বুকের আগল ঠেলে
অনিন্দিতা গুড়িয়া,
নিউ-দিল্লি
শ্রাবণের বিকেল, সকাল থেকেই আকাশের মুখটা থমথমে ভার ভার। ছোট্ট একটি
গ্রাম মনোহরপুর। গ্রামের এক পাশ দিয়ে কুল কুল করে বয়ে চলেছে ছোট্ট নদী
তটিনি। তবে এই ভরা বর্ষায় ছোট্ট তটিনি আর ছোট্টটি নেই, সে উচ্ছল উদ্দাম
যৌবনা কিশোরী তে পরিণত হয়েছে। গ্রামটি ছোট্ট হলে কি হবে? সবরকম
সুযোগ-সুবিধা সে গ্রামে আছে। কি নেই সেখানে! স্কুল, কলেজ, হসপিটাল পোস্ট
অফিস, ব্যাংক, মায় একটি বেশ বড়সড়ো লাইব্রেরিও আছে সেখানে।
লাইব্রেরিটার নাম “প্রগতি পাঠাগার”। হাই স্কুলের ঠিক পাশেই লাইব্রেরীটা।
বিকেল হলেই সেখানে দু-একজন করে ভিড় জমায়। নিস্তব্ধতা, বইয়ের গন্ধ,
পুরোনো কাঠের তাকের ধুলো, আর বেশ পুরানো সিলিং ফ্যান ঘোরার মৃদু
ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দে একটা আলাদা শান্তি আছে।
ভারতীয় সামরিক বিভাগের নৌ বাহিনীর ফ্ল্যাগ অফিসার অরুময় সেনের একমাত্র
সন্তান ডঃ ঋদ্ধিমান সেন। বছর আঠাশের সুঠাম সুদর্শন ঋদ্ধিমান বছর দুয়েক
হলো মনোহরপুর কলেজের ইংরেজির প্রফেসর হয়ে এসেছে। এই পাড়ারই একটি
বাড়িতে মা রনিতা সেনের সাথে থাকে। ছুটি ছাটাতে বাবা অরুময় সেন তাদের
সাথে এসে দেখা করে সময় কাটিয়ে যান। ঋদ্ধি রোজই লাইব্রেরীতে আসে। কিন্তু
বই পড়তে নয়, - অন্তত আজকাল তো নয়ই। সে আসে মেঘলার জন্য। লাইব্রেরীতে
এসে কোন একটি বই বা জার্নাল নিয়ে এক কোণের একটি টেবিল দখল করে বসে বই এর
আড়ালে মুগ্ধ বিস্ময়ে অনিমেষ নেত্রে চেয়ে থাকে মেঘলার দিকে।
মেঘলা চট্টোপাধ্যায়, নিখুঁত নাক নকশার অধিকারিনী ঈষৎ শ্যামবর্মা সুশ্রী
মেয়েটি সাইকোলজি নিয়ে মাস্টার্স এর ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট। এই
লাইব্রেরীটা মেঘলার দাদু ডাক্তার প্রগতি প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় নিজের
খরচায় তৈরি করেছিলেন। ডাক্তার বাবু আজীবন এই মনোহরপুরের হসপিটালেই
মানুষের সেবা করে গেছেন। তিনি অবশ্য লাইব্রেরিটার কোন নাম দেননি, তবে
তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে অর্থাৎ মেঘলার বাবা নির্মাল্য চট্টোপাধ্যায়
তাঁর পিতার নামে লাইব্রেরীটার নামকরণ করেছেন।
প্রায় প্রতিদিনই ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে সালোয়ার কামিজ ছেড়ে শাড়ি
পরে, লম্বা চুলে হাত খোঁপা করে মেঘলা লাইব্রেরীতে এসে বসে। বাবা
নির্মাল্য চট্টোপাধ্যায় হাই স্কুলের টিচার আর মা সংঘমিত্রা
চট্টোপাধ্যায় ব্যাংকের কর্মচারী। তার দাদা সূর্যশেখর চট্টোপাধ্যায়
বরাবর হোস্টেলে থেকেই পড়াশোনা করেছে। বর্তমানে সে আমেরিকার বস্টন শহরে
নামকরা কার্ডিওলজিস্ট। ঠাকুমা শ্যামা সুন্দরী দেবী গত হওয়ার পর সেই কোন
ছোট্টবেলায় প্রাইমারি স্কুলে পড়া কালিন হসপিটাল থেকে রিটায়ার্ড দাদুর
হাত ধরে লাইব্রেরীতে আসার সূচনা মেঘলার। বইয়ের গন্ধ মেঘলাকে পাগল করে।
সে রোজ বইগুলিকে ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করে আবার সুন্দর করে আলমারির মধ্যে
গুছিয়ে রাখে। এ যেন তার কাছে এক ভারী মজার খেলা। প্রতিটা আলমারির
প্রতিটা তাকের প্রতিটা বই তার নক্ষ দর্পণে। আর বই পড়াটা তার নেশা।
বোধহয় লাইব্রেরীতে এমন কোন বই নেই যা সে পড়েনি। কিছু কিছু বই তো আবার
বেশ কয়েকবার করে পড়েছে। যখনই লাইব্রেরীতে নতুন বই আসে সবার আগে সে
পড়ে। পরে সেগুলো রেজিস্ট্রেশন নম্বর লাগিয়ে রেজিস্টারে তুলে তারপর
আলমারির তাকে সযত্নে গুছিয়ে রাখে।
আবার কেউ বই নিতে এলে বা ফেরত দিতে এলে, মাঝে মাঝে মোটা লম্বা
রেজিস্টারটা টেনে নিয়ে বইয়ের নাম, লেখকের নাম, যিনি বই নিতে বা ফেরত
দিতে এসেছেন তার নাম, সবকিছু সুন্দর করে গুছিয়ে নোট করে রেখে দেয়।
মেঘলা নিজেকে লাইব্রেরিয়ান না বলে লাইব্রেরির স্বেচ্ছাসেবক বলতেই বেশি
পছন্দ করে। আপাত দৃষ্টিতে শান্ত কিন্তু কাজোল কালো টানা চোখ দুটো হরিণীর
মতো উজ্জ্বল আর চঞ্চল। সবসময় মুখে একটা স্মিত টানা হাসি লেগেই আছে। সবার
সাথে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই কথা বলে সে। অথচ সেই স্বাভাবিকতাই ঋদ্ধির
কাছে অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। সে বহুবার ঠিক করেছে - আজ বলব। খুব সহজ একটা
কথা -
“মেঘলা তোমাকে ভালো লাগে।”
কিন্তু কথায় বলে- "সহজ কথা যায় না বলা সহজেই"।
তাই বুক ফাটে কিন্তু মুখ আর ফোটেনা।
সেদিন ঋদ্ধি একটু দেরি করেই লাইব্রেরীতে এসেছিল। ভেবেছিল বুঝি
লাইব্রেরীটা এই সময় খালি থাকবে, কিন্তু তখনও বেশ কয়েকজন লাইব্রেরীতে
বসে বই পড়ছে, আবার কয়েকজন বই হাতে নিয়ে এন্ট্রি করানোর লাইনে
দাঁড়িয়ে আছে। অগত্যা ঋদ্ধিও বিভিন্ন আলমারির তাক খুঁজে খুঁজে বই বের
করার অছিলায় সময় নষ্ট করছিল। শ্রাবণ মাসের মেঘলা বিকেল, তাই সময়ের বেশ
আগেই সেদিন অন্ধকার হয়ে এসেছিল। লাইব্রেরী বন্ধ হওয়ারও আর বেশি দেরি
নেই, সবাই প্রায় লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে গেছে। গুটি গুটি পায়ে ঋদ্ধি
বইয়ের কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়ালো। হাতে শরৎচন্দ্রের 'দত্তা'। মেঘলা
হাসিমুখে বলল,
- “আপনি বুঝি শরৎচন্দ্র খুব পড়েন?”
ঋদ্ধি বলতে চেয়েছিল, “না, আজ তোমার সামনে দাঁড়ানোর অজুহাত হিসেবে বইটা
হাতে নিয়েছি।”
কিন্তু সে বলল,
- “হ্যাঁ… মানে…এই একটু-আধটু।”
মেঘলা বইটা এন্ট্রি করতে করতে বলল,
- “এই বইটা কিন্তু খুব সহজ ভাষায় গভীর উপলব্ধির কথা বলে।”
ঋদ্ধির মনে হল, কথাটা যেন তারই জন্য বলা। সে বলে ফেলতে চাইলে -
“আমি-ও তোমাকে খুব সহজ করে আমার হৃদয়ের একটা গভীর উপলব্ধির কথা বলতে
চাই…”
কিন্তু গলা শুকিয়ে গেল। শব্দগুলো মাথায় তৈরি হল, ঠোঁট পর্যন্ত এল,
তারপর কোথায় যেন হারিয়ে গেল। যেন বুকের ভেতরেই কেউ দরজা বন্ধ করে
দিল।
হঠাৎ লাইব্রেরির বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। আর ঠিক তখনই ঋদ্ধির
পাঞ্জাবির পকেটে রাখা ফোনটা বেশ জোরে শব্দ করে বেজে উঠলো। খালি
লাইব্রেরীতে গমগম করে বেজে উঠলো রিংটোনে শ্রীকান্ত আচার্যের কন্ঠে রবি
ঠাকুরের গান-
"এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়।
এমন দিনে মন খোলা যায়--
এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরোঝরে
তপনহীন ঘন তমসায়॥" -
ঋদ্ধি লাইব্রেরীর দরজার দিকে সরে গিয়ে ফোনটা বের করল পকেট থেকে, দেখলো
তার মায়ের ফোন। ফোনটা তুলল ঋদ্ধি -
- "হ্যাঁ মা বল,"
- "তোকে বারবার করে বললাম ছাতাটা নিয়ে যাওয়ার জন্য কিন্তু তুই নিলি না,
বাইরে খুব বৃষ্টি নেমেছে, তুই কোথায় আছিস?"
- "আমি লাইব্রেরীতে আছি মা। তোমায় চিন্তা করতে হবে না"
- "তুই যেন ভিজিস না খোকা"
- " না না মা, আমি ভিজছি না, বৃষ্টি থামলেই আমি বাড়িতে ফিরব।"
বলেই কল টা কেটে দিল ঋদ্ধি। কিন্তু মা আর কি করে বুঝবে- তার খোকা ভেতরে
ভেতরে প্রেমের অঝোর ধারায় আপদ মস্তক ভিজে চলেছে। শুধু ভিজে চলেছে বললেই
ভুল বলা হবে, কাঁচা মাটির মূর্তির মত একটু একটু করে গলে চলেছে।
লাইব্রেরীর টিনের ছাদে অনর্গল বৃষ্টির শব্দ যেন এক মোহময় কনসার্টের মতো
শব্দ তুলেছে। এই মুহূর্তে মেঘলার কান উৎকীর্ণ হয়ে উঠল রিংটোনের গানটি
পুরো শোনার জন্য, এই গান যে তার বড় প্রিয় একটি গান। কিন্তু প্রথম
স্টেনজার পরে আর শোনা গেলো না, ফোনটা ঋদ্ধি ধরে ফেলেছে। কিন্তু মেঘলার
মনের মধ্যে তখন গানের কলি গুলো ডানা মেলে দিয়েছে। মেঘলা জানলার বাইরে
সবুজ ঝোপটার দিকে তাকিয়ে গুন গুন করে গেয়ে উঠল গানটির পরের লাইনগুলি
-
"সে কথা শুনিবে না কেহ আর,
নিভৃত নির্জন চারি ধার।
দুজনে মুখোমুখি গভীর দুখে দুখি,
আকাশে জল ঝরে অনিবার--
জগতে কেহ যেন নাহি আর॥" -
ঋদ্ধি কখন যে এসে তার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়েছে মেঘলার খেয়াল নেই। সে
আপন মনে জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে গান গেয়ে চলেছে। তার সম্বিত ফেরাতে
ঋদ্ধি একটু খুক খুক করে কাশলো। মেঘলা গানটা থামালো বটে কিন্তু ঋদ্ধির
দিকে না তাকিয়ে জানালার বাইরে হাই স্কুলের খেলার মাঠের ওপারে দূরের
শ্রাবণের অঝোর ধারায় ভেজা বাতাসে দুলতে থাকা বড় নারকেল গাছটার দিকে
তাকিয়ে বলে উঠল,
- “বৃষ্টি হলে সবকিছু কেমন পরিষ্কার লাগে, না?”
ঋদ্ধি ভাবলো, এটাই সুযোগ। সে জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বলল,
- “হ্যাঁ… মনের অলিগলির ভিতরে চাপা পড়ে থাকা অনেক কথাও পরিষ্কার হয়ে
যায়।”
- “যেমন?” মেঘলার প্রশ্ন।
ঋদ্ধি এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল,
- “যেমন… কাউকে ভালো লাগলে সেটা চেপে রাখা ঠিক নয়।”
মেঘলা একটু অবাক হয়ে ঋদ্ধির দিকে তাকাল, বোধহয় ব্যাপারটা একটু ভালো করে
বোঝার চেষ্টা করল। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। বাইরে নাগাড়ে বৃষ্টি
পড়ছে।
- “তাহলে চেপে রাখেন কেন?” মেঘলার কণ্ঠে হালকা কৌতুক।
ঋদ্ধির বুকের ভেতর কাঁপন শুরু হয়েছে। এতদিনের আটকে থাকা শব্দগুলো যেন
হঠাৎই পথ খুঁজে পেল। সে খুব আস্তে মেঘলার কানের কাছে নিজের মুখটা এনে
প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল—
- “তোমাকে ভালো লাগে, মেঘলা।”
কথাটা বলেই সে বুঝল—এতদিন যে পাহাড়টাকে সে বুকের ওপর বয়ে বেড়াচ্ছিল,
তা আসলে ছিল একটা ছোট্ট পাথর। শুধু তুলতে সাহস লাগত।
মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
- “এই কথাটা বলতে এতদিন লাগল?”
ঋদ্ধি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। আস্তে করে বলল
- “সহজ কথা যায় না বলা সহজেই…”
বৃষ্টি থামল। আকাশে ফিকে আলো ফুটল। লাইব্রেরির ঘড়িতে ছ’টা বাজল। আর ঠিক
তখনই মেঘলার ফোনে তার মায়ের কল এলো, আর ফোনের রিংটোন টা বেজে উঠলো -
"ভালোবাসি ভালোবাসি
এই সুরে কাছে দূরে
জলে স্থলে বাজায় বাঁশি
ভালোবাসি ভালোবাসি। " -
কিছু কথা বলতে সময় লাগে—কারণ সেই কথাগুলো শুধু শব্দ নয়, তার সঙ্গে
জড়িয়ে থাকে ভয়, প্রত্যাশা, আর একটু স্বপ্ন। কিন্তু একবার বলা হয়ে
গেলে, পৃথিবীটা যেন সত্যিই একটু পরিষ্কার হয়ে যায়।