এক টুকরো স্বপ্নযাত্রা
অরুন্ধতী রায়,
কলকাতা
ডিফেন্সের চাকরির ব্যস্ত ও নিয়মমাফিক জীবনের মাঝে হঠাৎ করেই যেন একটু
মুক্তির হাওয়া নিয়ে এলো আমাদের ডিগ্রীপুর ভ্রমণ। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে
আমরা উঠেছিলাম MV Nalanda ক্রুজে। সঙ্গে ছিল আমার মা-বাবা আর আমার সাড়ে
তিন বছরের ছোট্ট ছেলে। বহুদিন পর সবাইকে নিয়ে এমন পারিবারিক সফরের আনন্দ
যেন শুরু থেকেই মন ভরে দিচ্ছিল।
পোর্ট ব্লেয়ারের ফিনিক্স বে জেটি থেকে যখন এম ভি নালন্দা ধীরে ধীরে
সমুদ্র কেটে এগোতে শুরু করল, তখনই মনে হয়েছিল যেন এক অচেনা
স্বপ্নযাত্রার দিকে পা বাড়ালাম।ক্রুজ ধীরে ধীরে সমুদ্রের বুক চিরে
এগিয়ে চলছিল। চারপাশে শুধু নীল জলরাশি আর দূরে ছোট ছোট সবুজ দ্বীপ।
জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের হাওয়া গায়ে মাখতে মাখতে মনে হচ্ছিল,
জীবনের সমস্ত ক্লান্তি যেন ধুয়ে যাচ্ছে। আমার ছোট্ট ছেলে কখনো সমুদ্রের
দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে, কখনো আবার আনন্দে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। মা-বাবার
মুখেও ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি। চারদিকে নীল সমুদ্র, দূরে দূরে
সবুজ দ্বীপ, আর মাথার উপর ধূসর-নীল আকাশ সব মিলিয়ে এক অপার্থিব অনুভূতি।
জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের উত্তাল হাওয়ার মাঝে সূর্যাস্ত দেখার
সেই মুহূর্ত আজও চোখে লেগে আছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের আলো আর
সমুদ্রের অন্ধকার যেন এক অন্য জগতের গল্প শোনাচ্ছিল।
পরদিন সকালে পৌঁছলাম ডিগলিপুর। আন্দামানের উত্তর প্রান্তের এই শান্ত
সুন্দর জনপদ যেন প্রকৃতির নিজের হাতে সাজানো। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে
সবুজ বন আর নির্জন সমুদ্রসৈকত সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। থাকার
জন্য যে হোটেলটি বেছে নিয়েছিলাম সেটিও ছিল অত্যন্ত সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও
ঝকঝকে। বড় বড় কাঁচের জানালা দিয়ে দূরের সবুজ আর নীল আকাশ দেখা
যেত।সকালে ঘুম ভাঙত সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দে। বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে
সূর্যোদয় দেখা যেন স্বপ্নের মতো লাগত। সকালে গরম চা আর স্থানীয় স্বাদের
খাবার দিয়ে দিন শুরু হত, আর রাতের খাবারে ছিল সমুদ্রের টাটকা মাছের
অসাধারণ স্বাদ।
সমুদ্রস্নানের অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ। ঢেউ এসে পায়ে আছড়ে পড়ছিল আর আমার
ছেলে আনন্দে হেসে উঠছিল। বিচে টাঙানো দোলনায় শুয়ে দুলতে দুলতে ঠান্ডা
ডাবের জল খাওয়ার মুহূর্তগুলো আজও চোখে ভাসে। চারপাশে নীল আকাশ, সামনে
বিশাল সমুদ্র আর নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়া, - মনে
হচ্ছিল সময় যেন থমকে গেছে।
তিন রাত চার দিনের এই ভ্রমণে ঘুরে দেখলাম ডিগলিপুরের নানা সৌন্দর্য। Ross
and Smith Islands-এর সেই বিখ্যাত বালির রাস্তা, যেখানে সমুদ্র দু’ভাগ
হয়ে মাঝখানে সাদা বালির পথ তৈরি করেছে, সত্যিই স্বর্গের মতো সুন্দর।
Kalipur Beach-এর কালো বালির সৈকতে বসে ঢেউয়ের শব্দ শুনতে শুনতে সময়
কেটে যেত। আবার কখনো ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ছোট ছোট রাস্তা ধরে এগিয়ে
গেছি স্থানীয় গ্রামগুলোর দিকে।
সবচেয়ে বেশি মন ছুঁয়ে গিয়েছিল ডিগলিপুরের বাঙালি গ্রামগুলো। মনে
হচ্ছিল যেন বহু দূরের আন্দামানে নয়, বাংলার কোনো শান্ত গ্রামে এসে
পড়েছি। মাটির উঠোন, তুলসী মঞ্চ, নারকেল সুপারি গাছ, পুঁই মাচা, উচ্ছে,
ঝিঙে, চিচিঙ্গে, সিমের ভারা, বাড়ির পাশে কলাগাছ, পুকুরে চরা হাঁস
সবকিছুতেই ছিল বাংলার চেনা গন্ধ। গ্রামের মানুষজনও অত্যন্ত আন্তরিক। কেউ
ডেকে জল খাইয়েছে, কেউ গল্প করতে বসেছে, কেউ আবার নিজেদের জীবনের কথা
শুনিয়েছে। দূর সমুদ্রের দ্বীপে থেকেও তারা কী সুন্দরভাবে নিজেদের বাংলা
সংস্কৃতি, ভাষা আর উৎসবকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তা দেখে সত্যিই অবাক হতে
হয়।
সন্ধ্যাবেলায় গ্রামের সরু রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে যখন দূরে শাঁখের
শব্দ আর ভেসে আসা বাংলা গানের সুর শুনছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সব
ব্যস্ততা থেকে বহু দূরে এক শান্ত নিরিবিলি বাংলায় এসে পৌঁছেছি।
ডিগলিপুর শুধু একটি ভ্রমণস্থল নয়, এটি এক অনুভূতি; যেখানে সমুদ্রের নীল,
জঙ্গলের সবুজ আর বাঙালিয়ানার উষ্ণতা একসঙ্গে মিশে গিয়ে মনে চিরকালের
জন্য এক টুকরো শান্তির ছবি এঁকে দেয়।
চারদিন তিনরাত্রির এই সফর যেন শুধু বেড়ানো ছিল না, ছিল পরিবারের সঙ্গে
কিছু অমূল্য মুহূর্তকে বাঁচিয়ে রাখার এক সুন্দর চেষ্টা। ডিফেন্সের কঠোর
নিয়মের জীবনের বাইরে এই কয়েকটা দিন আমাকে নতুন করে শান্তি, আনন্দ আর
পরিবারের উষ্ণতা অনুভব করিয়েছে। ডিগ্লীপুরের নীল সমুদ্র, শান্ত গ্রাম আর
সেই সুন্দর মুহূর্তগুলো আজও মনে পড়লে মন ভরে যায়।