলো টা দেখো, কি সুন্দর ঝকঝক করছে। কে বলবে বর্ষার আকাশ।"

হঠাৎই আমার একটা গান মনে পড়ে গেল। গুনগুন করে গেয়ে উঠলাম

'চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে উথলে পড়ে আলো'।
ও আমার সাথে পরে লাইন থেকে যোগ দিলো
"ও রজনীগন্ধা তোমার গন্ধ সুধা ঢালো" । গানটা শেষ হয়েছে কি হয়নি, আমরা একের পর এক গান গেয়ে চললাম "চাঁদ দেখতে গিয়ে আমি তোমায় দেখে ফেলেছি", "ও চাঁদ আসে না কেন আমার ঘরে"

একবার ও গায়, একবার আমি গাই। কি যে মজা পাচ্ছিলাম তা বলে বোঝানোর নয়। সেসব গানের বোধ হয় ঠিকমতো সুরও ছিল না, তাল ছিল না, ছন্দ ছিল না। তবুও গাইতে গাইতে দুজনেই হেসে লুটোপুটি খাচ্ছিলাম আর আনন্দের স্রোতে ভেসে যাচ্ছিলাম। আর সাথে সাথে চাঁদটাও যেন মেঘের সঙ্গে  খুনসুটি করে লুকোচুরি খেলছিল। যখন মেঘ এসে চাঁদ টাকে ঢেকে দেয় তখন একটু অন্ধকার হয়ে যায় আবার যেই মেঘটা সরে যায় অমনি চাঁদের নির্মল আলো আমাদেরকে যেন ধুয়ে দিচ্ছিল। চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম "কেন রে বাপু, আমাদের এই এতদিনের পরের খুশিটা কি তোর সহ্য হচ্ছে না? "

আমাদের কথা যেন আর শেষ হতেই চায় না একসময় আমার মনে হল এইবার বুঝি আমাদের বাড়ি যাওয়া উচিত। আমি বললাম
এই পলি অনেকটা সময় হলো রে আমাদের বাড়ি যেতে হবে, বলেই উঠে পড়লাম। পলি বলল  বৌদি আমার পেঁপে গাছটা দেখেছো? কত পেঁপে হয়েছে।

তাই নাকি? কই, কই, কোথায় তোর পেঁপে গাছ?
ওই তো ছাদের দিক দিয়ে হাত বাড়ালে পাওয়া যাবে। গাছটাতে খুব পেঁপে হয়েছে জানো, আমি আমার আশেপাশের সবাইকে প্রায় দুটো একটা করে দিয়েছি। চলো তোমাকেও কয়েকটা পেপে পেড়ে দিচ্ছি।

সে কিরে, এই রাতের বেলায় গাছে হাত দিবি নাকি?
তোমাকে আর দিনের বেলা পাচ্ছি কোথায় বলো? চলো তো? কিছুই হবে না আমার ঘরেই তো গাছ, বলেই পটপট করে চারটে বড় বড় পেঁপে ভেঙ্গে দিয়ে দিল আমার জন্য। পেঁপে চারটে দেখে খুশিতে আমার মনটা ভরে উঠলো। বাজার থেকে কত পেঁপেই তো কিনে আমরা খাই কিন্তু বাড়ি থেকে নিজের চোখের সামনে গাছ থেকে পাড়া পেঁপে.....সে এক অনির্বাচনীয় আনন্দ।

ছাদে তো যা গল্প করার করলাম তারপর নিচে এসেও আরো কিছুক্ষণ গল্প হল। অনেকদিন পর দুজন দুজনকে পেয়ে মনের কথা বলে কি যে ভালো লাগলো সে বলে বোঝানোর নয়। পলি বলল "বৌদি সময় পেলেই চলে এসো। এই ভাবেই আমরা আড্ডা দেবো কিছুক্ষণ। কিন্তু এখন কটা বাজে সেটা দেখেছো ঘড়িটা?"

" না তো দেখিনি রে, কটা বাজে? "
"শুনলে মাথায় হাত দেবে।"
কটা আর বাজে? বড়জোর দশটা কি এগারোটা হবে?
"না না বৌদি সাড়ে বারোটা"
বলিস কিরে! এ বাবা আমার ফোনটা তোদের নিচের ঘরে রাখা সেই জন্যই সময়টাও দেখা হয়নি। শুধু আড্ডা আর হাসি এই পলি আর থাকবো না রে তবে বেরোনোর আগে তোর দাদাকে ফোনে বলে এসেছি যে আমরা তোর বাড়িতে আসছি। তাঁর জন্য খাবার তোলা আছে। আমাদের আসতে দেরি হলে খেয়ে নিতে। আর চাবিটা পাশের বাড়িতে রাখা আছে।"

প্রবীর কখন চলে এসেছে আমরা দুজনের কেউ খেয়াল করিনি। ও ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে বলল "ভালো আছো বৌদি?"
হ্যাঁ হ্যাঁ আমরা ভালো আছি। তুমি কেমন আছ, ভাল তো? আজ আর বেশি কথা বলব না ভাই, কথা বলতে গেলে আরো বেশি রাত হয়ে যাবে। আমাদের ফিরতে হবে।

ওর বর মজা করে বলল "এতক্ষণ তো বান্ধবীর সাথে আড্ডা দিচ্ছিলেন, তারপর দু কলি গেয়ে উঠলো- "কিছুক্ষণ আরো না হয় রহিতে কাছে

আরো কিছু কথা না হয় বলিতে ম'রে
এই মধুমাস মধুময় হয়ে না হয় উঠিত ভ'রে
আরো কিছু কথা না হয় বলিতে ম'রে"- তারপরই গান থামিয়ে হো হো করে হেসে উঠলো।
আমিও হেসে গেয়ে উঠলাম "আসবো আরেকদিন আজ যাই"
তারপরেই পলিকে তাড়া লাগিয়ে বললাম
"পলি তাড়াতাড়ি আমার টিফিন বক্স দুটো খালি করে দে।
"না না ও দুটো আজকে দেব না। ও দুটো থাক কিছু বানিয়ে পরে দেব, খালি দেব না।
না না, কিছু দিতে হবে না, তোর কি মাথা টাথা খারাপ।
-তবে মালপোয়ার বাক্সটা খালি করে দিই। (একটা মালপোয়া মুখে দিয়েই পলি বলে উঠলো) দারুণ হয়েছে অনেকদিন পরে তোমার হাতের মালপোয়া খেলাম বৌদি। আমার এই ছোট্ট বাগানের পুঁইশাক, কুমড়ো বেগুন দিয়ে আর আলু বড়ি দিয়ে রান্না করেছিলাম। দুপুরে আমরা খেয়েছি, একটু আছে। ওটা তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি।
-তুইও পারিস বাবা যাই হোক। কিছু না কিছু দিয়েই ছাড়বি।
-ও.....আর তুমি যে অত কিছু নিয়ে এসেছো, তার বেলা কিছু না!
-বাবা কথায় তোর সাথে পারবো না।
-আমার পুইশাক রান্না কেমন হয়েছে খেয়ে বলো।
-তুইও চিকেন টা খেয়ে বলিস কেমন হয়েছে।
-ঠিক আছে বলব।
-এইবার আসে রে পলি, প্রবীরের শরীরের যত্ন নিস। সায়ন আর মৌ ভালো করে মন দিয়ে পড়াশুনা করিস, বাবা-মার মুখ উজ্জ্বল করিস। আর ভালো মনের মানুষ হবি।
-হ্যাঁ বৌদি, আমি ওদের সব সময় বলি, তোমার মেয়েদের মতো মানে ওদের দিদিদের মতন হতে হবে। ওদের একটু বকে দাও তো।
-তুই চুপ কর, ওরা যথেষ্ট ভালো, ওরকম বলিস না। হ্যাঁরে তোদের মোড়টা থেকে এখন কি রিকশা পাব? তোদের সবাইকে বলে যাচ্ছি এইবারে কিন্তু একদিন আমাদের বাড়িতে আসতেই হবে তোদের সবাইকে। আমরা একসাথে মিলে মিশে খুব আনন্দ করবো, খুব ভালো লাগবে আমাদের। টাটা ভালো থাকিস।
পলি বলল "বৌদি চলো দেখি রাস্তায়। কোন রিক্সা আছে কিনা।
দেখি সত্যিই একটাও রিকশা নেই। একটা টোটো চলে গেল দাঁড়ালো না। একটা রিক্সা উল্টো দিক থেকে প্যাসেঞ্জার নিয়ে আসছিল পলি বলল "এই রিক্সা যাবে নাকি? "
‎রিক্সাওয়ালা বললো "দাড়াও সামনেই প্যাসেঞ্জারকে নামিয়ে দিয়ে আসছি।"
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরই রিক্সাটা এল। পলি আমাদেরকে রিকশায় তুলে দিল। "বৌদি সাবধানে যেও কিন্তু।"
তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হল, সঙ্গে ছাতা ছিল না । পলি বলল "বৌদি একটু দাঁড়াও ছাতা নিয়ে আসছি"
আমি বললাম "না না অনেক রাত হয়ে গেছে আর ছাতা আনতে হবে না, আমরা রিক্সায় চলে যাচ্ছি।"
পলি বারবার করে রিক্সাওয়ালাকে বলল "ওদের একদম বাড়ির সামনে নামিয়ে দিও কিন্তু দাদা। "
"ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে, ঠিক করে নামিয়ে দেবো। তোমার অত চিন্তা করতে হবে না। "
"বাড়িতে পৌঁছে একটা ফোন করে দিও বৌদি, ভুলো না কিন্তু।"
রিকশা চলতে শুরু করলো। আমি রিক্সাওয়ালাকে বললাম "তোমাকে পেলাম বলে খুব উপকার হলো ভাই। "
রিক্সাওয়ালা বললো "ট্রেনের প্যাসেঞ্জার আনি বলে এত রাত পর্যন্ত ছিলাম। তবে আমি বাড়ির দিকেই যাচ্ছিলাম, মেসেঞ্জার নামিয়ে চলেও যেতাম হয়তো। কিন্তু উনি অতো করে বললেন তাই ফিরে এলাম। "

"অনেক ভালো হলো ভাই, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ ।"
বাড়িতে এসে দেখি দরজা বন্ধ, লাইট বন্ধ করে উনি খাবার দাবার খেয়ে শুয়ে পড়েছেন। বন্ধ দরজার কড়া নাড়লাম। কিছুক্ষণ পরে লাইট জেলে উনি উঠে এসে দরজা খুলে দিয়ে বলল "এত দেরি হল! "

"আর বোলো না, সে কি যে আড্ডায় মজে গেছিলাম, ঘড়ি টড়ি দেখার বালাই নেই। তাই ফিরতে দেরি হয়ে গেল। এই দেখেছো, বাড়ি এসে অবধি পলি কে ফোন করার কথা ভুলেই মেরে দিয়েছি। দাঁড়াও দাঁড়াও আগে পলি কে ফোন করে জানিয়ে দিন নইলে ও আবার খুব চিন্তা করবে। বলতে বলতেই পলির ফোন নম্বরটা মিলিয়ে ফেলেছিলাম, একটা রিং হতেই পলি ফোনটা তুলে নিল। "কি হলো বৌদি। তোমাদের পৌঁছাতে এত দেরি হল !"

"না রে, সময়মতো পৌঁছে গেছিলাম। আসলে দরজা বন্ধ করে তোর দাদা ঘুমিয়ে পড়েছিল।"
" ও আচ্ছা তাই বল। রাস্তায় কোনো অসুবিধা হয়নি তো? "
"না না রিক্সাওয়ালা টা খুব ভাল ছিল রে, রাস্তায় কোনো অসুবিধা হয়নি। "
ওপার থেকে পলি বলে চলেছে "সন্ধ্যাটা কি ভালো কাটলো তাই না গো বৌদি? "
আমি হেসে বললাম "হ্যাঁ, এখন আবার সন্ধ্যার আলোচনা করতে করতে আরও রাত গড়িয়ে ভোর হয়ে যাবে, চল চল অনেক রাত্রি হয়েছে, এবারে ফোনটা ছাড়, তোরাও শুয়ে পড়"
" ফোনটা ছাড়তে ইচ্ছে করছে না গো বৌদি"
আমি এবার গান গেয়ে বললাম
"আবার হবে তো দেখা, এ দেখাই শেষ দেখা নয়তো"
টা টা ভালো থাকিস, ঈশ্বর তোদের মঙ্গল করুন। "
"তোমরাও ভালো থেকো বৌদি, শুভরাত্রি।"

ক্রমশ..............