দোলাচল
অনিন্দিতা গুড়িয়া,
নিউ-দিল্লি
আজ অনেকদিন পর একটু মাছ যোগাড় করতে পেরেছে নিরু। গত প্রায় ছ মাস ধরে বর
তার বিছানা শয্যা। সঞ্চয় যেটুকু ছিল তাও ফুরিয়েছে অনেক আগেই, এখন
দুবেলা ডাল ভাত যোগাড় করা ও মুশকিল। মাছ তো এখন কল্পনা মাত্র।
তাও ভালো, পাড়ার নগেন খুড়োর দয়ায় বাচ্চা দুটো ভাতের সাথে আজ একটু মাছ
পাবে। বাচ্চা দুটোর আনন্দ আর ধরে না।
মাছ কাটা, ধোয়া, রান্না করা, সব কিছুর সময় বাচ্চা দুটো নিরুর গায়ে
গায়ে ঘুরতে থাকে।
রান্না শেষে রান্নাঘর লেপা, পোছা করে শাশুড়িকে ডাক দেয় নিরু,
- "মা আপনি খেয়ে নিলে তারপর ওরা খাবে। "
বিধবা শশী বালা তার নিরামিষ সিদ্ধ ভাত খেয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে
বললেন,
- "এবারে তোমরা খেতে বসো বৌমা।"
- "হ্যাঁ মা, আপনার ছেলের দুধ সাবু ঠান্ডা করতে দিয়েছি, ওনাকে দুধ সাবু
খাইয়ে তারপর আমরা খাব।"
- "খাবার গরম থাকতে থাকতে খেয়ে নাও, ভালো লাগবে। খোকাকে আজ আমি খাইয়ে
দিচ্ছি। বাচ্চা দুটোকে আর অপেক্ষা করিও না।"
ভাত মাছ তরকারি বেড়ে দিয়ে সবে নিরু নিজের জন্য ভাত বাড়তে যাবে, এমন
সময় -
- বৌমা............বলে চিৎকার করে ওঠেন শশীবালা।
ভাত ফেলে নিরু ছুটে যায় তাদের শোবার ঘরে। ঘরে ঢুকেই নিরু থ হয়ে যায়।
দুধ সাবুর বাটি হাতে বিছানার পাশে ছেলের মাথার কাছে স্থবির হয়ে
দাঁড়িয়ে শশীবালা, আর তার চোখের জলে মুখ বুক ভেসে যাচ্ছে। কি হয়েছে
বুঝতে সময় লাগে না। চিৎকার করে কাঁদতে যায় নিরু, শ্বশুড়ী শশীবালা হাত
দিয়ে চেপে ধরেন তার মুখ। তারপর আস্তে আস্তে প্রায় ফিসফিস করে বলেন,
- "যাও বৌমা কাঁদার জন্য তো তোমার চিরটা কাল পড়ে রইল, এখন বাচ্চাদের
খাইয়ে নিজেও খেয়ে নাও।"
শোকে বিহ্বল; বিষ্ময়ে হতবাক নিরু বলে ওঠে,
- "কি বলছেন মা, এই সময় আমি খাবো! তাও মাছ ভাত!"
কাপড়ের আঁচলে চোখের জল মুছে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাশুড়ি শশীবালা বলেন,
- " যে যাবার সে তো চলে গেছে, যারা আছে এখন তাদের মুখের দিকে আমায়
তাকাতে হবে। তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা আমায় করতে হবে। তুমি না
খেলে বাচ্চা দুটো যে বসে আছে বৌমা। মাছ ভাতের খুশি কি তুমি দেখনি ওদের
চোখে মুখে!"
অগত্যা নিরু আস্তে আস্তে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে, তারপর রান্নাঘরে ঢুকে
নিঃশব্দে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে ভাত খায়। অনেক দিনের আকাঙ্ক্ষিত মাছ-
ভাত!