নকশী কাঁথার ফসিল ও তার ভাঙন- (দ্বিতীয় ভাগ) ভাঙনের গভীরে

রীতা বিশ্বাস পান্ডে,

নিউ-দিল্লি

দেবীপক্ষের সেই প্রতিবাদের পর শিউলির জীবনে নতুন দিনের আলো এসেছিল বটে, কিন্তু সমাজের অন্ধকার শক্তি এত সহজে হার মানতে রাজি ছিল না। শিউলির কণ্ঠস্বর আর তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সমবায় কিছু পুরুষের মনে চরম বিদ্বেষের জন্ম দিয়েছিল, আর সবার উপরে ছিল মোড়লের ছেলের অহংকারী জিঘাংসা।

একদিন গভীর রাতে, শিউলির বাড়ির দরজায় জোর ধাক্কা পড়ল। শিউলি দরজা খোলার আগেই মোড়লের ছেলে আর তার দুই সঙ্গী কপাট ভেঙে ভেতরে ঢুকল। সম্পা মায়ের পাশে শুয়ে ভয়ে কাঁপতে লাগল। মোড়লের ছেলের চোখে প্রতিশোধের আগুন। শিউলির সব প্রতিবাদ, সব আত্মবিশ্বাস যেন মুহূর্তে নিভে গেল। প্রতিবাদী নারীকে দমিয়ে দেওয়ার এক নৃশংস উল্লাস নিয়ে তারা শিউলিকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল।

পরদিন ভোরে, গ্রামের ধানের ক্ষেতের পাশে অচেতন অবস্থায় শিউলিকে পাওয়া গেল। তার শরীর জুড়ে চরম লাঞ্ছনার চিহ্ন। সেদিনের প্রতিবাদী শিউলি যেন এক জীবন্ত মূর্তি হয়ে পড়ে রইল।

হাসপাতালে যখন শিউলির জ্ঞান ফিরল, তখন তার চোখ দুটি শূন্য, দৃষ্টিহীন। চিকিৎসকেরা জানালেন, শারীরিক আঘাতের চেয়েও গভীর মানসিক আঘাত তার স্মৃতিতে বিভ্রম ঘটিয়েছে। শিউলি তার নিজের নাম মনে করতে পারে না, সম্পাকে চিনতে পারে না, এমনকি সুচ-সুতো দেখলেও তার কোনো ভাবান্তর হয় না। তার জগৎ থেকে সব রঙ, সব নকশা মুছে গেছে।

এদিকে শিউলির ব্যবসা, তার গড়ে তোলা 'শিউলি নকশী গাঁথুনী'—সবকিছু থমকে গেল। সমবায়ের নারীরা দিশেহারা। টানা তিন মাস শিউলির চিকিৎসা চলল। হারিকেনের আলোয় তার সুচ আর চলল না, নকশী কাঁথার নতুন নকশা বোনা হলো না। শিউলির জীবনের এই সময়টা যেন এক পাথুরে ফসিল হয়ে এল—যেখানে সমস্ত গতি, সমস্ত সংগ্রাম থেমে গিয়ে শুধু জমাট বাঁধা শূন্যতা রয়ে গেল। বাজারের কোণে শিউলির কাঁথার জায়গাটি ফাঁকা পড়ে রইল।

তিন মাস পর, শিউলির চিকিৎসক জানান—শারীরিকভাবে সে পুরোপুরি সুস্থ। মানসিক অস্থিরতাও কমেছে। একদিন একা থাকতে থাকতে শিউলির মনে সব স্মৃতি ফিরে আসে, সেই রাতের ভয়াবহতা, মোড়লের ছেলের চেহারা—সবকিছু। কিন্তু শিউলি কাউকে বুঝতে দিল না যে সে সুস্থ। সে আগের মতোই উদাসীনতার ভান করে রইল। কেবল সম্পার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত। গ্রামের মানুষ মনে করল, শিউলির স্মৃতিভ্রম সারেনি, সে এখনও 'পাগলি'।

কিন্তু এই স্মৃতিভ্রষ্টতার আড়ালে শিউলি এক নীরব প্রতিশোধের নকশা বুনতে শুরু করল। তার চোখের সেই উদাসীনতা ছিল আসলে এক গভীর চতুরতা। এই সমাজ তাকে দুর্বল ভেবেছিল, সেই সুযোগটাই সে নিল। রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকত, শিউলি তখন উঠে বসত। সে আর কাঁথা সেলাই করত না, সে তখন বুনত তার প্রতিশোধের কঠিন জাল।

এক পূর্ণিমার রাতে, গ্রামের নদীর ধারে মোড়লের ছেলের উলঙ্গ, ক্ষতবিক্ষত লাশ আবিষ্কৃত হলো। সবাই হতবাক। কে করল এমন নৃশংস কাজ? গ্রামের মানুষ বলাবলি করতে লাগল, এ নিশ্চয়ই প্রকৃতির বিচার, নয়তো কোনো প্রতিহিংসাপরায়ণ আত্মা প্রতিশোধ নিয়েছে। ঘটনার কোনো কিনারা হলো না, পুলিশ এসে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল ঠিক যেমনটি শিউলির বেলায়ও পুলিশ ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছিল।

ঘটনার কিছুদিন পর, একদিন ভোরে, শিউলি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে ঘুম থেকে উঠল। তার চোখে আর শূন্যতা নেই, আছে সেই দেবীপক্ষের দিনের মতো দৃঢ়তা, তবে আরও শীতল, আরও শান্ত। সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।

শিউলি সোজা তার পুরনো কর্মশালায় গেল। সেখানে ধুলো জমে থাকা সুতো আর কাপড় তুলে নিয়ে সে সেলাই মেশিনে বসলো। নুসরাত আপা, সুরবালা ঠাকুমা—সবাই শিউলিকে দেখে অবাক!

"শিউলি? তুই! তুই তো..." নুসরাত আপা কথা শেষ করতে পারলেন না।

শিউলি হেসে বলল, "হ্যাঁ আপা, আমি ফিরে এসেছি। এতদিন আমার জীবনের নকশী কাঁথার ওপর পুরনো ফসিলের একটা ভারী পাথর চাপা ছিল। সেই পাথরটা সরিয়ে দিতে একটু সময় লাগল।"

তার সেলাই করা নকশী কাঁথাগুলো যে ফসিল হয়ে পড়েছিল, সেগুলোকে সে আর ছুঁড়ে ফেলে দিল না। বরং সেই পুরনো, বিবর্ণ কাপড়ের উপরে নতুন সুতো দিয়ে আরও উজ্জ্বল, আরও শক্তিশালী নকশা বুনতে শুরু করল। এই নকশায় ছিল তার প্রতিবাদের শক্তি, তার কষ্টের ইতিহাস, এবং তার নীরব বিজয়ের ছাপ।

শিউলি কাঁথাটিকে সামনে নিয়ে বলল, "আমার এই জীবনটা এখন এই কাঁথার মতো। ভাঙনের ওপর দিয়ে নতুন করে গড়ে ওঠা। যে সমাজ আমাকে দুর্বল ভেবেছিল, সেই সমাজকে আমি আবার দেখাব, আমি শেষ হয়ে যাইনি। আমার নকশী কাঁথার ব্যবসা যে ফসিল আকার ধারণ করেছিল, সেটা ভেঙে আবারও নতুন ভাবে শুরু হলো।"

শিউলির হাত চলল দ্রুত, তার সুচ আর ফোঁড়গুলো যেন শুধু কাপড় নয়, সমাজের হৃদপিণ্ড বিদ্ধ করে চলেছে। শিউলি এখন গ্রামের নারীদের কাছে শুধু শিল্পী বা নারী নয়, সে এক জীবন্ত কিংবদন্তি—যে নারী জীবনের চরমতম লাঞ্ছনাকেও প্রতিশোধ ও শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে। তার এই নতুন কাঁথাগুলো কেবল বিক্রি হবে না, তা গ্রামের প্রতিটি ঘরের দেয়ালে টাঙানো বা বিছানায় পাতা থাকবে, এক নীরব সতর্কতা হিসেবে—যে নারীর প্রতিবাদ কখনও থামে না।

~ক্রমশ~