মোহময়ী মধ্যপ্রদেশ (মাণ্ডু) সপ্তম পর্ব
মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী,
বালি হাওড়া
পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য
লাইব্রেরি
বিভাগে দেখুন...
কিন্তু মান্ডু তো কেউ রামমন্দির দর্শনের জন্য আসবেন না। আসবেন বাজবাহাদুর
ও রাণী রূপমতীর প্রেমকাহিনীর আস্বাদ নিতে। মান্ডুর শেষ স্বাধীন সুলতান
বাজবাহাদুরের প্রণয়গাথা ছড়িয়ে আছে মান্ডুর আকাশ বাতাস সর্বত্র। ১৫৪২
সালে শের শাহ মালব জয় করেন এবং সুজা খানকে শাসক নিযুক্ত করেন। সুজা খান
১৫৫৪ সালে মারা যাওয়ার পর তাঁর তিন পুত্রের মধ্যে অন্যতম মালিক বায়াজিদ
ভাইদের সরিয়ে সুলতান বাজ বাহাদুর নাম গ্রহণ করে সিংহাসনে বসেন। যদিও
সুলতান রাজকার্যের চেয়ে বেশি ভালবাসতেন নৃত্য গীত ও রবাব। তিনি নিজে
একইসঙ্গে সঙ্গীতজ্ঞ, নৃত্যশিল্পী ও অসাধারণ রবাব বাদক ছিলেন। তাঁর রবাবের
সুরে মথিত হত মান্ডুর আকাশ, বাতাস, প্রাঙ্গন।
সকলেই জানেন শিল্পীরা ভাবুক প্রকৃতির হন। একবার শিকার করতে গিয়ে জঙ্গলের
মধ্যে তিনি অপূর্ব সুরেলা কণ্ঠে গান শুনে সেই গান অনুসরণ করে গিয়ে দেখেন
এক অসামান্যা রূপসী মেয়ে ঝর্ণার ধারে বসে গান গাইছে। বাজ বাহাদুর মুগ্ধ
হন গানের সুরে রূপের জালে। পরিচয় জানতে গিয়ে জানা যায় জঙ্গলের কাছেই
রাজপুত মান সিং রাঠোরের একমাত্র কন্যা এই মেয়ে, নাম রূপমতী। সুপুরুষ বাজ
বাহাদুরকে দেখে রূপমতীরও মনে ঝর্ণার কলরোল। সুলতানের তর সয় না। তখনই
রূপমতীকে নিয়ে যেতে চান প্রাসাদে। কিন্তু রূপমতী রাখলেন শর্ত। ঠিক
এখানটায় মহাভারতের ধীবরকন্যার সত্যবতীর কথা মনে পড়ে যায়। তিনিও শর্ত
রেখেছিলেন, তবে সেটি ছিল রাজনৈতিক। আর এখানে প্রকৃতির কন্যা রূপমতী
চাইলেন নদীকে তার কাছে এনে দিতে হবে। রূপমতী মা নর্মদার উপাসনা না করে
অন্নজল গ্রহণ করতেন না। তাই তাকে এমন স্থানে রাখতে হবে যাতে সে প্রতিদিন
সকালে মা নর্মদার দর্শন পায়। সুলতান রাজি হলেন শর্তে।
বাজ বাহাদুর তাঁর প্রিয়ার জন্য এমন এক প্রাসাদ গড়ে দিলেন যেখান থেকে
দেখা যাবে নর্মদা নদীকে। শুধু তাই নয়, তিনি খাল খনন করে নর্মদা নদীর জল
নিয়ে এলেন মান্ডুতে। পাহাড়ের উপর নির্মিত হল সেনানিবাস ও নজর মিনার।
যার দু হাজার ফুট নীচে দিয়ে বয়ে চলেছে নর্মদা নদী। এই নজর মিনারকে
রূপমতীর জন্য ঢেলে সাজানো হল। নাম হল রূপমতী মহল। একটু দূরেই
রেওয়াকুণ্ডের পাশে বাজ বাহাদুর মহল। যা এখন আঞ্চলিক বাসিন্দাদের ভাষায়
'খন্ডহর'। প্রেমিক পুরুষ তার কামনার নারীকে নিয়ে তো এলেন। গোল বাধল তখনই।
আফগান সুলতান আর রাজপুত নারীর বিবাহে প্রবল বাধা আসে রাজপুরুষদের দিক
থেকে। কিন্তু বাজ বাহাদুর সমস্ত বাধা দূরে সরিয়ে ইসলাম ও হিন্দু মতে
বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন। জয় হল প্রেমের। দূরে গেল জাতপাতের বাধা। সুর আর
প্রেম তাদের বেঁধে দিল একসূত্রে। শোনা যায় বর্ষার রাতে মেঘমল্লার গাইতেন
রাণী রূপমতী। বাজ বাহাদুর তখন মুগ্ধ শ্রোতা। আবার বাজ বাহাদুরের রবাব
বাদন শুনে মুগ্ধ হতেন রূপমতী।
কিন্তু প্রেম স্থায়ী হবার বেশি সময় পেল না। রূপমতীর রূপের ও গুণের
খ্যাতি পৌঁছে গেল মুঘল বাদশাহ আকবরের কানে। মান্ডু দখলের জন্য তিনি
পাঠালেন সেনাপতি আদম খানকে। কিন্তু মান্ডু দখলের চেয়ে আদম খানের দৃষ্টি
ছিল রূপমতীর দিকে। মান্ডুর সেনা পরাজিত হল মুঘলদের কাছে। পরাজিত বাজ
বাহাদুর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করলেন। আদম খানের লোলুপদৃষ্টি এড়াতে
রাণী রূপমতী নিজেকে বিবাহের সাজে সজ্জিত করে হাতে বীণা নিয়ে বসলেন।
জীবনের শেষ সঙ্গীত গাইতে গাইতে তিনি অঙ্গুরীয় থেকে বিষপান করে নিজের
সম্মান রক্ষা করলেন। চারণ কবিরা আজও এই অমর প্রেম গাথা গেয়ে থাকেন।
রেওয়াকুণ্ড গ্রুপ : বাজ বাহাদুর মহল: এটি মান্ডুর দক্ষিণ প্রান্তে
অবস্থিত। এটি ছাড়াও রেওয়াকুণ্ড গ্রুপের মধ্যে পড়ে রূপমতী মহল ও
রেওয়াকুণ্ড। ১৫০৮ /০৯ এ বাজ বাহাদুর মহলের নির্মাণ শুরু করেন সুলতান
নাসির শাহ। সেই প্রাসাদকেই বাজ বাহাদুর নিজের মনের মত করে সাজিয়ে
তুলেছিলেন। বড় বড় হলঘর আর মাঝে উঠোন ছাড়া এখন আর কিছুই নেই। এখানে
একসময় সঙ্গীত মহলে বসত সঙ্গীতের আসর। এখানের বারান্দা থেকে একসময় গোটা
মান্ডুর অপরূপ সৌন্দর্য দেখা যেত।
রূপমতী মহল : পাহাড় চূড়ায় ছিল সেনানিবাস ও নজর মিনার। সেখান থেকে সোজা
নেমে গেছে নিমার উপত্যকা। দু হাজার ফুট নীচে বয়ে চলেছে মা নর্মদা। এই
নজর মিনারকেই ঢেলে সাজিয়ে তৈরি করা হল রূপমতী মহল। এর স্থাপত্য মুগ্ধ
করে মানুষকে। বিশেষ করে গোধূলি লগ্নে ও চাঁদনি রাতে।
রেওয়াকুণ্ড : এটি রূপমতী মহলের কাছে অবস্থিত।জলের সমস্যা মেটানোর জন্য
তৈরি হয়েছিল রেওয়াকুণ্ড। এই কুন্ডের উত্তরদিক থেকে বাজবাহাদুর প্যালেসে
জল যেত।
রেওয়াকুণ্ড থেকে রূপমতী রোড ধরে রয়্যাল এনক্লেভ গ্রুপে যাওয়ার পথে পড়ে
সাগর তালাও, ইকো পয়েন্ট, জালি মহল, দাই কা মহল, দাই কা ছোটি বহেন কা
মহল, দরিয়া খানের সমাধি ও সানসেট পয়েন্ট।
রয়্যাল এনক্লেভ গ্রুপ : এর মধ্যে আছে জাহাজ মহল, তাভেলি মহল (বর্তমানে
মিউজিয়াম), হিন্দোলা মহল, রয়্যাল প্যালেস, চম্পা বাওড়ি, সূরজ কুন্ড,
কপুর তালাও, মুঞ্জা তালাও প্রভৃতি।
জাহাজ মহল : এটি মান্ডুর সর্বপ্রধান আকর্ষণ। দূর থেকে দেখে মনে হল একটি
বিশাল জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে। তিনটি তালাও সামনে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জাহাজ
মহল। জলাশয়গুলি পদ্মের আকৃতির। ধাপে ধাপে সিঁড়ি বেয়ে নামতে হয়। মহলের
ভিতর বিশাল দালান। যা নাকি হারেম ছিল। অনেক সিঁড়ি ভেঙে ছাদে উঠতে হয়।
তারপর চারদিকে তাকালে বিস্ময় প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছু থাকে না। বাজ
বাহাদুর, রূপমতী এই জাহাজ মহলে সঙ্গীত ও নৃত্যের আসর বসাতেন। বর্ষায়
মেঘের ঘন ছায়ায় জমে উঠত আসর। চারপাশ সবুজ হয়ে উঠত। তালাওগুলি জলে
টলমল। গোটা জাহাজ মহল দীপের মালায় সেজে উঠত। সুরে ও প্রেমে ভেসে যেত
জাহাজ মহল।
হিন্দোলা মহল: এই মহলের একদিকের দেওয়াল এমনভাবে তৈরি যাতে মনে হয় এটি
হেলে আছে। এই অদ্ভুত স্থাপত্যের জন্য এর নাম Swinging Palace বা হিন্দোলা
মহল। দেখলে মনে হবে মহলটি দুলছে হাওয়ায়। হোসাং শাহর আমলে এটি তৈরি। এটি
প্রধানত অডিটোরিয়াম হিসাবে তৈরি করা হয়েছিল।
চম্পা বাওড়ি : হিন্দোলা মহলের পিছনে রয়েছে হামাম ও চম্পা বাওড়ি।
হামামে রয়েছে প্রাকৃতিক গিজার। স্নানের জলে থাকত চাঁপা ফুলের সুগন্ধ।
সেজন্য এর নাম চম্পা বাওড়ি। ছাদের ফুটো দিয়ে রোদ এসে জল গরম হত। মুঞ্জা
তালাও থেকে এখানে জল আসত। এটি পঞ্চদশ শতকে নির্মিত।
এর থেকে একটু দূরে নীলকন্ঠ মহল। নীলকন্ঠ মহলটি আসলে শিবমন্দির। ৬১ টি
সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। সামনে থেকে মনে হয় মসজিদের প্রাঙ্গণ। তুর্কো -
ইরানীয় স্থাপত্যে তৈরি গর্ভগৃহ ও নাটমন্দির।
রাস্তায় এক অদ্ভুত ধরনের ফল দেখলাম দোকানে দোকানে। জিজ্ঞেস করে জানলাম
ওগুলো মান্ডুর তেঁতুল বা ইমলি। আসলে বাওয়াব গাছের ফল। সুদূর দামাস্কাস
থেকে এই বাওয়াব গাছ অদ্ভুত ভাবে গোটা মান্ডু জুড়ে রয়ে গেছে। মানিয়ে
নিয়ে।
ক্রমশ..............