পালা বদল

সুচিত্র রঞ্জন পুরকাইত,

ডায়মন্ড হারবার

এক সময় বাড়িতে অতিথি আসা মানেই ছিল উৎসব। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ, চেনা মুখের হাসি, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা বিশেষ পদের গন্ধ—সব মিলিয়ে ঘর যেন মুহূর্তে প্রাণ পেয়ে উঠত। মা বলতো - 'অতিথি নারায়ণ' - আজ সেই দৃশ্যটাই বদলে গেছে। অতিথি এলেই আনন্দের বদলে অনেক সময় মনে ভর করে একরাশ ক্লান্তি আর অস্বস্তি।

আগে কারো বাড়িতে যাবার সময় আগে থেকে খবর দেওয়ার বালাই তো ছিলোই না, উল্টে হঠাৎ হঠাৎই অনেক দূর সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজনরাও এসে হাজির হয়ে যেতেন, আর বাড়ির লোকেরা অম্লান বদনে তাদের কে আতিথেয়তা করতো। আর আজকে কারো বাড়িতে যাওয়ার হলে কম করে এক মাস আগে থেকে তাকে ফোন করে খবর দিতে হয়। অনেক দূর সম্পর্কের আত্মীয় তো দূরে থাক, সবথেকে কাছের মামা মাসি পিসি এইসব আত্মীয়-স্বজন কে ও আমরা প্রায় ভুলতেই বসেছি।

আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা এই বদলের সবথেকে বড় কারণ। চাকরি, পড়াশোনা, সংসারের দায়িত্ব—সব মিলিয়ে মানুষের হাতে আর সময় নেই। অতিথি এলে যে স্বতঃস্ফূর্ত সময় দেওয়া দরকার, তা আজ অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে আন্তরিকতা থাকলেও আনন্দটা আর আগের মতো উচ্ছ্বল থাকে না।

অর্থনৈতিক চাপও কম দায়ী নয়। এক সময় অতিথিকে আপ্যায়ন ছিল স্বাভাবিক সামাজিক দায়িত্ব, আজ তা অনেকের কাছেই অতিরিক্ত খরচ ও ঝামেলার বিষয়বস্তু। এখন কে কী খাবে, কোথায় কোথায় ঘোরাবো, তাতে কতটা খরচ হবে—এই হিসাব আনন্দের জায়গাটা দখল করে নেয়। আর তার উপর আগে আত্মীয়-স্বজন এলে বাড়ির সবার জন্যই ভাজা পোড়া ঝোল ঝাল অম্বল পায়েস মিষ্টি সবই একই রকম রান্না বান্না হতো। কারুর জন্য আলাদা রকম কিছু হতো না। সবাই একসাথে বসে একই খাবার খাওয়া হতো। কিন্তু এখন এর ডায়াবেটিস আছে মিষ্টি খাবে না, ওর কোলেস্টেরল আছে ভাজা ভুজি খাবে না, তার হার্টের সমস্যা, ওর ব্লাড প্রেসার হাই.........ইত্যাদি নানান কারণে সবাই সব রকম খাবারও খেয়ে উঠতে পারে না। ফলে খাবার খেতে বসে আগে যে হট্টগোলটা হত এখন আর সেটা হয়ে ওঠেনা।

আরও একটি বড় পরিবর্তন এসেছে সম্পর্কের গভীরতায়। আগে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ হতো। আজ যোগাযোগ সীমাবদ্ধ হয়েছে ফোন আর সামাজিক মাধ্যমে। ফলে অতিথি এলেও সেই আপন ভাব, নির্ভেজাল আড্ডা আর আগের মতো হয়ে ওঠে না।

সব মিলিয়ে বলা যায়, অতিথি আসার ঘটনা বদলায়নি, বদলেছে আমাদের জীবনধারা ও মানসিকতা। তাই আগের মতো আনন্দের দিনগুলো আজ আর সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না—সেগুলো রয়ে গেছে স্মৃতির অ্যালবামে, নস্টালজিয়ার পাতায়।