চোখে দেখাটাই সব নয়(দ্বিতীয় পর্ব)
অর্ঘ্যদীপ গুড়িয়া,
নিউ-দিল্লি
পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য
লাইব্রেরি
বিভাগে দেখুন...
পরদিন সকালে, যখন প্যান্ডেল আবার ভিড়ের জন্য প্রস্তুত, আদিত্য ছদ্মবেশে
বের হল। তার চোখ চারপাশে খুঁজছে—স্যান্ডেল রাখার জায়গায় কে যাচ্ছে। সে
লক্ষ্য করল ফুটেজে দেখা ছেলেটি আবার এসেছে।
কিছুটা দূর থেকে সে চারপাশ পরীক্ষা করল, যেন কেউ লক্ষ্য না করে। এইবার সে
নীরবে জুতো স্টান্ডের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
ছেলেটি হাত বাড়াল এবং আরেকটি জুতো তুলে নিল। ঠিক সেই মুহূর্তে আদিত্য
ছেলেটিকে খপ করে ধরে ফেলল।
ছেলেটি প্রথমে চমকে গেল, তারপর ভয় পেয়ে কেঁদে উঠল।
— “দাদা, আমি… আমি… আমি কিছু জানি না।”
আদিত্য ছেলেটির চোখে চোখ রেখে বলল—
— “কিছু জানো না মানে? যা জানো খুলে বলো। না বললে কিন্তু পুলিশ
ডাকবো।”
ভয় পেয়ে ছেলেটি ধীরে ধীরে সব খুলে বলল। সে জানালো, এটা এক বড় চক্রের
কাজ। প্রতিটি বাচ্চা একটি নির্দিষ্ট সময়ে চুরি করতে আসে, তাদের সবাইকে
পরিচালনা করে *ভোলা বাউজি*। ছেলের দল প্যান্ডেল, মন্দির, বাজার—যেখানেই
সুযোগ পায়, সেখান থেকে নতুন চপ্পল চুরি করে, আর সেই চুরি করা জুতো
বাউজির লোকেরা তাদের থেকে নিয়ে বিক্রি করে দেয় স্থানীয় দোকানিদের
কাছে। এক জোড়া চপ্পল ৩০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। সারা বছরই এই
ব্যবসা চলে রমরমিয়ে।
আদিত্যর রাগ যেমন হলো তেমনই অবাকও হলো। সে বুঝল—এটা শুধু তার মা’র
স্যান্ডেল হারানো নয়। এটা একটা বিরাট চক্র, যেখানে অসংখ্য বাচ্চা
প্রতিনিয়ত কারো না কারো চপ্পল চুরি করছে আর কোন না কোন মানুষ হারাসমেন্ট
এর শিকার হচ্ছে। যে ঘটনা আর পাঁচজনের চোখে একেবারে একটা নিতান্ত সাধারণ
ঘটনা মাত্র। তার পেছনে যে বিরাট একটা গাং কাজ করছে এটা কিন্তু কারোর
চোখেই ধরা পড়ছে না।
আদিত্যর বুঝলো—সবই পরিকল্পিত। শুধু এই প্যান্ডেলেই নয়, শহরের বিভিন্ন
প্যান্ডেল, মন্দির—সকল স্থানে এই চক্র কাজ করছে।
আদিত্য হঠাৎ ভাবল, শুধু ছেলেটিকে ধরে ফেলা যথেষ্ট নয়। তাকে পুরো চক্রের
মূল পান্ডার দিকে যেতে হবে।
— “তাহলে ঠিক আছে,” সে মনে মনে বলল,
— “আজ আমি সেই আস্তানায় যাব যেখানে সব পরিকল্পনা তৈরি হয়।”
সন্ধ্যেবেলা, ছেলেটির কথা অনুসরণ করে আদিত্য পৌঁছল বস্তির দিকে। কিছু
পুরোনো ছোট ঘর, তার মধ্যে একটি ঘরে অনেক গুলো বাচ্চা একত্রিত হয়ে চুরি
নিয়ে আলোচনা করছে।
আদিত্য লক্ষ্য করল আশেপাশে আর তেমনভাবে সন্দেহভাজন কাউকে চোখে পরলো না।
সে চুপচাপ এগোতে লাগল।
বস্তির একটা বাঁক মুড়তেই হঠাৎ, একদল মানুষ দেখল তাকে। তাদের মধ্যে থেকে
চারজন দ্রুত এগিয়ে এসে ধরে ফেলে এবং জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। আদিত্য
প্রথমে কিছুটা চমকে গেল, কিন্তু ভয় পেল না। তারা তাকে একদম ভোলার ডেরায়
নিয়ে গেল।
এখানে অনেকগুলো বাচ্চা চুরি করা জুতোগুলোকে ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করে
বাক্সের মধ্যে প্যাকিং করতে ব্যস্ত। তাদের মাঝখানে একটা চেয়ার পেতে
আদিত্যর হাত-পা বেঁধে বসিয়ে রেখে গেলো লোকগুলো। তবে আদিত্যকে নিয়ে
বাচ্চাগুলোর মধ্যে কোনরকম মাথা ব্যথা নেই। তারা নিজেদের মতো হাসাহাসি
করছে, কথা বলছে, গল্প করছে আর খুব মনোযোগ সহকারে নিজের কাজগুলো করে
যাচ্ছে। আদিত্য লক্ষ্য করল তাদের কথাবার্তায় শিক্ষার ছাপ স্পষ্ট।
অন্যান্য বস্তির বাচ্চাদের মত অশ্লীল ভাষায় কথা বলছে না তারা। কিন্তু এই
নোংরা এঁদো বস্তিতে এটা খুবই আশ্চর্যের!
আদিত্য চোখে বুঝিবা একটু ঝিম ঝিম ভাব এসেছিল, তবে তা বেশিক্ষণ স্থায়িত্ব
হলো না। আদিত্য চোখ খুলে দেখলে তার সামনে একজন বেশ শক্ত সমর্থ্য কিন্তু
বয়স্ক মানুষ বসে তার দিকেই তাকিয়ে আছেন। আদিত্যের বুঝতে অসুবিধা হলো না
যে সেই ব্যক্তিটি ভোলা বাউজি ছাড়া আর কেউ নয়।
ভোলা বাউজি বয়সে বৃদ্ধ কিন্তু চোখের দৃষ্টি যেন শানিত ছুরি। তিনি দৃপ্ত
কড়া চোখে আদিত্যের মুখের উপর ঝুঁকে তাকিয়ে ছিলেন।
— “ এই ছেলে কে তুমি? এ সময়ে তুমি এখানে কেন?”
আদিত্য বলল—
— “আমি স্টুডেন্ট, তেমন কেউ নই। আমার কলেজের অ্যাসাইনমেন্ট করার জন্য
আপনাদের বস্তিটা দেখতে এসেছি।”
ভোলা হেসে বললেন—
— *“হুম… আমি জানি তুমি কে এবং কি চাও।
তুমি তো আদিত্য, এস এ টি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছো, আর তার জন্য স্টাডি
মেট- এর সাহায্য নিয়েছো তাই না?
আদিত্য খুব অবাক চোখে ভোলাবাউজির দিকে তাকিয়ে থাকে, তার চোখে একরাশ
প্রশ্ন। মনের মধ্যে ঘুরতে থাকে নানান কথা, তার নাম, সে কি পড়াশোনা করছে,
আগে কি করতে চায় এই লোকটা সবই জানে! লোকটা কি মন পড়তে পারে, না আর
কিছু?
তাই দেখে স্মিত হেসে ভোলাবাউজি বলল- মনে তোমার অনেক প্রশ্ন তোমার সব
প্রশ্নের জবাব তুমি পাবে, তবে আগে বসো, গল্প শোনো।”*
আদিত্য অবাক, কিন্তু আর কোন কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বসে গেল।
ভোলা বলতে লাগলো, ছোটবেলায় কীভাবে তিনি প্রথম চুরি করেছিলেন, কেন এবং
কীভাবে শিশুদের ব্যবহার করে চুরি টা কে বড় ব্যবসায় পরিণত করলেন। তিনি
বললেন—
তার প্রথম চুরি ছিল ক্ষুধার্ত অবস্থায়, এক গৃহস্থের বাড়ি থেকে দুটো
রুটি চুরি করে খেয়েছিলেন। গৃহস্থ সেই দম্পতি বুঝতে পেরেও কিছু বলেননি।
তাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন আর সেটাই তার জন্য একটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল। তিনি
বুঝতে পারলেন ছোট চুরি, কম ঝুঁকি, কিন্তু বেশি লাভ।
তিনি বুঝেছিলেন খাবার চুরি করে খেলে শুধু সেদিনের মত পেট ভরে, পরের জন্য
কিছুই থাকে না। আবার নতুন চুরি করতে হয়। তার চেয়ে এমন কিছু চুরি করা
উচিত যেটা দিয়ে খুব সহজেই নিজের সাথে সাথে আরো পাঁচজনের জীবন চালিয়ে
নেয়া যায়। সেই মতো তিনি এই জুতো চুরির ব্যবসা শুরু করলেন। প্রথমে একজন
সাথী, তারপর দুজন, তারপর চারজন, তারপর দশজন, এইভাবে করতে করতে আজ তার দলে
বাচ্চা বড় মিলিয়ে প্রায় ছয় লক্ষ জন কাজ করছে। তার চক্র শুধুমাত্র এই
এলাকা বা এই শহরেই নয় সারা দেশ জুড়ে চলছে।
তবে তিনি যে নিজের সাথে সাথে কেবল পাঁচ জনের খাদ্যের সন্ধানই করলেন না
তার সাথে সাথে ব্যবস্থা করলেন তাদের পড়াশোনার এবং ভালোভাবে সম্মানের
সাথে বাঁচার সুযোগ।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় তৈরি করেছেন প্রাইমারি থেকে সেকেন্ডারি সব ধরনের
শিক্ষা নিকেতন, যেখানে দুস্থ বাচ্চারা প্রায় বিনা মাইনেতে পড়তে পায়।
এবং স্কুলের পরেও উচ্চশিক্ষার জন্য স্টাডিমেট এর মত সংস্থা তারই তৈরি।
যাতে করে দেশের পিছিয়ে পড়া এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা বাচ্চারা খুব
সহজেই পড়াশোনা করার এবং সেই সাথে বিদেশি বিভিন্ন নামি দামি
ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পাবে এবং সাথে স্কলার্শিপও পাবে।
ভোলা স্পষ্ট করলেন, এই ব্যবসা কখনও সরাসরি কারও ক্ষতি করে না, শুধু
বস্তির শিশুদের সুযোগ দেয়। আমি চাইলে বাচ্চাগুলোকে পয়সা দিয়ে সাহায্য
করতেই পারি। কিন্তু পয়সা হাতে পেলে ওদের মধ্যে কর্মস্পৃহা কমে যাবে। আর
ওরা এখন কাজ করে হাতে পয়সা পায় তাতে করে ওদের আত্মনির্ভরতা বাড়ে।
আদিত্য হতবাক, কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারল—ভোলা এই চক্র ব্যবহার করে
শিশুদের এক ধরনের নিরাপদ উপার্জনের সুযোগ দেয়, সাথে শিক্ষারও ব্যবস্থা
করেছেন।
আদিত্যর মনে প্রশ্নের ঝড়—এটা কি অপরাধ, নাকি সমাজসেবা?
ভোলা বলে চলেছেন—“এটা দেখতেই শুধু চুরি, কিন্তু পরিকল্পনা এবং উদ্দেশ্য
ভিন্ন।
আদিত্য গভীরভাবে ভোলা বাউজির কথাগুলো শুনল। ভোলার চোখে মমতা, অভিজ্ঞতা,
এবং বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল। সব মিলিয়ে ভোলা যেন এক জটিল চিত্র।
ক্রমশ..............