মায়া-কান্না (তৃতীয় পর্ব)
সুনন্দন শিকদার,
কলকাতা
মদনদেব যে সমস্ত গুণবলীতে মহিমান্বিত , কান্ডজ্ঞান তার পড়ে না । নইলে
এইটে কি হয় যে প্রণব তার দুইদিন বাদেই সন্ধ্যার প্রাত্যহিক চায়ের আড্ডায়
এসে উপস্হিত হয় ? চায়ের আড্ডা প্রতি বিকেলে বসবেই । পাড়ার ছোকরা থেকে
আশীতিপর পর্যন্ত সবাই এতে যোগ দিয়ে গৃস্বামী নিবেদিত অফুরন্ত চা আর
বেগুনির সদ্ব্যবহার করেন । নিকুঞ্জবাবুর এটা বহুদিনের শখ । ভারতবর্ষের
অবস্হা থেকে ক্রিকেট-ফুটবলের রাজনীতির বিষয় সবাই সেখানে এমন গাম্ভীর্যের
সাথে আলোচনা করেন , যেন মনে হয় এই সুচিন্তিত মতামতের জন্যে সমস্ত দেশবাসী
রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছেন । নিকুঞ্জবাবুর ধারণা পাড়ায় তিনি খুব জনপ্রিয়
। বাড়িতে সারাদিন এই উৎসবের মেজাজ , যে মেয়ে অলকার ইউনিভার্সিটি যাবার
স্বপ্ন বানচাল করে দিয়েছে , তা তিনি মনে করেন না । প্রথম প্রথম সন্ধ্যা
আপত্তি করেছিল কিন্তু সেই আপত্তি শুনে নিকুঞ্জবাবু হেসেছিলেন মাত্র – সবই
বিধির লিখন বুঝলে সন্ধ্যা , যার হবার থাকবে ঠিক হবে । কি হবে তা আবশ্য
পরিস্কার বলেননি নিকুঞ্জবাবু ।
স্বদেশ জোয়ারদার বললেন ,
- আজকে প্রণবও আপনার চায়ের তারিফ করছে কুঞ্জবাবু । ধন্য ধন্য করছে ।
- কে ? কে প্রণব ?
- এই যে দেখছেন না , আজ এ আড্ডায় নতুন এসেছে । শান্তিময় মজুমদারের ছেলে ।
ও হচ্ছে চায়ের জহুরী । প্রণব নিকুঞ্জবাবুর মত ভাল মানুষ হয় না । সোনায়
মোড়া ওঁর হৃদয় । উনি আছেন বলে আমরা বুড়োরা বিকেলে একটা যাবার জায়গা পাই ।
মানসিক অবসাদে মরে যাই না । আর বৌদি ! তাঁর কথা আর কি বলব । কেউ মারা
গেলে তিনি এরকম ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন , তার কোন তুলনা নেই ।
- চা বাগানও আছে নাকি তোমাদের ?
- নামে মাত্র । কখন খোলে , কখনো বন্ধ হয় । ঝামেলা , বন্যা আর চিতাবাঘ
লেগেই আছে । তবে আমরা ভাল রিটেল ব্যাবসা করি ।
প্রণব তত প্যাঁচ-পয়জর জানে না । সে সহজ মনে বলে ,
- এটা পিওর দার্জ্জিলিং টি নয় , একটু ইনফেরিওর কোয়ালিটি ।
- দেখেছেন কুঞ্জবাবু প্রণব বলছে , চা-টা অসাধারণ , ঠিক দার্জ্জিলিং থেকে
না হলেও , আশেপাশের কোথাও থেকে এসেছে । এই ধরুন কুচবিহার
। - বেশ বেশ , প্রণব এই বেগুনিটা নাও । বেশ বড় । হরেন আজ দারুণ বানিয়েছে
বেগুনিটা । আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তেল ছ্যাঁক ছ্যাঁক করা অবস্হায় নিয়ে
এসেছি ।
বাইরে একটু মেঘ জমেছে । খোলা জানলা দিয়ে একটি নারকেল গাছ দেখা যাচ্ছে ।
তার একটিও পাতা নড়ছে না । বৃষ্টির এক-দুটি ফোঁটা শার্শি ছুঁয়ে গেল ।
সমস্ত বাড়িটায় কেমন একটা অনাদরের ছাপ স্পষ্ট । যেমন শার্সিটা । কাঁচটি
ফেটে গিয়েছে কিন্তু সারানো হয়নি । প্রতি বর্ষায় দেওয়ালে ছোপ ছোপ দাগ পড়ে
কিন্তু কবে যে রঙ হয়েছে কারুর মনে নেই । আসবাবগুলি প্রায় পঞ্চাশ বছরের
পুরোণ । কয়েক জায়গায় পালিশ উঠে গিয়েছে । সেইরকমই চলছে । রোমান অক্ষরে সময়
লেখা পেন্ডুলাম ঘড়িটি বন্ধ । কেউ সারায় না , বা দমটাও দেয় না । বুকশেলফে
কয়েকটি পুরোন জিওলজির বই আর অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশিনারি রাখা ।
নিকুঞ্জবাবু আগে সেন্ট্রাল জেলে , জেলর হিসেবে কাজ করতেন । দুর্জনে বলে ,
সব ব্যাপারে উদাসীনতা ছিল নিকুঞ্জবাবুর মোক্ষম অস্ত্র । সব পক্ষই তাঁকে
আপন লোক মনে করত । সেই সময় তিনি নানা ভাবে উপার্জন করেছিলেন- আইন
বহির্ভুত উপায়ও তার মধ্যে কম ছিল না । কিন্তু সঞ্চয় তাঁর ধাতে ছিল না ,
ছিল না সন্ধ্যারও । উদ্দাম ভোগী আর পৃথিবীত্যাগী যোগীদের এ বিষয়ে মিল আছে
। খাওয়াদাওয়া , পোষাকআশাক আর বন্ধুবাৎসল্য এই তিনসত্যেই ছিল তাঁর অখন্ড
মনোযোগ । সেই সংস্হাটি বন্ধ হয়ে যাবার পর এখন সম্বল হচ্ছে
রক্ষণাবেক্ষণহীন এই বনেদী বাড়িটি । রোজগার হচ্ছে গুটিকয় ভাড়াটিয়ার
নামমাত্র ভাড়া । শকুনি চোখ মেলে স্বদেশ জোয়ারদার এখন ওৎ পেতে আছেন কখন
সাধ্যাতিরিক্ত খরচ করার দায়ে কুঞ্জবাবু বাড়টি প্রমোটারকে দেবার কথাটি
পাড়েন । বিশাল ভালোটিয়া সেদিকে সুকৌশলে নিয়ে যাবার জন্যে তাঁকে অগ্রিম
টাকা দিয়ে রেখেছে ।
নিকুঞ্জবাবু একটি করে খুব দামী সিগারেট বাড়িয়ে দিলেন দুই ভিন্ন বয়েসের
অতিথির দিকে ।
ভিতরের ঘর থেকে যে ছেলেটি সামনে এসে বসল , অবিকল তার নিকুঞ্জবাবুর
কমবয়েসের মুখশ্রী । সেই গোলগাল মুখ , পুরু ভুরু , মেদযুক্ত চেহারা । তফাৎ
কেবল যে তার বাঁ গালে একটি লোমওয়ালা আঁচিল । নিকুঞ্জবাবু ছেলের সাথে
পরিচয় করিয়ে দিলেন ।
- অনিরুদ্ধ । আমার ছেলে । অলকার ভাই ।
অলকার নাম শুনে প্রণবের বুকের ভিতর কেমন করে । গতকাল থেকে তার মনের মধ্যে
একটি ছবি পাক খাচ্ছে । সে অলকার হাত ধরে গঙ্গার ধারে হাওয়া খাচ্ছে ।
রাত্রির গঙ্গায় স্টিমারের আলোকমালার চিত্র তার মনে রয়ে গিয়েছে । সে
সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করে ,
- তুমি কি কর ?
কথাটা শুনে অনিরুদ্ধ ইতস্ততঃ করে । অনেকে অনেকবার এমন বেয়াড়া প্রশ্ন তাকে
করেছে । তোর কি কাজ ভাই , আমি কি করছি শুনে ? চটজলদি একটা উত্তর তাই তার
তৈরী করাই আছে ।
- পাস করেছি । এখন চাকরি খুঁজছি ।
কি পাস বা কি চাকরি , তার ধার দিয়েও গেল না অনিরুদ্ধ । সত্যি কথাটা হল ,
সে চাকরি করে না । তার সর্বদাই ভয় , বাড়ির বাইরে বেরুলে হারিয়ে যাবে !
অনেক ভয়ে ভয়ে সে কলেজের গন্ডি ডিঙিয়েছে । যাবার সময় কলেজ তার
বাসস্ট্যান্ডের উল্টো ফুটে পড়ত । পারাপার করতে কমপক্ষে আধঘন্টা লাগত তার
। তার ভয় কখন গাড়ি চাপা পড়ে যাবে । আহম্ক চালকরা চাপা দেবার জন্যে
স্টিয়ারিং তাক করে আছে । পথচারী পেলেই হয় । একটি মোবাইলের দোকান দেবার
স্বপ্ন দেখে অনিরুদ্ধ । কিন্তু মূলধনের মত এমন উন্নাসিক আর অলস জীব
দেখেনি , যে একবারের জন্যেও দরজায় এসে বলবে , এই যে আমি এলাম । আই অ্যাম
অ্যাট ইয়োর সার্ভিস । মূলধন জমাবার আশায় এখন সে অনলাইনে শেয়ার খেলে । গত
বছর মাত্র চৌদ্দ হাজার টাকা লোকসান করেছে সে ।
প্রণব তার সাথে ভাব করার জন্যে নিজের সিগারেটটি তার দিকে এগিয়ে দিল ।
দুহাত প্রসারিত করে আঁতকে উঠল অনিরুদ্ধ ,
- সিগারেট খেলে ক্যান্সার হয় । ইন্টারনেটে লিখেছে । এত তাড়াতাড়ি মরতে চাই
না ।
নিকুঞ্জবাবু অপ্রতিভ হয়ে বললেন ,
- ওর ওই এক দোষ , চব্বিশ ঘন্টা ইন্টারনেট নিয়ে কি যে করে ।
ক্রমশ..............