পরিবারের সাথে দেবী দুর্গা ও তাদের বাহনরা

মনিকা পুরকাইত,

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা

শারদোৎসবের আনন্দ-আলোকে মর্ত্যধামে আগমন ঘটে আদ্যাশক্তি দেবী দুর্গার। তবে তিনি একা আসেন না; স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যের পৈতৃক ভিটায় তিনি পদার্পণ করেন তাঁর চার সন্তান—লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, ও গণেশকে সাথে নিয়ে। এই দেবী পরিবারের সৌন্দর্য ও শক্তির পূর্ণতা পায় তাঁদের নিজ নিজ অনুগত বাহনদের উপস্থিতি ও বৈশিষ্ট্যে।

​দেবী দুর্গা নিজে চড়ে আসেন সিংহবাহনে। সিংহ হলো সাহসিকতা, তেজ ও রাজকীয় মহিমার প্রতীক। দেবীর দশ হাতে দশটি অস্ত্র যেমন অশুভ শক্তি বিনাশের রূপ তুলে ধরে, তেমনি তাঁর অনুগত সিংহ পশুপতির শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে ধর্মে প্রতিষ্ঠিত রাখার বার্তা দেয়।

​সম্পদ ও সৌভাগ্যের দেবী লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা। রাতের অন্ধকারেও যা দেখতে পায়, সেই অলৌকিক দৃষ্টির প্রতীক এই পেঁচা। দেবী আমাদের শেখান—অন্ধকার ও মোহগ্রস্ত পরিবেশেও যেন মানুষ সচেতনতা ও আলোকপ্রজ্ঞার চয়ন করে।
​জ্ঞান ও শিল্পকলার দেবী সরস্বতীর বাহন শ্বেতহংস বা রাজহাঁস। রাজহাঁসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দুধ ও জলের মিশ্রণ থেকে কেবল ক্ষীর বা খাঁটি দুধটুকু গ্রহণ করা। এটি অসারের মাঝে সার বস্তুকে চিনে নেওয়ার এবং শুভ-অশুভের মধ্যে সত্যকে বেছে নেওয়ার বিবেককে নির্দেশ করে।

​দেব সেনাপতি কার্তিকের বাহন রূপময় ময়ূর। ময়ূরের বর্হিল ও সৌন্দর্য বাহ্যিক রূপের অহংকার বর্জনের শিক্ষা দেয়। চঞ্চলময় ময়ূরকে বশ করে কার্তিক দেখান কীভাবে মন ও সৌন্দর্যকে সংযমের সুতোয় বেঁধে যুদ্ধক্ষেত্রে পরাক্রমশালী হতে হয়।

​সিদ্ধিদাতা গণেশের বাহন ছোট একটি ইঁদুর (মুসিক)। ইঁদুর চঞ্চল, যেকোনো কিছুকে কেটে কুটে নষ্ট করতে ও গোপনে প্রবেশ করতে পারদর্শী। কিন্তু বিঘ্নহর্তা গণেশ তাকে বশীভূত করে বাহন করেছেন—যা বার্তা দেয় যে, ক্ষুদ্রতম ও চঞ্চল বাসনা বা মানসিক চঞ্চলতাকেও বুদ্ধির শক্তিতে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

​দুর্গাপূজা কেবল এক একক দেবীর আরাধনা নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবারের পুনর্মিলন। মা দুর্গা ও তাঁর সন্তানরা যেমন স্নেহ, মঙ্গল, বিদ্যা, বীরত্ব ও সিদ্ধির সমাহার, তেমনি তাঁদের বাহনরাও প্রকৃতি, পশুপাখি ও মানুষের এক অপূর্ব আত্মিক মেলবন্ধনের শিক্ষা বহিরাগত জগতের সামনে তুলে ধরে।