ক্ষুদে হিরো

বাসবদত্তা গুড়িয়া,

নতুন দিল্লি

শীতের মোরসুম! চারিদিকে নানা রঙের ফুলের মেলা, আর বাজার ভরা কমলালেবু, আপেল, আর নলেন গুড়, মোয়া- মুড়কি ইত্যাদিতে।

আর আমরা তো সবাই জানি শীতকাল মানেই মেলার মজা। চারিদিকে চলছে মেলার রমরমা। কোথাও বই মেলা, কোথাও কৃষি মেলা, কোথাও ফুল মেলা, আবার কোথাও বাউল মেলা। অন্যান্য বছরের মত এ বছরও নরেন বাবুর বাড়ির কাছে একটা বেশ বড় মেলা লেগেছে।

নরেন বাবুর ছেলে ক্লাস টু তে পড়া বছর সাতেকের রন মেলায় যাবার বায়না করে ক’দিন ধরেই মা- বাবার মাথা ধরিয়ে দিচ্ছে—

“বাবা, আমাকে মেলায় নিয়ে যাবে না?”

রনের চোখ দুটো যেন মেলা দেখার স্বপ্নে ঝিলমিল করত।

কিন্তু বাড়িতে অসুস্থ ঠাম্মা কে একলা রেখে মা কোথাও বেরতে পারেনা। আবার বাবার হাতে সময় নেই। অফিসের কাজ, ওভারটাইম—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই বাড়ি ফিরতে ফিরতে তাঁর রাত দশটা বেজে যায়। ক্লান্ত শরীরে বাবা বলতেন,

“আজ নয় রন, পরে একটা ছুটির দিনে নিয়ে যাব।”

রন মুখ ভার করে বলত,
“মেলা তো আর দুদিনই আছে বাবা। তোমার ছুটি তো সেই রবিবার, সে এখনও অনেক দিন বাকি। আমি কালকেই যাব।”

পরের দিন সত্যিই বাবা সন্ধে সাতটার সময় বাড়ি ফিরলেন। রন আগে থেকেই তৈরি, চোখেমুখে উত্তেজনা আর আনন্দ। বাবার সব ক্লান্তি যেন এক মুহূর্তে উবে গেল।

“ঠিক আছে রন, চলো আজই আমরা মেলায় যাই।”

মেলায় পৌঁছে রনের আনন্দ আর ধরে না। কতো রঙিন আলো, লোকজনের ভিড়, কত্তো দোকান, খেলনা, খাবারের গন্ধ—সব দেখে সে ছোটাছুটি শুরু করে দিল। বাবা শক্ত করে তার হাত ধরে রাখলেন। বললেন,

“মেলায় অনেক দুষ্ট লোক ও থাকে রন। হাত ছেড়ো না। যদি কেউ তোমায় নিয়ে পালিয়ে যায়?”

রন মাথা নাড়ল, একটু বুঝি বা ভয় পেল। তারপর বাবার হাত আরও শক্ত করে ধরল।

সবকিছু দেখে, একটু এটা সেটা খেয়ে, একটা খেলনা কেনার পর রন হঠাৎ জিদ ধরল,
“বাবা, নাগরদোলায় উঠব!”
বাবা একটু চিন্তিত হয়ে বললেন,
“ওটা অনেক উঁচুতে ওঠে, ভয় পাবে।”
“না বাবা, আমি ভয় পাব না।”
“খাবার খেয়েছ, বমি হয়ে যেতে পারে।”
“হবে না বাবা!”
শেষমেশ বাবাকে হার মানতেই হলো। দু’জন টিকিট কেটে নাগরদোলায় চড়ে বসল। ধীরে ধীরে উপরে উঠতে লাগল নাগরদোলা। আলো-ঝলমলে মেলা নিচে ছোট হয়ে আসছে। ঠিক তখনই, একেবারে চূড়ায় পৌঁছে হঠাৎ করেই নাগরদোলাটা থেমে গেল।

হঠাৎ চারদিকে হইচই। মাইকের এনাউন্সে কান পাতলে শোনা যায়—
“একটা বাচ্চাকে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে! ধরো! ধরো!”

রনের বাবা ভয়ে আঁতকে উঠলেন। রনকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এমন সময় রন হঠাৎ সামনে তাকিয়ে বলল,
“বাবা, ওই যে ওই দিকে ফুল গাছের ঝোপের ওখানে দু’জন একটা ছোট বাচ্চাকে নিয়ে চুপি চুপি পালাচ্ছে!”

বাবা আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। সঙ্গে থাকা মোবাইল দিয়ে পুরো ঘটনাটা ছবি ও ভিডিওতে ধরে ফেললেন এবং সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে খবর দিলেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ এসে দুষ্টু লোক দু’জনকে ধরে ফেলল। উদ্ধার হওয়া শিশুটিকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হলো। কান্না আর স্বস্তির মিলেমিশে যাওয়া দৃশ্য দেখে রনের চোখ বড় বড় হয়ে উঠল।

নাগরদোলা থেকে নেমে বাবা রনকে বললেন,
“ভাবতে পারিস, যদি ওরা তোকে নিয়ে পালিয়ে যেত, কী হতো?”

পুলিশ হেসে এগিয়ে এসে বললেন,
“ওকে নিয়ে পালাবে কী করে? রনই তো আমাদের দুষ্টু ধরতে সাহায্য করেছে!”

তারপর পকেট থেকে একটা বড় চকলেট বের করে রনের হাতে দিয়ে বললেন,
“এই নাও, সাহসী ছেলের জন্য পুরস্কার।”

রন চকলেট হাতে নিয়ে মিষ্টি হেসে বলল,
“ধন্যবাদ কাকু। আমি এটা বাড়িতে নিয়ে যাব। বাড়িতে আমার মা আর ঠাম্মা আছেন, আমি তাঁদের সঙ্গে ভাগ করে খাব।”
সেই মুহূর্তে বাবার বুক গর্বে ভরে উঠল।
ছোট্ট রন সেদিন শুধু মেলা ঘুরেই ফেরেনি—সে প্রমাণ করেছিল, সাহস আর সততা বয়স দেখে আসে না।