মাতলা, ঠাকুরান নদীর পার বেয়ে বেয়ে (নলপুর, ধইচি ও ভগবতপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা)

গৌরাঙ্গ বন্দ্যোপাধ্যায় ,

হাওড়া


পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য লাইব্রেরি বিভাগে দেখুন...


চতুর্থ তথা শেষ পর্ব

ভগবতপুরের টিকটিকি-কুমির ও ভয়ংকর বাইশ-ফুটিয়া:
আমাদের পরবর্তী ভগবতপুর অভিযান হল ১৯৯৩ এর নভেম্বর মাসে। এবার গিয়ে দেখলাম ফরেস্ট অফিসের পিছনেই একটি তিন রুমের একতলা বিল্ডিং তৈরী হয়েছে। সেখানে আমাদের রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর কংক্রিটের ঘাট নির্মাণ সম্পূর্ণ। সেখানে নতুন জেটি লেগেছে। এছাড়া এবড়ো খেবড়ো ইঁটের রাস্তা সংস্কার হয়ে এখন মসৃণ হয়েছে। উপরে হালকা সিমেন্টের প্রলেপও দেওয়া হয়েছে। আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে সেই তিন রুমের একতলা বিল্ডিংটিতে। যদিও জানলাগুলোতে কোন গরাদ নেই। শুধু ফ্রেম আর পাল্লা। তবে গতবার যে বাসস্থান ঠিক করা হয়েছিল তার তুলনায় এ তো স্বর্গ।

এবার আমরা নামখানা দিয়েই যাতায়াত করেছিলাম, রায়দিঘি হয়ে নয়। কারণ এবার আমাদের নলপুর- ধইচি যাবার প্রয়োজন ছিল না। ভগবতপুরে পৌঁছে গেলাম দুপুরের মধ্যে। ওখানে খাওয়া-দাওয়া করার পর সেদিন আমাদের কাজের জায়গাগুলো ও পুরো কমপ্লেক্সটা রেইকি করতে বেরোলাম। যাতে পরদিন থেকে পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারি।
ডিয়ার পার্কে মাত্র গোটাচারেক চিতল হরিণ দেখলাম। সবকটিই বেশ বড় সাইজের। উচ্চতা পূর্ণবয়স্ক মানুষের বুকের কাছাকাছি। একটির খুব বাহারি সিং। সেটি পুরুষ হরিণ। বাকি তিনটি স্ত্রী হরিণের সিং ছোট ছোট। তিন-চারটি বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপ (স্থলচর) ও অন্য এক প্রজাতির কাছিম (জলচর কচ্ছপ) দেখলাম। সবথেকে ভাল লাগল ছোট ছোট কালো কালো জলচর কচ্ছপ দেখে। আমরা জানতাম কচ্ছপকে উল্টে দিলে সে সোজা হতে পারে না। কিন্তু এই প্রজাতির কচ্ছপ ব্যতিক্রম। ওদেরকে জলের কাছাকাছি রেখে উল্টে দিলে ওরা পিঠ ঘষ্টে জলে চলে আসে, তারপর কিরকম একটা অদ্ভুত উপায়ে জলের মধ্যে উল্টে গিয়ে সোজা হয়ে সাঁতার কাটতে শুরু করে।

এরপর দেখলাম কুমিরের ব্রিডিং সেন্টার। মা কুমিরের ডিম ফুটে বাচ্চা হবার সময় তাদের সাইজ থাকে আমাদের গৃহপালিত টিকটিকির মত। সেগুলির নাম দিলাম টিকটিকি-কুমির। সেগুলোকে একটা কৃত্রিম সুইমিং পুলের মত জায়গায় রাখা হয়। সেখান থেকে একটু বড় হলে অন্য একটি বড় পুকুরে রেখে দেওয়া হয় যতদিন না দু'আড়াই ফুট সাইজের হচ্ছে। ঐ সব পুকুরগুলিতে জলের লবণাক্ত ভাব আনার জন্য নুন ও অন্যান্য আরো সল্ট পরিমাণমত দেওয়া হয়। তার সঙ্গে উপযুক্ত খাবার।
দু'ফুটের বাচ্চা কুমিরকে ছাড়া হয় কৃত্রিম খাড়ির মত স্থানে, যেটি লকগেট দিয়ে অন্যান্য প্রাকৃতিক খাড়ির সঙ্গে যুক্ত। সেটিতে নদীর লবণাক্ত জল পরিমাণমত ঢোকানো হয়। এবার সেই কুমিরগুলো পাঁচ-ছ ফুট হবার পর তাদেরকে আসল খাড়িতে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেগুলি কিশোর কুমির। সেগুলি এরপর অন্য পূর্ণবয়স্ক কুমিরদের সঙ্গে মিশে শিকার ধরতে শেখে। আবার কুমির প্রকল্পের এলাকার মধ্যে ফিরেও আসে। পূর্ণবয়স্ক কুমিরগুলিও দিনের নির্দিষ্ট সময়ে বন দপ্তরের নির্দিষ্ট কিছু খাড়িতে এসে খাবারের প্রতীক্ষা করে।
বিভিন্ন স্থান ঘুরিয়ে দেখাতে দেখাতে ফরেস্ট অফিসের কর্মচারীটি আমাদের নিয়ে এল একটি নির্দিষ্ট খাড়ির সামনে, যেখানে সেই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাইজের (২২ ফুট দীর্ঘ) কুমিরটি রয়েছে। শুনলাম আমাদের ভাগ্য ভাল হলে কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা তার দর্শন পাব। আমরা দাঁড়িয়ে আছি পাঁচ ফুট উঁচু পাঁচিলের এপাশে। ওপাশে দু'ফুট দূরেই খাড়ির শেষ প্রান্ত। খাড়িটি বড় জোর দশ ফুট চওড়া। তার দুপাশেও কাদামাটি রয়েছে চার ফুট করে।

একটু পরেই জলে আলোড়ন তুলে তিনি এলেন। নাক আর দুটি চোখ ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। যে খেতে দিচ্ছিল সে যেই একটা ঘাড় মটকানো মুরগি ছুড়ে দিল সঙ্গে সঙ্গে সেই বাইশ ফুটিয়া জলের উপর লাফিয়ে উঠে সেটি ক্যাচ করে নিল। দুর্দান্ত দৃশ্য। কিন্তু এরপর যা ঘটল তা যেমন অপ্রত্যাশিত তেমনি ভয়ঙ্কর। আমাদেরই এক সহকর্মীর (নাম বলব না) অবিমৃশ্যকারিতার ফলে এক সাংঘাতিক বিপদের মুখে আমরা পড়ছিলাম আরেকটু হলেই। পাঁচিলের এপাশে একটি মাঝারি সাইজের শোলার টুকরো (হয়ত কোন প্যাকিং বাক্সের অবশেষ) পড়েছিল। সে সেটি তুলে ঐ বাইশ ফুটিয়ার দিকে ছুঁড়ে দিল। শোলা হালকা হওয়ায় সেটি পাঁচিল টপকে একফুট যেতে না যেতেই মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে লেজের ঝাপটায় জল তোলপাড় করে তিনি এসে খপ করে সেটি মুখে পুরলেন ঐ বিশাল চোয়াল হাঁ করে বিরাট মুখব্যাদান করে। ঐ বীভৎস মুখ ও দাঁতের সারি দেখে আমাদের দাঁতকপাটি লাগার জোগাড়। এমনকি খাড়ির জলও পাঁচিল টপকে আমাদের মুখ চোখ ভিজিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ফরেস্ট অফিসের কর্মচারী সেই সহকর্মীকে প্রচন্ড গালাগাল দিয়ে উঠলেন। বললেন, "জানেন ও পাঁচিল টপকে এপারে চলে এলে কি হত?" সে নিজের ভুল বুঝতে পেরে কাঁচুমাচু মুখে শুধু বলল, "সরি, ভুল হয়ে গেছে।"

পরের পাঁচ'ছ দিন সেরকম উল্লেখযোগ্য কোন ঘটনা ঘটেনি। তবে ফেরার আগের দিন শুনলাম ভগবতপুর থেকে ১০ কিমি দূরের একটি গ্রামে বাঘ ঢুকে পড়েছে। বনদপ্তর থেকে শিকারী ডেকে পাঠান হল। যেদিন আমরা ফিরে আসব সেদিনই ঘুমপাড়ানি গুলি সহ শিকারী এসে পৌঁছলেন। আমরা গুলিগুলো দেখলাম কিন্তু বাঘ ধরা দেখতে পাওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের আর আহরণ করা হয়ে ওঠেনি।


সমাপ্ত..............