কাস্তে
গৌরাঙ্গ বন্দ্যোপাধ্যায়,
বালি, হাওড়া
হরেনের চায়ের দোকানে বসে রাজা উজির মারতে মারতে সুবিমলবাবুর নজরে এলো
এঁচোড়ে পাকা ছেলের দল আজ আবার কাজলের পিছনে লেগেছে। ওরা বক দেখাতে দেখাতে
কাজলকে ধাওয়া করছে আর ছড়া কাটছে –
"কাজলদাদা কাজলাদিদি করবে তুমি কি
এই দেখো না তোমার কেমন লেজ লাগিয়েছি।"
কাজল ফিরে ওদের দিকে দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে যাচ্ছে। আর বিড়বিড় করে গালি
দিচ্ছে। ছেলেগুলো হাসতে হাসতে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে আবার কাজলকে বিরক্ত
করতে এগোচ্ছে। এবার কাজল মুখে গালাগালির ফোয়ারা ছুটিয়ে রাস্তা থেকে ঢিল
তুলে ওদের দিকে ছুঁড়তে শুরু করলো।
সুবিমলবাবু খানিকটা আমোদ উপভোগ করছিলেন ঠিকই কিন্তু তাঁর একটু চিন্তাও
হচ্ছিল। তাঁদের বাড়ির বাগানের ঘাসগুলো বেড়ে উঠেছে অনেকটা। ফুলগাছগুলোও
খুব ঝাঁকড়া হয়েছে। ডাল ছাঁটা দরকার। কাজল ছেলেটা (নাকি মেয়েটা) বাগানের
কাজ বেশ ভালোই করে। ওকে দু-একদিনের মধ্যেই কাজে লাগাতে হবে। তাই বুশের
কুয়েত আক্রমণ - বাবরি মসজিদ - মনমোহন সিং - লাইসেন্সরাজ এসব জ্ঞানগর্ভ
আলোচনা ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসে ছেলের দলকে তাড়া দিয়ে ভাগিয়ে দিলেন। তারপর
কাজলকে বললেন, "কাজল, তুই কাল আমার বাড়ির বাগানটা করে দিয়ে যাস। সকাল
আটটার মধ্যে চলে আসিস কিন্তু। আর হ্যাঁ, বাগান করার পর বাড়ির নর্দমাটাও
সাফা করে দিবি। আর মেন গেটের সামনের রাস্তার সব ঘাস ভালো করে তুলে নিবি।
বেড়াল-কুকুরের গু আছে বলে মুখ ব্যাজার করবি না।"
"ঠিক আছে দাদু, আসবো।" বলে কাজল থানার দারোগাবাবুর কোয়ার্টারের পথ ধরে।
আজ ওখানে বাগানের কাজ করার কথা।
এখনকার দারোগাবাবু অমলিন শিকদার মানুষটা ভালো। প্রতি মাসে একবার করে
বাগানের কাজ করান। কাজ শুরুর আগে ও পরে ডাঁটি-ভাঙা-কাপে ভর্তি করে চা
দেন। আর কাজ শেষ হবার পর চারটি রুটি, গুড়, তরকারি এসবও দেন। তার সঙ্গে
কাজের মজুরি বাবদ তিরিশ টাকা। ওর বেশ ক'দিনের খাবার খরচ চলে তাতে। তবে
আগের দারোগাবাবু কৃতান্ত সরখেল ছিল খুব নোংরা মানুষ। তিন বছর আগে সে বদলি
হবার সময় পর্যন্ত খুব ভয়ে ভয়ে থাকতো কাজল। দারোগাগিন্নি না থাকলে কাজল
পারতপক্ষে ও বাড়িতে কাজে যেত না। একদিন কাজল বাগানের কাজে গিয়েছিল
দারোগাবাবু কাজে যাবার পর। দারোগাগিন্নি ছেলেকে আর বাড়ির চাকরকে রেখে
কোথাও বেরিয়েছিলেন একটু পর। কিন্তু তার পরেই কৃতান্তবাবু এসে থানার ড্রেস
ছেড়ে শুধু আন্ডারপ্যান্ট পরে বাগানে চেয়ার নিয়ে বসে সর্ষের তেল মাখতে
শুরু করেছিল।
তাদের এই কলকাতার গা ঘেঁষে থাকা মফস্বল টাউনে এখনও বেশির ভাগ বাড়ির সঙ্গে
ছোট বা মাঝারি বাগান আছে একটা করে। তাই মা মরে যাবার পর যখন লেখাপড়া ছেড়ে
সে পেট চালানোর তাগিদে বাজারে মোট বওয়া, নানা দোকানে ফাইফরমাশ খাটা থেকে
শুরু করে বিভিন্নরকম কাজ করত, তখন একদিন রাজদীপবাবু নিজেদের বিরাট
বাগানের মালির হেল্পার হিসাবে তাকে ডেকেছিলেন। কাজলের মা আগে ঐ বাড়িতে
বাসন মাজত, ঘর পরিষ্কার করত, আবার মালির হেল্পারের কাজও করত। অন্য দুটি
কাজ ততদিনে মানদামাসি ধরে ফেলেছে। কিন্তু বাগানের কাজ সে একেবারেই পারতো
না। এটা যেমন বুদ্ধির, তেমন পরিশ্রমের আর তেমনি দক্ষতার কাজ। কাজলের
কিন্তু গাছপালায় আগ্রহ ছিল ছোট থেকেই। স্কুলে জীবন বিজ্ঞান পড়া মন দিয়ে
শুনতো ও পড়তে গিয়ে সেই ছবি দেখে বাগানের গাছের সঙ্গে মিলিয়ে নিত। অনেক
ফলগাছ, ফুলগাছ সব চিনতো, জানতো। সেবারে মালি সুদেবের সঙ্গে সারাদিন
বাগানের কাজ করে পড়ন্ত বেলায় সানকির থালায় ভাত খেয়ে সে যখন রাজদীপবাবুর
বাড়ি থেকে চলে আসবে, তখন তিনি বললেন, "তুই এবার থেকে প্রতি সপ্তাহে একদিন
এসে সুদেবের সঙ্গে হাত লাগিয়ে বাগানের কাজ করে যাবি। কুড়ি টাকা করে পাবি।
আর ঐখানে যে ঘাসছাঁটা জড়ো করা আছে ওটা তুলে নিয়ে বাজারের সামনের ভ্যাট-এর
মধ্যে ফেলে দিয়ে যাস বাড়ি ফেরার পথে।"
সেইদিন সে বেশ খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের বস্তির ঝুপড়িতে ফিরেছিল। মা
চলে যাবার তিনমাস পর যেন সে পায়ের তলায় কিছুটা মাটি পেয়েছিল। দু'দিন আগেও
ঝুপড়ির মালিক এসে গালি দিয়ে বলে গেছে আট টাকা করে ভাড়া তিন মাস বাকি পড়ে
আছে। আর এক মাসের মধ্যে ভাড়া না মেটালে নাকি 'কেলিয়ে বাপের নাম ভুলিয়ে
দেবে।' আরে বাপের নাম তো সে কবেই ভুলে গেছে। অনেক ছোটবেলায় মাকে ঠেঙিয়ে
সেই যে বাপ কার সঙ্গে ভেগে গেছে, তারপর তো বাপের নাম একবারই শুধু লেগেছিল
তার স্কুলে ভর্তির সময়। সেই নাম আর এতদিন মনে থাকে? তাও যদি বোর্ডের
পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপ করার সুযোগ পেত তখন হয়তো বাপের নাম আবার লাগতো।
কিন্তু মা তো তার বছর খানেক আগেই দু'দিনের জ্বরে শেষ হয়ে গেল।
মনে পড়লো সেদিন দারোগা কৃতান্ত সরখেল তেল মাখতে মাখতে ওকে পিঠে তেল
লাগিয়ে দিতে বলেছিল। "বাগানের কাজ যতটা হয়েছে আজ থাক। হাত ধুয়ে এসে আমার
পিঠে তেল লাগা। তারপর ভাত খেয়ে বাড়ি যাস। কাল এসে বাকি কাজ করিস।" কাজল
পিঠে তেল মাখাতে শুরু করার একটু পরেই ওর হাত টেনে ওকে সামনে এনে বলেছিল,
"আয় এবার আমি তোকে তেল মাখাই।" বলে ওর জামার ভেতর দিয়ে পিঠে বুকে হাত
দিতে গিয়েছিল নোংরা লোকটা। কাজল কোনোরকমে দারোগার তেলে পিচ্ছিল হাত
ছাড়িয়ে ছুটে গেটের কাছে গিয়ে একবার শুধু বলেছিল, "গিন্নিমাকে বলে দেব।"
তারপর দারোগার মুখের ভয়ংকর হাসি দেখে আরো ভয় পেয়ে ছুটে পালিয়ে
বেঁচেছিল।
এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে দারোগা কোয়ার্টারে পৌঁছে গেল কাজল। অমলিনবাবু
থানার দিকে রওনা দিচ্ছিলেন। ওকে দেখে বললেন, "কি রে, এতো দেরি করলি কেন?
গেটের চাবি নে। সব কাজ সেরে গেট বন্ধ করে থানায় গিয়ে আমায় চাবি দিয়ে আসিস
কিন্তু।" বলে হন হন করে হাঁটা লাগলেন থানার দিকে। কাজল নিজের কাজ শুরু
করল।
মা মারা যাবার বছর দুয়েক আগে কাজল প্রথম বুঝতে পারে যে সে তার অন্য
পাঁচটা ছেলে বন্ধুদের মতো নয়। ভয় পেয়ে মাকে বলায় মা ফিসফিস করে বলেছিল,
"এসব কাউকে বলিস না।" সে সেকথা মেনে নিয়েছিল। শুধু তারপর থেকে সে কারো
সামনে খালিগায়ে বেরোতো না। বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলা ছেড়ে দিয়েছিল। শুধু
ডাঙ্গুলি খেলতো, আর মাঝে মাঝে ক্রিকেট। কিন্তু মা চলে যাবার পর তো সেসব
পাট চুকেবুকে গেছে কবেই। এখন তার বন্ধুদের প্রায় সবার মুখ হয় দাড়ি গোঁফ
ভর্তি নয়তো কামানো। আর তার মুখ এখনো মেয়েদের মুখের মতো নির্লোম। গাল ঢুকে
হনুদুটো উঁচু হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু পাতলা ঠোঁট, ভাসা ভাসা চোখ ও মসৃণ
গাল সহ তার মুখ এখনো যথেষ্ট কমনীয় ও রমণীয়।
তার বন্ধুদের কেউ কেউ যেমন রাজীব, অতনু – এরা বোধহয় বোঝে তার কষ্টটা।
কখনো উল্টোপাল্টা কিছু বলে না। কিন্তু সত্যজিৎ, পান্ডব, কুমুদ – এরকম
অন্য কয়েকজন বন্ধু তাকে সুযোগ পেলেই নানান অশালীন ইঙ্গিতবাহী কথা বলে
কষ্ট দেয়। ভদ্রতার সীমারেখা মানে না। তবে সবচেয়ে বেশি রাগ হয় যখন ওর চেয়ে
দশ বারো বছরের ছোট ছেলেগুলোও ওকে খেপায়, বিরক্ত করে, ঢিল ছুঁড়ে গালি দেয়।
কাজলও ইদানিং রুখে দাঁড়িয়ে ওদের বাপ্-মা তুলে গাল দিয়ে ঢিল ছুঁড়ে ওদের
আটকাতে চেষ্টা করে।
কিন্তু কাজলের সবচেয়ে বেশি রাগ ভগবানের উপর। তাকেই সবচেয়ে বেশি গালি দেয়,
অভিশাপ দেয়। কেন তাকেই এই দুর্ভাগ্য সইতে হচ্ছে? কেন তারই ছোটবেলায় বাপ
পালালো? বড় হবার আগেই কেন মা মরে গেলো? আবার তারই কেন এরকম 'ফিফটি-ফিফটি'
দশা হলো? ভগবানের এ কি অবিচার? কাজ করতে করতে সে সারাক্ষণ বিড়বিড় করতে
থাকে। আর যত রেগে যায়, তত রাগ ফলায় ওই স্থানু গাছগুলোর উপর। এখন অবশ্য
মাথাটা খানিক ঠান্ডা হয়েছে। এবার সে মন দিয়ে দারোগা কোয়ার্টারের বাগানের
কাজ শুরু করল।
পরদিন সুবিমলদাদুর বাড়ি কাজে যেতেই বড় গাছ ছাঁটা কাঁচিটা এগিয়ে দিয়ে দাদু
বলে উঠলেন, "দ্যাখ কাজল, এবার কিন্তু ফুলগাছের ডালগুলো নখ ছাঁটার মতো করে
ছাঁটবি, গতবারের মতো আঙ্গুল ছাঁটার মতো করে নয়। গতবার তুই এতো বেশি ছেঁটে
দিয়েছিলি, এমনকি জবাগাছটার ডগা পর্যন্ত ছেঁটেছিলি, যাতে জবা-টগর-গোলাপ সব
ফুলগাছগুলোতে তারপর কদিন একদম ফুল হয়নি। এখনও কম ফুল হচ্ছে। ওরকম ছাঁটলে
কিন্তু এক পয়সাও পাবি না। নে, কাজ শুরু কর।"
ঘন্টা তিনেক টানা কাজ করে কাজল বড় আমগাছটার নিচে একটু জিরোতে বসলো। গা
ঘামে ভেসে যাচ্ছে। কিন্তু ঢোলা জামাটা খোলার উপায় নেই। কোমর থেকে গামছাটা
খুলে মুখ মুছে হাফ প্যান্টের পকেট থেকে বিড়ি বের করে ধরালো। তারপর
গামছাটা ঘুরিয়ে হাওয়া খেতে লাগলো। তখন দেখলো কৃতান্ত সরখেল গেট খুলে
"সুবিমলবাবু আছেন নাকি?" বলে হাঁক পেড়ে বাড়ির দিকে এগোতে গিয়ে বাগানে
তাকিয়ে ওকে দেখতে পেলো। কাজলের মনে ভয়, আতঙ্ক, রাগ একসঙ্গে দাপিয়ে উঠলো।
সে হিংস্র চোখে দাঁত কিরমির করে পুরোনো দারোগার দিকে তাকিয়ে রইলো।
দোতলা থেকে সুবিমলদাদু চটি ফটফটিয়ে নামতে নামতে বললেন, "আরে আপনি! আসুন
আসুন। এদিকে কোথায় এসেছেন?"
"এই তো আমি আপনাদের থানায় আবার আসছি দিন পনেরোর মধ্যেই।" চেঁচিয়ে এটা বলে
কাজলের দিকে ফিরে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো, "কিছু হিসাব বাকি আছে।"
"শেষে কি বললেন? শুনতে পেলাম না।" সুবিমলদাদু সদর দরজা খুলে বললেন।
"কিছু না। বলছি কাজল ভালোভাবে কাজ করছে তো?"
"হ্যাঁ, হ্যাঁ। ও তো দারোগা কোয়ার্টারে কাল বাগান করে এসেছে। ওর হাতের
বাগানের কাজ কিন্তু ভালোই। কি বলেন?"
"সে আর বলতে। আমি আসি। তারপর ওকে ঠিকমতো ব্যবহার করবো। এই এলাকায় এসে
আপনার সাথেই প্রথম দেখা করে গেলাম। আজ আসি কেমন।"
"আচ্ছা আসুন।"
তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে কাজলের দিকে একবার তাকিয়ে কৃতান্তবাবু বেরিয়ে গেলেন।
মাটি থেকে কাস্তেটা তুলে নিয়ে হাতে চেপে ধরে কাজল মনে মনে বললো, "এস
বাছাধন। দেখা যাবে। এই তিন বছরে নখের সঙ্গে, শুধু আঙ্গুল কেন, হাত কিভাবে
কাটতে হয় সেটাও আমি শিখে গেছি।"