পৌষালী

প্রসেনজিৎ দাস,

ঘাটাল, পূর্ব মেদিনীপুর

পৌষের প্রথম প্রভাতে
আকাশের বুক জুড়ে যে নরম রোদ ভেসে আসে,
তারই কোমল স্পর্শে ঘুম ভাঙে বাংলার মাঠে,
ধানের দোলায় উঠে আসে সোনালি শস্যের নিঃশ্বাস ,
সেই আলো, সেই নিসর্গ, সেই মাটির মায়া সব নিয়ে
মিলে মিশে জন্ম দেওয়া এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্যের নাম -
পৌষালী।

পৌষালী যেন সেই চুপচাপ শীতের পরশ
যে পরশে শিশিরকণার বুকে ফুটে ওঠে রুপোলি জ্যোৎস্না,
নরম ঘাসের মাথায় জমে থাকা স্ফটিক বিন্দু
সূর্যের আলোয় হয়ে ওঠে আলোড়িত সুরের মালা।
গ্রামবাংলার মেঠো পথে
তার ছায়া পড়ে ধীরে ধীরে,
মাটির সৌরভ, খড়ের গন্ধ
আর দূর থেকে ভেসে ওঠা গরুর ঘণ্টার ধ্বনি
তার আগমনী বার্তা বহন করে।

শীতের কনকনে সকালেও
পৌষালীর উষ্ণতা অদ্ভুত এক জাগরণ ,
মাঠে কৃষকের হাঁকডাক,
মহিলাদের নকশীকাঁথায় ব্যস্ত হাত,
ছেলেমেয়েদের হাসি-ধাওয়া -
সবকিছু মিলিয়ে সংকোচহীন উৎসবের রূপ নেয়।

পিঠেপুলির ধোঁয়া উঠতে থাকে উঠোন ভরা চুল্লি থেকে,
নারকেল-খেজুরের গন্ধ মন ভরিয়ে দেয় ঘরদোর,
আলপনার সাদা ডানায়
তারুণ্যের হাসি খেলে যায়।
পৌষালী এই উৎসবেরই উদ্বোধন-স্বর,
যেন এক গভীর আহ্বান -
“এসো, মানুষ হও, মাটির সঙ্গে মিলেমিশে বাঁচো।”

নদীর ধারের কুয়াশা ভেজা নরম বাতাস,
শীষভরা ধানের ডগায় টুপ করে পড়া শিশির,
রাতের আকাশে অসংখ্য নক্ষত্রের নিভৃত দীপ্তি -
সবই যেন তার নামে সিক্ত হয়ে ওঠে।
পৌষালী মানে শীতের নরম শান্তি,
শান্তির ভেতর থাকা লুকোনো উল্লাস,
আর উল্লাসের বুক জুড়ে থাকা অনন্ত স্মৃতি।

তার উপস্থিতিতে জীবন থমকে দাঁড়িয়ে বলে -
"সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে
প্রকৃতির প্রতিটি অধ্যায়ই এক একটি শাশ্বত শিল্প।"
পৌষালী সেই শিল্পের রূপস্বরূপ,
যেখানে ধানগাছের দোল
আর মানুষের স্বপ্ন একই সুরে বাঁধা পড়ে।

যারা শহরে থাকে,
তাদের কাছে পৌষালী হলো ফিরে দেখা শৈশব;
মাটির গন্ধে লেখা ডাকপিয়নের চিঠি,
যেখানে লেখা থাকে গ্রামের উঠোন,
শীতের উনুন,
আর মায়ের হাতে তৈরি পিঠের অনন্ত মমতা।
পৌষালী সেই অতীতের দরজা খুলে দেয়
নিঃশব্দ নরম পায়ে।

তবু সে শুধু স্মৃতির নয় -
সে আগামীরও প্রতীক।
কারণ শীতের নীড় ভরা নীরবতার ভেতরেই
অঙ্কুরোদ্গমের জন্ম;
মাটির গর্ভে তখনই
সবচেয়ে বেশি সঞ্চিত হয় ভবিষ্যতের আশা।

পৌষালী সেই আশার নাম,
যে আশা বলে -
“তোমার ভিতরে আলো আছে,
মাটির মতো শক্তি আছে,
ধানের মতো পুষ্টি আছে,
শীতের মতো ধৈর্য আছে।”

তার আগমনে প্রকৃতি বলে ওঠে -
বাঁচো, সৃজন করো,
হৃদয়ে প্রেম রাখো,
এবং পৃথিবীর প্রতিটি ঋতুকে
একেকটি কবিতা হিসেবে পড়ো।
শেষ বিকেলের ম্লান আলোয়
যখন ঘরে ফেরা ঢাকের শব্দ ওঠে,
তখনও তার ছোঁয়া টের পাওয়া যায় -
যেন কেউ নীরবে বলে যাচ্ছে,
"আমি আছি, আমি ফিরবো,
আমি তোমাদের জীবনের শাশ্বত ঋতুচক্র।"

এইভাবে
ধূলিমাখা পথ, শ্যাওলা আঁকা পুকুর,
পিঠেপুলি, আলপনা, শিশির আর রোদ
সব মিলেই তৈরি হয়
পৌষালী নামের বিস্তীর্ণ এক অনন্ত কবিতা।
প্রকৃতির লেখা,
মানুষের বুকে গড়া
এক স্নিগ্ধ, আলোমাখা সৃষ্টির চিরন্তন গান।