এক দুর্গা, বহুরূপে বাংলা:
প্রচলিত দশভুজার আড়ালে বাংলার বিচিত্র
দুর্গারূপ ও লোকঐতিহ্য
সুচিত্র রঞ্জন পুরকাইত,
ডায়মন্ড হারবার, দক্ষিণ 24 পরগনা
বাংলায় দুর্গাপূজা মানেই কি শুধুই সিংহবাহিনী দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী?
চোখ বন্ধ করলে আমাদের সামনে যে প্রতিমাটি ভেসে ওঠে—দশ হাতে দশ অস্ত্র,
পদতলে মহিষাসুর, পাশে লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ—সেটিই অবশ্য বাংলার
সর্বাধিক পরিচিত দুর্গারূপ। কিন্তু বাংলার মাটি বড় বিচিত্র। এই মাটিতেই
কোথাও মা দুর্গার মুখ পোড়া, কোথাও তিনি শিকলবাঁধা, কোথাও তাঁর হাত মাত্র
দুটি, কোথাও চারটি, কোথাও তিনি শিবের কোলে উপবিষ্টা, আবার কোথাও একই
প্রতিমায় দুর্গা ও কালীর মিলন। এই প্রতিটি রূপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোনও
পরিবার, কোনও অঞ্চল, কোনও লোকবিশ্বাস কিংবা কোনও বিশেষ ধর্মীয়
ভাবধারা।
ক্যানিংয়ের পোড়ামুখী দুর্গা।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিংয়ের ভট্টাচার্য পরিবারের দুর্গা অন্য সব
প্রতিমার থেকে সহজেই আলাদা। দেবীর মুখ কালো, আর শরীর ঝলসানো তাম্রবর্ণের।
পরিবারের পুজোর সূত্র অবিভক্ত বাংলার ঢাকার বিক্রমপুরের বাইনখাঁড়া
গ্রামের সঙ্গে যুক্ত। পরিবারের প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, এক অগ্নিকাণ্ডে
দুর্গাদালান ও প্রতিমা পুড়ে যায়। পরে গৃহকর্তা রামকান্ত ভট্টাচার্য
স্বপ্নাদেশ পান—পুজো বন্ধ করা যাবে না, সেই পোড়া রূপেই দেবীর আরাধনা
করতে হবে। সেই থেকেই পোড়ামুখী দুর্গার প্রচলন। এখানে গণেশও প্রচলিত
অবস্থানের বিপরীতে দেবীর বাঁদিকে থাকেন। এককালে মহিষ বলির রীতি থাকলেও
বর্তমানে ফল বলি হয়।
বাঁকুড়ার মেজিয়ার শিকলবাঁধা দুর্গা।
পাল পরিবারের দুর্গাপূজা আড়াই শতাব্দীরও বেশি পুরনো। এখানে দেবীর
প্রতিমা ও আসনের কাঠের পাটাতন শিকল দিয়ে মন্দিরের দেওয়ালের লোহার আংটার
সঙ্গে বাঁধা থাকে। পরিবারের লোকবিশ্বাস—মা নাকি অত্যন্ত চঞ্চলা; পুজোর
সময় তাঁর বেদি নড়ে উঠত, তাই তাঁকে স্থির রাখার জন্য এই শিকল। এই ঘটনার
নির্দিষ্ট লিখিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই; ফলে এখানে ইতিহাসের চেয়ে পারিবারিক
স্মৃতিই প্রধান। এই পুজোয় পশুবলির পরিবর্তে মাসকলাই উৎসর্গ করার রীতিও
রয়েছে।
চুঁচুড়ার বড় শীলবাড়ির দ্বিভুজা শিবদুর্গা।
এখানে দেবীর হাত মাত্র দুটি, কোনও অস্ত্র নেই, মহিষাসুরও নেই। তিনি অভয় ও
বরদানের ভঙ্গিতে শিবের সঙ্গে একচালার মধ্যে বিরাজ করেন। হুগলির
সুবর্ণবণিক পরিবারগুলির বৈষ্ণব ভাবধারার প্রভাবেই এই নিরস্ত্র,
শান্তিদাত্রী রূপকে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে শীলবাড়ির পারিবারিক পুজো পুরনো
হলেও বর্তমান দ্বিভুজা শিবদুর্গার রূপটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক; তার
আগে এখানে ঘটপূজার প্রচলন ছিল।
বড়শুলের হরগৌরী।
পূর্ব বর্ধমানের দে বাড়িতে দেবী দশভুজা নন, দ্বিভুজা; তিনি মহাদেবের বাম
উরুর উপর উপবিষ্টা—হরগৌরী রূপে। সঙ্গে রয়েছেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক
ও গণেশ। পরিবারের প্রচলিত ইতিহাসে পুজোর বয়স আড়াই শতকেরও বেশি। এই
প্রতিমায় যুদ্ধের চেয়ে দাম্পত্যের স্নিগ্ধতা ও শক্তি-শিবের অবিচ্ছেদ্য
ঐক্য যেন বেশি স্পষ্ট।
সোমড়ার ত্রিভুজা দুর্গা।
হুগলির সোমড়ায় সেন পরিবারের দুর্গা দশভুজা নন—তিনি ত্রিভুজা। পরিবারের
ইতিহাসে বলা হয়, রামচন্দ্র সেন ধ্যানের মধ্যে দেবীর এই বিশেষ রূপ দর্শন
করেন। পিছনে থাকা সাতটি হাত আড়াল করা থাকে; দৃশ্যমান তিন হাতে রয়েছে
খড়্গ, ত্রিশূল ও সাপের লেজ। বৈষ্ণব মতে এখানে পূজা হয়। এই প্রতিমা যেন
মনে করিয়ে দেয়—দেবীর শক্তি হাতের সংখ্যায় নয়, তাঁর তত্ত্বে।
বীরভূমের মারগ্রামের চতুর্ভুজা দুর্গা।
মজুমদার বাড়িতে দেবী চারভুজা। এক হাতে ত্রিশূল, এক হাতে খড়্গ, অন্য দুই
হাতে চক্র ও শঙ্খ। এই পরিবারের পূজায় পশুবলি নেই; নবমীর যজ্ঞেও বলির
পরিবর্তে নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয়। পুজোর আগে ছিন্নমস্তার আরাধনাও হয়।
শাক্ত ঐতিহ্য ও পারিবারিক কুলাচারের এক স্বতন্ত্র সমন্বয় এখানে দেখা
যায়।
মেদিনীপুরের মুখার্জি বাড়ির দ্বিভুজা দুর্গা।
প্রায় তিন শতাব্দী ধরে চলে আসা এই পুজোয় দেবী দ্বিভুজা এবং প্রচলিত
মহিষাসুরমর্দিনী রূপে নন। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, এই পুজোর সূত্র
স্বপ্নাদেশের সঙ্গে যুক্ত এবং পুরনো কাঠামোতেই আজও প্রতিমা নির্মিত হয়।
বাংলার বহু পরিবারেই স্বপ্নে পাওয়া দেবীর রূপকে পরবর্তী প্রজন্ম
কুলাচারের অংশ করে নিয়েছে।
বিষ্ণুপুরের মৃন্ময়ী।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, মৃন্ময়ী মন্দিরের প্রতিষ্ঠা রাজা জগৎ
মল্লের সময়, ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। রাজাকে
দেবী স্বপ্নে মন্দির নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন—এমন কাহিনিও প্রচলিত।
মল্লরাজাদের কুলদেবী হিসেবে মৃন্ময়ীর আরাধনা বিষ্ণুপুরের রাজনৈতিক ও
সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একসময় মল্লরাজারা শাক্ত ছিলেন
এবং তন্ত্রমতে দেবীর আরাধনা করতেন।
বাংলার এই বিচিত্র দুর্গারূপগুলির দিকে তাকালে একটি কথাই মনে হয়—দুর্গা
এক, কিন্তু তাঁকে দেখার চোখ বহু। কোথাও তিনি অগ্নিদগ্ধ হয়েও অমর, কোথাও
চঞ্চলা হয়েও শিকলবন্দি, কোথাও অস্ত্রহীন শান্তিদাত্রী, কোথাও শিবের
সহধর্মিণী, কোথাও রাজবংশের কুলদেবী। শাস্ত্র, লোকবিশ্বাস, পারিবারিক
স্মৃতি, আঞ্চলিক শিল্পরীতি এবং মানুষের ব্যক্তিগত ভক্তি—সব মিলিয়েই
বাংলার দুর্গা পেয়েছেন তাঁর অগণিত রূপ।
তাই বাংলার দুর্গাপূজাকে শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রতিমার উৎসব বললে তার
সম্পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় না। বরং বলা যায়—বাংলার প্রতিটি প্রাচীন
দুর্গাদালানে মা যেন নতুন করে নিজের একটি মুখ প্রকাশ করেছেন। সেই বহুরূপী
মায়ের ইতিহাসই বাংলার সংস্কৃতির এক অনন্য সম্পদ।