মোহময়ী মধ্যপ্রদেশ (জব্বলপুর)

মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী,

বালি হাওড়া


পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য লাইব্রেরি বিভাগে দেখুন...

বান্ধবগড় থেকে অসামান্য একটা অনুভব নিয়ে জব্বলপুরের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। পৌঁছে গেলাম সন্ধ্যা নাগাদ। উঠলাম অটো ড্রাইভার যে হোটেলে নিয়ে গেলেন সেখানেই। মধ্যমানের হোটেল। তবে লাগোয়া নিজস্ব রেস্টুরেন্ট ও গাড়ির ব্যবস্থা আছে। রাতটুকু বিশ্রামে কাটল। পরদিন সকালে হোটেলের গাড়ি নিয়ে হোটেলের মালিকই চললেন ঘোরাতে। এনারা অসম্ভব পরিশ্রমী। ড্রাইভার অন্য কাজে গেছে বলে নিজেই চলে এলেন। বাঙালিরা আগে নিজের পদমর্যাদা নিয়ে ভাবে তারপর আড়িমুড়ি ভেঙে এক কাপ চা নিয়ে বসে। ব্যবসা নিয়ে এগোনো আর হয় না। যাইহোক, উনি প্রথমে নিয়ে গেলেন শহরের এক প্রান্তে বাহান্ন ফুট শঙ্কর মন্দির চৌরাহা। কাচনার শিব মন্দির। বিশাল শিবমূর্তি দূর থেকে দেখা যাচ্ছে। মূর্তির নীচে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মন্দিরের প্রতিরূপ। ভীষণ সুন্দর আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। মহিলারা নিজের মত করে পুজো করছেন। সকালবেলা শিব দর্শনে মনের মুক্তি।

শিব দর্শন করে চললাম পঞ্চবটী। প্রথমেই নৌকোর উদ্দেশ্যে যেতে বললেন আমাদের ড্রাইভার অর্থাৎ হোটেল মালিক। ওনার একটা অভ্যাস অতি বিরক্তিকর। সেটা হল একমুখ পানমশলা মুখে ঠুঁসে কথা বলা। আমরা ওনার কথা অনুযায়ী নৌকোয় উঠে বসলাম স্থানীয় পর্যটকদের সঙ্গে। অপরূপ নর্মদার ওপর দিয়ে নৌকো বেয়ে চলা। চারপাশে সাদা, কালো, গোলাপি, হালকা হলুদ পাথরের খাঁজের মধ্যে দিয়ে দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নেয়ের দল। মাঝে মাঝে উত্তাল বাতাস এসে নৌকোর মাথার প্লাস্টিক উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ঋষি জাবালীর নাম থেকে জব্বলপুরের উৎপত্তি। নর্মদার তীরে তীরে অজস্র সাধু সন্ন্যাসীদের আবাস। তার কিছু চোখে পড়ে। আর কিছু থাকেন অন্তরালে। জাবালী ঋষির তপোভূমি এই জব্বলপুর। নৌকো এগোতে এগোতে হঠাৎ দেখা যাবে সামনে আর এগোবার পথ নেই। পাহাড় এসে নদীপথ আটকে রেখেছে। কিন্তু নেয়ের দল একটা সরু অংশ দিয়ে নৌকো এগিয়ে আবার চওড়া নদীতে এনে ফেলে। ওই অংশটির নাম ভুলভুলাইয়া। কারণ লোকে ভুল করে ভাবে নদীপথ এখানে শেষ হয়ে গেছে।

চতুর্দিকে পাহাড় বেষ্টিত পঞ্চবটীতে নর্মদা নদীর gorge এ বোটিং করতে করতে জানতে পারলাম এখানে প্রচুর হিন্দি সিনেমার শুটিং হয়েছে। শাহরুখের ডাংকি একদম নতুন সিনেমা। পুরোনোর মধ্যে রাজ কাপুরের জিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায় ও ববি। এছাড়া রেখার খুন ভরি মাঙ্গ, শাহরুখের অশোকা ইত্যাদি ইত্যাদি। কতটা সত্যি জানি না। নদীর মধ্যে এক স্থানে মার্বেল রকের দুটি পাহাড়ের মাঝে ফাঁক এত কম যে বাঁদর নাকি এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে লাফিয়ে চলে যেত। তাই ঐ স্থানের নাম বান্দর কুন্দনি। নৌকো ওই পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে পর্যটকদের। মাঝে আবার কোন পাহাড়ের গা থেকে গিয়ে ছোট ছোট পাথর খন্ড এনে পর্যটকদের উপহার হিসেবে দেয়।

বোটিং শেষ করে পঞ্চবটী থেকে একটু এগোলেই চৌষট্টি যোগিনীর মন্দির।পাহাড়ের মাথায় বৃত্তাকার মন্দির। উঁচু উঁচু একশো আট সিঁড়ি ভাঙার পর মন্দির চত্বরে প্রবেশ করতে হয়। এই মন্দির তৈরি হয়েছে কচ্ছপঘট রাজত্বে একাদশ শতাব্দীতে। মা দুর্গা এক সাংঘাতিক শক্তিশালী দৈত্যকে দমন করার জন্য চৌষট্টি যোগিনীর দ্বারা পরিবৃতা হয়েছিলেন। মা দুর্গা ও সম্মিলিত যোগিনীর দ্বারা দৈত্য বধ সম্ভব হয়। অপরূপ কারুকাজ পাথরের উপর। পাহাড়ের উপর থেকে নর্মদার রূপ অসাধারণ লাগে। কোনো ভিড় নেই। কোনো আড়ম্বর নেই। আছে শুধু অনির্বচনীয় ভালো লাগা এই মন্দির দর্শনে। চৌষট্টি যোগিনী মা দুর্গারই অপর রূপ। মা এদের তৈরি করেছিলেন দৈত্য দমনের উদ্দেশ্যে। প্রধান অষ্টযোগিনীর নাম ব্রহ্মানী, বৈষ্ণবী, মহেশ্বরী, কৌমারী, বরাহী, নরসিংহী, ইন্দ্রাণী ও চামুণ্ডা। যাঁরা যথাক্রমে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, কুমার কার্তিক, বরাহ, নরসিংহ ও ইন্দ্রের শক্তিস্বরূপ এবং চামুণ্ডা মা দুর্গার অপর রূপ।

এরপর চলে আসা অপূর্ব ধুঁয়াধার জলপ্রপাতে। রোপওয়ে চেপে জলপ্রপাতের ওপর দিয়ে যাবার সময় এক স্বর্গীয় অনুভব হয়। সূর্যের আলো পড়ে জলের ওপর রামধনু দেখতে পাওয়া যায়। রোপওয়ে থেকে নেমে গাড়ি করে জলপ্রপাতের ধার দিয়ে ঘুরে আসা যায়। পাহাড়ের উপর থেকে দেখলে এক স্থানে নর্মদা নদীকে ভারতের ম্যাপের আকৃতি মনে হয়। এরপর জলপ্রপাতের ধারে বসে থাকলেই হবে। নর্মদার জলের অজস্র কণা আপনাকে ভিজিয়ে দিতে থাকবে। স্নান করার প্রয়োজন হবে না। জলের দিকে তাকিয়ে থাকলে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় এক লহমায় কেটে যাবে। উঠে আসতে ইচ্ছা করবে না। তবু এক সময় উঠে আসতে হবে। এই ধুঁয়াধার জলপ্রপাত জব্বলপুরের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ। ধুঁয়াধারের পর বহু প্রাচীন পঞ্চমাতার মন্দির দেখে নেওয়া। এর উপর থেকে মাতা নর্মদা দর্শন করা যায়। এরপর দর্শন ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির। মন্দিরের ভিতরে অসংখ্য নারকেল দিয়ে সাজানো। আসলে ওগুলি মানত করে মানুষের বেঁধে দেওয়া নারকেল। আর তাতেই কেমন সুন্দর করে গোটা মন্দির সাজানো হয়ে গেছে। নবম ও দশম শতকে ত্রিপুরী বংশের রাজত্বকালে এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন জব্বলপুর ছিল এঁদের রাজধানী। পরবর্তী কালে দ্বাদশ শতাব্দীতে গোন্ড রাজারা জব্বলপুর অধিকার করে নেন। তবে মন্দির অক্ষত থাকে।

এরপর দেখতে যাওয়া ভূতাত্বিক বিস্ময় ব্যালেন্সিং রক। একটি পাথরের তিন ফুট x সতেরো ইঞ্চি পাদভূমির উপর অবিশ্বাস্যভাবে দাঁড়িয়ে আছে আট ফুট উচ্চতার তিরিশ টন ওজনের এক বিশালাকার পাথর। যেটি রিখটার স্কেলে 6.5 মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করেও অটুট রয়েছে। ভূতাত্বিকদের মতে দেড় কোটি বছর আগে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে এটি তৈরি হয়েছে।

পরের গন্তব্য মদন মহল দূর্গ। এগারো শতকে মদন মহল দূর্গটি তৈরি করেছিলেন রাজা মদন সিং। গোন্ড রাণী দুর্গাবতী ও তাঁর বীর পুত্র নারায়ণের সঙ্গে এই দূর্গের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। রাণী দুর্গাবতী মুঘলদের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করে মৃত্যু বরণ করেন। এই দূর্গ অনেক ইতিহাসের সাক্ষ্য আজও বহন করে চলেছে। দূর্গের ভিতরে নাকি সোনার ইঁট এবং ধনসম্পদ লুকোনো আছে বলে গল্প এখনও বাতাসে ভেসে বেড়ায়। এই দূর্গের মধ্যে একটি সুড়ঙ্গ আছে, যেটি পালানোর পথ হিসেবে ব্যবহার করা হত। এখন প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে এই দূর্গ।এই মহলের কাছেই প্রাকৃতিক জলাশয় থাকার কারণে এখানে দূর্গ তৈরির দূরদর্শিতা লক্ষণীয়। এটি প্রধানত চুনাপাথর কাঠ ও ইঁট দ্বারা নির্মিত। এর মধ্যে আস্তাবল, অস্ত্রাগার ছিল। এখন সবই ধ্বংস হয়ে গেছে। দুশো ছাপ্পান্ন সিঁড়ি ভেঙে দূর্গে পৌঁছে দেখতে হয় এক সময়ের সুরক্ষা চৌকি এখন নিজেই সুরক্ষাবিহীন হয়ে পড়ে রয়েছে।

এছাড়া আছে তিলওয়ারা ঘাট ও গোয়ারি ঘাট। ভ্রমণের সুযোগ পেলে দেখে নেওয়া যায় জৈন টেম্পল ও শারদা টেম্পল। গোয়ারি ঘাটের সন্ধ্যারতির দৃশ্য অতি মনোরম।


ক্রমশ..............