মহালয়ার ভোর
অদিতি মন্ডল,
কলকাতা
ভৈরব রাগের কোমল সুর তখনও যেন ভোরের অন্ধকারেই বিলম্বিত হয়ে আছে।
প্রকৃতিতে শীতের নরম স্পর্শ লেগেছে মাত্র। শেষ রাতের বিছানার নরম
উষ্ণতায় আমাদের ঘুম তখনও কাঁচা। এমন সময় বারান্দার দিকের বন্ধ কাঠের
জানলায় টক টক করে দু-একটা টোকা পড়ত। তারপর আমাদের রাশভারী বাবার
স্নেহের পরশ জড়ানো গলা শোনা যেত,
— "উঠে পড়ো সবাই, মহালয়া শুনতে হবে তো।"
কণ্ঠে কোমলতা থাকলেও তার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকত এক অদৃশ্য তাগিদ। সেই
ডাক অমান্য করার সাধ্য ছিল না। বিনা বাক্যব্যয়ে পাতলা চাদর গায়ে
জড়িয়ে, ভারী শালকাঠের খিল খুলে আমরা বেরিয়ে আসতাম বারান্দায়।
সামনে তাকাতেই মনে হতো, ভোর যেন কুয়াশার চাদর গায়ে দিয়ে উঠোনের
মাঝখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। শিউলি গাছটার গোড়ায় সাদা ফুল আর কমলা
ডাঁটি মিলে যেন আপনমনে আলপনা এঁকেছে। উঠোনের ধারের ঘাসের ডগায় জমে থাকা
শিশিরে প্রতিটি পাতা নুয়ে আছে। আকাশের গায়ে তখনও ছোপ ছোপ কালো
অন্ধকার।
এদিকে বাবা কাঠের টেবিলের ওপর ঝুঁকে পুরোনো রেডিওর টিউনিং নিয়ে ব্যস্ত।
মাঝেমধ্যে রেডিও থেকে ভেসে আসছে খসখসে 'শাঁ-শাঁ' শব্দ। কখনও কাঁধ থেকে
নেমে আসা চাদরের খুঁট টেনে তুলে নিচ্ছেন, কখনও আবার রেডিওর নব ঘুরিয়ে
মিলিয়ে নিচ্ছেন ঠিক তরঙ্গ।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে এইসব দেখতে দেখতেই ঘুমজড়ানো আলস্য ধীরে ধীরে কেটে
যেত।
ঠিক তখনই মা রান্নাঘর থেকে উষ্ণ গরম জলের মগ বাড়িয়ে দিয়ে বলতেন, —
"মুখ ধুয়ে নে। চোখে কিন্তু ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিবি।"
অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুখ-হাত ধুয়ে ভেজা হাত দুটো আবার চাদরের ভেতর ঢুকিয়ে
বুকের কাছে গুটিয়ে নিতাম। তারপর বারান্দার লম্বা কাঠের বেঞ্চের এক কোণে
পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়তাম।
ততক্ষণে বাবার রেডিওর ভাঁজ করা অ্যান্টেনা সোজা হয়ে আকাশের দিকে উঠে
গেছে।
হঠাৎই খসখসে শব্দ থেমে যেত।
তারপর এক গম্ভীর, আবেগময়, উদাত্ত কণ্ঠ ভরে দিত চারদিক—
"যা দেবী সর্বভূতেষু..."
মুহূর্তের মধ্যেই মনে হতো, ভোর আর ভোর নেই; আকাশ-বাতাস জুড়ে দেবীপক্ষের
আগমনী সুর বেজে উঠেছে। ঘরের বারান্দা, উঠোন, কুয়াশা, শিউলিফুল—সব যেন
সেই কণ্ঠের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে।
মা-বাবার ঠোঁটও কখন যে নিঃশব্দে স্তোত্রের সঙ্গে মিশে যেত, টেরই পেতাম
না। কখনও মা আস্তে আস্তে গলা মেলাতেন— "জাগো দুর্গা..." কিংবা অন্য কোনো
আগমনী গানে। আমরা নিঃশ্বাস আটকে শুনতাম দেবীর আবির্ভাব, অসুরবধের কাহিনি,
স্তোত্র আর গানের অপূর্ব মেলবন্ধন। মনে হতো, দেবী যেন সত্যিই পথ চলা শুরু
করেছেন আমাদের গ্রামের দিকেই।
রেডিওর সম্প্রচার শেষ হতেই বাবা ধীরে ধীরে রেডিওর নব ঘুরিয়ে সেটি বন্ধ
করতেন। ঘরটা হঠাৎই কেমন নিস্তব্ধ হয়ে যেত। মা উঠে যেতেন রান্নাঘরের
দিকে, বাবা নিজের কাজে।
ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে আসত আর-এক পরিচিত কণ্ঠ। পাশের বাড়ির টেলিভিশনে
কলকাতা দূরদর্শনে মহালয়ার অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে।
আমরা আর এক মুহূর্তও দেরি করতাম না। এক লাফে সদর দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে
ছুটে যেতাম পাশের বাড়ির বারান্দায়। সামনে জায়গা পাওয়ার উপায় ছিল না।
পাড়ার সব কচিকাঁচা ততক্ষণে মেঝেতে, বেঞ্চে, জানলার ধারে যে যেখানে
পেরেছে বসে পড়েছে। আমরাও একটু পেছনে কোথাও গুটিসুটি মেরে বসে যেতাম।
তারপর আর কোনো শব্দ থাকত না।
শুধু বড় বড় বিস্ময়ভরা চোখ।
পর্দায় তখন দেবী দুর্গা আর মহিষাসুরের ভয়ংকর যুদ্ধ। দেবী কে লক্ষ করে
বিশাল বিশাল পাথর ছুঁড়ে দিচ্ছে অসুর। আর দেবী অনায়াসে সেগুলো ভেঙে
দিচ্ছেন। কখনও ত্রিশূল, কখনও চক্র, কখনও অগ্নিশিখায় একে একে বিনাশ হচ্ছে
অসুরসেনা। আমাদের বুকের ভেতরেও কখনও ভয়, কখনও বিস্ময়, কখনও আনন্দ ঢেউ
খেলতে খেলতে শেষ পর্যন্ত এসে থামত সেই মুহূর্তে—যখন দেবীর ত্রিশূল বিদ্ধ
করত মহিষাসুরের বক্ষ, আর বেজে উঠতো ঢাক কাঁসর।
অনুষ্ঠান শেষ হতেই যেন জাদু ভেঙে যেত।
বারান্দা ভরে উঠত হইহই আর চিৎকারে। কেউ মহিষাসুরের অট্টহাসি নকল করছে,
কেউ আবার দেবী সেজে ত্রিশূল ধরার ভঙ্গি করছে। কেউ পালাচ্ছে অসুর হয়ে,
কেউ তার পেছনে ছুটছে দেবীর সৈন্য সেজে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো পাড়াটাই
যেন ছোট্ট এক দেবাসুরের রণক্ষেত্র হয়ে উঠত।
হাসতে হাসতে বাড়ির পথে ফিরতে ফিরতে হঠাৎই চোখে পড়ত—শরৎ সত্যিই এসে
গেছে।
আকাশের নীল গায়ে ভেসে বেড়াচ্ছে তুলোর মতো সাদা মেঘ। দূরে কোথাও মৃদু
ঢাকের বাদ্যি ভেসে আসছে সকালের বাতাসে। ভেজা মাটির পথের ধারে দু-একটা
কাশফুল মাথা দুলিয়ে যেন দেবীর আগমনীকে স্বাগত জানাচ্ছে। বাড়ির উঠোনে
শিউলি গাছের পাতার ডগা থেকে টুপটুপ করে শিশির পড়ছে সদ্য ঝাঁট দেওয়া
ভেজা মাটির ওপর। সোনালি সকালের আলোয় ঘাসের ডগায় জমে থাকা
শিশিরবিন্দুগুলো হিরের কণার মতো ঝলমল করছে।
মনে হতো, দেবীকে তখনও দেখিনি; অথচ তাঁর আগমনের সমস্ত চিহ্ন চারদিকে
ছড়িয়ে পড়েছে।
সেই ভোর থেকেই বুঝে যেতাম—পুজো আর বেশি দূরে নেই।