ঈশ্বর প্রাপ্তি

অনিন্দিতা গুড়িয়া ,

নিউ-দিল্লি

গ্রামের নাম কুলতলি। গ্রামের পাশ থেকে কুলকুল করে বয়ে চলেছে ছোট্ট একটি সোঁতা নদী। ছোট ছোট সবুজ টিলা আর বড় বড় সব গাছপালাতে ঘিরে আছে গ্রামটি । ছোট্ট গ্রাম টি শান্ত, আর একটু সরল সাদাসিধে মানুষে ভরা। সেই গ্রামেরই বাসিন্দা গদাধর কাকা, বয়স পঁয়ষট্টির আসে পাশে, কিন্তু কৌতূহল ছিল পাঁচ বছরের শিশুর মতো।

একদিন টিভিতে কাকা ভক্ত প্রহ্লাদ নামে একটা পুরানো মুভি দেখছিল, হঠাৎ কাকার মাথায় কী যে ঢুকল, বললো-
“আমিও ঈশ্বরকে দেখব!”

ব্যাস! ধীরে ধীরে গোটা গ্রামে ঘোষণা হয়ে গেল।

সকালবেলা গ্রামের একমাত্র চায়ের দোকানে অন্যান্য দিনের মতো আর সকলের সাথে গদাধর কাকা দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল। পাশে দাঁড়িয়ে নাড়ু বললো
- "কাকা আমি শুনলাম তুমি নাকি ঈশ্বরকে খুঁজতে যাবে, তা কখন! "

চা খেয়ে নিজের গামছায় মুখ মুছতে মুছতে কাকা বললেন,
- “আমি কাল থেকেই ঈশ্বর খুঁজতে বেরোব।”

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে হারু বলল,
- “কাকা, ঈশ্বর কি বাজারে বিক্রি হয় নাকি?”

কাকা গম্ভীর হয়ে বললেন,
- “তুমি বোঝো না হারু! মন থেকে ডাকলে ঈশ্বর পাওয়া যায়!”

পরের দিন ভোরবেলা কাকা গামছা, লাঠি, আর একটা মুড়ির থলে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। প্রথমে গেলেন মন্দিরে।

মন্দিরে ঢুকেই বললেন,
- “হে ঈশ্বর! তুমি কোথায়?”

পুজারী ব্রাহ্মণ সত্য সাধন ভটচার্জী মশাই অবাক হয়ে বললেন,
- “এই তো মধুর মুরতি মোহন বংশীধারী তোমার সামনে স্বয়ং দন্ডায়মান!”

কাকা মাথা নেড়ে বললেন,
- “না না, আমি আসল ঈশ্বর চাই, মূর্তি নয়!”

পুজারী মশাই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন।

এরপর কাকা গেলেন জঙ্গলে। সেখানে একটা বড় বটগাছ দেখে (ভক্ত প্রহ্লাদ মুভিতে দেখা থামের কনসেপ্টটা মনে পড়ে গেল, যে থামের ভিতর থেকে ভগবান নরসিংহ স্বয়ং প্রকট হয়েছিলেন।) মনে মনে ভাবলেন -
“এই তো পেয়েছি! ঈশ্বর নিশ্চয় এই গাছের ভিতরে আছেন!”

তিনি গাছের গুঁড়িতে ধাক্কা দিয়ে বললেন,
“ ঈশ্বর আমি জানি তুমি এর মধ্যেই আছো, তাই দেরি না করে বেরিয়ে এসো!”

গাছ অবশ্য কোনো উত্তর দিল না, কিন্তু পাশ দিয়ে যাওয়া এক ছাগল “ম্যাঁ-এএ” করে ডেকে উঠল।

কাকা খুশি হয়ে বললেন,
“আহা! ঈশ্বর কথা বলছেন!”

কাকা বলতে লাগলেন
- "হে ঈশ্বর শুধু ম্যাঁ-এএ বলে শব্দ করলেই তো আমি তোমার কথার কিছু বুঝতে পারছি না, তুমি কি বলতে চাইছো আমার সামনে এসে বল।"

কাকা নিজের লাঠি গামছা মুড়ির থলে সব পাশে মাটিতে রেখে দিয়ে বারবার করে করুন আকুতি জানাচ্ছিল।

এমন সময় একটা দুষ্টু বাঁদর কাকার মুড়ির থলে নিয়ে পালিয়ে গেল। মুড়ির থলিটাকে নিয়ে সে গাছের এডাল থেকে সে ডালে বেয়ে বেড়াচ্ছে। ঘন পাতার ফাঁকে কাকা বাঁদরকে তো দেখতে পাচ্ছে না। কেবল কাকা নিজের মুড়ির থলিটাকে এডাল থেকে ও ডালে সরে সরে যেতে দেখছে।

কাকা তখন চেঁচিয়ে উঠলেন,
- “ঈশ্বর এই ছিল তোমার মনে! আমাকে দেখাতো দিলেই না, উল্টে চোরের মতো আমার মুড়ি নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছো! কোন কথা শুনতে চাই না, হয় আমার সামনে এসে আমায় দেখা দাও, আর নইলে আমার মুড়ি ফেরত দাও!”

সেই পথ দিয়ে ফিরছিল গ্রামের মতি গোয়ালা। সে পাশের গ্রামে দুধ দিতে যেত। কাকার এহেন অবস্থা দেখে মতি গোয়ালা কোনরকমে কাকাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে গ্রামে ফেরত নিয়ে এলো। মতি গোয়ালার মুখে গ্রামের লোকজন এই গল্প শুনে হেসেই গড়াগড়ি।

কাকা কিন্তু থামলেন না। এবার তিনি ঠিক করলেন উপবাস করবেন। সবাই অনেক করে বোঝালো, কিন্তু তিনি নিজের গোঁ ধরে বসে রইলেন, উপোস তিনি করবেনই। ব্যাস এরপর তিনদিন না খেয়ে বসে থাকলেন।

চতুর্থ দিন সকালবেলা কাকার অবস্থা আর চোখে দেখা যায় না, চোখ মুখ শুকিয়ে এই এতোটুকু হয়ে গিয়েছে ।গলা থেকে শব্দ বেরোচ্ছে না, কেবল চিঁ চিঁ করে একটু ক্ষীন আওয়াজ বেরোচ্ছে। সবাই বলাবলি করছে
-"এইবার বুঝি গদাধর কাকা মরল বলে।"

এইসব দেখে শুনে পাশের বাড়ির পিঙ্কি এসে বলল,
- “কাকা, মা তোমার জন্য গরম খিচুড়ি পাঠিয়েছে।”

কাকা খিচুড়ির গন্ধ পেয়ে আর থাকতে পারলেন না। এক নিমেষে পুরো এক থালা খিচুড়ি সাফ। তারপর হঠাৎ চোখ বড় বড় করে বললেন,
“আহা! এই যে খিচুড়ি খেয়ে আমার জীবনে প্রাণ ফিরে এলো, আসলে এটাই তো ঈশ্বর!”

সবাই অবাক।

কাকা বললেন,
- “যখন খুব খিদে পায়, তখন যে জিনিসটা আনন্দ দেয় সেইটাই ঈশ্বর!”

হারু হেসে বলল,
“তাহলে আমার জন্য ঈশ্বর হলো লুচি-আলুরদম!”

নাড়ু বললো,
- "আমার জন্য ঈশ্বর হলো বিরিয়ানি।"

মতি গোয়ালা বললো,
- "দুধ দুইতে আমার খুব ভালো লাগে। "

পিংকি বলল,
- "আমি খাবার খাইয়ে খুব আনন্দ পাই।"

চা দোকানের সুবোধ খুড়ো বললে,
- "ভালো চা করতে পারলেই আমার মনটা আনন্দে নেচে ওঠে।"

কাকা মাথা নেড়ে বললেন,
- “ঠিকই বলেছো! ঈশ্বর সবার কাছে আলাদা আলাদা!”

তারপর থেকে কুলতলি গ্রামে কেউ যদি বলে “ঈশ্বর কোথায়?”-

সবাই একসাথে বলে,
- “যেখানে তোমার মন খুশি হয়, সেখানেই ঈশ্বর!”