শহীদ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু

অভিজিত মুখোপাধ্যায়,

নতুন দিল্লি

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে ক্ষুদিরাম বসু ছিলেন নির্ভীক অসম সাহসী মৃত্যুভয় শূন্য সশস্ত্র বিপ্লবে বিশ্বাসী এক মহান যোদ্ধা । তিনি ছিলেন রোমাঞ্চপ্রিয় ও ডানপিটে নামে সর্বজনবিদিত এক মরণজয়ী কিশোর । মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে জীবনের জয়গান গাওয়া এক অসম সাহসী প্রতিবাদী যুবক । তিনিই প্রথম বাঙালী বিপ্লবী যাকে ব্রিটিশ সরকার ফাঁসি দিতে এতটুকুও কুণ্ঠাবোধ করেনি বয়সে ছোট হওয়া সত্ত্বেও । কিশোর বিপ্লবী ক্ষুদিরামের ফাঁসির ঘটনায় তৎকালীন ভারতীয় জনসমাজ শোকে-দুঃখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল । স্বাধীনতা আন্দোলনে আত্মবলিদান দিয়ে তিনি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন । আন্দোলন আরও তীব্র গতি লাভ করেছিল । বলা যায় সশস্ত্র বিপ্লবের ক্ষেত্রে ক্ষুদিরাম এক নতুন যুগের প্রবর্তন করেছিলেন । মাত্র পনেরো বছর বয়সে স্বেচ্ছাসেবী হয়ে তিনি বিপ্লবী দলে যোগদান করেছিলেন । ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য তিনি নিজের ইচ্ছায় বিপদ সঙ্কুল পথ বেছে নিয়েছিলেন, যার নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে চিরকাল লেখা থাকবে ।

ক্ষুদিরাম বসু ৩/১২/১৮৮৯ তারিখে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত মেদিনীপুরের নিকটবর্তী (বর্তমান নাম পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা) কেশপুর থানার অধীনে মোহবনি (বর্তমান নাম হাবিবপুর) গ্রামের একটি বাঙালি কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন । তার পিতার নাম ছিল ত্রৈলোক্যনাথ বসু এবং মাতার নাম ছিল লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী । ত্রৈলোক্যনাথ বসু ছিলেন নাড়াজোল রাজবাড়ির তহসিলদার । ক্ষুদিরাম বসু ছিলেন পিতা-মাতার চতুর্থ সন্তান । তিন দিদির পরে তিনিই ছিলেন পিতা-মাতার একমাত্র পুত্র সন্তান । ক্ষুদিরাম বসুর জন্মের আগে তাঁর দুই ভাইয়ের অকাল মৃত্যু হয়েছিল । তাই তৎকালীন সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী পুত্রের মৃত্যুর আশঙ্কায় লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী পুত্রকে তার বড় মেয়ের কাছে তিন মুঠো খুদের বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছিলেন । খুদের বিনিময়ে কেনা হয়েছিল বলে শিশুটির নাম রাখা হয়েছিল ক্ষুদিরাম । ক্ষুদিরাম মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মাতৃহারা হয়েছিলেন । তার এক বছর পরে সে পিতৃহারা হয়েছিলেন । পিতার মৃত্যুর কারণটি ছিল এই রকম -- ত্রৈলোক্যনাথ বসু মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে আদায়কৃত ৩০০০ টাকা তিনি সযত্নে রাজবাড়ির কোষাগারে স্থিত সিন্দুকে তুলে রেখেছিলেন । কিন্তু এক অসৎ ও প্রতারক কর্মী তাঁর সরলতার সুযোগ নিয়ে সেই টাকা সিন্দুক থেকে আত্মসাৎ করেছিল । নাড়াজোল রাজবাড়ির রাজা নরেন্দ্রলাল খান কিন্তু সেদিন ওই টাকা চুরির বিষয় কিছুই জানতে পারেননি । অতঃপর ত্রৈলোক্যনাথ বসু ঘর-বাড়ি, বিষয় সম্পত্তি বিক্রি করে ঐ টাকা রাজকোষে শীঘ্রই জমা দিয়েছিলেন, যাতে সেই লজ্জাজনক ঘটনা সকলের অজানা থেকে যায় । তারপর দুঃখ, শোক, অপমান ও আত্মগ্লানিতে জর্জরিত ত্রৈলোক্যনাথ বসু স্ত্রী লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবীর মৃত্যুর এক বছরের মধ্যেই অকাল মৃত্যুবরণ করেছিলেন ।

বাল্যকালে ক্ষুদিরামের শিক্ষা জীবন শুরু হয়েছিল আনন্দপুরের একটি মিডল স্কুলে । বড় দিদি অপরূপা অনাথ ভাই ক্ষুদিরামকে দাসপুর থানার অন্তর্গত এক গ্রামে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন । অপরূপার স্বামী অমৃতলাল রায় ক্ষুদিরামকে তমলুকের হ্যামিল্টন হাই স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন । সেখানে তিনি চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিলেন । ১৯০১ সালে ১২ বছর বয়সে হ্যামিল্টন হাই স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময়েই ক্ষুদিরাম হয়ে উঠেছিলেন স্কুলের বন্ধুদের সর্দার । রণপার সাহায্যে তিনি তমলুক থেকে মেদিনীপুর প্রায় ৪০ কি.মি. পথ অতি অল্প সময়ের মধ্যে পৌঁছে যেতেন । তমলুকের বর্গভীমা মন্দিরের পাশে জৈনক রক্ষিতদের ছিল একটি দালান বাড়ি, সেখানে তিনি ব্যায়ামাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । সেই আখড়ায় নিয়মিত শরীরচর্চা হত ।

১৯০২ খ্রিস্টাব্দে মেদিনীপুর অঞ্চলে জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু এবং রাজনারায়ণ বসুর প্রভাবে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন গড়ে উঠেছিল । এই গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনের কর্মকান্ড রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয় ব্রিটিশ বিরোধীদের দ্বারা পরিচালিত হতো । সেই সংগঠনের নেতা ছিলেন হেমচন্দ্র দাস কানুনগো । তিনি মেদিনীপুরের রাধানগরের নিবাসী ছিলেন । বিপ্লবী সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন হেমচন্দ্র দাস কানুনগোর সহকারী ।

১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে শ্রী অরবিন্দ এবং ভগিনী নিবেদিতা মেদিনীপুরে এসেছিলেন স্বাধীনতার জন্যে জনসমক্ষে বক্তব্য রাখতে এবং বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে গোপন অধিবেশন করতে । স্কুল পড়ুয়া ছাত্র ক্ষুদিরাম আগ্রহ সহকারে সেই আলোচনা শুনতে যেতেন । তাঁদের জ্বালামুখী বক্তব্য কিশোর ক্ষুদিরামের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করতো । তাঁদের আলোচনায় অংশগ্রহণ করে দেশ মাতৃকার প্রতি তাঁর মনের কোণে ভালোবাসা অঙ্কুরিত হতে শুরু করেছিল । তাঁর মননে গভীর রেখাপাত করেছিল । তখন থেকেই তিনি বিপ্লবী ভাবধারায় উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিলেন । শৈশবে পিতা-মাতাকে হারিয়ে ক্ষুদিরাম কিশোর বয়স থেকেই নিজের সর্বস্ব নিবেদন করেছিলেন দেশের জনসাধারণের মঙ্গল কামনার্থে এবং পরাধীন দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের তাগিদে ।

১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে জামাইবাবু অমৃতলাল রায় তমলুক থেকে মেদিনীপুরে সরকারি কাজে বদলি হয়ে এসেছিলেন । ক্ষুদিরামও তাঁর বড়দিদি অপরূপার স্বামী অমৃতলাল রায়ের সঙ্গে তমলুক শহর ছেড়ে মেদিনীপুরে চলে এসেছিলেন । মেদিনীপুরে আসার পরে অমৃতলাল রায় তাঁকে মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন । কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হওয়া সত্ত্বেও লেখাপড়ায় তাঁর মন বসেনি । এখানে তাঁর প্রধান ভূমিকা হয়ে উঠেছিল বলিষ্ঠ সংগঠকের । পাহাড়পুরী স্বদেশ সমিতি, ভীরমার শাহে শক্তি সমিতি, বসন্ত-মালতী আখড়া সহ নানান স্বদেশীমূলক প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুলেছিলেন । একদিকে শরীরচর্চা অন্যদিকে ভবিষ্যৎ জীবনে যথার্থ বিপ্লবী হওয়ার উপযুক্ত পঠনপাঠন ও শিক্ষাগ্রহণ এই সব কর্মকান্ডের মধ্যেই তিনি বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন । সেই গুপ্ত সমিতিতে অনেকেই আসতেন । কিশোর, যুবকদের চেতনার মান উণ্ণয়নের জন্যে তাঁদের গীতা পাঠ, ‘সন্ধ্যা’, ‘যুগান্তর’ নামক পত্রিকা সকলের অবশ্য পাঠ্য ছিল । মেদিনীপুরেই তাঁর বিপ্লবী জীবনের প্রথম সূত্রপাত ঘটেছিল । একেবারে কৈশোর কালেই তিনি বিপ্লবী কার্যকলাপের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন । মাত্র ১৫ বছর বয়সেই একজন স্বেচ্ছাসেবী হয়ে তিনি গুপ্ত অনুশীলন সমিতিতে যোগদান করেছিলেন । তিনি গুপ্ত সমিতির গোপন বৈঠকে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করতেন । অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই ক্ষুদিরাম তাঁর গুণাবলীর জন্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন । অচিরেই তিনি গুপ্ত সমিতির একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী হয়ে উঠেছিলেন । ক্ষুদিরাম সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সাহায্যে বিপ্লবী দলভুক্ত হয়ে অনুশীলন সমিতিতে আশ্রয় পেয়েছিলেন । ক্ষুদিরাম ছিলেন বিপ্লবী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর হাতে গড়া শিষ্য । তিনি লাঠি খেলা, ছোরা খেলা শিখেছিলেন, শরীরকে সবল ও মজবুত করার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করতেন । বিপ্লবী সত্যেন্দ্রনাথ বসু চেয়েছিলেন, অল্পবয়সী ছেলেদের নিয়ে একটি দল গড়ে তুলতে । ক্ষুদিরাম তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করার পর থেকেই তাঁর জীবন ও ব্যক্তিত্বে বিশেষ পরিবর্তন দেখা দিয়েছিল । ক্ষুদিরাম হয়ে উঠেছিলেন এক অন্য মানুষ । সারাদিন তরুনদের ও সহকর্মীদের শরীরচর্চা শিক্ষা দেওয়া, তাঁত চালানো আর রাতে বিভিণ্ণ পত্র-পত্রিকা পাঠ করা, আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করা এটাই ছিল তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ । কিন্তু কখনো ক্লান্তি তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি । তৎকালীন মেদিনীপুর অঞ্চলের কাঁথি, তমলুক মহকুমার প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জেও তিনি বহু গুপ্ত সমিতি পরিচালনা করতেন । এমন কী সুদূর বাঁকুড়া জেলার ফুরকুসমার নিকটবর্তী ছেঁদাপাথর নামক গ্রামে গিয়ে তিনি বন্দুক চালনার শিক্ষা দিতে যেতেন । ক্ষুদিরাম বিপ্লবী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নির্দেশেই 'সোনার বাংলা' শীর্ষক নামক ভারতে ব্রিটিশ শাসন বিরোধী পুস্তিকা বিতরণের অপরাধে পুলিশের দ্বারা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ।

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বিপ্লবী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর চেষ্টায় বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন খুব জোরালো হয়ে উঠেছিল । বঙ্গভঙ্গের সময় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ক্ষুদিরাম সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন । নবম শ্রেণীর পরে স্কুল ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে । এরপর তাঁর পূর্ণ ধ্যানজ্ঞান হয়ে উঠেছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম । স্কুল ছাড়ার পর ক্ষুদিরাম বিপ্লবী দলের সভ্য হয়েছিলেন এবং ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকা বিতরনে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন । ক্ষুদিরাম এক বছরের মধ্যেই তাঁর সুগভীর আগ্রহ ও দক্ষতার কারণে বোমা রাখা ও বোমা তৈরির কৌশল আয়ত্ত করে ফেলেছিলেন । সেই সময় সাধারণ মানুষ বিদেশী দ্রব্য বর্জন করতে শুরু করেছিলেন । বিলাতি দ্রব্য বয়কট, বিলাতি লবনের নৌকা ডোবানো প্রভৃতি কর্মকান্ডের মধ্যে দিয়ে স্বদেশী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন বিপ্লবী ক্ষুদিরাম । একদিকে স্বদেশী আন্দোলন অন্যদিকে বয়কট আন্দোলনে নিবেদিত প্রাণ ক্ষুদিরাম সেই সময় বড়ই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন । কিন্তু পিছিয়ে আসা তাঁর স্বভাব বিরুদ্ধ কারণ তিনি ছিলেন জন্মগত যোদ্ধা । তাঁর সংকল্প ছিল গ্রামের সকল মানুষকে সত্যিকারের মানুষ করে তোলা । জনগণের সেবা করাই ছিল তার জীবনের একমাত্র ব্রত । অনতিবিলম্বে ছাত্র-শিক্ষকদের সহায়তায় তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘ছাত্রভান্ডার’ । তিনি নিজে পায়ে হেটে মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাড়ি বাড়ি ফেরি করতেন । অবশেষে সংগঠনের অপর ছাত্র-শিক্ষকরাও তাঁকে অনুসরণ করে স্বেচ্ছায় জনগণের সেবায় নিযুক্ত হয়েছিলেন । তিনি নিজে আচরি ধর্ম অপরকে শিক্ষা দিয়েছিলেন । অন্যেরা তাঁর কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন । প্রাকৃতিক দুর্যোগেও মানুষের সাহায্যের জন্য তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে অর্থ সংগ্রহ করতেন । আগামী প্রজন্মকে লড়াই করে কি ভাবে বেঁচে থাকতে হবে সেই মন্ত্রও তিনি বাঙালিকে নিজের জীবন উৎসর্গ করে শিখিয়ে গিয়েছিলেন—

“লড়ো,
না লড়তে পারলে বলো,
না বলতে পারলে লেখো,
না লিখতে পারলে সঙ্গ দাও,
না সঙ্গ দিতে পারলে যারা কাজ করছে,
তাঁদের মনোবল বাড়াও,
যদি তাও না পারো,
যে পেরেছে তাঁর মনোবল কমিয়ো না
কারণ সে তোমার ভাগের লড়াই লড়ছে” ।

১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে কাঁসাই নদীর বন্যার সময়েও বিপ্লবী ক্ষুদিরাম সক্রিয় ভাবে ত্রাণকার্যে অংশ গ্রহণ করেছিলেন । ১৯০৬ সালে স্বদেশীয়ানার বর্ণময় পর্বে নাড়াজোল রাজপরিবারের রাজা নরেন্দ্রলাল খান ক্ষুদিরামের জামাইবাবু অমৃতলাল রায় মহাশয়কে একটি চিঠি পাঠিয়ে একদা তাঁর অধীনে কর্মরত প্রয়াত ত্রৈলোক্যনাথ বসুর পুত্র-কন্যাদের খবরাখবর জানতে চেয়েছিলেন । কারণ রাজকোষের বার্ষিক হিসাবের সময় তিনি ত্রৈলোক্যনাথ বসুর সততার কথা জেনে গিয়েছিলেন । সেই সূত্রে তিনি অমৃতলাল রায় মহাশয়কে চিঠি লিখেছিলেন । ক্ষুদিরামও সেই সময় রাজবাড়িতে উপস্থিত হয়েছিলেন । রাজা গচ্ছিত অর্থ ক্ষুদিরামকে গ্রহণ করতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন । কিন্তু সর্বত্যাগী, সর্বহারা, দেশমাতৃকার চরণে বলি প্রদত্ত ক্ষুদিরামের কাছে সেই অর্থ বোঝা স্বরূপ প্রতীতি হয়েছিল । ক্ষুদিরাম সুখ ভোগের জন্য সেই টাকা নিতে অস্বীকার করেছিলেন । রাজা তাঁকে অনেক অনুরোধ-উপরোধ করেছিলেন সেই টাকা গ্রহণ করার জন্য । অবশেষে বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত ক্ষুদিরাম তাঁর ব্যায়ামাগার ও স্বদেশী ভান্ডার সহ স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা রাজাকে জানিয়েছিলেন । তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিগত প্রয়োজনের পরিবর্তে ওই গচ্ছিত অর্থ স্বদেশী তহবিলে দান করতে অনুরোধ করেছিলেন । সত্যনিষ্ঠ পিতা-মাতার সন্তানরাই ক্ষুদিরাম হয়ে জন্মগ্রহণ করে এই পৃথিবীতে এটাই একমাত্র চিরসত্য ।

রাজা সেদিন নিষ্পাপ, নির্লোভ এক অতি অল্পবয়সী কিশোরের মুখ নিঃসৃত কথা শুনে আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলেন । তাঁর কামনা-বাসনা হীন উদার চরিত্র, দেশের প্রতি তাঁর ঐকান্তিক ভালাবাসা রাজাকে অতিশয় মুগ্ধ করেছিল । ক্ষুদিরাম সেদিন স্বীয় আচরণের দ্বারা নাড়াজোল রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহাশয়কে স্বদেশী মন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছিলেন । ক্ষুদিরামের প্রতিষ্ঠিত ‘ছাত্রভান্ডার’-এ রাজা সেই অর্থ দান করেছিলেন । দেশের শিক্ষা ও স্বাধীনতার স্বার্থে রাজার সেদিন থেকেই পথচলা শুরু হয়েছিল অর্থ আর সহায়তা দিয়ে ।

৬/১২/১৯০৭ তারিখে নারায়ণগড় রেলস্টেশন বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর ক্ষেত্রেও ক্ষুদিরামের অবদান ছিল অনস্বীকার্য । ১৯০৭ সালে কলকাতার গুপ্ত সমিতির প্রথম বোমা প্রস্তুতকারী বিপ্লবী ছিলেন উল্লাসকর দত্ত এবং হেমচন্দ্র দাস কানুনগো । ঐ বছরেই বারীন্দ্র কুমার ঘোষ তার সহযোগী হেমচন্দ্র দাস কানুনগোকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন সেখান থেকে বোমা তৈরীর কৌশল আয়ত্ত করার জন্য । হেমচন্দ্র দাস কানুনগো প্যারিসে নির্বাসনে থাকা একজন রাশিয়ান নিকোলাস সাফ্রানস্কি-এর কাছ থেকে বোমা তৈরির কায়দা শিখে অতি সত্বর দেশে ফিরে এসেছিলেন । ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি বিদেশ থেকে বোম তৈরীর কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন । তিনি ছিলেন মেদিনীপুর অঞ্চলের রাধানগর নিবাসী । তারপর বারীন্দ্র কুমার ঘোষ আর হেমচন্দ্র দাস কানুনগোর সহযোগিতায় আলিপুর প্রেসিডেন্সি বিচারালয়ের মুখ্য হাকিম ডগলাস কিংসফোর্ডকে তাঁদের পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেছিলেন । তাঁরই হাতে ছিল স্বামী বিবেকানন্দের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ভূপেন্দ্রনাথ দও এবং যুগান্তর পত্রিকার অন্যান্য সম্পাদকদের মামলা । তাঁদের বিরুদ্ধে কিংসফোর্ড কঠোর শাস্তি প্রদান করেছিল । কারণ যুগান্তর পত্রিকা দ্বন্দ্বমূলক সম্পাদকীয় লিখে তার প্রতিক্রয়া ব্যক্ত করেছিল । ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে বিরাট আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল যুগান্তর পত্রিকার । যদিও এই ঘটনার দ্বারা নিঃসন্দেহে অনুশীলন সমিতির জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী আদর্শ প্রচারের সহায়ক হয়েছিল । যুগান্তর মামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে বিপ্লবী সুশীল সেনকে গ্রেপ্তার করে তাঁর উপর চাবুক মারার শাস্তি প্রদান করেছিল কিংসফোর্ড । বিপ্লবীদের বিচার ধারায় কুখ্যাত কিংসফোর্ড ছিল এক নরপিশাচ । আলিপুর প্রেসিডেন্সি আদালতে মুখ্য হাকিম হিসেবে কাজে যোগ দেওয়ার সময় থেকেই নবীন রাজনৈতিক কর্মীদের সে ভীষণ কঠোর ও নিষ্ঠুর বাক্য প্রয়োগ করতো । কিংসফোর্ড স্বদেশী কর্মীদের শারীরিক নির্যাতন দিতে বেশি পছন্দ করতো । এই নৃশংস ভূমিকার জন্য তরুণ বিপ্লবীরা তাঁর ওপর বোমা নিক্ষেপের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন । কিংসফোর্ডকে হত্যা করার প্রথম প্রচেষ্টা হয়েছিল বিপ্লবী হেমচন্দ্র দাস কানুনগোর তৈরী বই বোমা দিয়ে কিন্তু সেটা কার্যকর হয়নি । তিনি ছিলেন মেদিনীপুর অঞ্চলের রাধানগর নিবাসী ।

১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে নিরাপত্তার ভয়ে কিংসফোর্ডের পদোন্নতি করে সরকার তাকে বিহারের মুজঃফরপুর জেলার বিচারপতি হিসেবে বদলি করে দিয়েছিল । সেই সময় ব্রিটিশ সরকার কিংসফোর্ডের জীবন বাঁচানোর জন্যে অত্যন্ত সচেতন হয়ে উঠেছিল । নতুন জায়গায় যাওয়ার তাঁদের রীতি অনুযায়ী অনেকেই উপহার দিয়ে তাঁকে আন্তরিক শুভেছা জ্ঞাপন করছিল । সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার অছিলায় বিপ্লবীদের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী হেমচন্দ্র দাস কানুনগো ক্যাডবেরি কোকোর খালি টিনে এক পাউন্ড পিকরিক অ্যাসিড এবং তিনটে ডেটোনেটর রেখে হার্বার্ট ব্রুম রচিত “কমেণ্টারিজ অন দ্যা কমন ল” বইয়ের ফাঁপা অংশে বোম ফিট করে বাদামি কাগজে মুড়ে বিপ্লবী পরেশ মল্লিক কিংসফোর্ডের বাড়িতে দিয়ে এসেছিলেন । তখনকার দিনে এমন একটি বোম তৈরী করার কথা শুনলে আজও শিহরন জাগে । কিংসফোর্ড সেই মুহূর্তে প্যাকেটটা না-খুলে সেলফে রেখে দিয়েছিল । কিংসফোর্ড লন্ডনের আই.সি.এস. পাশ করা একজন ব্রিটিশ বিচারপতি ছিল এবং পুস্তক প্রেমী হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি ছিল প্রচূর । তাই তাঁকে বই উপহার দেওয়া । ভাবতেও অবাক লাগে বাঙলার বিপ্লবীরা কী পরিমাণ বিচক্ষণ, দৃঢ়সঙ্কল্প ও দূরদৃষ্টি সম্পণ্ণ ছিলেন !

প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেলেও অনুশীলন সমিতিতে যুক্ত বিপ্লবীগণ কিংসফোর্ডকে হত্যা করার প্রচেষ্টা জারি রেখেছিলেন । এপ্রিল মাসে বিপ্লবীদের দুই সদস্যের একটা পরিদর্শক দল মুজঃফফরপুর সফর গিয়েছিলেন । তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী । সেখান থেকে তাঁরা ফিরে আসার পরে কিংসফোর্ডকে দ্বিতীয় বার হত্যার প্রচেষ্টায় নবীন ক্ষুদিরামের কাঁধে দেওয়া হয়েছিল বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব । মুজঃফরপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কিংসফোর্ডকে দ্বিতীয়বার হত্যার প্রচেষ্টায় দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছিল প্রফুল্ল চাকী ও দলের কনিষ্ঠতম বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর উপর । দ্বিতীয় বারের মুজঃফরপুর যাত্রায় প্রফুল্ল চাকীর সঙ্গী হয়েছিলেন এক নবীন ছেলে ক্ষুদিরাম বসু । প্রথমে স্থির হয়েছিল প্রফুল্ল চাকীর সঙ্গী হবেন বিপ্লবী কানাইলাল দত্ত । কিন্তু পরে সেই সিদ্ধান্ত বিপ্লবীদের মতে পাল্টাতে হয়েছিল । এবারে তাঁরা বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের তৈরী বোমা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন ।

মুজঃফরপুর জেলায় পৌঁছে তাঁরা দু’জনে নিজেদের নাম বদলে ফেলেছিলেন । বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীর নতুন নামকরণ হয়েছিল হরেণ সরকার আর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর নতুন নামকরণ হয়েছিল দীনেশচন্দ্র রায় । কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত এক দাতব্য ধর্মশালায় তাঁরা আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন । অজ্ঞাতবাসের দিনগুলোতে তাঁরা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন । দুই বিপ্লবী সফলভাবে তিন সপ্তাহের উপর তাঁদের পরিচয় গোপন রাখতে পেরেছিলেন । ৩০/৪/১৯০৮ তারিখ সন্ধ্যায় প্রফুল্ল চাকী এবং ক্ষুদিরাম বসু তাঁদের পরিকল্পনা কার্যকর করার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় হাজির হয়েছিলেন ।

সেই সময় মুজঃফরপুর জেলায় থাকতেন এক ইংরেজ ব্যারিস্টার নাম পিঙ্গল কেনেডী । যার অধীনে একদা বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (বাঘা যতীন) কাজ করতেন । কেনেডী ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তিভোগী এক ভারত প্রেমীক এবং মুঘোল সাম্রাজ্যের উপরে মৌলিক গবেষণার জন্য বিখ্যাত । ভারত সাম্রাজ্য রক্ষার স্বার্থে ইংরেজ সরকার ভারতীয় অর্থের বিনিময়ে সৈন্যবাহিনী মোতায়েন করার বিরুদ্ধে কংগ্রেসের মঞ্চ থেকে তিনি জ্বালামুখী বক্তৃতা করতেন । কেনেডীর উৎসাহেই যতীন মুজঃফরপুরে তরুণদের জন্য ফুটবল ও অ্যাথলেটিক ক্লাব গড়ে তুলেছিলেন । মায়ের মৃত্যুর পরে যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় আর মুজঃফরপুর ফিরবেন না বলে যখন কেনেডীকে জানালেন, কেনেডী সাহেব একটি সুপারিশ পত্র পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন বাংলা সরকারের অধীনে অর্থসচীব পদে নিযুক্ত তাঁর বন্ধু হেনরি হুইলারের কাছে । যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বাংলা গভর্নমেণ্টের অধীনে কলকাতা শহরে ১২০ টাকা বেতনের চাকরি পেয়েছিলেন ।

সেইদিন ইউরোপিয়ান ক্লাবে বসে ব্যারিস্টার কেনেডীর স্ত্রী ও কন্যার সঙ্গে কিংসফোর্ড ও তাঁর স্ত্রী ব্রিজ খেলছিলেন । রাত ৮.৩০ নাগাদ বাড়ি ফেরার জন্য তাঁরা সকলে রওনা হয়েছিলেন । তাঁদের দুটো গাড়িই ছিল একই রকম দেখতে সাদা রঙের । প্রথম গাড়িতে ছিলেন ব্যারিস্টার কেনেডীর স্ত্রী ও কন্যা আর পরের গাড়িতে ছিল কিংসফোর্ড ও তাঁর স্ত্রী । কেনেডী মহিলাগণ কিংসফোর্ডের বাড়ির চত্বর দিয়েই নিজেদের গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন । কিংসফোর্ডের গাড়ি অনুমান করে বিপ্লবী দু’জন দৌঁড়ে গিয়ে ভুলক্রমে মহিলাদের গাড়িতে বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন । একটা প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং গাড়িটা সঙ্গে সঙ্গে কিংসফোর্ডের বাড়ির দোরগোড়ায় আনা হয় । গাড়িটা ভেঙে গিয়েছিল । মিস কেনেডী এক ঘণ্টার মধ্যেই মারা গিয়েছিলেন আর মিসেস কেনেডী ২/৫/১৯০৮ তারিখে মারা গিয়েছিলেন । দ্বিতীয় বার চেষ্টার পরেও বেঁচে গিয়েছিল অত্যাচারী ডগলাস কিংসফোর্ড ।

প্রফুল্ল চাকী এবং ক্ষুদিরাম বসু তারপর পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন । তাঁরা পরস্পরের থেকে বিচ্ছিণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন । যদিও রাতের মধ্যেই ঘটনাটা প্রচার হয়ে গিয়েছিল সর্বত্র । সুর্যোদয়ের পর থেকেই সমস্ত রেলস্টেশনে সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল, যাতে প্রত্যেক যাত্রীর উপর কড়া নজর রাখা যায় । ক্ষুদিরাম ২৫ মাইল পায়ে হেঁটে এক সময় ওয়াইনি নামক এক রেলস্টেশনে এসে পৌঁছেছিলেন (ওয়াইনি রেল স্টেশনের বর্তমান নাম ক্ষুদিরাম বসু পুসা স্টেশন) । যখন একটা চায়ের দোকানে এক গ্লাস জল চাইতে গিয়েছিলেন, তখন ফতে সিং ও শিউ প্রসাদ সিং নামে দুই কনস্টেবলের মুখোমুখি হতে হয়েছিল । তার ময়লা পা এবং বিধ্বস্ত ও ঘর্মাক্ত চেহারা দেখে তাঁদের একটু সন্দেহ হয়েছিল । কয়েকটা প্রশ্ন করার পর তাদের সন্দেহ আরও বেড়ে গিয়েছিল । তারা ক্ষুদিরামকে আটক করেছিল । ক্ষুদিরাম তাদের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় ধস্তাধস্তি শুরু করেছিলেন । কিন্তু সেই মুহূর্তে লুকিয়ে রাখা দুটো রিভলভারের একটা মাটিতে পড়ে গিয়েছিল । অন্য রিভলভারটা দিয়ে কনস্টেবলদের গুলি করতে উদ্যত হওয়ার আগেই কনস্টেবলদের একজন ক্ষুদিরামকে পিছন দিক থেকে মজবুত ভাবে ধরে ফেলেছিল । ক্ষুদিরামের পক্ষে তখন অব্যাহতি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই আর ছিল না । তার কাছে ৩৭ রাউন্ড গোলাগুলি, ৩০ টাকা নগদ, একটা রেলপথের মানচিত্র এবং একপাতা রেলের সময়সারণি পাওয়া গিয়েছিল । বিপ্লবী ক্ষুদিরাম সেই দিন চিরকালের জন্যে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন

অন্যদিকে প্রফুল্ল চাকীও কয়েক ঘণ্টা কষ্ট করে অনেকটা হেঁটেছিলেন । দিনের মাঝামাঝি ত্রিগুণাচরণ ঘোষ নামে এক ভদ্রলোক লক্ষ করলেন যে, এক যুবক তাঁরই দিকে এগিয়ে আসছেন । তিনি অনুমানে বুঝে গিয়েছিলেন যে, প্রফুল্ল চাকীই পলাতক আততায়ীদের একজন । ত্রিগুণাচরণ ঘোষ তাঁকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বিশ্রাম করতে বলেছিলেন । তিনি সেই রাতেই বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীর জন্য অতি সত্বর কলকাতায় ফেরার ব্যবস্থা করেছিলেন । তিনি সমস্তিপুর থেকে মোকামাঘাট যাওয়ার এবং সেখান থেকে হাওড়া যাওয়ার ট্রেনের টিকিটের ব্যবস্থা করেছিলেন । সেই দিন দুর্ভাগ্যবশতঃ ট্রেনের একই বগিতে ব্রিটিশ পুলিশের পদলেহনকারী সব-ইন্সপেক্টর নন্দলাল ব্যানার্জী সফর করছিল । কথোপকথনের মাধ্যমে সে ধরে ফেলেছিল যে, প্রফুল্ল চাকীই হচ্ছেন সেই অন্য বিপ্লবী । শিমুরিঘাট রেল স্টেশনে প্রফুল্ল চাকী যখন জল খাওয়ার জন্যে ট্রেন থেকে নামেন, তখন ব্যানার্জী মুজঃফরপুর থানায় একটা টেলিগ্রাম পাঠায় । মোকামাঘাট রেল স্টেশনে প্রফুল্ল চাকীকে পাকড়াও করার চেষ্টা করে ব্যানার্জী । বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী তাঁর কাছে থাকা রিভলভার দিয়ে নিজের আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন । অবশেষে রিভলভারে যখন আর একটা মাত্র গুলি অবশিষ্ট ছিল তখন পুলিশের হাতে নিজেকে ধরা না দিয়ে অগত্যা নিজের মুখ গহ্বরে গুলি চালিয়েছিলেন ।

১/৫/১৯০৮ তারিখে হাতকড়ি লাগানো অবস্থায় বিপলবী ক্ষুদিরামকে মুজফফরপুর আনা হয়েছিল । মুজফফরপুর রেল স্টেশনে সেদিন ভিড় জমে গিয়েছিল কিশোর ক্ষুদিরামকে দেখার জন্য । ক্ষুদিরাম মুজঃফরপুরে পা রাখার পরে গোটা শহর থানায় ভিড় করেছিল সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর দ্বারা ঘিরে থাকা একটি কিশোর ছেলেকে একপলক দেখার জন্যে । জেলাশাসক মিস্টার উডম্যানের বাড়িতে ক্ষুদিরামকে এনে রাখা হয়েছিল । প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছিল না কিছুই শুধু মাত্র অনুমান ও সন্দেহের ভিত্তিতে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল । এরপর শুরু হয়েছিল বিচারের নামে প্রহসন । হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ক্ষুদিরামের বিচার শুরু হয়েছিল ২১/৫/১৯০৮ তারিখে এবং চূড়ান্তভাবে সেদিন তাঁকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল । রায় শোনার পরে ক্ষুদিরামের মুখে হাসি দেখা গিয়েছিল । তাঁর বয়স ছিল খুবই কম । বিচারক কর্নডফ জানতে চেয়েছিল তাঁকে যে ফাঁসিতে মরতে হবে সেটা সে বুঝেছে কিনা ? মৃত্যুভয় হীন বীর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম মুচকি হেসেছিলেন বিচারকের প্রশ্ন শুনে ।

১১/৮/১৯০৮ তারিখে মহাপ্রাণ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুকে মুজঃফরপুরের কারাগারে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল । ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসির সময় দুজন বাঙালী উপস্থিত ছিলেন । একজন হলেন বেঙ্গলী কাগজের সংবাদদাতা ও উকিল উপেন্দ্রনাথ বসু আর অন্যজন হলেন ক্ষেত্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় । উপেন্দ্র নাথ বসু ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি নিয়ে সেই সময় একটা লেখা লেখেন, নিচে রইল সেই লেখাটি .....

"মজঃফরপুরে আমাদের উকিলদের একটি ছোট্ট আড্ডা ছিল । আমরা প্রতি শনিবার সেখানে একত্রিত হইয়া গল্প করিতাম, রাজা উজির বধ করিতাম । ১লা মে শোনা গেল মজঃফরপুর হইতে ২৪ মাইল দূরে উষা নামক স্টেশনে একটি বাঙ্গালী ছাত্রকে পুলিশ ধরিয়া আনিয়াছে । দৌড়িয়া স্টেশনে গিয়া শুনিলাম পুলিশ ছাত্রটিকে লইয়া সোজা সাহেবদের ক্লাবের বাড়িতে গিয়াছে । সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ উডম্যান তাহার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করিতেছেন ।

পরদিন সকালে ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ উডম্যান বাঙালী উকিলদিগকে নিজের এজলাসে ডাকাইয়া পাঠাইলেন । আমাদের মধ্যে প্রবীন উকিল শ্রীযুক্ত শিবচরণ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সরকারী উকিল । তাঁর সঙ্গে আমরা ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে উপস্থিত হইয়া দেখি, কাঠগড়ায় দাঁড়াইয়া রহিয়াছে একটি ১৫/১৬ বছরের প্রিয়দর্শন বালক । এতগুলো বাঙালী উকিল দেখিয়া ছেলেটি মৃদু মৃদু হাসিতেছে । কি সুন্দর চেহারা ছেলেটির, রঙ শ্যামবর্ণ কিন্তু মুখখানি এমনই চিত্তাকর্ষক যে দেখিলেই স্নেহ করিতে ইচ্ছা করে । উডম্যান সাহেব যখন ছেলেটির বর্ণনা পড়িয়া আমাদের শোনাইতে লাগিলেন, তখন জানিলাম ছেলেটির নাম ক্ষুদিরাম বসু নীবাস মেদিনীপুর । ক্ষুদিরামের বর্ণনা পড়িতে পড়িতে ক্রোধে উডম্যান সাহেবের বদন রক্তবর্ণ ও ওষ্ঠ কম্পিত হইতেছিল । দায়রায় ক্ষুদিরামের পক্ষ সমর্থনের জন্য কালিদাসবাবুর নেতৃত্বে আমরা প্রস্তুত হইতে লাগিলাম । নির্ধারিত দিনে রঙপুর হইতে দুজন উকিল এই কার্যে সহয়তা করিতে আসিলেন । একজনের নাম সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী । এজলাস লোকারণ্য, তিন-চার জন সাক্ষীর জবানবন্দী, জেরা ও বক্তৃতা শেষ হইলে, ক্ষুদিরামের উপর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হইল ।

আদেশ শুনিয়া ক্ষুদিরাম জজকে বলিলো, ‘একটা কাগজ আর পেনসিল দিন, আমি বোমার চেহারাটা আঁকিয়া দেখাই । অনেকেরই ধারণাই নাই ওই বস্তুটি দেখিতে কি রকম’।

জজ ক্ষুদিরামের এ অনুরোধ রক্ষা করিলেন না ।

বিরক্ত হইয়া ক্ষুদিরাম পাশে দাঁড়ানো কনস্টেবলকে ধাক্কা দিয়া বলিল, ‘চলো বাইরে’ ।

ইহার পর আমরা হাইকোর্টে আপিল করিলাম । ক্ষীণ আশা ছিল, যদি মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাব্বজীবন কারাদণ্ড হয় । জেলে তাহাকে এ প্রস্তাব করিতেই সে অসম্মতি জানালো, বলিল ‘চিরজীবন জেলে থাকার চেয়ে মৃত্যু ভালো’ । কালিদাস বোঝাইলেন দেশে এমন ঘটনা ঘটিতেও পারে যে তোমায় বেশিদিন জেলে থাকিতে নাও হইতে পারে । অবশেষে সে সম্মত হইল । কলকাতা হাইকোর্টের আপিলে প্রবীন উকিল শ্রীযুক্ত নরেন্দ্রনাথ বসু হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতা দিলেন । কিন্তু ফাঁসির হুকুম বহাল রহিল ।

১১ আগস্ট ফাঁসির দিন ধার্য হইল । আমরা দরখাস্ত দিলাম যে ফাঁসির সময় উপস্থিত থাকিব । উডম্যান সাহেব আদেশ দিলেন দুইজন মাত্র বাঙালী ফাঁসির সময় উপস্থিত থাকিতে পারিবে । আর শব বহনের জন্য ১২ জন এবং শবের অনুগমনের জন্য ১২ জন থাকিতে পারিবে । ইহারা কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়া শ্মশানে যাইবে । ফাঁসির সময় উপস্থিত থাকিবার জন্য আমি ও ক্ষেত্রনাথ বন্দোপাধ্যায় উকিলের অনুমতি পাইলাম । আমি তখন বেঙ্গলী কাগজের স্থানীয় সংবাদদাতা । ভোর ছ’টায় ফাঁসি হইবে । পাঁচটার সময় আমি গাড়ির মাথায় খাটিয়াখানি ও সৎকারের অত্যাবশকীয় বস্ত্রাদি লইয়া জেলের ফটকে উপস্থিত হইলাম । দেখিলাম নিকটবর্তী রাস্তা লোকারণ্য । সহজেই আমরা জেলের ভিতরে প্রবেশ করিলাম । ঢুকিতেই একজন পুলিশ কর্মচারী প্রশ্ন করিলেন বেঙ্গলী কাগজের সংবাদদাতা কে ?

আমি উত্তর দিলে হাসিয়া বলিল, আচ্ছা ভিতরে যান । দ্বিতীয় লোহার দ্বার উন্মুক্ত হইলে আমরা জেলের আঙ্গিনায় প্রবেশ করিলাম । দেখিলাম ডানদিকে একটু দূরে প্রায় ১৫ ফুট উঁচুতে ফাঁসির মঞ্চ । দুই দিকে দুই খুঁটি আর একটি মোটা লোহার রড যা আড়া-আড়িভাবে যুক্ত তারই মধ্যখানে বাঁধা মোটা একগাছি দড়ি ঝুলিয়া আছে । তাহার শেষ প্রান্তে একটি ফাঁস । একটু অগ্রসর হইতে দেখিলাম ক্ষুদিরামকে লইয়া আসিতেছে চারজন পুলিশ । কথাটা ঠিক বলা হইল না । ক্ষুদিরামই আগে আগে অগ্রসর হইয়া যেন সিপাহীদের টানিয়া আনিতেছে । আমাদের দেখিয়া একটু হাসিল । স্নান সমাপন করিয়া আসিয়া ছিল । মঞ্চের উপস্থিত হইলে তাহার হাত দুইখানি পিছন দিকে আনিয়া রজ্জুবদ্ধ করা হল । একটি সবুজ রঙের টুপি দিয়া তাহার গ্রীবামূল পর্যন্ত ঢাকিয়া দিয়া ফাঁসি লাগাইয়া দেওয়া হইল । ক্ষুদিরাম সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল । এদিক ওদিক একটুও নড়িল না । উডম্যান সাহেব ঘড়ি দেখিয়া একটি রুমাল উড়াইয়া দিলেন । একটি প্রহরী মঞ্চের একপ্রান্তে অবস্থিত একটি হ্যান্ডেল টানিয়া দিল । ক্ষুদিরাম নিচে অদৃশ্য হইয়া গেল । কেবল কয়েক সেকেণ্ড ধরিয়া উপরের দিকের দড়িটা একটু নড়িতে লাগিল । তারপর সব স্থির ।

কর্তৃপক্ষের আদেশে আমরা নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়া শ্মশানে চলিতে লাগিলাম । রাস্তার দুপাশে কিছু দূর অন্তর পুলিশ প্রহরী দাঁড়াইয়া আছে । তাহাদের পশ্চাতে শহরের অগণিত লোক ভিড় করিয়া আছে । অনেকে শবের উপর ফুল দিয়া গেল । শ্মশানেও অনেক ফুল আসিতে লাগিল । চিতারোহণের আগে স্নান করাইতে মৃতদেহ বসাইতে গিয়া দেখি মস্তকটি মেরুদণ্ড চ্যুত হইয়া বুকের উপর ঝুলিয়া পড়িয়াছে । দুঃখে, বেদনায়, ক্রোধে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মাথাটি ধরিয়া রাখিলাম । বন্ধুগণ স্নান শেষ করাইলেন তারপর চিতায় শোয়ানো হইলে রাশিকৃত ফুল দিয়া মৃতদেহ সম্পূর্ণ ঢাকিয়া দেওয়া হইল । কেবল উহার হাস্যজ্বল মুখখানা অনাবৃত রহিল ।

দেহটি ভস্মিভূত হইতে বেশী সময় লাগিলো না । চিতার আগুন নিভাইতে গিয়া প্রথম কলসী ভরা জল ঢালিতেই তপ্ত ভস্মরাশির খানিকটা আমার বক্ষস্থলে আসিয়া পড়িল । তাহার জন্য জ্বালা যন্ত্রনা বোধ করিবার মতন মনের অবস্থা তখন ছিল না । আমরা শ্মশান বন্ধুগণ স্নান করিতে নদীতে নামিয়া গেলে পুলিশ প্রহরীগণ চলিয়া গেল । আর আমরা সমস্বরে বন্দেমাতরম বলিয়া মনের ভার খানিকটা লঘু করিয়া যে যাহার বাড়ি ফিরিয়া আসিলাম । সঙ্গে লইয়া আসিলাম একটি টিনের কৌটায় কিছুটা চিতাভস্ম, কালিদাসবাবুর জন্য । ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলায় সে পবিত্র ভস্মাধার কোথায় হারাইয়া গিয়াছে” ।

"ক্ষুদিরাম হওয়া".......সহজ নয় । যারা নিজেদের সমস্ত সুখ স্বাচ্ছন্দ্য আর যৌবন দেশের জন্য উৎসর্গ করলেন তাদের কি, আমাদের কাছ থেকে আরেকটু "সম্মান"প্রাপ্য নয় কি ?

এ তো মৃত্যু নয়, যেন বিজয় গর্ব । গলায় দড়ি পরার আগে ফাঁসুড়েকে তিনি অপার কৌতূহল বশতঃ প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছিলেন – আচ্ছা, ফাঁসির দড়িতে মোম লাগানো হয় কেন ? নিষ্পাপ প্রশ্ন । ফাঁসুড়ের চোখ দুটো জলে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল, কারণ সেও একজন রক্তে-মাংসে সৃষ্ট মানুষ । জীবিকার তাগিদে সে শুধু কর্তব্য পালন করছিল মাত্র । পরম নির্বিকার চিত্তে সে দড়ি গলায় পরেছিলেন । ফাঁসি হওয়ার সময় ক্ষুদিরামের বয়স হয়েছিল মাত্র ১৮ বছর, ৭ মাস এবং ১১ দিন । পরবর্তী কালে ক্ষুদিরাম বসুকে ফাঁসির মঞ্চে আত্মবলিদানকারী ভারতের কনিষ্ঠতম বিপ্লবী অভিধায় অভিষিক্ত করা হয়েছিল ।

বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর মৃত্যুর পরে ব্রিটিশ সরকারের তরফ থেকে যে তদন্ত শুরু হয়েছিল তাঁর নাম ‘আলিপুর বোমা মামলা’ নামে চিহ্নিত হয়ে আছে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাসে । এরপর বহু বিপ্লবীদের জীবন নরকে পরিণত হয়ে গিয়েছিল । কিন্তু তবুও তাঁরা ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসেননি । শরীরে শেষ রক্তবিন্দুর বিনিময়েও তাঁরা ছিনিয়ে নিতে পেরেছিলেন দেশের স্বাধীনতা । ঐটুকুই ছিল তাঁদের জীবনের স্বার্থকতা । মাতৃভূমিকে তাঁরা কেবল পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন, সুখ ভোগ করার বাসনা ছিল না তাঁদের অন্তরে । তাঁদের জন্মই হয়েছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বাধীন ভারতের সূর্যোদয় দেখাবেন বলে । হিন্দুদের মতো মুসলিমদের সেই তুলনায় আত্মত্যাগের বোঝা বহন করতে হয়নি কখনো । তাঁরা যা চেয়েছিল ব্রিটিশ সরকার তাঁদের সাগ্রহে উপহার দিয়েছিল ভারতকে দিখন্ডিত করে । অবশ্য তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সুবিধাবাদী, ভোগবিলাসী প্রথম সারির স্বার্থপর কিছু ভারতীয় নাগরিক ।

মরণজয়ী ক্ষুদিরামকে কেন্দ্র করে মেদিনীপুরবাসী গীতিকার পীতাম্বর দাস রচনা করেছিলেন সেই কালজয়ী গান - ‘একবার বিদায় দাও মা ঘুরে আসি…’। যে গান শুনলে নিজের অজান্তে এখনো অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে মানুষের চোখের পাতা ।

বাল গঙ্গাধর তিলক, তার সংবাদপত্র ‘কেশরী’-তে দু’জন নবীন যুবককে সমর্থন করে আওয়াজ তুলেছিলেন-- অবিলম্বে স্বরাজ চাই, যার ফলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার দেশদ্রোহিতার অপরাধে তিলককে গ্রেপ্তার করেছিল ।

আজ একবিংশ শতাব্দীর দুই দশক সমাপ্তির পরে পঞ্চম বছরে উপনীত হয়ে আমাদের শুনতে হচ্ছে স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীরা যারা স্বীয় মাতৃভূমির জন্য ফাঁসির মঞ্চে আত্মবলিদান দিয়ে হাসি মুখে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তাঁরা ছিলেন “সন্ত্রাসবাদী” ।

১১/৮/২০২৫ হোয়াটসঅ্যাপ-এ পাওয়া পোস্ট থেকে জানলাম আমাদের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের একটি মন্তব্য – “বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও মুসলিম বিদ্বেষী জঙ্গি ক্ষুদিরামের ফাঁসি দিবস আজ” ।

বাংলাদেশের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, এবার শোনা যাক খোদ মেদিনীপুর অঞ্চলে স্থিত বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা – “বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ সমস্ত কলেজগুলির ষষ্ঠ সেমেস্টারের ইতিহাস অনার্সের সি ১৪ পেপারের “মর্ডান ন্যাশনালিজম ইন ইন্ডিয়া” পরীক্ষা ছিল । ওই পেপারের ‘ক’ বিভাগের ১২ নম্বর দাগের প্রশ্ন ছিল, ‘মেদিনীপুরের তিন জন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নাম করো যারা সন্ত্রাসবাদীদের দ্বারা নিহত হন? মেদিনীপুরের বিপ্লবীদের সন্ত্রাসবাদী আক্ষ্যা বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের” ।

কে জানে স্বর্গের অমৃতলোক বাসী সেই পবিত্র ও মহান বিপ্লবীরা লোকচক্ষুর অন্তরালে দাঁড়িয়ে পরিহাস ছলে হয়তো বলছেন -- হায় ভারতবর্ষ ! যাঁর জন্য করলাম চুরি সেই বলে চোর ?