মায়া-কান্না (দ্বিতীয় পর্ব)

সুনন্দন শিকদার,

কলকাতা

অলকা রিমোট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে টিভি দেখে সময় কাটায় । এ বাড়িতে পড়াশোনার পাট উঠেই গিয়েছে বহুদিন । কোন ক্রমে পাস কোর্সে বি এ টা পাস করেছে সে । তার সাথে পাস করা মেয়েরা ইউনিভার্সিটিতে চলে গিয়েছে । কেউ কেউ চটপট বিয়েটা সেরে ফেলে ভিনরাজ্যে বা বিদেশে । কেবল অলকা একই রকম রয়ে গিয়েছে । ইউনিভার্সিটিতে পড়া বান্ধবীদের সাথেই মাসে একদুবার বিকেলে বা সন্ধ্যায় সে ঘুড়ে বেড়ায় । যদিও তারা যে অলকার ব্যাপারে উৎসাহী তা নয় । বরং অলকার সঙ্গে বেরুলে খাবার-দাবারের দোকানে অলকাই নিয়ে যায় । ভ্যানিটি ব্যাগ বের করে বিল মেটায় । এটাই ওর তিন ইউনিভার্সিটির বান্ধবী- পৌলমী , শুক্লা আর রাত্রীর আকর্ষণ ।

দুটি মশলা দোসা ওরা ভাগ করে খেয়েছে । ওয়েটার এসে বিলটা যে দিয়েছে সেটি দেখে অলকা তার ব্যাগ খুলেই অবাক হয়ে গেল । ব্যাগে কোন টাকা নেই । টাকা পুরো সাফ । বাসে উঠেছিল । কোন পকেটমারেরই কাজ হবে । চোখে প্রায় জল এসে গেল অলকার । চার জনের মধ্যে কেবল তারই এত লোকসান করল ওরা ? আর আজকের দিনটিতেই করতে হল এই দুষ্কর্মটি !

আজ মলে উৎসবের মেজাজ । সমস্ত দোকান বেলুন দিয়ে সাজানো । ওপরের কোন তলা থেকে পপ্ সঙ্গীত ভেসে আসছে । সব দোকানই কিছু না কিছু ফ্রি গিফট দিচ্ছে । এই দোকানটি ফ্রি দিচ্ছে একটি কোকের বোতল । সুন্দর ভাবে সাজানো দোকানে হরেক রকম খাবারের লোভনীয় ছবি , তার পাশে তাদের ইংরেজি নাম আর ভিরমী-খাওয়া দর । প্রন পকোরা বলে লাল-সসে মোড়া এক বিশাল বাগদা চিংড়ির ছবি জ্বল জ্বল করছে- সেইটে চোখ টানছে অলকার । তক তকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন মেঝে । কাউন্টারে কমলা ইউনিফর্ম পরা একজন ছেলে হিসেব মেলাচ্ছে । অলকা কি করবে ? সে কি বান্ধবীদের গিয়ে বলবে তার অসহায়তার কথা , নাকি কিছু না বলে কেটে পড়বে হঠাৎ ? নাকি সে কাউন্টারে গিয়ে ব্যাগটিকে বন্ধক রাখতে বলবে ? বান্ধবীদের কাছে গিয়ে অসহায়তার কথা বলার মেয়ে সে নয় । কেটে পড়লে তার ঘরের বাইরে একমত্র বিনোদনের জগৎ সে হারাবে ।তবে উপায় ?

কাউন্টারের ছেলেটি মুখ তুলে তাকাচ্ছে । বিলটা সাধারণতঃ মেনুকার্ডের মধ্যেই কাস্টমাররা রেখে দেন । এই তরুণী কি চান ?

- আমার হ্যান্ডব্যাগটি পিকপকেট হয়েছে ।

- ওমা !

- ইম্যাজিন । নিয়ে নিল অতগুলো টাকা ।

- কোথায় ?

- বাসে । বাই দি ওয়ে , হ্যান্ডব্যাগটা রাখুন আমি টাকা নিয়ে আসছি ।

- বাঁধা রাখব । এরকম হয় নাকি ?

- স্ট্রেঞ্জ প্রবলেম , স্ট্রেঞ্জ সলিউশান ।

- ম্যাডাম এমন তো –

- কত হয়েছে ?

যে কথাটা বলল সে একজন যুবক । অস্বাভাবিক রোগা আর লম্বা । চোখে সরু বাদামী ফ্রেমের চশমা । গায়ে নীল হাওয়াই শার্ট আর জিন্সের প্যান্ট । সে গম্ভীরভাবে বলল ,

-আমি বিল মিটিয়ে নিচ্ছি আপনি ওদিকটা দেখুন ।

- আপনাকে তো চিনলাম না ।

- আমি আপনার একজন হিতাকাঙ্খী ।

- যাই হোক একটা নাম তো থাকবে ।

- প্রণব মজুমদার ।

- আপনাকে কোথায় দেখেছি দেখেছি মনে হচ্ছে ।

- মনে পড়ছে না ?

- ও মাই গড , মনে পড়ছে না ।

- পাশের পাড়াতেই থাকি ।

একজন আপাতঃ অপরিচিত পুরুষমানুষকে কোন তরুণী সাধারণতঃ বিল মেটাতে দেয় না । কিন্তু অলকা তো সাধারণ মেয়ে নয় । তার নিজের সম্বন্ধে আত্মবিশ্বাস অপরিসীম । যদিও নীতিগতভাবে সে পুরুষদের এড়িয়ে চলে , তবু এ ব্যাপারে তার কৌতূহল আছে । টেবিলে ফিরলে , পৌলমী বলল ,

- তোর এমন হ্যান্ডসাম একটা হি-ম্যান বয়ফ্রেন্ড আছে , আমাদের বলিসনি , এটা একটা ইনসাল্ট অলকা ।

রাত্রি বলল ,

- না হয় পরিচয় করালি না । দ্যাটস্ ইয়োর উইশ । তা বলে আমদের খাওয়ানোর বিল মেটাতে বলবি ওকে । তুই কতদিন এমন হয়ে গিয়েছিস অলকা ? হাউ মিন ।

সমালোচনার ঝড় মাথা পেতে নেওয়ার পর অলকা মুখ তুলে তাকাচ্ছে । আড়চোখে দেখছে যুবকটিকে । প্রণব মজুমদার কাউন্টারে বড্ড দীর্ঘক্ষণ ধরে কথা বলছে । কথাটা একটু সংক্ষেপ করে বেরিয়ে গেলে পারে না । পারে নিশ্চই কিন্তু যাচ্ছে না কেন ? সে কি তার জন্যে অপেক্ষা করছে ? পুরুষদের এই গায়ে পড়া ভাব , তাকে বিরক্তও করে আমোদিতও করে । রাত্রি বলল ,

- দেখ এখনো যায়নি । হি রিয়েলি লাভস ইউ ।

- লাভ না হাতি ।

অলকার ফরসা কান লাল হয়ে পড়ল । নীল টপ আর জিনস পরা রাত্রী তার পুরুষালী গলায় ডেকে ওঠে ,

- এই যে শুনে যান ।

প্রণব মজুমদারের মুখটি এইটুকু হয়ে গিয়েছে । এমন অপ্রস্তুত যে হতে হবে সে ভাবতে পারেনি ।

- আলাপ করিয়ে দিই । ওর নাম হচ্ছে অলকা দাশগুপ্ত । শি ইস এ নাইস গার্ল । তবে বিল মেটানোর জন্যে আমরা কোন ধন্যবাদ দেব না । পুরোটাই অলকা দেবে ।

প্রণবের একটা মুদ্রাদোষ আছে । ঘাবড়ে গেলে গালে হাত বোলাতে থাকে । মানুষের উপকার করতে গিয়ে তো বড় বিপদ হল ।

পৌলমী বলল ,

- তুই ছেলেদের বড্ড হ্যারাস করিস রাত্রি । এটা ঠিক হচ্ছে না ।

- কে বলল হ্যারাস করি , অনেকদিন কাউকে করিনি ।

প্রণব কতদূর চালাক চতুর অলকার জানা নেই । তবে না হলে যে রাত্রি ছিঁড়ে খাবে এটা তার জানা । বেকায়দায় পেলে ভদ্রভাষায় - মিষ্টিভাষায় কাহিল করায় সে ওস্তাদ । অলকা ভ্রুকুটি করে বলে ,
- আপনি যান প্রণববাবু । দিস ইস এ অল গার্লস ক্লাব ।

অলকা প্রণবকে নিস্তার না দিলে কি হত বলা মুস্কিল , কিন্তু নিঃশব্দে একটা জিনিস ঘটে গেল । অলকা এই প্রথম বুঝল কাউকে রক্ষা করায় একটা সূক্ষ্ম আনন্দ আছে । এই আনন্দটা গুনগুন করে লেগে থাকল তার মনে

ক্রমশ..............