ঝরাপাতার মর্মর

রীতা বিশ্বাস পাণ্ডে,

নিউ-দিল্লি

ফাল্গুনের তপ্ত দুপুরের রোদে তখন সারা শহর যেন ঝিমোচ্ছে। কিন্তু সেই তপ্ত রোদেও এক অদ্ভুত মাদকতা থাকে। কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে তখন আগুনের শিখা লেগেছে। অয়ন তার পুরনো স্টুডিওর জানালার পাশে বসে বাইরের এই পরিবর্তনটা লক্ষ্য করছিল। তার সামনে রাখা ক্যানভাসটা এখনো সাদা, ধবধবে সাদা। গত কয়েকমাস ধরে অয়নের মনে এক অদ্ভুত শূন্যতা কাজ করছে। রঙের তুলি ধরলেই যেন মনে হয় সব রঙ ফুরিয়ে গেছে।

বসন্তের বাতাস যখন জানালার পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকল, তখন একরাশ শুকনো পাতা উড়ে এসে পড়ল তার ঘরে। এই শুকনো পাতার শব্দটা অয়নের খুব চেনা। এটা বিদায়ের সুর। কিন্তু অয়ন জানে, এই বিদায়টুকু না থাকলে বসন্তের সেই রক্তিম পলাশ কখনো ফুটত না। প্রকৃতির এই নিয়মটা বড় নিষ্ঠুর, আবার বড় সুন্দর।

অয়ন ভাবল, তার জীবনটাও কি এখন এই চৈত্রসংক্রান্তির মতো? যা কিছু পুরনো, যা কিছু মলিন, তা আঁকড়ে ধরে রাখার বৃথা চেষ্টা করছে সে। তার স্টুডিওর এক কোণে পড়ে আছে পুরনো কিছু স্কেচ, যেগুলো গত বৈশাখে সে এঁকেছিল। তখন জীবনে ছিল এক অন্যরকম উন্মাদনা। কিন্তু সময় তো কারো জন্য থেমে থাকে না।অয়ন এক কাপ কফি নিয়ে বসলো।
শহরের এই যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে অয়ন ঠিক করল সে গ্রামে যাবে। তার আদি নিবাস সেই অজপাড়াগাঁয়ে, যেখানে এখনো বসন্ত আসে কোকিলের কুহুতানে, যেখানে পলাশ ফুল ঝরে পড়ে ধুলোমাখা মেঠো পথে।
ট্রেন যখন তাকে স্টেশনে নামিয়ে দিল, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। চারদিকে এক মায়াবী আলো। অয়ন দেখল, রাস্তার দুপাশে শিমুল আর পলাশের সারি। ঝোপঝাড়ে উঁকি দিচ্ছে নাম না জানা বুনো ফুল। বাতাসের ঘ্রাণে এক অন্যরকম সতেজতা। সে যখন তার পুরনো বাড়ির সামনে দাঁড়াল, তখন দেখল জরাজীর্ণ আম গাছটার নিচে এক কিশোরী বসে আলপনা দিচ্ছে।
অয়ন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এখন তো সন্ধ্যা হয়ে এল, এখনো আলপনা দিচ্ছ যে?”
কিশোরীটি মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে এক অদ্ভুত সারল্য। সে বলল, “দাদাভাই, কাল যে চৈত্রসংক্রান্তি। পুরনো বছরকে বিদায় দিতে হবে না? আর পরশুই তো নববর্ষ। আমাদের উঠোনটা যদি রঙিন না হয়, তবে নতুন বছর ঢুকবে কোন পথে?”
অয়ন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এক সামান্য কিশোরীর কথায় জীবনের কত বড় এক সত্য লুকিয়ে আছে। আমরা তো সবাই আমাদের মনের উঠোনটা পুরনো দুঃখ আর গ্লানি দিয়ে ভরিয়ে রাখি, সেখানে নতুনের জন্য কোনো জায়গা থাকে না।
চৈত্রের শেষ দিন। গ্রামে আজ সাজ সাজ রব। নীল পূজার প্রস্তুতি চলছে। গাজনের মেলায় ঢাকের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে দূর থেকে। অয়ন দেখল, গ্রামের সাধারণ মানুষগুলো কত অল্পে খুশি। সারা বছরের অভাব-অনটন ভুলে তারা আজ মেতে উঠেছে উৎসবের আমেজে।
বিকেলে অয়ন নদীর ধারে গিয়ে বসল। নদীর জল এখন অনেকটা শুকিয়ে এসেছে, কিন্তু তার কলতান থামেনি। তীরে কাশবনের শুকনো ডগাগুলো বাতাসে দুলছে। সূর্য যখন দিগন্তে ডুবছে, তখন আকাশটা এক মায়াবী সিঁদুরে রঙ ধারণ করল। অয়ন অনুভব করল, এই যে সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে, এটা কেবল একটা দিনের শেষ নয়, এটা একটা গোটা বছরের সমস্ত ক্লান্তি আর ব্যর্থতার বিসর্জন।
সেই সন্ধ্যায় অয়ন তার ব্যাগের ভেতর থেকে স্কেচবুকটা বের করল। অনেকদিন পর তার হাত কাঁপল না। সে আঁকতে শুরু করল—একটি বিশাল পলাশ গাছ, যার অর্ধেক ডাল শুকনো আর বাকি অর্ধেকে ফুটে আছে টকটকে লাল ফুল। নিচে দাঁড়িয়ে আছে একদল মানুষ, যারা পরম আগ্রহে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। রূপকটি ছিল স্পষ্ট—অতীতের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আগামীর স্বপ্ন দেখা।
সূর্য ওঠার আগেই গ্রামের মহিলারা ঘরদোর লেপাপোছা শেষ করে আলপনা দিয়ে সাজিয়ে ফেলেছে। অয়ন যখন ঘুম থেকে উঠল, তখন পাখির কলকাকলিতে চারদিক মুখরিত। সে দেখল, ঠাকুরঘরে মা মঙ্গলঘট বসিয়েছেন। ধূপ-ধুনোর মিষ্টি গন্ধে সারা বাড়ি যেন এক পবিত্র রূপ ধারণ করেছে।
আজ পহেলা বৈশাখ। নতুন সাজে সেজেছে সবাই। অয়ন তার পুরনো পাঞ্জাবিটা ছেড়ে একটা নতুন সাদা পায়জামা আর লাল-সাদা আড়ং পাঞ্জাবি পরল। আজ তার মনে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো হাহাকার নেই। সে বুঝতে পেরেছে, বসন্ত যেমন জীর্ণতাকে সরিয়ে পুষ্পিত হয়, নববর্ষও তেমনি মানুষকে নতুন করে বাঁচার শক্তি দেয়।
গ্রামের চতুষ্পাঠীতে আজ হালখাতা। ব্যবসায়ীরা নতুন খাতা খুলছেন। অয়ন দেখল, সবাই একে অপরকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাই আজ এক সুরে সুর মিলিয়ে বলছে— 'শুভ নববর্ষ'। এই যে মিলন, এই যে একাত্মতা, এটাই তো বাঙালির প্রাণের উৎসব।
দুপুরে গ্রামের বড় দিঘির পাড়ে মেলা বসেছে। অয়ন সেখানে গিয়ে দেখল নাগরদোলা, মাটির পুতুল, আর তালপাতার বাঁশির শব্দে বাতাস উৎসবমুখর। সে একটি মাটির একতারা কিনল। সেই একতারার সুরে যেন মাটির টান মিশে আছে।
বিকালে অয়ন দেখল, বটতলায় এক বাউল দল গান ধরেছে। গানের কথাগুলো ছিল এমন:
"পুরানো দিনেরে ভুলে যাও ওরে মন,
নতুন সাজে সাজাও তোমার আপন বৃন্দাবন।"
অয়ন বুঝল, মানুষের জীবনটা আসলে একটি চক্রের মতো। চৈত্র আসে ঝরিয়ে দিতে, আর বৈশাখ আসে পূর্ণ করতে। বসন্ত সেই পরিবর্তনের সেতু। তার ক্যানভাসে যে রঙের অভাব ছিল, প্রকৃতির এই লাল-সবুজ বৈচিত্র্য আজ তা পূর্ণ করে দিয়েছে।
সেদিন রাত্রে অয়ন যখন আবার তার স্টুডিওর কথা ভাবল, তখন তার চোখে আর কোনো অন্ধকার ছিল না। সে ফিরে যাবে শহরে, কিন্তু সাথে নিয়ে যাবে এই পলাশের আগুন আর নববর্ষের প্রথম সূর্যের তেজ।
বসন্ত আর নববর্ষ—দুটোই আসলে নতুনের জয়গান গায়। একটি আসে প্রকৃতির সাজে, অন্যটি আসে মানুষের হৃদয়ের উৎসবে। অয়নের এই যাত্রা তাকে শিখিয়ে দিল যে, প্রতিটি শেষই আসলে একটি নতুন শুরুর পূর্বাভাস।
গ্রামের মেঠো পথ থেকে যখন সে আবার শহরের দিকে পা বাড়াল, তখন তার কানে বাজছিল ঢাকের সেই চিরচেনা শব্দ। আকাশে তখন পূর্ণিমার চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। অয়ন মনে মনে বলল, “স্বাগতম নববর্ষ। স্বাগতম নতুন জীবন।”
জীবন থেমে থাকে না, ঠিক যেমন ফাল্গুনের শেষে বৈশাখ আসতে বাধ্য। এই আশাবাদই তো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। ধ্বংসের ভেতর থেকেই তো ফিনিক্স পাখির মতো নতুনের জন্ম হয়। আর সেই জন্মের গানটাই হলো পয়লা বৈশাখ।