কলমের টানে মৃত্যুকে জয়
সুলেখা ভান্ডারী,
কসবা, বালিগঞ্জ
আমি একজন গৃহিণী, একজন মা, একজন স্ত্রী, একজন দিদিমা। সংসারের নানান
দায়িত্ব, সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মাঝেই আমার জীবন এগিয়ে চলেছে।
কিন্তু এই পরিচয়গুলোর আড়ালে আমার আর-একটি সত্তা আছে - আমি একজন
লেখিকা।
সংসারের নিত্যদিনের খুঁটিনাটি, জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত, শারীরিক
অসুস্থতা কিংবা মানসিক ক্লান্তি- সবকিছুর মধ্যেও আমি আঁকড়ে ধরে রেখেছি
আমার কলমকে। কারণ লেখাই আমার মুক্তির আকাশ। লেখার খাতার পাতায় আমি হয়ে
উঠি স্বাধীন; সেখানে কোনো বাধা নেই, কোনো শাসন নেই, কোনো সীমারেখা নেই।
সেখানে আমি আমার নিজের রাজ্যের একমাত্র অধিপতি। কলম যেন আমার তরবারি, আর
শব্দেরা আমার অনুগত সৈনিক। তাদের সঙ্গে নিয়ে আমি অবাধে বিচরণ করি কল্পনা
আর অনুভূতির জগতে। জীবনের বাঁকে বাঁকে নিত্য দিনের চেনা ঘটনা ও আমার মনের
অলিন্দে রূপকথার জাল বোনে। আর সেই রূপকথার রা আমার কলমের ছোঁয়া পেয়ে
রঙিন প্রজাপতির মতো আমার লেখার খাতার পাতায় পাতায় উড়ে বেড়ায়।
অনেকদিন ধরেই হৃদরোগের সমস্যায় ভুগছিলাম। শরীর মাঝেমধ্যে সতর্কবার্তা
দিত, কিন্তু সংসার আর লেখালেখির ব্যস্ততায় সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা
হয়ে ওঠেনি। ভেবেছিলাম, এও হয়তো অন্যসব সমস্যার মতোই কেটে যাবে। কিন্তু
পয়লা বৈশাখের সেই দিনটি আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
সেদিন হঠাৎই শারীরিক অবস্থার এমন অবনতি হলো যে পরিবারের সবাই ভয় পেয়ে
গেল। সন্তানরা প্রায় জোর করেই আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। একের পর এক
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানালেন, হৃদযন্ত্রের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
দ্রুত সিএবিজি (CABG) বা বাইপাস সার্জারি ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।
কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা যেন কেঁপে উঠেছিল। অপারেশন! জীবনের এতগুলো বছর
পার করে এসেও এই শব্দটির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বড় অসহায় মনে হচ্ছিল।
হাসপাতালের সাদা দেয়াল, যন্ত্রের শব্দ আর চিকিৎসকদের গম্ভীর মুখের মাঝে
হঠাৎ করেই মৃত্যুর সম্ভাবনাটা যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
অপারেশনের দিন এগিয়ে এল। অপারেশন থিয়েটারের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে
জীবনের বহু মুহূর্ত একসঙ্গে চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। মনে পড়ছিল ঈশ্বরের
কথা, গুরুদেবের কথা, যাঁদের আশীর্বাদে এতদিনের পথচলা। মনে পড়ছিল প্রয়াত
মা-বাবার মুখ, যাঁদের স্নেহ আর শিক্ষা আজও আমাকে পথ দেখায়। মনে পড়ছিল
দিদিদের কথা, দাদার কথা, ভাইয়ের কথা, যারা শৈশব-কৈশোরের সঙ্গী। মনে
পড়ছিল আমার স্বামী আর সন্তানদের কথা, যাদের জন্যই বেঁচে থাকার এত
আকুলতা। মনে পড়ছিল বন্ধুদের কথা, যারা প্রতি মুহূর্তে আমার পাশে থেকে
আমাকে সাহস যুগিয়ে যেত।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছিল আমার লেখার জগতের কথা।
মেয়ে জামাই স্বামী প্রতিবেশী এমন অনেককে দরজার বাইরে অপেক্ষারত অবস্থায়
রেখে দিয়ে ডাক্তার নার্সদের সাথে ধীরে ধীরে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে
গেলাম। সবার মুখ টেনশানে থমথম করছে, কিন্তু আমি আমার যন্ত্রণাক্লিষ্ট
মুখের উপর টানা স্মিত হাসিটাকে ধরে রেখে সবাইকে যেন বোঝাচ্ছিলাম - "আমি
ভালো আছি, ভালো থাকবো, তোমরাও টেনশন করো না, ভালো থেকো। দেখো সব ভালো
হবে।"
কিন্তু আমি নিজেই দোটানায় ভুগছিলাম। মনে হচ্ছিল, যদি আর সবার মাঝে ফেরা
না হয়, যদি আর কোনোদিন কলম ধরতে না পারি? যদি আর কোনোদিন সাদা কাগজের
বুকে আমার মনের কথা লিখে যেতে না পারি? যদি অসমাপ্ত গল্পগুলো চিরদিনের
মতো অসমাপ্তই থেকে যায়? যদি পাঠকদের জন্য আর কোনো নতুন শব্দের মালা
গাঁথা না হয়?
সেই মুহূর্তে বুঝেছিলাম, লেখালেখি আমার কাছে শুধু একটি শখ নয়; এটি আমার
অস্তিত্বের অংশ। কলমের ডগায় আমি আমার হাসি, কান্না, স্বপ্ন, যন্ত্রণা,
ভালোবাসা, সবকিছুই খুঁজে পাই। লেখাই আমাকে জীবন্ত রাখে।
অপারেশন টেবিলে শুয়ে আমি চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করছিলাম। মনের গভীর
থেকে শুধু একটি কথাই বারবার উঠে আসছিল -"হে ঈশ্বর, যদি আরেকটু সময় দাও,
তবে সবাইকে ভালোবেসে, ভালো রেখে, আমি আবারও লিখব। আবার শব্দের ভেলায়
চেপে মানুষের কাছে পৌঁছব।"
অনিশ্চয়তার এক দোলাচল তখন আমাকে ঘিরে রেখেছিল। জানতাম না সামনে কী
অপেক্ষা করছে। জানতাম না আবার কবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব। জানতাম না
আদৌ ফিরতে পারব কি না। ধীরে ধীরে অ্যানেস্থেসিয়ার প্রভাবে চোখ ভারী হয়ে
এল। কখন যে চেতনা নিভে গেল, তা আমি নিজেও টের পাইনি।
তারপর এক দীর্ঘ অন্ধকার পেরিয়ে আবার যখন চোখ খুললাম, তখন মনে হলো যেন
নতুন করে জীবনকে ফিরে পেলাম। মাথার ভেতর গিজগিজ করছে অসংখ্য ছবি, যেন
আমার স্মৃতির রানী তার অমূল্য পেটিকা খুলে 'স্মৃতির পসরা'- সাজিয়ে
বসেছে। হসপিটালের বেডে শুয়ে যন্ত্রের একটানা বিপ-বিপ শব্দগুলোকে ছাপিয়ে
আমার যুদ্ধ ক্লান্ত শরীরের কান দুটি উৎকীর্ণ হয়ে থাকতো, ক্লান্ত দু
চোখের পাতাকে প্রায় জোর করে খুলে রেখে উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম
কেবিনের দরজার দিকে- কখন ভিজিটিং আওয়ার শুরু হবে আর বাড়ির লোকের
মুখগুলো দেখতে পাবো।
অস্ত্রোপচারের যন্ত্রণা ছিল, শরীর দুর্বল ছিল, সামনে দীর্ঘ পুনর্বাসনের
পথ ছিল। কিন্তু একটি জিনিস তখনও আমার মনে অটুট ছিল - আমার লেখার
ইচ্ছা।
ঈশ্বরের পরম করুনায়, স্বামীর ভালোবাসায়, আর মেয়ে জামাইদের অক্লান্ত
সেবায় আজও সুস্থতার পথে হাঁটছি। শরীর আগের মতো নয়, অনেক বিধিনিষেধ মেনে
চলতে হয়। তবু প্রতিদিন যখন কলম হাতে নিই, মনে হয় আমি জীবনের কাছে আবার
জয়ী হয়েছি। হৃদয়ে সেলাইয়ের দাগ রয়ে গেছে, কিন্তু সেই দাগ আমাকে ভয়
দেখায় না; বরং মনে করিয়ে দেয় আমি মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছি।
আমি জানি, জীবন অনিশ্চিত। কিন্তু যতদিন শ্বাস আছে, ততদিন আমার কলম চলবে।
কারণ লেখাই আমার বেঁচে থাকার শক্তি, লেখাই আমার সাহস, লেখাই আমার
মুক্তি।
হয়তো আমি শুধু একজন সাধারণ গৃহিণী, একজন মা, একজন দিদিমা। কিন্তু যখন
আমি লিখি, তখন আমি শুধু একজন মানুষ নই - আমি এক অদম্য যোদ্ধা, যে কলমকে
সঙ্গী করে জীবনের প্রতিটি অন্ধকারকে অতিক্রম করার স্বপ্ন দেখে।