জীবনের মূল্যবোধ

অনিন্দিতা গুড়িয়া ,

নিউ-দিল্লি

ক্লাস টু তে পড়া ছোট্ট রেহানা, স্কুলবাস থেকে নেমে মা আমিনার হাত ধরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বলল,

- জানো আম্মি, আজ আমি মিতার পাশে বসে ছিলাম। কিন্তু রেশমা আপা জোর করে আমাকে লিলুফার পাশে বসিয়ে দিল। আর নিজের ক্লাসে যাবার আগে চোখ বড় বড় করে বলেছিল - খবরদার মিতার পাশে বসবি না, ওরা হিন্দু। আচ্ছা আম্মি, হিন্দু কি হয়? হিন্দুদের পাশে বসলেই বা কি হয়!
- তুমি এখন অনেক ছোট অতশত বুঝবে না রেশমা আপা যেটা বলছে সেটাই শুন তাতেই তোমার ভালো হবে।
- কিন্তু দিদিমনি যখন আমাদের খেলার মাঠে দৌড়াতে বললেন তখন আমি আর মিতা দুজনই ছুটতে গিয়ে পড়ে যাই, এতে আমার হাঁটু আর মিতার কনুই কেটে গেছে।
- আমিনা সসব্যস্তে বলে উঠলো,
- সে কি! খুব রক্ত বেরিয়েছে! এখনই বাড়িতে গিয়ে ওষুধ লাগিয়ে দেবো সোনা।
- আরে না না আম্মি, দিদিমণি স্কুলেই আমাদের ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আম্মি আমি দেখলাম ওর কোনই থেকে যেমন লাল রক্ত পড়ছিল আমার হাটু থেকেও ঠিক তেমনি লাল রক্ত পড়ছিল। তবে মিতা আর আমি আলাদা কেন? কেন তবে রেশমা আপা ওর পাশে বসতে বারণ করেছিল।

আমিনা শুধু ছোট করে বলে,
- তোমার আব্বু বাড়িতে ফিরলে তার থেকে তুমি জেনে নিও।
- রেহানা বলে,
- আব্বু তো কাল সন্ধ্যেবেলা ফিরবে, তাই না আম্মি?

*******************************************

পরদিন সকালে রেহানা স্কুলে যায়। সারাদিন স্কুল করে আবার বিকাল বেলা স্কুল থেকে ফেরার সময় স্কুল বাস থেকে নামতেই আমিনা রেহানার হাত ধরে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করে।
আবারো রেহানা বকবক করতে করতে আসে,
- জানো আম্মি আজ কি হয়েছে?
- আমিনা বলে
- কি হয়েছে?
- আজ একটা বাচ্চার ধাক্কায় আমার সব টিফিন মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে গিয়েছিল। মিতা ছুটে এসেছিল, তারপর নিজের টিফিন থেকে পুরো অর্ধেক আমাকে খেতে দিয়েছিল। কি সুন্দর রান্না করে মিতার মা। আমি ওর টিফিন খেয়েছি। কিন্তু জানো না সেটা রেশমা আপা দেখে ফেলেছে আর আমাকে খুব বকেছে। বলেছে- ওরা কাফের, নাপাক তুই ওদের জিনিস কেন খেয়েছিস? বলো না আম্মি, কাফের কি হয়, নাপাক কি হয়?

- আমিনা কি উত্তর দেবে বুঝে পায়না, শুধু একটা চাপা নিশ্বাস করে তার বুক ঠেলে বেরিয়ে আসে। সে বলে,
- আজ সন্ধ্যায় তোমার আব্বু ফিরলে তুমি তার থেকে সব জেনে নিও।

সন্ধ্যেটা ধীরে ধীরে নামছিল। আকাশে মাগরিবের আজানের সুর ভেসে আসতেই আমিনা উঠোনে জল ছিটাচ্ছিল। রেহানা বারান্দার পোটে বসে পা দোলাচ্ছিল, চোখ বারবার গেটের দিকে—আব্বু কখন আসবে সেই অপেক্ষায়।

কিছুক্ষণ পরেই গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন রেহানার আব্বু, সেলিম। সারা দিনের ক্লান্তি মুখে, তবু মেয়েকে দেখেই হাসিটা চওড়া হয়ে ফুটে উঠল।

— “এই যে আমার রাজকুমারী! আজ স্কুল কেমন হলো?”

রেহানা দৌড়ে এসে আব্বুর হাত ধরে টেনে ঘরের ভেতর নিয়ে গেল।
— “আব্বু, তোমাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করার আছে।”

আমিনা চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে রইল। সে জানত, আজকের প্রশ্নগুলোর উত্তর তাকে নয়, সেলিমকেই দিতে হবে।

রেহানা একটু গম্ভীর মুখে বলল,
— “আব্বু, হিন্দু কি হয়? কাফের কি হয়? নাপাক মানে কী? আর আমরা কি আলাদা?”

সেলিম প্রথমে একটু চমকে উঠল। তারপর মেয়েকে কোলে বসিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
— “এই প্রশ্নগুলো কে তোমাকে শিখিয়েছে মা?”

রেহানা সব খুলে বলল—মিতা, রেশমা আপা, টিফিন, রক্তের রঙ—কিছুই বাদ রাখল না। বলতে বলতে তার চোখ দুটো ভিজে উঠল।

সেলিম গভীর নিশ্বাস নিল। তারপর বলল,
— “শোন মা, মানুষ আলাদা হয় না রক্তে, কষ্টে বা ভালোবাসায়। মানুষ আলাদা হয় শুধু চিন্তায়।”

সে রেহানার হাতটা ধরে নিজের আঙুল দিয়ে হালকা করে চিমটি কাটল।
— “ব্যথা লাগছে?”

— “হ্যাঁ,” রেহানা বলল।

তারপর সেলিম বলল,
— “এই ব্যথা কি শুধু আমাদের হয়, না মিতারও হয়?”

— “মিতারও হয়,” রেহানা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল।

— “ঠিক তাই। আল্লাহ মানুষকে মানুষ হিসেবেই বানিয়েছেন। কেউ মুসলমান, কেউ হিন্দু—এগুলো বিশ্বাসের নাম, মানুষের গায়ের রঙ বা রক্তের নাম নয়। ‘নাপাক’ মানুষ হয় না মা, খারাপ কাজ নাপাক হয়। আর যে ক্ষুধার্ত বন্ধুকে নিজের খাবারের ভাগ দেয়, সে কখনোই খারাপ হতে পারে না।”

রেহানা একটু ভেবে বলল,
— “তাহলে মিতার টিফিন খাওয়াটা খারাপ কাজ হয়নি?”

সেলিম মৃদু হেসে বলল,
— “না মা। ওটা ছিল খুব সুন্দর একটা কাজ। ভালোবাসার কোনো ধর্ম হয় না।”

আমিনা এতক্ষণে চোখের কোণ মুছতে মুছতে বলল,
— “তোমার আব্বু ঠিকই বলছেন রেহানা।”

রেহানার মুখটা হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
— “তাহলে আমি কি আবার মিতার পাশে বসতে পারি আব্বু?”

সেলিম একটু ভেবে বলল,
— “তুমি কার পাশে বসবে, কার সঙ্গে খেলবে—এটা তোমার মন ঠিক করবে। কিন্তু কখনো কাউকে ছোট করবে না, আবার কাউকে ঘৃণাও করবে না।”

*******************************************

পরদিন সকালে স্কুলে যাবার সময় রেহানা ব্যাগ গুছিয়ে নিল। বাসে উঠে সে নিজেই মিতার পাশে গিয়ে বসল। মিতা হেসে তার হাত ধরল।

রেশমা আপা দূর থেকে তাকাল। রেহানার চোখে আজ আর ভয় নেই—শুধু শিশুসুলভ দৃঢ়তা।

খেলার মাঠে দৌড়ানোর সময় আবারও দু’জনে পাশাপাশি ছুটল। হয়তো আবার পড়বে, আবার রক্ত বেরোবে—কিন্তু সেই রক্তের রঙ হবে একই। লাল।

আর সেই লালের ভেতরেই ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠবে একটাই পরিচয়—

মানুষ