প্রিয়জন(প্রথম পর্ব)
সুলেখা ভান্ডারী,
কসবা, বালিগঞ্জ
দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। রাত তখন প্রায় বারোটা চল্লিশ। বাইরে তুমুল ঝড়
বৃষ্টি হচ্ছে, ঘুম আসছিল না। কি করি কি করি ভাবছিলাম। কিছুক্ষন পায়চারিও
করলাম। তারপর হঠাৎ মনে হলো, একটি পত্রিকার সম্পাদিকা আমাকে লেখা দিতে
বলেছিলেন, এখনো তো কিছু লেখা হয়ে ওঠেনি। কাগজ-কলম নিয়ে তখনই বসে গেলাম।
কিন্তু চট করে মাথাতে তেমন কিছু আসছিল না, কি লিখি কি লিখি ভাবতে হঠাৎ
মনে হল আরে পলি দের বাড়িতে গেলাম তো গত রবিবারে। লিখে ফেলি সেই নিয়ে
কিছু একটু। তোমরাও তো আমাদের পরিবার পরিজন, তাই আমার বন্ধুর বাড়িতে
গেলাম, কি হলো, না হলো, খুঁটিনাটি তোমাদের সাথে একটু শেয়ার করি।
জানালায় বসে লিখছি, ঘরের মধ্যে সবাই ঘুমোচ্ছে। একবার একবার করে খুব জোরে
জোরে বাজ পড়ছে আর বৃষ্টির ঝাপটা আমার খাতার উপর পড়ছে। তখনই হৈমন্তী
শুক্লার ওই গানটার কথা আমার খুব মনে পড়ে গেল
"ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা ছুঁয়ে না।"
আর আমার মনে হল আমি এখন গেয়ে উঠি "ওগো বৃষ্টি আমার খাতার পাতা ভিজিও না,
আমার কত কথা লেখা আছে খাতাতে
সে যেন পড়ে দেখে তার নামেতে কি কথা লিখেছি।"
বেশিদিন নয়, গত রবিবারের কথা। তবে পলি অনেকদিন আগে থেকেই আমাকে ওদের
বাড়িতে যাওয়ার জন্য বলছে। অনেক দিন হয়ে গেছে ওদের বাড়িতে যায়নি। তবে
ফোনে কথা হয়। আর পলি আমাকে তাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাতেই
থাকে। কিন্তু নানান কাজে অকাজে সুযোগ আর হয়ে ওঠে না।
রবিবার দুপুরে রান্না খাওয়ার পরে ভাবলাম নাহ আজ একবার ঘুরেই আসি পলিদের
বাড়ি থেকে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। আজ মেয়েটার অফিস ছুটি। ওকে বললাম "কিরে
যাবি নাকি আমার সাথে? "
সাথে সাথেই ও রাজি।
তো কারো বাড়িতে যেতে গেলে খালি হাতে কি আর যাওয়া যায়? আর বাজারের কেনা
মিষ্টির উপর আমার খুব একটা আস্থা নেই। ও তো সবাই কিনে খেতে পারে। তাই
ভাবলাম একটু মালপোয়া বানিয়ে নিয়ে যাই বলি আবার আমার হাতের মালপোয়া
খেতে খুব ভালোবাসে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। চটজলদি কি আর বানাবো দুই মা
মেয়ে মিলে বাড়িতে থাকা কিছু উপকরণ দিয়ে একটু মালপোয়া বানিয়ে নিলাম।
মেয়ে বলল " মা শুধু মালপোয়া নিয়েই যাবে? কেমন কেমন দেখায় না! "
আমি বললাম "তা তো বটেই, আর কি নেওয়া যায় বলতো ? "
"দুপুরে চিকেন টা কিন্তু আজকে ফাটাফাটি বানিয়েছিল মা। "
"ঠিক আছে তাহলে সেই চিকেনই খানিকটা নিয়ে নেই, কি বল? "
"তাই নাও বরং।"
চিকেনের বেশ খানিকটা তুলে নিলাম একটা বড় টিফিন ক্যারিয়ারে আর গ্রাম
থেকে আসা কিছু পাকা কলা ছিল ফ্রিজে তাও কয়েকটা নিয়ে নিলাম। এইবারে মনে
হল এই নিয়ে বেশ যাওয়া যায়। একবার ভেবেছিলাম পলিকে সারপ্রাইজ দেব।
কিন্তু মেয়ে বলল পলি পিসিকে সারপ্রাইজ দিতে গিয়ে নিজে না সারপ্রাইজ
হয়ে যাওযাও। রবিবারের দুপুর, দেখো আবার পলি পিসিরা থাকবে কিনা। "
মনে মনে ভাবলাম সত্যিই তাই। না জানিয়ে যাওয়াটা বোধহয় বোকামি হবে। তাই
ওদের বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়েই ওকে ফোন করলাম। আমার ফোন পেয়ে বলে তো
যার পরনে উচ্ছ্বসিত। বলল "বৌদি এসো এসো চটজলদি এসো। বিকেলের আড্ডাটা
জাস্ট জমে যাবে। আর কি খাবে বলো, প্রবীর এনে রাখবে। মটন রোল, ফিস ফ্রাই,
বিরিয়ানি না চাওমিন কি খাবে বলো।"
আমি বললাম না না কিচ্ছু আনাতে হবে না শুধু গল্প করব আর তোর হাতের মুড়ি
মাখা খাব, সাথে চা দিস।
ঠিক আছে তুমি এসো তো বৌদি।
আমাদের বাড়ি থেকে পলিদের বাড়ি খুব একটা দূরে নয়। রিক্সায় করে
আধঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম ওদের বাড়িতে। গিয়ে পলি পলি বলে ওদের
বাইরের গেটের কড়া নাড়ালাম। পলি এসে গেট খুলে এক মুখ হাসি নিয়ে বলল
"সুস্বাগতম, একটু দাঁড়াও বৌদি।"
কেন রে?
আরে দাঁড়াও না-
বলেই ঘরের ফুলদানি থেকে একটা গোলাপ ফুল নিয়ে এসে আমার হাতে দিয়ে বলল
"ওয়েলকাম"
আমি বললাম তুইও পারিস বটে। হা হা হা হা করে হেসে ফেললাম দুজনেই। তাহলে
বৌদিমনি পায়ের ধুলো পরলো বলো। তার পর ও গান করে বলল
"কতদিন পরে এলে একটু বসো,
আমার অনেক কথা বলার ছিল যদি শোনো"
ঘরে ঢোকার সাথে সাথে আমাকে খুশির চোটে বেশ জোরে বুকের সাথে লাগিয়ে
জড়িয়ে ধরল। তারপর ওদের ঘরে বসিয়ে প্রথমেই সার্ভ করল ধোঁয়া ওঠা চা আর
গরম গরম পকোড়া। এ কথা ও কথা বলতে বলতে চা পকরা শেষ। তার কিছুক্ষণ পরেই
চিকেন চাওমিন খেতে দিল। কতদিন পরে কাছে পেয়ে কত না মনের কথা, কোনটা
ছেড়ে কোনটা বলি। তারপর একবার রান্নাঘর ঠাকুর ঘর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার
ঘর গান বাজনার ঘর এবং নিজেদের বেডরুম আর কত রংবাহারি ফুলের গাছে ভরা
বারান্দা রেলিং ছাদের সিড়ি এই সব ঘুরিয়ে দেখানোর পর আমি ওর ঠাকুর ঘরে
কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। ওর ঠাকুর ঘরটা দেখে আমার খুব ভালো
লাগলো। ঠাকুরের সিংহাসনটা খুব সুন্দর করে সাজানো। দেখে ভক্তিতে আমার মাথা
নত হয়ে গেল। আমি হাতজোড় করে প্রণাম করলাম আর মনে মনে বললাম
"আমি সকল কাজের পাই যে সময় তোমারে ডাকিতে পাইনে।" আরও বললাম, জয় মা
তারা, সবার মঙ্গল করো মা, সবাইকে ভালো রেখো।
এরপর পলি হাতে একটা মাদুর নিয়ে এসে আমায় বলল " বাচ্চারা নিচে একসাথে
খেলুক, কথা বলুক, বৌদি চলো, আমরা ছাদে গিয়ে বসি।"
চাঁদের আলোয় মাদুর বিছিয়ে বসে পড়লাম। কত গল্প। গল্প আর শেষ হয় না।
খুব ভালো লাগছিল। ওর ছেলে মেয়েরা কত বড় হয়ে গেছে। ওরা কি নিয়ে
পড়াশোনা করে, পড়াশুনার সাথে সাথে আর কি কি করে, সব কথা গল্প করছিল।
আমিও গল্প করছিলাম আমার মেয়েদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। বড় মেয়ের ঘরে
একটা ছোট নাতি হয়েছে। হঠাৎ কথার মাঝখানে পলি বললো "বৌদি তুমি কিন্তু খুব
রোগা হয়ে গেছো গো"
" আর বলিস না, শরীর খুব খারাপ রে। "
"শরীর থাকলে তো রোগ ভোগ হবেই, ওসব কথা ছাড়ো তো। সব সময় অসুখ বিসুখ
শুনতে শুনতে আর ভালো লাগেনা। অনেকদিন পর কাছে পেয়ে মনের দুটো কথা বলতো,
কি যে সারাক্ষণ শরীর খারাপ বলতে থাকো বুঝিনা বাপু। আজকাল তো কলম ধরেছ, কত
সুন্দর সুন্দর লেখা লিখছো, তোমার লেখা পড়তে আমরা সবাই খুব ভালোবাসি। এসব
নিয়ে কথা বলতো। তবে বৌদি এখনো তুমি সেই আগের মতো চারমিং আছো। তবে নতুন
এই চশমাটা তোমায় বেশ মানায়। চশমা পরলে কিন্তু তোমাকে সুন্দর লাগে। আগে
যেমন সাজগোজে পরিপাটি ছিলে, এতদিন পরও তেমন আছে দেখছি। লক্স কাটা কপালের
ওপরে একটা বড় টিপ নিচে ছোট টিপ। ঠিক আগের মতই। আর তোমার সব থেকে বড় গুন
কি জানো বৌদি? সব সময় তোমার মুখে লেগে থাকা ওই প্রাণ খোলা হাসি। এই
যাহ্! দেখেছো বৌদি, কেমন ভুল মন আমার? তোমার সাথে গল্প করতে করতে মুড়ি
মাখার কথা ভুলেই গেছি। তুমি একটু বসো, আমি এক্ষুনি আসছি। - এই বলেই এক
ছুটে পলি ছাদ থেকে নেমে গেল। আমি মনে মনে ভাবছি কি আন্তরিক ব্যবহার, না
আমার রক্তের সম্পর্কের কেউ, আর না আমার নিজের কোন আত্মীয় পরিজন।
সে অনেকদিন আগের কথা, আমাদের বাড়ির কাছেই একটি মন্দির আছে। আমার শাশুড়ি
মা যতদিন বেঁচে ছিলেন প্রায় প্রতিদিন মর্নিং ওয়াক করতে গিয়ে ওই
মন্দিরের মায়ের পায়ে ফুল দেওয়ার জন্য যেতেন, মায়ের পূজা ভোগ আরতি
দর্শন করতেন আর ফেরার পথে মায়ের প্রসাদও নিয়ে আসতেন। আর ওই মন্দিরেই
মায়ের ভোগ রান্নার দায়িত্ব ছিলেন পলির শাশুড়ি। রোজ যাতায়াত করতে করতে
আমার শাশুড়ির সাথে পলির শাশুড়ির বেশ একটা সুন্দর বন্ধুত্বের সম্পর্ক
তৈরি হয়ে যায়। তো সেই সূত্রেই একদিন আমার শাশুড়ি মা পলীর শাশুড়িকে
সপরিবারে আমাদের বাড়িতে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানান। পলির মেয়ে তখন খুব
ছোট। সেই ছোট্ট মেয়েকে সাথে করে পলি আর ওর শাশুড়ি আমাদের বাড়িতে
এসেছিলেন একদিন। এরপর আমরাও সপরিবারে একদিন ওদের বাড়িতে ঘুরতে যাই।
এইভাবেই ওদের সবার সাথে আমাদের আলাপ পরিচয় ধীরে ধীরে আরো গভীর হয়। ওর
শাশুড়ি আর আমার শাশুড়ি দুজনে যেমন বন্ধু, তেমন পলি আর আমি আমরাও দুই
বৌমা মিলে বন্ধু হলাম। কিন্তু তোমাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে আমরা যদি
একে অপরের বন্ধু তাহলে ও আমাকে নাম ধরে না ডেকে বৌদি কেন বলে।
এসো তোমাদের সেই ঘটনাটাই বলবো।
ক্রমশ..............