মাতলা, ঠাকুরান নদীর পার বেয়ে বেয়ে (নলপুর, ধইচি ও ভগবতপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা)

গৌরাঙ্গ বন্দ্যোপাধ্যায় ,

হাওড়া


পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য লাইব্রেরি বিভাগে দেখুন...


প্রথম পর্ব

মাতলায় সুন্দরবনের ভয়ঙ্কর প্রাণী:

রায়দিঘিতে এসে পৌঁছেছি প্রায় দেড়-দু ঘন্টা আগে। এখনও পর্যন্ত আমাদের নিতে আসার কথা যে লঞ্চের তার কোন খবর নেই। আমার সঙ্গে আরো পাঁচজন ওয়েবেল অফিস ও তার সাব-কন্ট্রাক্টরের লোক এবং দুজন WEBREDA অফিসের কর্মচারী দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করছি রায়দিঘি জেটির পাশেই অবস্থিত একটি হোটেলে। হোটেল বলতে বিরাট কিছু নয়। যে কোন গঞ্জের ভাত খাবার হোটেল যেমন হয় আর কি। তবে এটা দোতলা বাড়ি। নিচের তলায় খাবার হোটেল, আর দোতলায় ৪-৫ টি রুম আছে, ভাড়া দেওয়া হয় - অস্থায়ী আস্তানা হিসাবে। তবে মাঝখান থেকে এরকম বলে লাভ নেই, আগের কথা একটু বলে নেওয়া যাক।

১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাস। ওয়েবেল কোম্পানির হয়ে সোলার প্রজেক্ট করার জন্য সুন্দরবনের তিনটি ফরেস্ট অফিসে আমাদের যেতে হবে দিন পনেরোর জন্য। স্থানগুলি হল নলপুর, ধইচি ও ভগবতপুর। ওয়েবেল থেকে আমি, গাঙ্গুলি ও পরেশদা, কন্ট্রাক্টরের তিনজন এবং WEBREDA-র অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার কুমার ও আরেকজন সকাল ন’টার মধ্যে রায়দিঘিতে পৌঁছে গেছি। আমি ভোরবেলা বালি থেকে বেরিয়ে শিয়ালদা এসে সেখান থেকে সাউথ সেকশনের লক্ষীকান্তপুর লোকাল ধরে মথুরাপুর রোড স্টেশনে নেমে আধঘন্টা অটোতে ঝাঁকানি খেতে খেতে রায়দিঘি ঘাটে পৌঁছে গেছি সাড়ে আটটার আগেই। বাকিরাও তার আধঘন্টার মধ্যেই এসে গেল। কিন্তু ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের যে লঞ্চের আসার কথা ন'টার সময়, বেলা এগারোটাতেও তার কোন পাত্তা নেই।

সে যুগে সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী এলাকাতেও ল্যান্ডফোনে যোগাযোগ করতে পারাটা ছিল বেশ ভাগ্যের ব্যাপার। তাই কলকাতার ফরেস্ট অফিস খোলার পর আমরা সেখানে ফোনে যোগাযোগ করে আমাদের দুরবস্থার কথা জানাতে পারলাম বেলা এগারোটার পর। তারপর সেখান থেকে আরো একঘন্টা পর তাঁরা RT (রেডিও ট্রান্সমিটার - বিভিন্ন ফরেস্ট অফিসের ও কিছু লঞ্চের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম) মারফত খবর পেয়ে জানালেন যে আমাদের নিতে যে লঞ্চটি আসছিল, সেটি বিকল হয়ে পড়ে আছে কোন একটি স্থানে। আমাদের আরো দু'তিন ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে। যেহেতু দুপুরের লাঞ্চ বারোটার আগেই হয়ে গেছে তাই হাতে বেশ খানিকটা বাড়তি সময় পেয়ে গেলাম।

আমরা ফাঁকা সময়ে কাছাকাছি এলাকাটা ঘুরতে বেরোলাম ঘন্টা দুয়েকের জন্য। কাছাকাছি দুটি মন্দির দেখে মাতলা নদীর পার ধরে বেশ কিছুটা গিয়ে এমন একটা স্থানে পৌঁছলাম যেখানে শুধু দিগন্ত প্রসারিত মাছের ভেড়ি - আর তার চারপাশে ছোট ছোট কুটির। শীতের দুপুরের মনোরম আবহাওয়ায় দারুন লাগছিল। তবে আমাদের এবারের টীম লিডার কুমার বললেন, আড়াইটার মধ্যে আমাদের রায়দিঘি জেটিতে ফিরে যেতে হবে। সেই অনুযায়ী আমরা যথাসময়ে রায়দিঘিতে ফিরে এলাম।

লঞ্চ চলে এলো তিনটের আগেই। তারপর সব পার্সোনাল লাগেজ ও প্রজেক্ট সংক্রান্ত লাগেজ লঞ্চে তুলে লঞ্চের ডেকে বসে গুলতানি শুরু করলাম। একটু পরেই লঞ্চ চলতে শুরু করল দক্ষিণমুখো। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই মূল মাতলা নদীতে এসে পড়ল যেখানে নদীটা অনেকটা চওড়া। ঘন্টাখানেক চলার পর সেটি মূল নদী থেকে একটি খাড়ির মত জলধারায় ঢুকে নোঙ্গর করে দিল। জানতে পারলাম জোরদার জোয়ার আসছে, তাই এখন আর লঞ্চ চলবে না। একটু পরেই সূর্য ডুবতে শুরু করল। আমরা নদীর পশ্চিম পার বরাবর রয়েছি, তাই নদীর জলে সূর্যাস্তের শোভা দেখা গেল না। তবে দুপাশের ঘন বন যেন আরো ঘন হয়ে উঠল। সূর্য বনের গাছপালার আড়ালে অদৃশ্য হবার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত চারদিক আঁধার হয়ে গেল।

একটু পরেই শীত করতে লাগল। আমার অন্যান্য সঙ্গীরা গিয়ে কেবিনে ঢুকে পড়ল। আমি চলে গেলাম সারেং-এর কেবিনে গল্প করতে। সারেং-এর সঙ্গে গল্প করার ফাঁকে একজন এসে খবর দিল যে আজ রাতে আর লঞ্চ ছাড়বে না। শুনে আবার দুশ্চিন্তায় পড়লাম যে ইঞ্জিন আবার গড়বড় করছে নাকি। কিন্তু সারেং চাচা বারবার জোর দিয়ে বললেন যে ইঞ্জিনের কোন সমস্যা নয়। কিন্তু কিসের সমস্যা সেটা কিছুতেই ভেঙে বললেন না। শুধু বারবার বললেন, 'চিন্তা কইরেন না কত্তা, আইজ রাতে যাওয়া রিক্স হইয়ে যাইব। আপনেরা একটু পরে রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়েন। ভোরের আলো ফুটতেই লঞ্চ ছাড়ি দিব।' কিন্তু একটু আগে উনি-ই বলেছিলেন যে জোয়ারের পর ভাটা শুরু হলেই লঞ্চ ছাড়বে। রাতে লঞ্চ চালাতে কোন অসুবিধা নেই। উনিই এখানকার সবথেকে অভিজ্ঞ সারেং, ইত্যাদি। তাহলে কেন লঞ্চ ছাড়ছে না? বিশেষ করে ঐ কর্মচারী কি এমন খবর দিল যার জন্য এখানে রাতে যাওয়া স্থগিত করে দেওয়া হল। আমি কৌতূহলে সারেং চাচাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেললাম। শেষ অবধি বললাম, 'চাচা, আপনার ছেলে আপনাকে এসব জিজ্ঞেস করলে আপনি কি তাও কিছু বলতেন না?' তারপর উনি মুখ খুললেন।

উনি আমায় প্রতিপ্রশ্ন করলেন, 'আচ্ছা, বলেন তো, আপনেদের ধারণায় সুন্দরবনের সবথেকে ভয়ঙ্কর প্রাণী কি?'

আমি বললাম, 'হয় বাঘ, নয় কুমির, নাহলে সাপ - এছাড়া অন্য কোন ভয়ঙ্কর প্রাণীর কথা আমার জানা নেই।'

'না, এদের থেকে অনেক ভয়ঙ্কর প্রাণী সুন্দরবনের ডাকাত! RT-তে সেই ডাকাতদলের এই এলাকায় আসার খবর মিলেছে। তাই আজ রাতে আর আমরা যাবু নি। আপনেরা ভয় পাবেন বলেই আমি বলতে চাইনি।'

তারপর কথা প্রসঙ্গে উনি ওনার শরীরের তিনটি চিহ্ন দেখালেন - পায়ের নিচের অংশে কুমিরের দাঁতের দাগ, পিঠের কাঁধের কাছে বাঘের থাবার দাগ ও কোমরের একটু উপরে পেটের ডানদিকে গুলি ফুঁড়ে বেরিয়ে যাওয়ার দাগ। সবকটি ক্ষেত্রেই ওনার অভিজ্ঞতার কথা সংক্ষেপে দু'লাইনে বলে শেষ করে আমায় ওনার কেবিন থেকে আমাদের কেবিনে চলে যেতে বললেন। আমার সেই ঘটনাগুলোর স্থান, কাল এসব ঠিকঠাক মনে নেই। তবু মূল ঘটনাগুলো যেটুকু মনে আছে বলছি।

কুমির: ভগবতপুরের কাছে একটি খাড়িতে ব্রীড করা কিশোর কুমিরকে মাংস খেতে দেবার সময় সেই খাড়িতে কোনভাবে ঢুকে পড়া একটি পূর্ণবয়স্ক কুমিরের লেজের ঝাপটায় ভারসাম্যহীন হয়ে কাদায় পড়ার সময় ঐ কিশোর কুমিরটি ওনার পা কামড়ে ধরেছিল। তবে ওনার সঙ্গী পর পর দুটি মুরগি কুমিরের দিকে ছুড়ে দেওয়ায় কিশোর কুমিরটি ওনার পা ছেড়ে মুরগি খেতে শুরু করে। তাতেই তিনি সেবার রেহাই পান। হাসপাতালে যেতে হয়নি। ফার্স্ট এইড নিয়েই ভাল হয়ে গেছিল।

বাঘ: ঠাকুরান নদীর পূর্ব পারে (যেদিকটা core সুন্দরবন এলাকা ও বাঘের বাসস্থান) মউলেদের (যারা বাঘকে ধোঁকা দেবার জন্য মাথার পিছনদিকে মানুষের মুখোশ পরে মধু সংগ্রহ করে প্রাণ হাতে করে) নিয়ে গেছিলেন ছোট ভুটভুটি নৌকা করে। নৌকা নদীর পাড়ে নোঙ্গর করা ছিল। ভর দুপুরবেলা। নৌকায় উনি ছাড়া শুধু আরেকজন ছিলেন। খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির জন্যই বাঘের গতিবিধি টের পাননি। বাঘ নিঃশব্দে নৌকায় উঠে পিছন থেকে ওনাকে আক্রমণ করে ও কাঁধের নিচে পিঠে থাবা মারে। উনি সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে গিয়ে বাঘের নাকে টাঙ্গি দিয়ে মারেন। ওনার সঙ্গী বাঘের মাথায় হাল দিয়ে মারেন। তাতে বাঘ ভয় পেয়ে নৌকা থেকে লাফিয়ে জলে নেমে সাঁতরে পারে উঠে অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু তারই ধাক্কায় নৌকাটা উল্টে যায়। ওনার সঙ্গী নৌকাটাকে ধরে সোজা করে ওনাকে জল থেকে তোলেন। তারপর উনি বেশি রক্তপাতের জেরে আচ্ছন্ন হয়ে যান। সঙ্গী তখন নৌকা চালিয়ে এনে ওনাকে অন্য নৌকাতে পৌঁছে দিয়ে ফিরে যান। সেখান থেকে লঞ্চে নিয়ে গিয়ে মূল ভূখণ্ডে পৌঁছে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে সাতদিন কাটিয়ে তারপর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।

ডাকাত: এই ব্যাপারে বিশেষ কিছুই বলতে চাননি চাকরি জীবনের গোপনীয়তার কারণে। শুধু বলেছেন যে, রাতে লঞ্চে ডাকাত পড়েছিল। আর্মড ফরেস্ট গার্ডদের সঙ্গে ডাকাতদের গুলির লড়াইতে দুজন গার্ড ও একজন ডাকাত মারা পড়ে। ওনার পেট ফুঁড়ে গুলি বেরিয়ে যায়। বুকেও গুলির খোঁচা লেগে রক্ত ঝরে। ডাকাতরা লঞ্চ থেকে তিনজনকে পণবন্দি করে নিয়ে যায়। যাবার আগে RT সেট ভেঙে দিয়ে যায়। উনি মরার ভান করে পড়ে থাকেন বলে বেঁচে যান। আরেকজন সতীর্থ লঞ্চের নোঙ্গরের নিচে লুকিয়ে পড়ায় বেঁচে যান। তারই সহায়তায় ঐ অবস্থাতেই লঞ্চ চালিয়ে সেটাকে কাছাকাছি গ্রামে ভেড়ান। তারপর গ্রামবাসীদের সহায়তায় হাসপাতাল। সেখানে দিন পনের কাটিয়ে তারপর বাড়ি ফেরা।


ক্রমশ..............

আলোকচিত্র সৌজন্যে লেখিকা অদিতি মন্ডল