মোহময়ী মধ্যপ্রদেশ (মাণ্ডু)
মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী,
বালি হাওড়া
পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য
লাইব্রেরি
বিভাগে দেখুন...
উজ্জয়িনী থেকে ট্রেনে ভোরবেলা বেড়িয়ে পড়লাম। তখন সবে উজ্জয়িনীর
পাখিদের ঘুম ভেঙেছে।উজ্জয়িনী স্টেশনে সাধুসন্তের আনাগোনা। তাঁদের
গন্তব্য সম্ভবত ওঁকারেশ্বর। আমরাও যাবো সেখানে, তবে মাণ্ডু বা মান্ডবগড়
হয়ে। ট্রেনে দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম ইন্দোর। সেখান থেকে একটি গাড়ি
আমাদের বাকি সবটুকু ঘোরাবে এবং আবার ইন্দোরে এসে বিদায় জানাবে। আপাতত
নিশ্চিন্ত মনে গাড়ির সিটে দেহ ছেড়ে দেওয়া গেল। তবে সারথিটিকে কেন জানিনা
খুব একটা পছন্দের মনে হল না। তার একটা কারণ হতে পারে মুখে গুটখা জাতীয়
কিছু নিয়ে কথা বলা। যাইহোক ইন্দোর এখন ছাড়িয়ে এগিয়ে যাব। ফেরার পথের
জন্য ইন্দোর আমাদের অপেক্ষায় থাকুক। যেতে যেতে ভাল করে শহরটাকে দেখছি,
শুনেছি শহরটি নাকি বিশেষরূপে পরিচ্ছন্ন। ট্রেনে আসার পথে ইন্দোরের আগের
স্টেশন বা স্টেশন সংলগ্ন এলাকা সেকথা বলেনি। সেখানে আবর্জনা ও
প্লাস্টিকের পাহাড় চোখ এড়িয়ে যায়নি। এবার শহরটিকে ছেনে নেওয়ার পালা।
পরিষ্কার শহর। তবে আহামরি কিছু নয়।
শহর ছেড়ে এগিয়ে চলা বিন্ধ্য পর্বতের শিখরে দু হাজার ফুট উচ্চতায়
বিয়াল্লিশ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকা দুর্গনগরী মাণ্ডুর উদ্দেশ্যে।
এর মধ্যে দুর্গের আয়তন প্রায় তেইশ বর্গকিমি। মাণ্ডু মধ্যপ্রদেশের ধার
জেলার একটি প্রাচীন নগরী। এর পথে পথে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য গল্প, আর সে
গল্প প্রেমের, সে গল্প বিচ্ছেদের। দশম শতকের শেষ ও একাদশ শতকের প্রথম
ভাগে পারমার বংশের রাজা মুঞ্জা ও রাজা ভোজের হাত ধরে মাণ্ডুর গৌরবময়
অধ্যায় শুরু হয়েছিল। ঐ বংশেরই রাজা উদয়াদিত্য ১০৬৮ সালে রাজধানী ধার
থেকে মান্ডুতে নিয়ে যান উপযুক্ত সুরক্ষার কারণে। নির্মাণকালে এর নাম ছিল
মণ্ডপ দুর্গ। মণ্ডপ থেকেই মাণ্ডব, তা থেকে মাণ্ডু। ত্রয়োদশ শতকে মালব্য
সুলতানরা মাণ্ডুর নাম পাল্টে রাখেন শাদিয়াবাদ। যার অর্থ আনন্দনগরী।
দিল্লির সুলতান জালালুদ্দিন খিলজি মান্ডু অধিকার করেন ১২৯৩ সালে। কিন্তু
তিনি দিল্লি ফিরে যান। পরের শতকে আলাউদ্দিন খিলজি গুপ্তচর লাগিয়ে মান্ডু
দুর্গ দখল করেন ও তাঁর সেনাপতি আইন-উল-মুলককে সেখানের দায়িত্ব দিয়ে
যান। এরপর ১৪০১ পর্যন্ত মান্ডু দিল্লির খিলজি ও তুঘলক বংশের অধীনে ছিল।
১৪০১ সালে দিলওয়ার খান ঘুরী, মহম্মদ বিন তুঘলকের গভর্নর, রাজধানী
'ধার'কে স্বাধীন মালবের রাজধানী ঘোষণা করেন। তিনিই মান্ডুতে তারাপুর গেট
তৈরি করেন। তিনি মারা যাবার পর ১৪০৫ সালে তাঁর ছেলে হোসাং শাহ ধার থেকে
মান্ডুতে রাজধানী স্থানান্তরিত করে তিরিশ বছর রাজত্ব করেন।
আমাদের গাড়ি ছোট ছোট পাহাড় ঘুরে ঘুরে উঠতে শুরু করেছে। মাণ্ডুর বারোটি
প্রবেশদ্বার। এই প্রবেশদ্বারগুলির নাম হল দিল্লি দরওয়াজা, আলমগীর
দরওয়াজা, ভাঙ্গি দরওয়াজা, রামপাল দরওয়াজা, জাহাঙ্গীর দরওয়াজা,
তারাপুর দরওয়াজা, কামানি দরওয়াজা, প্রভৃতি। এই সব দরওয়াজা দিয়ে
বিভিন্ন দুর্গে প্রবেশ করতে হয়। সমগ্র দ্রষ্টব্যস্থানকে তিনভাগে ভাগ করা
হয়েছে। ভিলেজ গ্রুপ বা সেন্ট্রাল গ্রুপ, রয়্যাল এনক্লেভ এবং রেওয়াকুণ্ড
গ্রুপ।
মাণ্ডু প্রবেশের মুখে গাড়ি থামল। দেখে মনে হল যেন কোন জলপ্রপাত আছে।
তেমনই সেখানকার পাহাড়ের আকৃতি। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখি জলের কোন বিন্দু
সেখানে নেই। এই স্থানটি "কাকোড়া খো"। ড্রাইভারের বক্তব্য অনুযায়ী বর্ষার
সময় ওখানে জলপ্রপাত দেখা যায়। তখন চারপাশ সবুজের চাদরে ঢাকা থাকে। আমরা
শীতের শেষে গেছি, তাই জল শুকিয়ে শুধু পাথরের চাট্টান। একটি দাগ রয়েছে
পাথরের উপর। সেটি নাকি পাহাড়ের অপরপ্রান্ত থেকে ঘোড়ার ডিঙিয়ে এদিকে
এসে পড়ার দাগ! ঈশ্বর জানেন কতটা বাস্তবসম্মত। এছাড়াও আর একটি জনশ্রুতি
আছে এই স্থানটি ঘিরে। পাহাড়ের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে দড়ি বেঁধে
একজন জাদুকর নাকি ব্যালেন্সের খেলা দেখিয়ে রাজাকে সন্তুষ্ট করতে
চেয়েছিল। রাজা নাকি শর্ত দিয়েছিলেন, যদি জাদুকর পুরো রাস্তা দড়ির ওপর
দিয়ে হেঁটে আসতে পারে তবে মাণ্ডু জাদুকরের হয়ে যাবে। জাদুকর উৎসাহ পেয়ে
ব্যালেন্সের খেলা খুব সুন্দরভাবে দেখাচ্ছিল। কিন্তু এতে গ্রামবাসীরা
জাদুকরের হাতে রাজ্য চলে যাবার ভয়ে মাঝরাস্তায় যখন শূন্যে জাদুকর এসে
পৌঁছয়, তখন দড়ি কেটে দেয়। ব্যস। জাদুকরের জাদু মাঝপথেই খাদে সমাধি লাভ
করে। তবে গল্পের সত্যতা বোঝা গেল না কারণ আমাদের ড্রাইভার সেই রাজার নাম
বা সময় কিছুই বলতে পারেনি।
ভিলেজ গ্রুপ : এতে প্রথম পড়বে আশরফি মহল। অতীতে এখানে ছিল মাদ্রাসা।
অনেকগুলি সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হবে এখানে। উঠেই প্রশস্ত একটি বিরাট ছাদবাগান
যেন। এখান থেকে শহরের অনেকটা দেখা যায়। বর্তমানে সাততলা মহলটি প্রায়
ধ্বংসপ্রাপ্ত। তবু যেটুকু আছে সেটুকু বড় সুন্দর হয়ে ধরা দেয়। সুলতান
মামুদ শাহ খিলজি এটিকে বিজয় তোরণ হিসেবে গড়েছিলেন। পূর্ববর্তী শাসক
হোসাং শাহ ১৪৩৫ সালে মারা যাবার পর তার পুত্র মামুদ শাহ ওরফে গজনী খান
মাত্র এক বছর রাজত্ব করেন। তাঁকে তাঁর বিশ্বস্ত অনুচর মামুদ খান
বিষপ্রয়োগে হত্যা করেন ও সিংহাসনে বসেন। মামুদ খানের হাত থেকে খিলজি
শাসক মামুদ শাহ আবার এই রাজ্য কেড়ে নেন এবং গুজরাট, দাক্ষিণাত্য ও
জুনানপুরে তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। এই আসরফি মহল খিলজি শাসকের
বিজয়স্তম্ভ। ১৪৬৯ সালে তিনি মারা যান, ওনার সমাধি আসরফি মহলে এখনও
রয়েছে।
জামি মসজিদ : এটি দামাস্কাসের মসজিদের অনুকরণে গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন
হোসাং শাহ। শেষ করেন মামুদ শাহ খিলজি ১৪৫৪ সালে। অসাধারণ স্থাপত্যশৈলির
নিদর্শন এটি।
হোসাং শাহ টুম্ব : মসজিদের পাশেই রয়েছে হোসাং শাহ ও তাঁর পরিবারের
সদস্যদের সমাধি। সম্পূর্ণ সমাধিক্ষেত্রটি অপরূপ শ্বেতপাথরের জালির কাজে
সমৃদ্ধ। এই সৌধটি এতটাই সুন্দর যে মুঘল সম্রাট শাহজাহানও মুগ্ধ হয়েছিলেন।
কিন্তু বর্তমানে এই স্থাপত্যগুলির প্রাচীর রামনামের পোস্টারে অনেকটাই
ঢাকা পড়ে গেছে। রক্ষণাবেক্ষণের যথেষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হয়। সবথেকে বড়
কথা ওখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা বা ড্রাইভার সবসময়ই ওগুলো দেখতে যেতে
মানা করছেন। তাদের বক্তব্য - কেয়া দেখনা হ্যায়? সব খন্ডহর হ্যায়।
রামমন্দির যাইয়ে, রামমন্দির দেখিয়ে।
রামমন্দির : বাসস্ট্যান্ডের পাশেই রয়েছে রামমন্দির। প্রাচীন মন্দির
ধ্বংস হয়ে গেছে, আবার সুন্দর করে নির্মিত হয়েছে বর্তমান মন্দিরটি। এখানে
সাধুসন্তদের থাকার ব্যবস্থাও আছে। দর্শন পেলাম তারাপীঠের সাধুদের।
নিজেরাই আমাদের বাঙালি দেখে এসে আলাপ করলেন।
ক্রমশ..............