মোহময়ী মধ্যপ্রদেশ (উজ্জয়িনী)

মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী,

বালি হাওড়া


পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য লাইব্রেরি বিভাগে দেখুন...

উজ্জয়িনীকে মন্দিরনগরী বলা হয় আবার মধ্যভারতের কাশীও বলা হয়। আমার কাছে উজ্জয়িনী খুব সুখদায়ক নয়। অন্ততঃ মাঝরাতে স্টেশনে নেমে হোটেল খোঁজা, অটোওলার দেখানো একটি খুব সাদামাটা হোটেলে থাকতে বাধ্য হওয়া এবং হোটেলের ঘরে ঢুকতে গিয়ে আমার সঙ্গীর পতন... সবকিছু মিলিয়ে মোটেই আনন্দদায়ক হয়নি। তবু অবন্তিকা অবন্তিকাই। ভোরবেলা উঠে হোটেল থেকে হাঁটা পথে মহাকালেশ্বর মন্দিরের প্রাঙ্গণে পৌঁছে গতরাতের খারাপ অভিজ্ঞতা ভুলতে এক মুহূর্তও লাগল না। কারণ এটি সেই উজ্জয়িনী, যেখানে কালিদাস ছিলেন। এখানে ছিলেন আর্যভট্টের মত মহাজ্ঞানী। কারণ এখানে ছোট বড় মিলে পাঁচ হাজারের বেশি মন্দির আছে। শিপ্রা নদীর তীরে মালব মালভূমির উপরে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪৯২ মিটার উচ্চতায় এই তীর্থস্থান অবস্থিত। এটি ভারতের অন্যতম প্রাচীন শহর। অন্ততঃ পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। পুরাণে এর নাম ছিল অবন্তিকা। পরবর্তী কালে নাম হয় উজ্জয়িন। বর্তমানে উজ্জয়িনী। আদি ব্রহ্মপুরাণে এটিকে সর্বশ্রেষ্ঠ শহর বলা হয়েছে। অগ্নিপুরাণে ও গারুদাপুরাণে এর নাম যথাক্রমে মোক্ষদা ও ভক্তিমুক্তি।

এই শহরের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

(১) এখানে একই সঙ্গে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ শিবমন্দির (মহাকালেশ্বর) ও শক্তিপীঠ তথা সতীপীঠ (হরসিদ্ধি মাতা মন্দির) বিরাজমান।

(২) এই শহরের উপর দিয়ে একই সঙ্গে কর্কটক্রান্তি রেখা ও মূল ভারতের মধ্যবর্তী দ্রাঘিমারেখা গিয়েছে। খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে ভারতের স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত এই শহরটির অবস্থান ও সময় অনুযায়ী Indian Standard Time নির্ধারণ করা হত।

(৩) এখানে দুটি ভিন্ন সময়ে দুজন বিখ্যাত রাজা রাজত্ব করেছেন। মৌর্য বংশের রাজা বিক্রমাদিত্য (একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দী) ও খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে রাজা অশোক।

(৪) এখানে শিপ্রা নদীর তীরে বিক্রমাদিত্যের সভাকবি মহাকবি কালিদাস তাঁর কাব্য রচনা করেছেন, আবার বিজ্ঞানী আর্যভট্টর (পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতক) কর্মস্থল ছিল এখানকার মানমন্দির। ভারতের পাঁচটি মানমন্দিরের মধ্যে প্রাচীনতম ও উন্নততম মানমন্দির এটি। অন্য চারটি জয়পুর, দিল্লী, মথুরা ও বারাণসীতে অবস্থিত।

(৫) ভারতের চারটি কুম্ভমেলার মধ্যে এটি অন্যতম। এখানে শিপ্রা, গন্ডকী ও সরস্বতী নদীর সঙ্গমে কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া হরিদ্বারে গঙ্গার তীরে, প্রয়াগে গঙ্গা যমুনা সঙ্গমে ও নাসিকে গোদাবরী নদীর তীরে বারো বছর অন্তর কুম্ভমেলা হয়ে থাকে।

মহাকালেশ্বর মন্দির : উজ্জয়িনীর প্রধান আকর্ষণ এই মন্দির। এই মন্দিরে পূজিত হন দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম লিঙ্গ মহাকাল। ইনি স্বয়ম্ভূ। দক্ষিণমুখী দেবতা। মূল মন্দির বিনষ্ট হলে ১৮৫০ সালে মারাঠারা এই মন্দিরটি পুনরায় নির্মাণ করেন। মন্দিরকে ঘিরে রেখেছে শ্রীমহাকাল করিডোর। রুদ্র সাগর হ্রদ থেকে মন্দির পর্যন্ত প্রায় ৯০০ মিটার লম্বা করিডোর। ১০৮টি পিলার, প্রায় ২০০টি মূর্তি ও ভগবান শিবের গল্প কাহিনী নিয়ে দেওয়াল চিত্র সাজানো হয়েছে। সন্ধ্যায় চতুর্দিকে আলোকমালায় সজ্জিত হয়ে ওঠে। রাতে তাই এই মন্দির আরও আকর্ষণীয়। এখানে ভস্মারতি হয় ভোরবেলা চারটে থেকে ছটা অবধি (শিবরাত্রির দিন বাদে)। দর্শনের জন্য অনলাইনে প্রি বুকিং করতে হয় এইখানে https://shreemahakaleswar.com/bhasmarti

উজ্জয়িনী শহরে মোট চুরাশিটি শিবমন্দির আছে। তার মধ্যে অনেকগুলিই মহাকালেশ্বর মন্দির চত্বরেই, যথা - ওঁকারেশ্বর, নাগচন্দ্রেশ্বর, ত্রম্ব্যকেশ্বর, ঘৃষ্ণেশ্বর, ভীমাশঙ্কর, বৈজনাথ, রুদ্রেশ্বর, বৃহস্পতেশ্বর, ত্রিপুরেশ্বর, প্রকটেশ্বর ইত্যাদি। এছাড়া বাইরে রয়েছেন মহাকল্পেশ্বর, কপিলেশ্বর, সোমনাথ, হনুমন্তেশ্বর, স্বয়ম্ভূ সর্বেশ্বর, বিরাটপ্রমুখেশ্বর, শ্রীকুন্ডেশ্বর ও আরও কয়েকটি। মূল মহাকালেশ্বর মন্দিরের মধ্যে রয়েছে গনেশ মন্ডপম, কার্তিক মন্ডপম (যেখান থেকে প্রথম মহাকালেশ্বর দর্শন হয়) ও নন্দী মন্ডপম। এছাড়া মন্দির চত্বরে শ্রীরাম মন্দির, সতীমাতা মন্দির, নন্দীদেবের মন্দির ও দুটি হনুমান মন্দির আছে। মহাকালেশ্বর মন্দিরের প্রবেশ পথের ধারে বিশালাকার মহাগনেশ মন্দির আছে। যার মধ্যে পঞ্চমুখী হনুমান বিরাজমান।

পুরাণ অনুসারে শিবভক্ত রাবণ শিবলিঙ্গ নিজের রাজ্যে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। স্বয়ং শিব সেই লিঙ্গ ভেঙে দেন, তার টুকরো পড়ে এই স্থানে। পরবর্তী কালে সেইখানেই মহাকালেশ্বর প্রকট হন ও মন্দির গড়ে ওঠে। মহাকালেশ্বর মন্দির সম্পর্কে এই প্রবাদ আছে যে এই মন্দিরে শিবলিঙ্গের সামনে শ্রদ্ধার সঙ্গে নিজেকে সমর্পণ না করে কেউ উজ্জয়িনী শহরে আধিপত্য চালাতে পারবে না। এই শহরের রাজা একমাত্র শিব। তাই অন্য কোন রাজা, মন্ত্রী, MLA এঁদের কাউকে রাত কাটাতে দেওয়া হয় না।

হরসিদ্ধি মাতা মন্দির : এটি উজ্জয়িনীর অন্যতম সতীপীঠ তথা শক্তিপীঠ। শিবপুরাণ মতে এখানে সতীর কনুই পড়েছিল। দেবী এখানে অন্নপূর্ণা নামে পূজিতা। মূল গর্ভগৃহে দেবী অন্নপূর্ণা অধিষ্ঠিতা, তাঁর দুই পাশে মহালক্ষী ও মহাসরস্বতী। মূল মন্দিরের পাশেই রয়েছে ভৈরব কর্কটেশ্বর শিব মন্দির। মন্দিরের সামনে দুটি সুউচ্চ বাতিদানে সন্ধ্যারতির সময় হাজার প্রদীপ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। বহুদূর থেকেও এই অপূর্ব প্রদীপের আলো চোখে পড়ে। এখানে পূজা দিলে মনোস্কামনা পূর্ণ হয়। রাজা বিক্রমাদিত্য এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

গোপাল মন্দির : এটি উজ্জয়িনীর অন্যতম বিশাল মন্দির। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি এই মন্দির নির্মাণ করে মারাঠারা।

গড়কালিকা মন্দির : মহাকালেশ্বর মন্দির থেকে দুকিলোমিটার দূরে এটি অবস্থিত। কথিত আছে এই মা কালীর আশীর্বাদ পেয়ে মূর্খ কালিদাস মহাকবি কালিদাসে পরিণত হয়েছিলেন। এর কাছেই শৈবদের নাথ সম্প্রদায়ের গুরু মৎস্যেন্দ্রনাথের স্মৃতিমন্দির।

ভর্তৃহরি গুহা : গড়কালিকার কাছেই এই গুহা। বিক্রমাদিত্যের সম্পর্কিত দাদা সাধক কবি ভর্তৃহরি শিপ্রা নদীর তীরে এই গুহায় বসে তপস্যা করেছিলেন। ওনার রচিত তিনটি কাব্য হল বৈরাগ্যশতকম, মনোলয়, বাসনোপশম। কথিত আছে যে, যৌবন ধরে রাখতে এক সাধু রাজা ভর্তৃহরিকে একটি ফল দান করেন। রাজা সেটি রাণীর হাতে দেন তাঁর নিজের ব্যবহারের জন্য। কিন্তু রাণী সেই বিশ্বাস রাখতে পারেন নি। সেই ফল অনেক হাত ঘুরে আবার রাজার কাছেই ফেরত আসে। তখন ওনার বৈরাগ্য আসে ও তিনি এই গুহায় সাধনা করেন।

সন্দীপনী আশ্রম : কথিত আছে যে, এই আশ্রমে শ্রীকৃষ্ণ এবং সুদামা গুরু সন্দীপনীর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। এখন এখানে রয়েছে একটি বাগান ও কৃষ্ণ, বলরাম, সুদামা ও সন্দীপনীর মূর্তি।

কালভৈরব মন্দির : স্কন্দপুরাণে প্রাচীন এই মন্দিরের উল্লেখ আছে। মারাঠারা এটি তৈরি করেন। এই মন্দিরেও একটি বিশাল দীপস্তম্ভ রয়েছে।

রাম জনার্দন মন্দির : রাজা জয় সিংহের প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির সপ্তদশ শতকের। মন্দিরে রাম ও বিষ্ণু মূর্তি বিরাজমান।

মঙ্গলনাথ মন্দির : মৎস্যপুরাণে বলা হয়েছে এই স্থানে মঙ্গল গ্রহের জন্ম হয়েছে। মন্দিরের গর্ভগৃহে শিবমূর্তি আছে। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে এই স্থান থেকে বোধহয় মঙ্গল গ্রহ দেখা যেত।

কালিয়াদহ প্রাসাদ : পার্সিয়ান স্থাপত্যের এই প্রাসাদে এসেছিলেন মুঘল সম্রাট আকবর ও জাহাঙ্গীর। প্রাসাদ থেকে শিপ্রা নদীর দৃশ্য অসাধারণ।

বেধশালা : মহাকালেশ্বর মন্দিরের দু কিমি দূরে এই বেধশালায় গ্রহ নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করার যন্ত্র রয়েছে। এই স্থানেই আর্যভট্ট গবেষণা করতেন। পরবর্তী কালে ১৭২৫ - ১৭৩০ সালের মধ্যে এই যন্তর মন্তর নির্মাণ করেন মহারাজ সওয়াই জয় সিং। এখানে একটি তারামন্ডল ও টেলিস্কোপ আছে। তেরোটি স্থাপত্য জ্যোতির্বিদ্যা যন্ত্র নিয়ে এই মানমন্দিরটি গঠিত। স্থানীয় সময়, উচ্চতা (স্থানের) পরিমাপ করার লক্ষ্যে এবং সূর্য, নক্ষত্র ও গ্রহের পতন পরিমাপ এবং গ্রহণ নির্ণয়ের লক্ষ্যে এই বেধশালা নির্মিত হয়েছিল। বিভিন্ন বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে নক্ষত্র ও গ্রহের গতি ও বৈশিষ্ট্য রেকর্ড করা হত। ভৌগোলিকভাবে উজ্জয়িনী শহরটিকে ভারতের গ্রিনউইচ হিসাবে বিবেচনা করা হত কারণ ভারতীয় উপমহাদেশের দ্রাঘিমাংশের প্রথম মেরিডিয়ান এর মধ্যে দিয়ে যায়।

উজ্জয়িনীর যন্তর মন্তরের মধ্যে একটি পঁচাশি ফুট উঁচু টাওয়ারে বৈদিক ঘড়ি বসানো হয়েছে। ঘড়িটি সরকারী অবজারভেটারির পাশে অবস্থিত। ভারতীয় পঞ্চং গণনার উপর ভিত্তি করে অনন্য ঘড়িটি গ্রহের অবস্থান, মুহুর্ত, জ্যোতিষ গণনা ও ভবিষ্যৎ বাণীর তথ্য প্রদান করে।

রামঘাট : সবশেষে যাওয়া যাক সন্ধ্যারতি দেখতে শিপ্রা নদীর তীরে রামঘাট। সমস্ত ভক্তদের উদ্বেল উপস্থিতি এখানের পরিবেশ উষ্ণতায় ভরিয়ে রাখে। নানান বাদ্যযন্ত্র সহযোগে নদী আরতি অবশ্যই দর্শনীয়। অনেক সাধু সন্ত থাকেন এই ঘাটে। আরতির সময় তাঁদের নৃত্য দেখাও এক মনোরম অভিজ্ঞতা। পদ্মপুরাণ অনুসারে এই ঘাটে শ্রীরামচন্দ্র পিতা দশরথের মৃত্যুর পর চিত্রগুপ্তের পূজা করেছিলেন। আরতির পর নদীর জলে ছোট্ট ছোট্ট দীপ ভাসিয়ে দেওয়া হয়। ছোট ছোট ঢেউয়ে দীপ ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলে প্রিয়জনের মঙ্গলের উদ্দেশ্যে।


ক্রমশ..............