রচনা -গরু
অনিন্দিতা গুড়িয়া ,
নিউ-দিল্লি
ছোট্ট মিতুল তার মা বাবা দাদু ঠাকুমার সাথে শহরে বসবাস করে। তবে তার বাবা
মা দুজনেই নিজের নিজের কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। তাই মিতুল প্রায় জন্ম
থেকেই দাদু ঠাকুমার কাছেই মানুষ। সে দাদু ঠাকুমার নয়নের মনি।
কতই বা বয়স হবে মেয়েটার, বড়জোর সাড়ে চার পাঁচ বছর হবে। এই বয়সেই
পড়ার চাপে তার মাথা তোলার সময় নেই। নতুন ক্লাসের বাংলা টিচার বন্দনা
মিস ভীষণ কড়া ধাতের মানুষ। একটু এদিক ওদিক হলেই ভীষণ বকা দেন। ছোট্ট বলে
মাফ করেন না একটুও। তাই বাচ্চারা তাঁর ক্লাসে তটস্থ। মিতুল এবারে লোয়ার
কেজি থেকে আপার কেজিতে উঠেছে।
নতুন ক্লাসের প্রথমদিন। ক্লাসে এসেই বন্দনা মিস গরুর রচনা লিখতে দিলেন।
প্রথম কয়েক মিনিট জিক খসখস জিক ইত্যাদি শব্দ করে ব্যাগের চেইন খোলা,
খাতা পেনসিল বের করা, ব্যাগের চেইন বন্ধ করা পর্যন্ত নানান শব্দ হবার পরই
পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই লেখায় ব্যস্ত। মিতুলও লিখছে। বন্দনা
মিস ঘুরে ঘুরে দেখছেন। হঠাৎ তিনি মিতুলের পাশে এসে দাঁড়িয়ে গেছেন, টান
মেরে খাতাটাকে উঠিয়ে নিয়েছেন হাতে, তারপর চিৎকার করে ওঠেন-
" অসভ্য মেয়ে, গরুর রচনাও লিখতে শিখনি! গরুর দুটি পা, একটি চোখ, একটি
কান ও দুইটি শিং আছে! তুমি গরুও দেখনি কোনদিন?"
ভয়ে ভয়ে মিতুল মাথা হেলিয়ে জবাব দিল, সে দেখেছে।
-"কোথায় দেখেছো এমন চেহারার গরু? "
বেচারি মিতুল ভয়ে একপ্রকার জড়োসড়ো হয়ে ব্যাগ থেকে টেনে বার করল তার
একটা বই । আর সেই বইয়ের পাতায় হাট কবিতায় গরুর গাড়িতে জোড়া গরুটার
ছবি দেখিয়ে দিল। গতকাল সন্ধ্যেবেলাতেই দাদু খুব সুন্দর করে হাট কবিতাটি
আবৃত্তি করে শুনিয়েছিল তাকে, আর সেই সাথে ছবিটাও দেখেছিল মিতুল। সত্যিই
ছবির সেই গরুর দুটো পা, একটা চোখ, একটা কান আর দুটো শিং দেখা যাচ্ছে।
আবার চেঁচিয়ে উঠলেন বন্দনা মিস -'চিড়িয়াখানায় গেছো কোনদিন? সেখানে
থাকা বাঘ, সিংহ, হাতি দেখনি? জানোয়ার কখনো দুপায়ের হয়? বাড়িতে পোষা
কুকুর বেড়ালও তো দেখেছো হবে? এই সাধারন বুদ্ধি টুকুও হয়নি!"
ক্লাসের অন্যান্য বাচ্চারা সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।
সত্যিই তো, মিতুলের বড্ড ভুল হয়ে গেছে। সে তো দাদু ঠাম্মির সঙ্গে
চিড়িয়াখানায় গেছে। কই সেখানে তো দু পেয়ে জানোয়ার একটাও দেখেনি।
তাদের নিজেদের বাড়িতে কোন কুকুর বা বিড়াল নেই বটে, তবে যখনই তাতানের
ঘরে গেছে সেখানে কুকুর এবং বেড়াল দুটোই দেখেছে সে। নাইবা দেখল গরু,
কিন্তু বাকি জানোয়ার তো দেখেছে সে। মিতুল ছোট হলেও খুব বুদ্ধিমতী, সে
নিজের ভুল সহজেই বুঝতে পেরেছে।
এইবারে মিতুল আগের লেখা রচনাটাকে কেটে দিয়ে নতুন পাতায় নতুন করে গরুর
রচনা লিখছে-
রচনা- গরু
গরু একটি জানোয়ার। তাই তার চারটি পা, দুটি কান, দুটি চোখ, দুটি শিং ও
একটি লেজ আছে। এই পর্যন্ত মিতুলের বেশ মনে ধরেছে, ঠিকঠাকই লিখেছে সে।
এবারে আর বন্দনা মিস তাকে বকতে পারবে না, আর ক্লাসের সবাইও তার রচনা শুনে
হাসবে না। কিন্তু এরপরেই আসল গন্ডগোল শুরু হলো। বইয়ের ছবিতে তো গরুর রং
কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তাহলে গরু কি রঙের হয়? মিস কে জিজ্ঞেস করলেই
এক্ষুনি বকা খাবে। তার চেয়ে ও যেমন যেমন দেখেছে তেমন তেমনই লিখবে। যেমন
ভাবা তেমন কাজ, একটু ভেবে নিয়ে মিতুল আবার লিখতে শুরু করল-
গরু হলদে কালো (বাঘের মত), সাদা কালো ছোপ ছোপ (ভূলোর মত) কুচকুচে কালো
(মেনির মত) হয়। গরু, মাংস- (বাঘের মতো), রুটি তরকারি (ভুলোর মত), দুধ
ভাত (মেনির মতো), আর কলা গাছ (হাতির মত) খায়। গরু নানা রকম শব্দ করে
ডাকে, যেমন হালুম, ভৌ ভৌ, মেঁউ ইত্যাদি।
গরু কামড়ে দিলে ডাক্তারের কাছে গিয়ে ইনজেকশন লাগাতে হয়, নইলে খুব
খারাপ একটা অসুখ করে লোক মরে যায়। তবে গরুর নাকটা কখন হাতির শুঁড়ের মত
হয় জানা নেই! বোধ হয় যখন গরুর সর্দি হয়।
ঘন্টা পড়ে গেল, বন্দনা মিস সকলের খাতা জমা নিলেন।
পরদিনই স্কুল থেকে মিতুলের গার্জেন কল করা হলো। স্কুলের ডাকে মিতুলের
দাদু স্কুলে এসে দেখা করলেন বন্দনা মিসের সাথে। বন্দনা মিস দাদুকে সাথে
করে হেডমিস্ট্রেসের ঘরে এলেন এবং হেড মিস্ট্রেস এর সামনেই মিতুলের রচনার
খাতাটি দাদুকে পড়ে শোনাতে বললেন। রচনা পড়ে দাদু একটুও বকলেন না
মিতুলকে। তিনি যা বোঝার বুঝে গেছেন। মিতুলকে কোলে করে বাড়িতে এনে
মিতুলের ঠাম্মিকে বললেন -
"গোছগাছ করে নাও। এই ইঁট-কাঠ পাথরের জঙ্গলে না থেকে যান্ত্রিক জীবনের
জাঁতা কলে পিষে কিছুতেই তিনি মিতুলের শৈশব কে নষ্ট করে তাকে রোবট বানাতে
পারবেন না। মিতুলের এই তথাকথিত শিক্ষা ব্যবস্থার যান্ত্রিক রোবোটিক
শিক্ষার থেকে অনেক বেশি প্রয়োজন এই প্রকৃতিকে চেনা জানা। ওর মা বাবা
ওদের মত নিজের নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকুক, চলো আমরা প্রকৃতির মাঝে
সবুজের সমারোহে আমাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়েই থাকবো। আর সেখানেই
প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে মিতুল তার প্রাইমারি শিক্ষার পাঠটা শিখবে।