দেবী মা / কুমারী মা
তমাল আচার্য ,
গোরক্ষপুর, উত্তর প্রদেশ
শারদ সন্ধ্যা। শুক্লা অষ্টমী, দেবী মা দুর্গার সন্ধ্যা আরতি শেষে প্রবর
পুরোহিত শাস্ত্রী মশাই বিশ্রাম হেতু নিজের স্বয়ং কক্ষে গেলেন।
ভক্ত দর্শকদের ঢাক কাঁসর নানান বাদ্যযন্ত্রের মিশ্রণ শব্দে, কলরবে পূজা
প্রাঙ্গণ মুখর। ভেসে আসা শব্দের মাঝে শাস্ত্রী মশাই ক্লান্ত শরীরটা
বিছানায় এলিয়ে দিয়েছেন, ইত্যবসরে দরজায় মৃদু আঘাত।
"দরজা খোলা আছে, এসো"- বললেন শাস্ত্রী মশাই।
ক্ষন মধ্যে তিনজন মাতৃ স্থানিয়া সুবেসি লাবণ্যময়ী মহিলা ঘরে প্রবেশ করে
শাস্ত্রী মশাই কে প্রণাম করে একটু দূরে বসলেন। সামান্য স্মিত হাসিতে
শাস্ত্রী মশাই আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। তাঁদের একজন জানালেন, "আমরা
এসেছি আপনার কাছ থেকে 'কুমারী পূজা'- সম্বন্ধে জানতে। কেন এ পূজা হয়,
কেনই বা শিশু বালিকাদেরই পূজা করা হয়।"
স্নিগ্ধ স্মিত হাসিতে শাস্ত্রী মশাই বললেন,
-পুরানে কথিত আছে বানাসুর নামে এক অজেয় মহাপরাক্রমশালী অসুরের অত্যাচারে
দেবগন স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়ে দেবী দুর্গার শরণাপন্ন হলেন। তাদের আর্ত
আবেদনে করুণাময়ী মা দেবগন কে রক্ষা করার নিমিত্তে কুমারী রূপে শুক্লা
অষ্টমী তিথিতে ঘোরতর যুদ্ধ শেষে অসুরকে বধ করে দেবতাদের মাঝে শান্তি
ফিরিয়ে দিলেন। সেই কাল থেকে কুমারী পূজার প্রচলন। এ পূজার চলন মা
দুর্গা, মা জগদ্ধাত্রী, মা অন্নপূর্ণা, মা কালিকা পূজা তেও আছে।
প্রয়োজনে শুক্লা নবমী তিথিতে ও এ পূজার বিধান আছে। শাস্ত্র মতে অনূর্ধা
১৬ বছরের অনুঢা কন্যাদের কুমারী পূজায় পূজা করা হয়। বালিকাদের বয়স
অনুসারে এক এক নামে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন-
১ বছরের কন্যা সন্ধ্যা
২ বছরের সরস্বতী
৩ বছরের ত্রিধামূর্তি
৪ বছরের কালিকা
৫ বছরের শুভগা
৬ বছরের উমা
৭ বছরের মালিনী
৮ বছরের পুঞ্জিকা,
৯ বছরের কাল সন্দর্ভা বা
১০ বছরের অপরাজিতা
১১ বছরের রুদ্রানী
১২ বছরে ভৈরবী
১৩ বছরের মহালক্ষ্মী
১৪ বছরের পিঠনায়িকা
১৫ বছরে ক্ষেত্রজা
১৬ বছরে অম্বিকা
শাস্ত্রী মশাই বলে চলেছেন.....
তবে কি জানো মা জননীরা, চার বছরের কালিকা পাঁচ বছরের সুভগা ছয় বছরের উমা
এবং সাত বছরের মালিনী বালিকাদের পূজা শ্রেয়। ঠাকুর রামকৃষ্ণের কথায়-
'মাটির প্রতিমা পূজা হয়, মানুষের হয় না। ' ছোট শিশুদের নির্মল আধার
হওয়ার ফলে দেবী প্রকৃতির প্রভাব বেশি থাকে আর এই ভাবনাতেই ঠাকুর মা
সারদাকে পূজা করেন দেবী জ্ঞান করে।
মহিলাদের একজন জিজ্ঞাসা করলেন- " ঠাকুর মশাই, আমাদের এই হিন্দু সমাজে কবে
থেকে কুমারী পূজা শুরু হয়? "শাস্ত্রী মশাই তার কাছে রাখা কিছু ফল
মিষ্টান্ন এর মধ্যে থেকে কিছু মিষ্টি তাদের দিয়ে বললেন একটু মিষ্টি খাও,
ফল দিলাম না, কারণ রাতে ফল খেতে নেই। তারপর তিনি বললেন বেলুড় মঠে ১৯০১
সালে স্বামী বিবেকানন্দ সারদা মায়ের উপস্থিতিতে দেবী পূজার শুক্লা
অষ্টমী তিথিতে নয় জন কুমারী বালিকার কুমারী পূজা করেন, যা আজও পালন
হচ্ছে। স্বামীজি বলেন শিশু বালিকাদের কোন ধর্ম বা জাতি নেই
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ত্রিশক্তির উৎসই কুমারীতে। এক কথায় স্বামী বিবেকানন্দ
এই কুমারী পূজার প্রবর্তক। স্বামীজী ১৮৯৮ তে কাশ্মীরে ভ্রমণে থাকাকালীন
দুর্গাষ্টমীর দিনে এক চার বছরের কাশ্মীরি মুসলমান মেয়ের পূজা করেছিলেন।
১৮৯৯ তে একটি ব্রাহ্মণ কন্যার পূজা করেছিলেন কন্যাকুমারীতে। বর্তমান
সময়ে ঘরে ঘরে নানান পূজা প্রাঙ্গণে কুমারী পূজার প্রচলন শুরু হয়ে গেছে।
একটু থেমে শাস্ত্রী মশাই বলতে শুরু করলেন মা জননীরা মহাভারতের যুদ্ধের
প্রাক্কালে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন এই পূজা করেছিলেন। মা জননীরা জেনে নাও
আস্থা বিশ্বাস সবচাইতে বেশি মানুষের মনে গাঁথা থাকলে দেখবে পৃথিবী ভীষণ
সুন্দর। কথায় বলে 'বিশ্বাসে মিলায় কৃষ্ণ, তর্কে বহু দূর।' শাস্ত্রী
মশাই চুপ হলেন।
রমনী তিনজন শাস্ত্রী মশায়ের পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করে বললেন আপনার
কাছ থেকে কুমারী পূজা সমন্ধে বেশ কিছু জানতে পারলাম, ভালো লাগলো। আসি
ঠাকুর মশাই।
এসো মা জননীরা, "দুগ্গা দুগ্গা"- বলে শাস্ত্রী মশাই তিনটি অপস্রীয়মান
দেহের দিকে তাকিয়ে দুহাত জড়ো করে অভ্যাসমতো কপালে ঠেকিয়ে মায়ের
উদ্দেশ্যে ক্লান্ত সুরে বলে উঠলেন-
'যা দেবী সর্বভূতেষু, মাতৃরূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যই নমস্তস্যই নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।।'
(পুরান কথা ও লোককথা থেকে সংগৃহীত)