মন্ডপে হুলস্থুল
অনিন্দিতা গুড়িয়া,
নিউ-দিল্লি
একবার বারোয়ারি এক দুর্গাপূজার মণ্ডপে বিষম কাণ্ড ঘটে গেল! পঞ্চমীর দিন
সন্ধ্যেবেলা, আলোয় আলোকময় চারপাশ, ঢাকিরা সবে ঢাকে চাঁটি মেরেছে, এমন
সময় পূজার কর্মকর্তারা মণ্ডপের পর্দা সরিয়ে আঁতকে উঠলেন।
আরে! এ কী দৃশ্য? সিংহাসনে কেবল দশভুজা দেবী দুর্গা একাই বিরাজমান! তাঁর
পাশে লক্ষ্মী নেই, সরস্বতী নেই, কার্তিক-গণেশ তো দূরের কথা, মায়ের পদতল
থেকে নিজের আসন খালি করে গায়েব স্বয়ং মহিষাসুরও!
ক্লাব সম্পাদক অমলবাবু চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে চেঁচিয়ে উঠলেন, "ওরে বাবা
রে! দেব-দেবীরা সব গেল কোথায়? শেষমেশ কি বাজেট কম দেখে রেগেমেগে সবাই
প্যান্ডেল ছেড়ে পালাল নাকি?"
মহাবিপদে পড়ে কর্মকর্তারা শেষমেশ মা দুর্গার সামনেই হাতজোড় করে
দাঁড়িয়ে পড়লেন। সভাপতি মশাই কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "মা গো!
তুমি একলা কেন? আর পরিবার-পরিজন সব গেল কোথায়? তারা কি কোন কারণে আমাদের
ওপর কুপিত হয়েছে?"
মা দুর্গা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হেসে বললেন, "আর বোলো না বাছা!
বাপের বাড়ি বলে কথা। বাপের বাড়ির লোক যেমনই হোক না কেন, বছরে এই একবার
তো আমাকে আসতেই হবে। আমার মা-বাবা যে সারাবছর পথ চেয়ে বসে থাকে। কিন্তু
পরিবারের বাকিদের নিয়ে যে মহা ফাঁপরে পড়েছি!"
অমলবাবু ব্যাকুল হয়ে বললেন, "কেন মা? কী হয়েছে?"
মা দুর্গা এবার শুরু করলেন বিষাদসিন্ধু সম এক মজার গল্প।
"প্রথমেই ধোরো মহিষাসুরের কথা। সে তো ভয়ের চোটে এবার ট্রেনের টিকিটই
কাটতে চায়নি! অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে যদিও বা তাকে মন্ডপ পর্যন্ত টেনে
আনতে পেরেছি, কিন্তু যেমনই আমি বেদিতে চড়ে বসেছি সেই সুযোগে তিনি
মহাপুরুষ কোথায় যে উধাও হয়েছেন তার হদিস পাচ্ছিনা।"
গলবস্ত্র হয়ে গদগদ কন্ঠে অমল বাবু বলে ওঠেন -"কেন মা, তার আবার কি হলো"?
"তার সোজা কথা—মর্তের মানুষ নাকি দৈত্য দানবকেও হার মানায়! গতবছর দশমীর
দিন সিঁদুর খেলার সময় মহিষাসুরের মুখে এমনভাবে সিঁদুর লেপে দেওয়া
হয়েছিল যে তার চোখ-মুখ জ্বলে লাল। ঠেলে গুঁজে সন্দেশ খাওয়াতে গিয়ে তার
সামনের একটা দাঁতই ভেঙে দিয়েছে মণ্ডপের এক চ্যাংড়া ছেলে! তদুপরি, কানের
মধ্যে জ্বলন্ত ধূপকাঠি গুঁজে দেওয়া, আর গোঁফ ধরে টেনেই চলেছে তো টেনেই
চলেছে! মহিষাসুর বলল—'আগে লোকে আমাকে দোর্দণ্ডপ্রতাপ অসুর ভাবত, ভয় পেত।
আর আজকাল? দাঁত-বের-করা ছোকরা-ছোকরিরা এসেই বলে—আরে ওষুরদা, চলো একটা
ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল সেলফি হয়ে যাক! তারপর আবার চুলের মুঠি ধরে টানে!
পশুরাজ সিংহ পর্যন্ত ভয়ে কাঠ, আর ওই অসুরের সম্মান তো ধুলায় লুটিয়েছে!
তাই ও সাফ জানিয়ে দিয়েছে—মর্তে আর নো-এন্ট্রি!'"
কথা শুনে কর্মকর্তাদের চোখ ছানাবড়া! সম্পাদক মশাই বিড়বিড় করলেন,
"অসুরটার ওপর সত্যি একটু বেশিই অত্যাচার হয় বটে... তবে মা, আমাদের
কার্তিক-গণেশ আর লক্ষ্মী-সরস্বতী সোনাদের কী হলো?"
মা দুর্গা মাথায় হাত দিয়ে বললেন, "ওদের কথা আর বোলো না! ওদিকে
ছানাপোনাদের বাহনরাও মর্তে আসতে নারাজ। আর বাহন না এলে বাচ্চারা একা আসবে
কী করে বলো?
গণেশের ইঁদুর কঁকিয়ে উঠে বলেছে—মর্তের মানুষ চারপাশ বিষে বিষময় করে
রেখেছে! ওসব বিষের বড়ি খেয়ে আমাদের ভাই বোন আত্মীয় পরিজনেরা সব পটল
তুলেছে। আমি ওসব বিষাক্ত জায়গায় যাচ্ছি না!
লক্ষ্মীর পেঁচা তো ঘোর গম্ভীর গলায় নাক সিঁটকে বলল—আগে মর্তের মানুষ
আমাদের দিকে ফিরেও দেখত না, দু-একজন পেঁচা বলে ভয় পেত, সেটুকুই যা ভালো
ছিল! আজকাল তো মানুষ আমাদের দেখলেই খাঁচায় পুরে পোষ মানাতে চায়! কি না
আমরা সৌভাগ্যের প্রতীক! পেঁচাকে বানাবে পোষা পাখি? আমি মোটেই খাঁচাবন্দী
হতে যাচ্ছি না!
সরস্বতীর হাঁস আবার ভয়ে ডানা গুটিয়ে বসে আছে। তার সোজা কথা—মর্তে
নামলেই নাকি কিছু পেটুক মানুষ কড়াইয়ে তেল চড়িয়ে মাংস কষানোর ডেট ঠিক
করে ফেলে! ওসব ভোজনরসিকদের বিশ্বাস নেই, আমাকে দেখলেই মেরে খেয়ে
নেবে!
আর কার্তিকের ময়ূর তো ডানা উঁচিয়ে কেঁদেই ভাসাল! সে বলল—মণ্ডপে পা
দিলেই তো লোকে টেনে টেনে ডানা থেকে সব রঙিন পালক ছিঁড়ে নেয়! তার ওপর
আজকাল নাকি কিছু দুষ্টু লোক ময়ূরের মাংসের তান্দুরি পিকক খাওয়ার
প্ল্যানও ফাঁদছে! বাপ রে বাপ, প্রাণ বাঁচাতে আমি কৈলাস ছেড়েই নড়ব
না!'
সোজা হিসাব—বাহনরা যদি স্ট্রাইক করে, তবে কি আর আমার বাচ্চাকাচ্চারা
আসতে পারে? তাই আমিই একাই চটজলদি রিকশা ধরে চলে এলাম!"
দেবী দুর্গার মুখে এই মারাত্মক সত্য শুনে কর্মকর্তাদের মধ্যে একবারে
হুলুস্থুল পড়ে গেল! 'গেল গেল' রব উঠল চারদিকে। মণ্ডপে সিংহ নেই, অসুর
নেই, গণেশের মোদক খাওয়ার লোক নেই—পূজো হবে কীভাবে?
অবশেষে ক্লাবের দশজন জোয়ান সদস্যকে কৈলাসে স্পেশাল বডিগার্ড হিসেবে
পাঠানো হলো। সাথে করে নিয়ে যাওয়া হলো ইঁদুরের জন্য বিষমুক্ত দেশি ঘি-এর
লাড্ডু, পেঁচার জন্য অন্ধকারের বিশেষ চশমা হাঁসের জন্য ওয়াটারপ্রুফ
নিরাপত্তা কবচ, আর ময়ূরের জন্য পালক-রক্ষা 'স্পেশাল হেলমেট'! আর
মহিষাসুরের জন্য আলাদা করে লিখে নিয়ে যাওয়া হলো এক
অঙ্গীকারপত্র—"মণ্ডপে কেউ সেলফি তুলতে পারবে না, কানের ধূপ গোঁজা বারণ,
নাকে মুখে একগাদা মিষ্টি ঠুসে দেওয়া যাবে না, এবং সিঁদুর শুধুই কপালে
লাগানো হবে, মুখে মাথায় নয়!"
সবাইকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে, মিষ্টি খাইয়ে, ভিআইপি সুরক্ষার
গ্যারান্টি দিয়ে অবশেষে ষষ্ঠীর সকালে মহা ধুমধামে মণ্ডপে আনা হলো
দেব-দেবী ও তাঁদের বাহনদের।
বেদিতে উঠে দেবী দুর্গা হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে এক গম্ভীর ও অত্যন্ত
প্রয়োজনীয় বাণী শোনালেন।
মা দুর্গা বললেন, "শোনো মর্তের মানুষ! তোমরা দেবী হিসেবে আমাকে পুজো
করছ, অথচ আমার বাচ্চাদের বাহনদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছ? এই ইঁদুর, পেঁচা,
হাঁস, ময়ূর, এমনকি সাধারণ পশু-পাখি এরা শুধু কোনো দেব-দেবীর বাহন বা
তোমাদের খাদ্যবস্তু নয়! এদের প্রত্যেকটি প্রাণী এই ধরণী ও পরিবেশের
ভারসাম্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি।"
দেবী একটু থেমে বুঝিয়ে বললেন, "ইঁদুর না থাকলে মাটির উর্বরতা কমে যাবে,
পেঁচা না থাকলে ফসলের ক্ষতিকারক পোকা-মাকড় ও ইঁদুরের উপদ্রব সামলাবে কে?
হাঁস ও জলচর পাখিরা জলাশয়ের ইকোসিস্টেম পরিষ্কার রাখে, আর ময়ূর ও
অন্যান্য পাখিরা বীজ ছড়িয়ে নতুন গাছের জন্ম দেয়। প্রকৃতির এই
জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করলে বা পশুপাখিদের শুধু ভোগের বস্তু মনে করলে পুরো
পরিবেশের ভারসাম্যই একদিন নষ্ট হয়ে যাবে। আর প্রকৃতি বাঁচলে তবেই না
তোমরা বাঁচবে!"
মায়ের এই গভীর ও চোখ খুলে দেওয়া উপদেশ শুনে মণ্ডপের সমস্ত দর্শনার্থী
ও পূজার কর্মকর্তারা মাথা নিচু করে নিজেদের ভুল বুঝতে পারলেন। তাঁরা
সমস্বরে প্রতিজ্ঞা করলেন যে, এরপর থেকে তাঁরা কেবল পূজার মণ্ডপেই নয়,
বাস্তব জীবনেও সমস্ত জীবজন্তু ও পশুপাখিদের সুরক্ষা দেবেন, তাদেরকে শুধু
শুধু কষ্ট দেবেনা এবং পরিবেশকে ভালোবাসবেন।
অবশেষে মহিষাসুর মুখে মাস্ক আর চোখে রোদচশমা এঁটে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল,
ইঁদুরমশাই এক হাতে লাড্ডু নিয়ে অমলবাবুর দিকে তাকিয়ে পট করে চোখ মারল,
আর পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকারে ঢাকের শব্দে চারদিক গমগম করে উঠল। সবাই
সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো —"বল বল দুর্গা মাই কি... জয়! পরিবেশ বাঁচাও, জীবন
বাঁচাও!"