কি হতে চাও?

সুমনা মজুমদার দাস,

কলকাতা

আজ দীপ্তি খুব দ্বন্দ্বে পড়ে গেছে । যে কারণে সে তার জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটা নিতে দ্বিধা বোধ করছে। যে সিদ্ধান্তের উপর তার গোটা ভবিষ্যৎটা নির্ভর করবে ।

বারান্দাতে বসেই সে শুনতে পাচ্ছে পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা মা ও বাবার কথা কাটাকাটির শব্দ।সে ভালো মতোই জানে যে তারা কি নিয়ে কথা বলছে। হঠাৎ তার মনে হয় তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করতে পারবে, তখনই সে এক ছুটে বারান্দা থেকে বেরিয়ে যায়।

দীপ্তির বয়স আজ ষোলো বছর পূর্ণ হলো। সে সদ্য মাধ্যমিক পাশ করেছে। তার বাবা একজন আর্মি অফিসার এবং মা বিমানসেবিকা। ছোটবেলা থেকেই দীপ্তি দেখেছে যে তার বাবা ও মা ভারি ব্যস্ত মানুষ, তাকে তারা সময়ই দিতে পারেন না। শৈশবে মা-বাবার সঙ্গ না পাবার দরুন তাদের উপর দীপ্তির ভারী অভিমান হতো। তার একমাত্র প্রিয় সাথী ছিল তার ঠাম‌। যে সব সময় তার সাথে থাকে, খেলে, গল্প শোনায়। ঠাম দীপ্তিকে খুব ভালোবাসে আর দীপ্তিও ঠামকে সকলের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। ঠামই তাকে বুঝিয়ে ছিল যে তার বাবা ও মা কতটা দায়িত্বশীল কাজ করেন। তবে ছোটবেলায় না বুঝলেও একটু বড়ো হবার পর সে নিজেই এটি উপলব্ধি করে এবং মা-বাবাকেই জীবনের আদর্শ হিসেবে মনে করতে থাকে।

দীপ্তির বাবা দীপ্তমান বলিষ্ঠ চেহারার খোলা মনের মানুষ। তিনি নারীদের উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ডে সাহায্য করে থাকেন। তার মতে সামাজিক- উন্নতি নারী-উন্নয়নের মাধ্যমেই সম্ভব। তাই ব্যক্তিগত জীবনেও স্ত্রীর চাকরি করা নিয়ে তিনি কখনো আপত্তি করেননি। তার ইচ্ছে, দীপ্তি ভবিষ্যতে আর্মিতে যোগ দিয়ে দেশে কাজ করুক এবং নারীদের আদর্শ হয়ে উঠুক।

দীপ্তির মা তপতী খুব সুন্দরী, তাকে দেখে তার আসল বয়স বোঝাই যায় না। দীপ্তিও তার মায়ের মতোই সুন্দরী। ছোটবেলায় যখন সে তার মাকে সুন্দর করে সেজে কাজে বেরতে দেখতো, তখন তার মায়ের মতো হতে ইচ্ছে করত। তখন সে মাকে বলতো, "আমি বড়ো হয়ে তোমার মতো হতে চাই।"

তপতীও খুব খুশি হতো মেয়ে তার মতো হতে চায় শুনে । তাই সে ঠিক করেছিল যে দীপ্তিকে সে তার মতো একজন বিমানসেবিকা বানাবে। কিন্তু তপতী এটাও জানতো যে দীপ্তমান মেয়েকে আর্মিতে পাঠাতে চান। সেই কারণেই মেয়ে ভবিষ্যতে কি হবে সেই নিয়ে দু-জনের মধ্যে প্রায়শই কথা কাটাকাটির উপক্রম হত।

আজ দীপ্তির মাধ্যমিকের ফল প্রকাশ হয়েছে। সে খুব ভালো নম্বর নিয়ে পাশ করেছে। আবার আজ তার জন্মদিনও। তাই আজ সন্ধ্যায় তাদের বাড়িতে একটি পার্টির আয়োজন করা হচ্ছে। সেখানে মান্যগন্য অনেকেই আসবেন। তখন সেখানে সকলে একটাই কথা বলবে, "তুমি বড়ো হয়ে কি হতে চাও?"

এই প্রশ্নটার মুখোমুখি দীপ্তিকে হতেই হবে। তখন সে কার মুখ রাখবে, বাবার না মায়ের?

এই প্রশ্নের উত্তরটাই সে মনে মনে খুঁজে চলছে। কিন্তু কিছুতেই পাচ্ছে না। আসলে সে বাবা ও মা দুজনকেই ভালোবাসে। এক জনের মান রক্ষা করতে গেলে তো অপর জনকে কষ্ট দেয় হবে। তা দীপ্তি কিছুতেই চায় না। তাই সে এসে দাঁড়িয়েছে ঠামের ঘরের সামনে। ঠাম দুপুরে ঘুমোন। তাই দীপ্তির মনে হচ্ছিল এই সময় ঠামকে ডাকবে কি না? কিন্তু সন্ধ্যার পার্টির তো আর বেশি দেরি নেই। সে আর অপেক্ষা করতে পারছে না। তাকে যদি কেউ এই মানসিক দ্বন্দ্ব থেকে বের করতে পারে তবে সে হল তার ঠাম। তাই এখন ঠামের সাথে কথা বলতেই হবে তাকে।

দরজায় দাঁড়িয়ে দীপ্তি বলল, "ঠাম, ঘুমোচ্ছ নাকি?

আরতিদেবী মানে দীপ্তির ঠাম সজাগই ছিলেন। তিনি উঠে বসে বললেন," না, তবে তোমার কি হয়েছে বলোতো দিদিভাই ? স্বরটা যেন কেমন লাগছে!

দীপ্তি গিয়ে আরতিদেবীর পাশে বসে বলল, আমি বড়ই ধর্মসঙ্কটে পরে গেছি। কি যে সিদ্ধান্ত নেব বুঝতেই পারছিনা। বাবা আর মা এর মধ্যে থেকে যেকোন একজনের ইচ্ছেকে সমর্থন করলে যে আর একজন কষ্ট পাবে, যে আমি তা কখনোই চাই না। আমার এখন কি করা উচিত ঠাম?

দীপ্তির কথাগুলো খুব মন দিয়ে শুনলেন তিনি।

নিজের ছেলে আর বউমাকে খুব ভালোভাবেই চেনেন,আর এও জানেন যে তারা কি চায় আর চেনেন এই ‍মেয়েকে। যার মধ্যে বার বার তিনি নিজেকে খুঁজে পান।

আরতিদেবী তার কঠিন ব্যাক্তিত ভরা দৃষ্টি দিয়ে দীপ্তির দিকে তাকিয়ে বললেন, "তুমি কি হতে চাও? তোমার মনের ইচ্ছেগুলোকে আগে নিজের মধ্যে খোঁজ। কারোর আশা পূরণের জন্য নয়, নিজের জন্য। যাতে তোমার ভেতরের প্রতিভাগুলোকে তুমি চিনতে পারো আর সেই অনুযায়ী পেশা বেছে নিতে পারো।"

"আমি নিজেই জানি না ঠাম, আমার কি প্রতিভা আছে। ছোটবেলায় আমার বাবা-মায়ের কাজগুলো ভালো লাগতো। তাই আমি বড়ো হয়ে তাদের মতোই হতে চাইতাম। কিন্তু এখন তাদের পেশা গুলোকে আর আগের মতো ভালো লাগে না। এমন নয় যে সেগুলো ভালো নয়, তবে আমার মন থেকে সেই ভালো লাগাটা আর আসে না।"

" ঠিক আছে। আর একটু পরেই তুমি তোমার আসল প্রতিভাকে চিনতে পারবে। আশা করছি তোমার বাবা-মাও তোমাকে বুঝতে পারবে। "

" কিন্তু কি ভাবে? "

" একটু অপেক্ষা করো। সময় হলেই সব বুঝতে পারবে। "

হঠাৎ তপতী আরতিদেবীর ঘরের সামনে থেকে যাবার সময় দীপ্তিকে দেখতে পেয়ে বলল," একি , তুমি এই সময় মা-এর ঘরে কি করছ? যাই হোক, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। গেস্টদের আসার সময় হয়ে গেল যে। তুমি আমাদের সাথেই নীচে যাবে। আর, মা আপনিও তৈরি হয়েনিন। "

নীচতলার হলরুমটাকেই আজ পার্টির জন্য সাজানো হয়েছে। বাড়ির কেয়ারটেকার আকাশই সমস্ত ব্যবস্থা করেছে। আকাশ প্রায় কৈশোর বয়স থেকেই তার বাবার চাকরির হাল ধরে এ বাড়িতেই রয়েছে। সে এবাড়ির সকলকেই নিজের পরিবারের মতোই ভালোবাসে এবং সবার সব কথা মেনে চলে।

যথা সময়ে হলরুমটি আনন্দ - কোলাহলে ভরে যেতে লাগলো। সকলে শরবৎ হাতে পার্টির ডেকোরেশন দেখছে এবং নিজেদের মধ্যে উচ্ছ্বসিত ভাবে কি যেন আলোচনা করছে। একটু পরেই বাবা ও মায়ের সাথে দীপ্তি পার্টিতে এসে উপস্থিত হল।

দীপ্তি ভারী অবাক হল পার্টিতে তার অয়েল পেন্টিং গুলো সাজানো দেখে। শুধুমাত্র দীপ্তিই নয়, তার বাবা - মাও ভারী অবাক হল।

দীপ্তমান আকাশকে ডাকতেই যাচ্ছিলেন এসব এর কারন জানতে, এমন সময় তার সামনে তার উচ্চপদস্থ কয়েক জন অফিসার এসে দাঁড়ালেন তাদের মধ্যে থেকে মিস্টার সেন বলেন, " বোস,দীপ্তির ভালো রেজাল্টের জন্য অনেক অভিনন্দন। শুনলাম এই সব পেন্টিং গুলো নাকি দীপ্তি করেছে। সত্যি, অসাধারণ প্রতিভা। এই বয়সে এমন দক্ষতা ভাবাই যায় না।"

মিস্টার রায় বলেন, "দীপ্তি যদি পেন্টিং নিয়ে পরবর্তী সময়ে এগিয়ে যেতে পারে তবে ও অনেক উন্নতি করবে।"

মিস্টার দাশগুপ্ত বলেন," আমার পরিচিত কিছু নামজাদা আর্টিস্ট আছেন। যদি বলেন তো দীপ্তির জন্য কথা বলতে পারি, তাদের কাছ থেকে ও আরও অনেক কিছু শিখতে পারবে। "

মিস্টার রায় বলেন, "এই ছবিগুলো দেখে কেউ বলতেই পারবে না যে এগুলো সব এক কিশোরীর আঁকা। "

দীপ্তি, দীপ্তমান ও তপতী নানা জনের নানা কথা শুনছিল। কিন্তু কিছুই বলতে পাচ্ছিল না।

কিছুক্ষণ পর যখন দীপ্তির বন্ধুরা দীপ্তির সাথে কথা বলতে লাগল। তখন দীপ্তমান মৃদুস্বরে তপতীকে উপরে যেতে বলল।

দুজনে উপরে নিজেদের ঘরে চলে এলো।

" দীপ্তি যে এত ভালো আঁকতে পারে আমি জানতামই না।"

"আমিও তোমার মত আজই জানলাম। তবে মা হিসেবে আমার তো আগেই জানা উচিত ছিল। তবে কাজ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থেকেছি যে মেয়েটার দিকে বিশেষ নজরই দিতে পরিনি। ওর ভালো লাগা মন্দ লাগা গুলো আমার কাছে আজও অজানা।"

"সত্যিই , আমারা বাবা - মায়েরা নিজেদের শখ, ইচ্ছে সবই সন্তানদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি, তাদের ইচ্ছেটা একবারও জানতে চাইনা। "

হঠাৎ একটা শব্দে দুজনেই দরজার দিকে তাকালো। সেখানে আরতিদেবী নীচে যাবার জন্য তৈরি হয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন।

"তুমি জানো মা আমাদের দীপ্তি কত ভালো....... "

দীপ্তমানের কথা শেষ করতে না দিয়েই আরতিদেবী বললেন, "আমি জানি বাবু। দিদিভাই এর আসল প্রতিভাকে আমিই প্রথম চিনতে পেরেছিলাম। তোমরা কোনো দিনই ওর মধ্যে ওর নিজস্বতাকে খোঁজোনি। তাই তোমারা বুঝতে পারোনি।

ছেলেবেলায় আমাদের অনেকেরই অনেক কিছুই হতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বড়ো হবার পর আমাদের ইচ্ছেগুলো বদলে যেতে থাকে। তখন বাড়ন্ত বোধবুদ্ধি দিয়ে আমাদের বিচার করতে হয় যে কোন কাজটা করতে আমাদের মন থেকে ভালো লাগে। কারন কাজের প্রতি ভালোলাগা না থাকলে ভালোবাসা আসেনা।

ঠিক তেমনি দীপ্তিকে আমি মন প্রাণ ঢেলে আঁকতে দেখেছি। আর ও যে সত্যিই ভালো আঁকে তার প্রমাণ তো তোমারা নিচে গিয়েই পেয়েছো।"

" তার মানে মা আপনি......", তপতী অবাক হয়ে বলল।

" হ্যাঁ, আমিই আকাশকে বলেছিলাম দুপুরে হলরুলটাকে দীপ্তির আঁকা গুলো দিয়ে সাজাতে। যাতে তোমাদের চোখের সামনে দীপ্তির আসল প্রতিভাকে তুলে ধরতে পারি। "

দীপ্তমান দুঃখিত ভাবে বলল, আমরা আমাদের ভুলটা বুঝতে পেরেছি মা।"

তপতী বলল, "আমরা এখন চাই দীপ্তি নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিক। আমরা কেউই ওর উপর নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেব না। ও যা হতে চায় তাই হোক।"

এদিকে এক ঘর লোকের মধ্যেও দীপ্তির নিজেকে খুব একা মনে হচ্ছিল। ঠাম ঠিকই বলেছিল। সে সত্যিই উপলব্ধি করতে পেরেছে তার মনের ইচ্ছেগুলোকে।

হঠাৎ দীপ্তি লক্ষ্য করল যে ঠাম তাকে ডাকছে। সে কাছে যেতেই দেখল পাশে বাবা আর মাও দাঁড়িয়ে আছে।

ঠাম তার কাঁধে সস্নেহে হাত রেখে বলল,"দিদিভাই,এখন নিশ্চয়ই তুমি তোমার প্রতিভাকে চিনতে পেরেছ। ভবিষ্যতে যা হতে চাও তাই হয়েও। কেউ তোমার উপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবেনা। মনে রাখবে তোমার পরিবার সব সময় তোমার সাথে থাকবে।"

এরপর জন্মদিনের কেক কাটা পর দীপ্তমান সকলের সামনে দীপ্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি ক হতে চাও? "