মায়া-কান্না (প্রথম পর্ব)
সুনন্দন শিকদার,
কলকাতা
পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য
লাইব্রেরি
বিভাগে দেখুন...
এমন কান্না কেউ কাঁদতে পারে , সন্ধ্যাকে না দেখলে কেউ জানতেই পারত না ।
মড়া কান্না বোধহয় একেই বলে । শর্মিষ্ঠা বললেন ,
- এতক্ষণ অনুষ্ঠানটা খালি খালি লাগছিল । এবার একটু নুন লঙ্কা পড়ল ।
শর্মিষ্ঠা যাই বলুন , স্পষ্টবাদিনী বলে পাড়ায় খ্যাতি আছে । যে কোন
সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁর টিকা-টিপ্পনির বিশেষ কদর । শর্মিষ্ঠা মুখে কাপড়
দিলেন । কান্না না হাসি কোনটা চাপতে ঠিক বোঝা গেল না ।
অনুষ্ঠানটা আর কিছু না । রক্তময়বাবু মারা গিয়েছেন । মেদ-মাংসহীন
হাড়সর্বস্ব একটি চন্দনমাখা শরীর , উঠোনে একটি কাঁঠালকাঠের তক্তায় শোয়ানো
আছে । মাথার কাছে দুটি আর পায়ের কাছে দুটি রজনীগন্ধা স্টিক ।
রক্তময়বাবুর নামটি কে দিয়েছিল জানিনা , কিন্তু তাঁর কৌতুকবোধ যে ছিল তা
বলতে হবে । কারণ পুলিশ , গুন্ডামি বা খুন- রক্তের সাথে আত্মীয়তা থাকা
প্রতিটি জীবিকার থেকেই রক্তময়বাবু দূরে থেকেছেন । শত হস্ত দূরে । বেঁচে
থাকতে কেউ কেউ তাঁকে “কাক” বলে ডাকত । কৃষ্ঞবর্ণের জন্যে নয় , তাঁর
ধুরন্ধর স্বভাবের জন্যে । মজুমদারদের বনেদী বাড়ি । তিন ভাই- বিপ্লবময় ,
রক্তময় , শান্তিময় । মেজভাইটি অবিবাহিত । এমন উচ্চভাবার্থক নামের সাথে
চায়ের যোগ থাকা জরুরী । হয়েছেও তাই । তিন ভাইয়ের চায়ের পাতার পাইকারি
দোকান । চায়ের ব্যাবসা বৃদ্ধির পিছনে রক্তময়বাবুর অবদান কম নয় । কৃপণ বলে
কে বা কারা একটি উপাধি সেঁটে দিল আর তিনি জীবিত অবস্হায় কেবল এই
সুখ্যাতি খন্ডন করার চেষ্টা চালিয়ে গেলেন –অর্থাভাব নয় , এই করুণ
ট্র্যাজেডিই রক্তময় মজুমদারের জীবনের প্রধান সুর ।
মোট কথা তিনি মারা গিয়ে কারুর দূঃখ হয়নি , ভাইপো এবং ভাইঝিদের বরং বিশেষ
সুবিধা হয়েছে । তারা যে কাকাকে ভালবাসত না এমন নয় । বিশেষ করে উনি যখন
বহুপূর্বেই তাঁর সম্পত্তি এত সন্তর্পনে ভাগ বাঁটোয়ারা করে রেখেছিলেন ,
যাতে ভুলক্রমে কারুর পাইপয়সা বেশী-কম না হয় , তখন তো কাকার প্রতি কিছু
অযাচিত টান তাদের থাকবেই । কিন্তু কেউ মারা গিয়ে সম্পত্তি লাভ হলে , তাঁর
মরদেহের সামনে লুব্ধচোখে হাসিটা ঠিক রেওয়াজ নয় । এব্যাপারে আইনে না হোক
সমাজে কিছু বিধিনিষেধ আছে । এবং অর্থব্যায়ের ব্যাপার নেই বলে এই নিয়মটা
লোকে মানে ।
শর্মিষ্ঠা বাড়ির ছোটবৌ । আন্তরিক হোক লোকদেখানো হোক কান্নাটা তাঁর
স্বাভাবিক । কিন্তু তাঁর কিছুতেই কান্না আসছে না । সন্ধ্যাকে দেখে তাঁর
বরং হাসি পাচ্ছে । ব্যাপারটা অপ্রীতিকর । পাড়ার বয়স্ক মানুষ যাঁরা মর্নিং
ওয়াকের ফাঁকে হাতে গরম চা নিয়ে এর ওর মাথার পাশ দিয়ে উঁকি মারছেন তাঁদের
কাছে মজুমদার পরিবারের কোন মুখরক্ষাটা হবে ?
দোষটা শমির্ষ্ঠার নয় । দোষটা সন্ধ্যার । সে পাড়া ফাটিয়ে হাউ হাউ করে
কাঁদছে । যেন রক্তময়বাবুর মৃত্যুতে সে এইমাত্র অনাথ হল , যেন মৃত্যুটা
অপ্রত্যাশিত – ডায়ালিসিস কন্টকিত তিল তিল করে মৃত্যু নয় , যেন ইন্দ্রপতন
হয়েছে ! অথচ যিনি লোকান্তরিত হয়েছেন আর যিনি লোকভর্ত্তি উঠোনে বসে শোক
করছেন , তাঁদের মধ্যে কটি বাক্যবিনিময় হয়েছে তা বলা মুস্কিল । সন্ধ্যার
কান্না দেখে অবিশ্যি অনেকেই চোখ মুছছেন । রক্তময়বাবুর জীবিত অবস্হায়
আড়ালে আবডালে “কাক” বলতে তাঁদের বাধত না । অনেক দূর দূর থেকে রবাহুত হয়ে
ভিড় জমাচ্ছেন কিছু অপরিচিত মানুষ । এ ওঁকে জিজ্ঞাসা করছেন – উনি কে ? উনি
কি করতেন ? কেবল শর্মিষ্ঠা ভাবছেন , আচ্ছা ভদ্রমহিলা পারেনও বটে । এমন
গলা ফাটিয়ে কান্না ! তিনি এককালের ইউনিভার্সিটির বি এস সি- যে সময়
সাধারণতঃ মেয়েরা আর্টস পড়ত । সন্ধ্যার কান্না তাঁর কাছে কেবল কৌতুকের নয়
, কৌতূহলের বিষয় ।
হাসি সভ্যতার দান , কান্না প্রকৃতির আদিমতম ভাষা । সমাজে কান্নার একটা
ভূমিকা আছে । জজের সামনে দাঁড়ানো অপরাধীও জানে , খুব নগন্য ভূমিকা সেটি
নয় । কিন্তু সন্ধ্যার কান্নার ব্যাপারটিই আলাদা । কেউ মারা গেলেই
সন্ধ্যাকে মানুষ যেচে এসে খবর দেয় । ধূপ , রজনীগন্ধা , শববাহী শকট – এর
সাথে সন্ধ্যার কান্না যুক্ত না হলে আয়োজন যেন সম্পূর্ণ হয় না । এটি
রেওয়াজ হয়ে গিয়েছে । এতটাই যে অনেক ধর্মীয় আচারের মত অজান্তেই মানুষ যেন
এটিকে বরণ করে নিয়েছে ।
স্বামী নিকুঞ্জবাবু এ ব্যপারে উদাসীন থাকলেও , আপত্তি সন্ধ্যার মেয়ে
অলকার । কেউ মারা গিয়েছে , বহুদিন দেখা সাক্ষাৎ নেই , মা চলল কান্নাকাটির
আসর জমাতে এই ব্যাপার কি সহ্য করা যায় ? অলকা বড় হয়েছে । সে যখন জিনসের
শার্ট প্যান্ট পরে ইউনিভার্সিটির বান্ধবীদের সাথে যখন দোকান বা মলে ঘুরে
বেড়ায় তখন পাড়ার কোন না কোন মানুষের সাথে দেখা হয়ে যাবেই । তাদের মধ্যে
কেউ না কেউ সামান্য হেসে বলবে , মা এসেছিলেন , অমুকবাবুর ইয়েতে তিনি যে
এত আঘাত পাবেন ভাবতেই পারিনি । তাঁর মত এমন মানুষ আজকাল বিরল । আমরা তো
পরের জন্য এত ভাবি না । কথাগুলি কি ব্যাঙ্গ করে বলা ? মাঝে মাঝে সন্দহ হয়
অলকার । অনেকবারই সে বলেছে , এমন কর কেন মা ? প্রতিশ্রুতিও আদায় করেছে
মায়ের কাছ থেকে । কিন্তু সন্ধ্যাকে আটকায় কে ?
ক্রমশ..............