পথ

অঞ্জনা কুন্ডু দত্ত,

গড়িয়া

ট্রেন চলছে , হঠাৎ একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা আমাকে বললেন "আমাকে একটু হোটোর স্টেশন এ নামিয়ে দেবে মা।" আমি রোজ ই সকাল ৯টা ১৫মি: ডায়মন্ড হারবার গামী ট্রেন ধরে হোটোর স্টেশন এ নেমে স্কুলে যাই। আমি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি করি।ওনাকে সম্মতি জানিয়ে বললাম অবশ্যই নামিয়ে দেব। তখন উনি ব্যস্ত হয়ে আমার হাত টা বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বললেন তোর মতো যদি আমি একটা মেয়ের জন্ম দিতাম তাহলে হয়তো আমি সমাজের কাছে বাহবা পেতাম না ছেলের মা হিসেবে । কিন্তু আজ এই বয়সে এরকম অসহায় ও একা লাগত না। ওনার বয়স দেখে মনে হলো প্রায় ৭৯-৮০হবে। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে ওনার। মুছে নিয়ে বললেন ছেলেটাও বা কি করবে বলো, তার এখন নিজস্ব একটা সংসার আছে। দুটো ছেলে স্ত্রী নিয়ে নাজেহাল অবস্থা।সে অফিস চলে গেলেই আমার খুব খিদে পায়। সকালে উঠে বাসি কাজ সেরে স্নান করে পুজো সারতে দশটা বেজে যায়।তারপর কিছু না খেয়ে প্রেসারের ওষুধ ও খেতে পারি না। তাই বৌমার কাছে খাবার খেতে চাইলে শুধু বলে আপনি গ্রামের বাড়িতে গিয়ে থাকুন।জানো মা আমার বাড়িতে কেউ নেই। একসময় ও বাড়িতে আমি খোকাকে নিয়ে কতটা সময় কাটিয়েছি। তখন ভাবি নি ওর বাবা চলে গেলে খোকা আর আমি দুজনেই একা হয়ে যাব। হয়তো খোকা দেখতে আসবে কিন্তু রোজ তো আমাদের দেখা হবে না। তাই ভাড়ুতে যাচ্ছি, ওখানে আমার নিজের বাড়ি। "তুমি ট্রেন থেকে নেমে একটু অটোতে তুলে দেবে মা"। অবশ্য ই দেব। ভাগ্যের কি পরিহাস। ট্রেন থেকে নেমে ওনাকে একেবারে অটোতে করে নিয়ে ভাড়ুতে পৌঁছে দিলাম। গিয়ে দেখলাম বাড়িটা অযত্নে পরে রয়েছে।"আয় মা বোস", তার পর বলেন আমাকে এখানে প্রায় সবাই চেনে। কারণ আমি এখানে অনেক টিউশনি করতাম।এটা আমার বাবার বাড়ি। খোকাকে নিয়ে আমরা দুজনে এখানে ই সংসার পেতেছিলাম। আমার বাবা মা সব কলকাতায় থাকতেন। খোকা বিয়ের পর বারুইপুর এ ফ্ল্যাটে থাকে। আমার সেদিন আর স্কুলে যাওয়া হয় নি। বাস্তবতা কতই না কঠিন।

~সমাপ্ত~